“ভারতীয় মুসলমানদের বলছি! এটা একটা অনুরোধ এবং সতর্কীকরণ। আগামী সপ্তাহে রামমন্দির নিয়ে অনলাইনে এবং অফলাইনে হইচই দেখতে পারেন। আপনাদের উপহাস করা হতে পারে, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হতে পারে, অপমান করা হতে পারে। অগ্রাহ্য করুন। যে কোনো বিতর্কিত জিনিস উপেক্ষা করুন। আপনার কাউকে কোনো প্রতিক্রিয়া জানানোর দরকার নেই। সবকিছু উপেক্ষা করুন। উত্তেজিত হয়ে পড়বেন না। অনর্থক বিতর্কে জড়াবেন না। আপনার নিরাপত্তাই সবচেয়ে বড় কথা।”

গত সপ্তাহে বিশিষ্ট সাংবাদিক ইসমত আরা নিজের ফেসবুক ওয়ালে এই পোস্ট করেন। বহুবার এই পোস্ট শেয়ার হয়। লেখাটা ঘুরতে থাকে নানা জনের (পড়ুন মুসলমানদের) ওয়ালে। এটাই ভারতীয় মুসলমানদের আজকের জীবনের রূঢ় বাস্তবতা। ইসমতের পোস্ট শুধু তাঁর নয়, তাঁর লেখায় প্রতিফলিত হয়েছে আপামর ভারতীয় মুসলমানের মানসিক অবস্থা। এ এমন এক সময় যখন আমাদের সুরক্ষার দায়িত্ব আমাদের, রাষ্ট্রের নয়। বিভাজনের তারাজুতে রাষ্ট্র নিজেই বাটখারা হয়ে গেছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে তারাজুর অন্যদিকে রেখে। বেচারা ভারতীয় মুসলমানদের আর কিছুই করার নেই নিজেদের সুরক্ষায় মন দেওয়া ছাড়া।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ট্রেনে চাপলে শুধুমাত্র নাম প্রকাশ পেয়ে গেলে প্রাণের ভয়, প্রেমিকাকে চুমু খেতে গেলে লাভ জিহাদের নামে কেস খাওয়ার ভয়, মাংস দিয়ে চারটে ভাত মেখে খেতে গেলে গণপিটুনিতে মরার ভয়, বাড়ি ভাড়া না পাওয়ার ভয়, কাগজ হারিয়ে গেলে এনআরসিতে নাম বাদ পড়ার ভয়, বাচ্চার নাম জেনে গেলে তার ক্লাসে বন্ধুরা তাকে একঘরে করে রাখবে – সেই ভয়। কেবল ভয়, ভয় আর ভয়। নিজেদের ভারতীয় প্রমাণ করতে করতে ভারতীয় মুসলমান ক্লান্ত।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময়ে ভারতীয় মুসলমানদের পূর্বপুরুষরা বেছে নেন ভারতবর্ষকে। মহম্মদ আলি জিন্নার পাকিস্তানের থেকে জওহরলাল নেহরু, মহাত্মা গান্ধীর ভারত তাঁদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়েছিল। দেশভাগের পর সবথেকে বড় ধাক্কা বোধহয় এদেশের মুসলমানরা পায় ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর। ঐতিহাসিক বদলা দাবি করে ভেঙে ফেলা হয় বাবরি মসজিদ। বাবরি ধ্বংসের পর প্রমাদ গুনতে থাকা ভারতীয় মুসলমানরা অনেকেই ভেবেছিলেন এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। শেষপর্যন্ত দোষীরা শাস্তি পাবে আর ন্যায় হবে। ’৯২ সালের পর ভারতীয় মুসলমান দেখেছে গোধরাকাণ্ড পরবর্তী দাঙ্গা, মুজফফরনগর দাঙ্গা। প্রত্যেকবার ভারতীয় মুসলমানদের ড্রয়িং রুমে এই নিয়ে কথা হয়েছে এবং শেষ হয়েছে এই আশা রেখে, যে ভারতের সংবিধান মজবুত। শেষপর্যন্ত সব ঠিক হয়ে যাবে।

৬ ডিসেম্বর, ১৯৯২ থেকে ২২ জানুয়ারি, ২০২৪। কেটে গেছে ৩২ বসন্ত। চারিদিকের চরম উল্লাস আর বিজয়োৎসবে ফিরে আসছে সেবার শীতকালের হাড় হিম করা স্মৃতি। বাড়ির উঠোনে খড়, ধানের তুষ আর বাঁশের মুড়ো দিয়ে ভিড় করে তাতে আগুন লাগানো হত। বিকেল থেকে রাতের খাওয়া পর্যন্ত সেই আগুনের তাপ নেওয়া ছিল রোজকার রুটিন। সেদিনও বসে আগুন তাপছিলাম। পাশে চটের বস্তায় বসে ছোট মাসতুতো বোন। পূর্ব দিক থেকে সজোরে একটা পাথর এসে পড়ল বস্তার ধারে। কয়েক ইঞ্চির জন্য বেঁচে গেল বোনের মাথাটা। তারপর কয়েকটা বাড়িতে এটাই হয়ে উঠল রোজ রাতের ঘটনা। বাড়ির বড়দের মুখে বাবরি মসজিদ ভাঙার কথা স্মৃতিপটে গেঁথে গেল। তবে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার এবং স্থানীয় নেতাদের ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। রোজ পালা করে বাড়ি পাহারা দিতে শুরু করলেন পার্টির ক্যাডাররা। সব ভুলে জীবন এগিয়ে গেল।

তারপর ২০০২ – গুজরাট দাঙ্গা। এহসান জাফরি, বিলকিস বানো – আজও ন্যায়বিচারের জন্য আইনের দরজায় যাঁরা দাঁড়িয়ে। যারা সেদিনের গুজরাটে মুসলিম নিধনের পুরোধা, আজ তারা ক্ষমতার অলিন্দে। ২০০২ সালের গোধরাকাণ্ড পরবর্তী দাঙ্গার পরেও ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে কোথাও একটা আশা ছিল, বিচার হবে এবং সারা দেশে ও জিনিস সম্ভব নয়। কিন্তু ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর থেকেই ভারতীয় মুসলমানদের ড্রয়িং রুমের ভাষা বদলাতে শুরু করে। দাঙ্গার জন্য একাধিক মহল যাঁকে অভিযুক্ত করেছিল, তাঁকে গোটা ভারতবর্ষ প্রধানমন্ত্রী হিসাবে মেনে নেবে, এটা ভারতীয় মুসলমানদের কাছে তখনো অকল্পনীয় ছিল। তারপর থেকে উগ্র ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি এবং মুসলমানবিদ্বেষ তাঁদের ঠেলে দেয় ব্যাকফুটে। রাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কর্পোরেট মিডিয়া হাউসগুলো রাতের প্রাইম টাইম খবরে লাভ জিহাদ, করোনা জিহাদ ইত্যাদি নামের মুসলমানবিদ্বেষের মুচমুচে পকোড়া বিক্রি করতে শুরু করে। রাষ্ট্র সেই সুযোগে দখল করে নিয়েছে সংখ্যাগুরুর মন আর মনন। ২০২০ সালের দিল্লি দাঙ্গা, নাগরিকত্ব আইন, একের পর এক গণপিটুনিতে হত্যা পাল্টে দিয়েছে ভারতীয় মুসলমানের ড্রয়িং রুমের ভাষা। ঘোর নিরাশায় তলিয়ে যেতে যেতে সে ভাষায় উঠে আসে পূর্বপুরুষদের এদেশ ছেড়ে চলে না যাওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতি রাগ ও সন্দেহ। উঠে আসে তিলে তিলে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হওয়ার গ্লানি।

প্রগতিশীল রাজ্য পশ্চিমবঙ্গেও বদলে যায় প্রেক্ষাপট। যে রাজ্যের রাজনীতিতে শ্রেণি ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ শব্দ, রাজ্যে পালাবদলের সাথে সাথে পরিচয়ের রাজনীতির হাত ধরে শ্রেণির জায়গা দখল করে ধর্ম। তাই ওদের রাম বনাম আমাদের কালী – এই লড়াইয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এখন ভোটব্যাঙ্ক হিসাবেও আর গণ্য হয় না/হবে না। কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দলের বিরোধিতা করতে গিয়েও বিরোধীদের হাঁটতে হচ্ছে কেন্দ্রের বেঁধে দেওয়া বয়ান বরাবর, অর্থাৎ ধর্ম। পাছে ‘সংখ্যাগুরু’ ভোটব্যাঙ্ক অখুশি হয়। এই অবস্থায় কেঁদে মরে উন্নয়ন। ২০০৮ সাল পর্যন্ত বাংলায় সেরকম দাঁত ফোটাতে না পারা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের শাখা ২০২০ সালে বেড়ে হয়েছে ১৬০০!

২২ জানুয়ারি, ২০২৪ এসে গেছে। এর পর কী? লজ্জার এক বৃত্ত সম্পূর্ণ হওয়ার পর আর কী আছে অপেক্ষায়? আর কত লজ্জা?

আরো পড়ুন দ্বিতীয় শ্রেণির বাঙালি, দ্বিতীয় শ্রেণির মুসলমান

চাপা দেওয়া মলের ঢাকা খুলে দিলে সমস্ত কীট বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইবে, এটাই স্বাভাবিক। সেই কীট কি শুধুই ভারতীয় মুসলমানদের ঘরেই প্রবেশ করবে? নাকি বৃহত্তর ভারতীয় সমাজ নীরবতা ভেঙে ফের সেই মলকে তার উপযুক্ত জায়গায় ফের পাঠাবে সেটাই দেখার। বাঙালি কি এবার চাঁদ, ফুল, জোছনা নিয়ে কবিতা লেখার পাশাপাশি পাশের বাড়ির সেই মুসলমানকে নিয়েও কিছু লিখবে? সেই মুসলমান, যার বাড়ি ২০২১ সালেও গুঁড়িয়ে দিয়েছে ধর্মের ধ্বজাধারী লোকজন? বাংলায় যাঁরা ক্ষমতায়, তাঁরা কোনোরকমে সংহতি সভা করে মিটিয়ে দিয়েছেন সেসব, বিচার পাওয়া বলতে যা বোঝায় তা হয়নি এমন অনেক ঘটনায়।

তবে কি সব শেষ?

মোবাইলে শেষরাতে ভেসে আসে বন্ধুর বার্তা “শোন, ২২ তারিখ ছুটি নিয়ে জলপাইগুড়ি (বাড়ি) গিয়ে থাকিস। একা থাকবি না, বাড়ির বাইরে বেরোস না।”

সাতশো কিলোমিটার দূরে থাকা বন্ধুর এই চিন্তা, এই ভালবাসাই হয়ত ভরসা। রাষ্ট্রের হিংস্রতা খর্ব করতে পারে এরকম বন্ধুরাই। আজকের পর ভারতীয় মুসলমান আরও বেশি করে খোঁজ করবে এই বন্ধুত্বের। সমস্যা হল, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দুঃখকে পণ্য বানিয়ে সহানুভূতির বন্যা বইয়ে দেওয়া আর সঠিক বন্ধুত্ব যাপনের মধ্যে বিস্তর ফারাক।

মলের গন্ধে বাতাস দূষিত হলে তা সমস্ত চেম্বারেই পৌঁছবে। আজ মুসলমান, কাল জাতের বিভাজন? বল এখন সংখ্যাগুরুদের কোর্টে। আজ যে বৃত্ত সম্পূর্ণ হল তা আরও লজ্জা, ঘৃণার উদ্রেক করবে কিনা তা সংখ্যাগুরুরাই ঠিক করতে পারে।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মতামত জানান

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.