অযোধ্যায় রামমন্দিরে রামলালার মূর্তিতে প্রাণপ্রতিষ্ঠার অনুষ্ঠান নিয়ে সারা দেশ যখন রামময়, যখন একজন রামলালার পায়ে ফুল দিয়ে প্রণাম করে প্রাণ প্রতিষ্ঠার আচার শেষ করছেন, তখন হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে আরেকজন কখনো বাসে, কখনো নৌকায়, কখনো হেঁটে জনগণের সঙ্গে মিশে গিয়ে ভারত জোড়ার ও ন্যায়ের জন্য গলা তুলছেন। ভারতীয় রাজনীতিতে দুটি সমান্তরাল ঘটনা ঘটছে একই দিনে, একই সময়ে। এই মুহূর্তে সারা দেশে কার জোর বেশি, কার কম – তা প্রশ্নাতীত। কিন্তু এই ঘটনাগুলি উপেক্ষা করার মত নয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দুবার কেন্দ্রে তাঁর দল বিজেপিকে ক্ষমতায় নিয়ে এসেছেন, তৃতীয়বার ক্ষমতা দখলের জন্য আর কয়েকমাস বাদেই নির্বাচনের দিকে যাবেন। অন্যজন রাহুল গান্ধী – দুবারই মোদীর কাছে হেরেছেন। সোজা কথায় গোহারা হেরেছেন। তিনি যে জনপ্রিয়তার নিরিখে নির্বাচনী রাজনীতিতে মোদীর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারেন না, একথা কারোর অজানা নয়। ভারতীয় রাজনীতিতে বিরোধী দলগুলি যে দুর্বলতম অবস্থায় রয়েছে, তাও অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তীব্র দক্ষিণপন্থী হিন্দুত্ববাদী একটি দলের বিরুদ্ধে যে জোরাল কোনো আদর্শগত অবস্থান বিরোধীরা নিতে পারছেন না, তা জলের মত পরিষ্কার।

তবু রাহুলের ভারত জোড়ো ন্যায় যাত্রা আশার আলো জাগায়। ঠিক যেমনভাবে তাঁর প্রথম পর্বের কেরল থেকে কাশ্মীরের ভারত জোড়ো যাত্রা অনেকের বুকেই বল এনে দিয়েছিল। সেইসময় কয়েকটি রাজ্যের নির্বাচন থাকলেও জাতীয় নির্বাচন ছিল না। সেবার সন্তর্পণে নির্বাচনমুখী গুজরাটকে নিজের যাত্রার বাইরে রেখেছিলেন রাহুল। নিজের যাত্রাকে শুধুই নির্বাচনী রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ রাখেননি। একটি আদর্শগত ধ্বজা নিয়ে হেঁটেছিলেন দীর্ঘ পথ। এবারের যাত্রা দেশের সাধারণ নির্বাচনের ঠিক আগে হচ্ছে। তাই অনেকেই এটিকে নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত করতে চাইবেন, করছেনও। কিন্তু শুধুই নির্বাচনী যাত্রা হিসাবে এটিকে দেখলে বা রাহুলরাও এটিকে নির্বাচনের সঙ্গে বেঁধে দিলে বোধহয় ভুলই করা হবে। রাহুল এবং কংগ্রস দলের নেতারা তাঁদের এক্স হ্যান্ডেলে বা অন্য প্রচার মাধ্যমে একটি বার্তা তুলে ধরার চেষ্টা করছেন যে ‘মহব্বত কি দুকান’ খুলতেই পথে নেমেছেন রাহুল। বিভেদ, বিদ্বেষ ভুলে সবাইকে আপন করে নেওয়ার মধ্যেই ভারতীয় বহুত্ববাদকে আবার স্মরণ করিয়ে দিতে চাইছেন তিনি।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আসামের শোনিতপুর জেলায় যখন রাহুল গান্ধীর বাসের উপর বিজেপির কর্মী সমর্থকরা হামলা চালায় বলে অভিযোগ ওঠে, তখন রাহুলের পোস্ট করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি বিজেপি ঝাণ্ডাধারীদের দিকেই চুম্বন ছুঁড়ে দিচ্ছেন। বাইরে থেকে বিজেপি ও মোদীর সমর্থনে স্লোগান ভেসে এলেও হাসিমুখে রাহুল তাঁদের দিকে হাত নাড়ছেন। একসময় বাস থেকে নেমে তিনি এগিয়েও গেলেন বিক্ষোভকারীদের দিকে।

এটি একটি প্রতীকী ঘটনা মাত্র। মণিপুর থেকে ভারত জোড়ো ন্যায় যাত্রা শুরুর দিন থেকেই রাহুল এবার বিরোধের মুখে পড়ছেন। কখনো বিজেপি পরিচালিত রাজ্য সরকারের থেকে তো কখনো পথের বিজেপি সমর্থকদের থেকে। জাতিদাঙ্গা বিধ্বস্ত মণিপুর থেকে রাহুলের যাত্রা শুরুর কথা ঘোষণা করা হলেও, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিজেপি পরিচালিত রাজ্য সরকার যাত্রার অনুমতি দিতে টালবাহানা করে গেছে। ইম্ফলের হাপ্টা কাঙ্গজেইবুংয়ের মাঠ থেকে যাত্রা শুরু করতে চাইলেও বীরেন সিংয়ের সরকার শেষে জমায়েতের লোকসংখ্যা বেঁধে দিয়ে শর্তাধীন অনুমতি দেয়। কংগ্রেস অবশ্য শর্ত মানতে না চেয়ে যাত্রা শুরু করে পার্শ্ববর্তী থৌবাই জেলা থেকে।

২২ জানুয়ারি যখন মোদী রামলালার প্রাণপ্রতিষ্ঠা করছেন, তখন রাহুল আসামের বড়দুয়াতে শ্রী শ্রী শঙ্করদেব সত্রে যেতে চেয়েছিলেন ১৫ মিনিটের জন্য। কিন্তু সেখান থেকে ১৭ কিলোমিটার দুরেই তাঁর যাত্রাকে ব্যারিকেড করে আটকে দেয় বিজেপি পরিচালিত আসাম সরকারের পুলিশ। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা দাবি করেন, আইনশৃঙ্খলার অবনতি হওয়ার আশঙ্কাতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

শুধু মন্দিরের কথা না বলে রাহুল তাঁর প্রচারযন্ত্রের মাধ্যমে দেশের যুবক-যুবতীদের এবং সাধারণ মানুষের দুঃখ দুর্দশার কথা তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। কখনো বেকারত্বের কথা, কখনো চা বাগানের শ্রমিকদের কম মজুরির কথা, কখনো বিজেপি পরিচালিত রাজ্য সরকারের দুর্নীতির কথা উঠে আসছে তাঁর কথোপকথনে। তিনি বিচারধারা বা আদর্শগত লড়াইয়ের কথা বলছেন বারবার। ব্যক্তিকেন্দ্রিক না করে লড়াইকে আদর্শগত লড়াইয়ের দিকে নিয়ে যাওয়ার মধ্যেই আশার আলো দেখা যায়।

সারা দেশ জুড়ে যখন রাজনৈতিক ব্যক্তিপুজো উন্মাদনার পর্যায়ে চলে গেছে, যখন সংখ্যাগুরুর হুঙ্কার সংখ্যালঘুদের কোণঠাসা করে দিয়েছে, যখন আর কেউ ‘মিলে সুর মেরা তুমহারা’ গাইছেন না, যখন দেশের বেকারত্ব, কৃষকদের মজুরি, শ্রমিকদের দাবি নিয়ে সরকার সরাসরি কথা বলতে চাইছে না, দেশের সাংবিধানিক কাঠামোই যখন আক্রান্ত (শীতকালীন অধিবেশনে এতজন সাংসদ একসঙ্গে সাসপেন্ড হয়ে গেলেন), দেশটি যখন এক দেশ এক ধর্মের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন একটি সমান্তরাল রাজনৈতিক বক্তব্য উঠে আসুক – গণতান্ত্রিক দেশে এটিই কাম্য। শুধুমাত্র নির্বাচনী জোট ও রণকৌশলে ভারতের বর্তমান সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। গণতন্ত্রকে আবার প্রতিষ্ঠা করা, সংবিধানকে একটি বিশেষ ধর্মের উপরে তুলে ধরা, বহুত্ববাদকে মর্যাদা দেওয়া, ঘৃণার রাজনীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য লাগাতার রাস্তায় থাকার পরিসর দরকার। রাহুলের ভারত জোড়ো যাত্রা সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে পারে।

আরো পড়ুন কতটা পথ পেরোলে পরে ভারত পাওয়া যায়?

কিন্তু তাঁর যাত্রাকে আরও অনেক পথ অতিক্রম করতে হবে। তিনি নিজে একজন পরাজিত সৈনিক। তাঁর নিজের দলই তাঁর আদর্শগত অবস্থান নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত। রামমন্দির উদ্বোধনের অনুষ্ঠানের নিমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করা হোক বা শিল্পপতি গৌতম আদানির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দহরম মহরম নিয়ে সরব হওয়া – রাহুল এখনো নিজের দলকেই এক সুরে গাওয়াতে পারছেন না। এ ছাড়াও বিভ্রান্তিমূলক অতীত রয়েছে কংগ্রেস দলের। পুরো বিরোধী শিবিরই আদর্শগত অবস্থান নিয়ে ছন্নছাড়া।

প্রথম পর্বের ভারত জোড়ো যাত্রা রাহুলের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির পরিবর্তন করতে পেরেছে ঠিকই। কিন্তু তাঁর রাজনীতি নিয়ে ধারাবাহিকতার অভাবের কথা বারবার উঠে আসে। তবু তিনি যদি একটি সমান্তরাল আদর্শগত অবস্থান নিয়ে দেশের আসল ইস্যুগুলির দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেন, তাহলে তাতে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উপকারই হবে। রামমন্দিরের উৎসবের আবহেও তাঁর যাত্রা মূলধারার সংবাদমাধ্যমে সামান্য হলেও জায়গা করে নিতে পারছে। তাঁকে একেবারে উপেক্ষা করতে পারছে না বিজেপি পরিচালিত রাজ্য সরকারগুলিও। কাজেই ধারাবাহিকভাবে ভারত জোড়ো যাত্রার ইস্যুগুলিতে ন্যায় চেয়ে অন্যায়ের প্রতিবাদ করে গেলে দেশের ভাল, দশের ভাল এবং কংগ্রেস দলেরও ভাল হবে।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.