ধন্নিপুর জায়গাটা ঠিক কোথায়, সেটা হয়ত খুব বেশি মানুষ জানেন না। জানার দরকারও পড়েনি সেভাবে। আজ সেখানকার এক মসজিদের বিষয়ে কয়েক লাইন লেখার কথা ভাবছি। তার আগে, শুরুর দিকের গল্পটা একবার ঝালিয়ে নেওয়া যাক।
২০১৯ সালের ৯ নভেম্বর ভারতের সুপ্রিম কোর্টে অযোধ্যা মামলার চূড়ান্ত রায় দেওয়া হয়। সেই রায়ে ধ্বংস হওয়া বাবরি মসজিদের বদলে উত্তরপ্রদেশ সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয় সুন্নি সেন্ট্রাল ওয়াকফ বোর্ডকে অযোধ্যা জেলার যে কোনো জায়গায় পাঁচ একর জমি দিতে হবে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
ওই মামলা সুপ্রিম কোর্টে উঠেছিল ২০১০ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়ের পর। একবার দেখে নেওয়া যাক, এলাহাবাদ হাইকোর্ট কী রায় দিয়েছিল। তথাকথিত বিতর্কিত জমি, যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল বাবরি মসজিদ, যা ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ এবং তাদের সহচর একাধিক হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের করসেবকদের হাতুড়ি, গাঁইতি, শাবলের আঘাতে ভেঙে পড়ে, তার আয়তন ছিল ২.৭৭ একর। ২০১০ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্টের তিন বিচারপতির বেঞ্চ (বিচারপতি এসইউ খান, বিচারপতি সুধীর আগরওয়াল ও বিচারপতি ডিভি শর্মা) রায় দেয় যে এই বিতর্কিত জমি সমান তিন ভাগে ভাগ করা হবে। এক ভাগ পাবে রামলালার প্রতিনিধিত্ব করা হিন্দু মহাসভা, এক ভাগ পাবে উত্তরপ্রদেশ সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড আর এক ভাগ পাবে নির্মোহী আখড়া। আরও নিখুঁতভাবে বলতে গেলে, হিন্দু মহাসভার ভাগে পড়ে ‘রামলালা বিরাজমান’ অংশ, নির্মোহী আখড়ার ভাগে রাম চবুতরা এবং সীতা রসোই অংশ। বাকিটা যায় সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডের কাছে। রায়ে খুব স্পষ্ট ভাষায় লেখা ছিল, হিন্দুদের ধর্মীয় বিশ্বাসে এই জমি ভগবান রামের জন্মস্থান এবং কোনো এক হিন্দু মন্দির ধ্বংস করেই সেখানে বাবরি মসজিদ বানানো হয়েছিল। এই মসজিদ ইসলামিক রীতিনীতি মেনে তৈরি করা হয়নি (“the disputed land was the birthplace of Rama as per the faith and belief of Hindus, and that the Babri Masjid was built after the demolition of a Hindu temple, noting that it was not built in accordance with the tenets of Islam”)।
তিন বিবাদী পক্ষের কেউই এই রায়ে খুশি হয়নি, ফলে তারা যায় সুপ্রিম কোর্টে। সেই মামলারই চূড়ান্ত রায় ঘোষণা হয় ২০১৯ সালে। সেই রায়ে পুরো বিতর্কিত জমিটিই দিয়ে দেওয়া হয় – না, হিন্দু মহাসভা বা নির্মোহী আখড়াকে নয়। দেওয়া হয় রামমন্দির বানানোর জন্য। বলা হয় সে কাজের দায়িত্বে থাকবে একটি ট্রাস্ট – রাম জন্মভূমি ট্রাস্ট। রায় দানের তিনমাসের মধ্যে সেই ট্রাস্ট গঠন করতে হবে। নির্মোহী আখড়া এবং বাকিদের সেই ট্রাস্টের সদস্য করতে হবে।
ওয়াকফ বোর্ডের আইনজীবী জাফরয়াব জিলানি বোর্ডের তরফে জানান, বোর্ড এই রায়ে খুশি নয়, কিন্তু তারপরেও তারা এই রায়কে মাথা পেতে নিচ্ছে। বোর্ডের চেয়ারম্যান জুফার ফারুকি জানান, তাঁরা এই রায়কে স্বীকার করছেন, কোনো রিভিউ পিটিশন তাঁরা দাখিল করবেন না। আরও কিছু সংগঠন এই মামলায় মুসলমান সম্প্রদায়ের স্বার্থরক্ষায় লড়ছিল, যেমন জামায়েত উলেমা-এ-হিন্দ এবং অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড। তারা এই রায়কে স্বীকার করতে অসম্মত হয় এবং ১৭ নভেম্বর ২০১৯ তারিখে রিভিউ পিটিশন দাখিল করে। সুপ্রিম কোর্টের রায়কে যাঁরা লিখিতভাবে স্বাগত জানান পুরনো বিবাদকে ভুলে নতুন ঐক্যবদ্ধ ভারত গড়ার লক্ষ্যে, তাঁদের মধ্যে ছিলেন কংগ্রেস নেতারা, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার, মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী কমলনাথ এবং ডিএমকে নেতা এম কে স্ট্যালিন।
২
নতুন মসজিদের জন্যে অযোধ্যা জেলার ধন্নিপুর গ্রামে পাঁচ একর জমি চিহ্নিত করা হয় এবং একটি ট্রাস্টের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ট্রাস্ট গঠিত হয় ২০২০ সালের মে মাস নাগাদ, নাম ইন্দো-ইসলামিক কালচারাল ফাউন্ডেশন। ভারতের মাটিতে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের ছবি তুলে ধরবে এই মসজিদ – এমনটা বলা হয়েছে।
ধন্নিপুর গ্রাম যেখানে রামমন্দির হয়েছে সেখান থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে। প্রস্তাবিত মসজিদ এলাকার নকশা প্রাথমিকভাবে তৈরি করেছিলেন দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা ডিন এসএম আখতার। কিন্তু এতে ইসলামের পাঁচটি মূল ভিত্তি বা প্রথা – কলিমা, নামাজ, রোজা, হজ এবং জাকাত –দৃশ্যমান ছিল না। ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদেও এই পাঁচটি ভিত্তি দৃশ্যমান ছিল না বলে বাবরি মসজিদকে প্রকৃত মসজিদ বলে মানতে অস্বীকার করেছিল সুপ্রিম কোর্ট। সেজন্য ধন্নিপুরের এই নতুন মসজিদের প্রাথমিক নকশা নাকচ করে দেওয়া হয়। ভবিষ্যতে কোনো আদালত এই মসজিদকেও ‘প্রকৃত মসজিদ নয়’ বা ‘যথেষ্ট ইসলামিক নয়’ বলে দাগিয়ে দেবে – এমন ঝুঁকি কে নেবে? তাই মসজিদের নকশা আবার নতুন করে বানানো হয়, যাতে এই পাঁচটি মূল ভিত্তি দৃশ্যমান। নতুন নকশাটি বানিয়েছেন পুণের স্থপতি ইমরান শেখ। এতে ইসলামিক মিনারেট এবং পবিত্র চাঁদের আদলও রাখা হয়েছে, যাতে একে মসজিদ বলে চিনতে কারোর কোনোদিন কোনো ভুল না হয়।
আরো পড়ুন রামমন্দির হল, এরপর কোনদিকে যাবে কমণ্ডলু রাজনীতি?
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, এই পাঁচ একর জমিতে শুধু মসজিদ থাকবে না। সঙ্গে নাকি থাকবে ৩০০ শয্যার ক্যানসার হাসপাতাল, স্কুল, কমিউনিটি কিচেন। সেখানে শুধুমাত্র নিরামিষ খাবার পাওয়া যাবে। থাকবে একটি লাইব্রেরি এবং মৌলবী আহমদুল্লাহ শাহ ফৈজাবাদীর নামে একটি গবেষণা কেন্দ্র। সেখানে আধুনিক ভারতের গঠন প্রক্রিয়ায় মুসলমান সমাজের অবদানের বিভিন্ন দিক নিয়ে গবেষণা ও প্রকাশ করা হবে। মৌলবী আহমদুল্লাহ শাহ ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের একজন শহীদ।
এত কিছু মিলিয়ে আনুমানিক খরচের পরিমাণ প্রায় তিনশো কোটি টাকা। মনে করা হচ্ছে এর মধ্যে মসজিদ বাদে বাকিগুলি নির্মাণে খরচ হবে মোট ২৮০ কোটি টাকা। ইন্দো-ইসলামিক কালচারাল ফাউন্ডেশনের হাতে এখনো তার ১% টাকাও নেই। এবছর মার্চ মাস থেকে শুধু মসজিদ বানানোর কাজ শুরু হবে। ফাউন্ডেশনের সম্পাদক আতাহার হুসেন জানিয়েছেন, খুব শিগগিরই তাঁরা রাজ্যে রাজ্যে মানুষের কাছে পৌঁছবেন টাকা তোলার জন্য। যেমন যেমন টাকা উঠবে, তেমন তেমন নির্মাণের কাজ এগোবে। সম্প্রতি এক সাংবাদিক সম্মেলনে ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, ধন্নিপুরের এই মসজিদ পরিচিত হবে হজরত মহম্মদের নামে – মহম্মদ বিন আবদুল্লাহ মসজিদ।
৩
অযোধ্যা মামলার চূড়ান্ত রায় দিয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টের পাঁচজন বিচারক – বিচারপতি অশোক ভূষণ, বিচারপতি শরদ অরবিন্দ বোবড়ে, বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়, বিচারপতি এস আবদুল নাজির এবং তৎকালীন প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গোগোই।
২০২১ সালের জুলাই মাসে অশোক ভূষণ সুপ্রিম কোর্ট থেকে অবসর নেন। সেবছর অক্টোবর মাসেই ন্যাশনাল কোম্পানি ল অ্যাপেলেট ট্রাইব্যুনাল (NCLAT)-এর চেয়ারপার্সন নিযুক্ত হন। সেই চাকরির মেয়াদ ২০২৫ অবধি। বোবড়ে অযোধ্যার রায়দানের নদিন পরেই গোগোইয়ের পর সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হন। প্রায় দেড় বছর এই পদে থাকার পর ২৩ এপ্রিল ২০২১ তারিখে অবসর নেন। আপাতত তিনি কোনো সরকারি পদে নেই। বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড় এই মুহূর্তে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি। বিচারপতি এস আবদুল নাজির সুপ্রিম কোর্ট থেকে অবসর নেন ৪ জানুয়ারি ২০২৩। তার ঠিক চল্লিশ দিনের মাথায়, ১২ ফেব্রুয়ারি, ভারত সরকার তাঁকে অন্ধ্রপ্রদেশের রাজ্যপাল নিযুক্ত করে। এখনো তিনি সেই পদেই আছেন। এই নিযুক্তি নিয়ে কিছুদিন শোরগোল চলেছিল, তবে সিদ্ধান্ত বদলায়নি।
গোগোই প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হন ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮। তাঁর প্রধান বিচারপতি হওয়া নিয়ে বিতর্ক ছিল। মূলত তাঁর পূর্বসুরি বিচারপতি দীপক মিশ্রের সুপারিশেই তাঁকে প্রধান বিচারপতি করা হয় অন্য বিচারকদের আপত্তি অগ্রাহ্য করে। ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে তাঁর নামে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে। কিন্তু একটি আভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি একমাসের মধ্যেই তাঁকে নিরপরাধ বলে ঘোষণা করে। নভেম্বর মাসে অবসর নেওয়ার চারমাস পরে, ১৯ মার্চ, ২০২০ তারিখে তাঁকে বিজেপি রাজ্যসভার সদস্য হিসাবে মনোনীত করে।
৪
শেষের পরেও কিছু কথা থেকে যায়। এই লেখাটি লেখা হয়েছিল ২০২৩ সালের শেষ সপ্তাহে। ইন্দো-ইসলামিক কালচারাল ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইট থেকে বেশকিছু তথ্য উদ্ধৃত করেছিলাম। এবছর পয়লা জানুয়ারি দেখলাম সাইটটার (https://iicfindia.com/) আর অস্তিত্ব নেই। হয় স্বেচ্ছায়, নয় পয়সার অভাবে সাইটটা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ওয়েবসাইটে ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপকদের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা দেওয়া ছিল, কেউ অনুদান পাঠাতে চাইলে কীভাবে পাঠাবেন তাও লেখা ছিল। ভেবেছিলাম এই লেখা প্রকাশ করার আগে সেই তথ্যগুলো জুড়ে দেব। কিন্তু তা আর সম্ভব নয়। তবে ২১শে জানুয়ারি ২০২৪ তারিখে রয়টার্স এবং ইকোনমিক টাইমসে, এবং তার দুদিন আগে ডেকান হেরাল্ডের প্রতিবেদনে একটা খবর পাওয়া গেছে। ওই ফাউন্ডেশনের ডেভলপমেন্ট কমিটির প্রধান হাজি আরাফত শেখ, যিনি নিজে একজন স্থানীয় বিজেপি নেতা, জানিয়েছেন মসজিদের কাজ শুরু হবে এ বছরের মে মাসে, পবিত্র রমজান মাসের শেষে। সম্পূর্ণ প্রকল্প শেষ করতে লাগবে ৩-৪ বছর। নির্মাণের খরচ তোলার জন্য তাঁরা খুব শিগগিরই একটি নতুন ক্রাউডফান্ডিং ওয়েবসাইট চালু করতে চলেছেন।
লেখকের অনুমতিক্রমে তাঁর এই ব্লগ পোস্ট পুনঃপ্রকাশ করা হল। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







