~ সায়ন্তন চক্রবর্তী ~

হেই সামালো ধান হো

কাস্তেটা দাও শান হো

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

জান কবুল আর মান কবুল

আর দেব না আর দেব না

রক্তে বোনা ধান মোদের প্রাণ হো

জমিদারদের লেঠেল বাহিনীর হাতে নির্যাতিত কৃষক পরিবারের সংগ্রামের কাহিনী আজও আমাদের দেশে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক! দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে অনাবাদী জমিতে কঠোর শ্রম দিয়ে সোনা ফলাবার পরে যখন জোতদাররূপী রাজ্য সরকার ২০,০০০ মানুষকে জীবিকা কেড়ে নিয়ে তাঁদের বাস্তুচ্যুত করেন, তখন সেই প্রান্তিক মানুষের হাতে সংগ্রাম ব্যতীত অন্য বিকল্প থাকে কি?

গতকাল সকাল থেকে সবাই দৃশ্যটি দেখেছেন। এক গুলিবিদ্ধ এবং সম্ভবত মৃত মানুষকে লাথি মারছেন আরেকজন মানুষ।

স্থান আসামের দরং জেলার অন্তর্গত সিপাঝাড় এলাকার কিরাকোটা চরের গরুখুঁটি গ্রাম।

সম্প্রতি আসাম সরকার বিভিন্ন জায়গায় রাজ্য সরকারের জমি দখলদারদের হাত থেকে পুনরুদ্ধার করে নিজেরা ৭৭০০০ বিঘার উপরে সমবায় চাষের পরিকল্পনা করেছেন। সেই পরিকল্পনার অঙ্গ হিসাবেই বিশ্বনাথ, মরিগাঁও এবং নওগাঁও জেলায় উচ্ছেদ অভিযান চালানোর পরে দরং জেলায় উচ্ছেদ শুরু হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর নিজের সহোদর সেই জেলার পুলিশের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা এবং বুধবার রাতে উচ্ছেদের নোটিস দিয়ে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই শুরু হয়েছে উচ্ছেদ অভিযান। গ্রামবাসীরা প্রতিবাদ করলে সরকারিভাবে তাঁদের পুনর্বাসনের কথা বলে আশ্বস্ত করা হয়। তাঁরা সেই আশ্বাস পেয়ে ফিরে যাওয়ার সময়েই গুলিচালনা!

সরকারিভাবে বলা হয়েছে এই দখলদাররা সকলেই অনুপ্রবেশকারী। যে মৃত ব্যক্তিদের নাম পাওয়া গেছে তাদের মধ্যে আছে দ্বাদশ বর্ষীয় শেখ ফরীদ, যে তার আধার কার্ড মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগেই সংগ্রহ করেছিল।

বিজয় শংকর বানিয়া নামে এক সরকার নিযুক্ত চিত্রসাংবাদিককে দেখা গেছে, যে মইনুল হক নামে একজন গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরেও লাথি মারছিল। মইনুলেরও আধার কার্ড ছিল। আসামে জাতীয় নাগরিক পঞ্জিতে নাম না থাকলে আধার কার্ড পাওয়া যায় না।

তবু নাকি তাঁরা অনুপ্রবেশকারী! তাঁরা নাকি জাতিগতভাবে অসমিয়াদের দেশে অন্য দেশ থেকে এসে তাঁদের নিজভূমে সংখ্যালঘু করার চক্রান্ত করছেন!

এই সরকারি আগ্রাসনে যাঁরা বাস্তুচ্যুত হলেন , তাঁরা ধর্মীয় পরিচয়ে মুসলমান এবং জাতিগতভাবে বাঙালি। সেই উনিশ শতকের শেষ থেকেই তাঁরা ভূমিপুত্র অসমিয়াদের চক্ষুশূল এবং ১০০ বছর বসবাসের পরেও অসমিয়াদের কাছে বহিরাগত।

উনিশ শতকের শেষের দিকে তৎকালীন ব্রিটিশ শাসক আসামের অনাবাদী জমিগুলোকে চাষযোগ্য করে তুলতে পূর্ববঙ্গের ময়মনসিংহ, দিনাজপুর ,রংপুর ইত্যাদি এলাকা থেকে প্রান্তিক মুসলমান বাঙালি কৃষিকর্মীদের নিয়ে আসতে শুরু করেছিলেন। আসামে পাট চাষ হবে এবং সেই কাঁচা পণ্য কলকাতায় স্থাপিত জুটমিলগুলোর চাহিদা মেটাবে — এই ছিল পরিকল্পনা।

ব্রহ্মপুত্রের পশ্চিম প্রান্ত থেকে পূর্ব দিকে মানুষের অভিবাসন শুরু হয়েছিল, যা তীব্র গতিলাভ করে ১৯০৫ সালের লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গের পরে।

পূর্ববঙ্গ আসামের সাথে জুড়ে যাওয়ায় প্রজননের গতি বৃদ্ধি হল, মুসলমান অভিবাসী কৃষকেরা পশ্চিম এবং মধ্য আসামে জনবসতি স্থাপন করলেন। সেই সময় থেকেই আসামের জনজাতিদের মধ্যে এই অভিবাসন নিয়ে ক্ষোভের সঞ্চার হল। স্বভাবগতভাবে যাযাবর জনজাতিগুলোর থিতু হয়ে বসার অভ্যাস ছিল না এবং তাঁদের পরম্পরাগত জমিতে পূর্ববঙ্গীয় বাঙালি মুসলমানদের এই বসতি স্থাপন তাঁদের আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে সংশয়ী করে তুলেছিল।

১৮৭৪ সাল পর্যন্ত আসামে অসমিয়া নয়, বাংলা ভাষাকে সরকারি ভাষা করে রেখেছিল ব্রিটিশ সরকার। পরে জনবহুল গোয়ালপাড়া, কাছাড় এবং সিলেট জেলাকে পুরনো আসামের সাথে জুড়ে দেওয়ার ফলে ব্রিটিশ আসামে অসমিয়ারা সংখ্যালঘু হয়ে পড়লেন। এই আর্থিক এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ভয়ই ১০০ বছর ধরে চলা অশান্তির মূল কারণ।

১৯৪৭ সালে ঘটে যাওয়া বেশ কিছু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পরে ১৯৫১ সালের জনগণনায় একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করা গেল। দেশভাগের পরে বহু সংখ্যায় হিন্দু বাঙালি উদ্বাস্তু প্রবেশের পরেও দেখা গেল অসমিয়াদের অনুপাত জনসংখ্যার প্রায় ৬০%, বাঙালিরা মাত্র ২০%। এই অদ্ভুত ঘটনার মূল কারণ ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার অভিবাসী মুসলমানরা নিজেদের ভাষাগতভাবে অসমিয়া হিসাবে নথিভুক্ত করেছিলেন। জাতিদাঙ্গার মুখে নিরাপত্তাহীনতা এর জন্য দায়ী।

১৯৭৯-১৯৮৫ সাল অবধি চলা আসাম আন্দোলনের প্রাথমিক বীজ বপন হয়েছিল এই দীর্ঘ সময় ধরে চলা দুটো ভাষাগতভাবে ভিন্ন সম্প্রদায়ের নিরাপত্তাহীনতা এবং সেই কারণে উদ্ভূত তিক্ততায়। ১৯৮৩ সালে তিন বছর ধরে আসু (All Assam Students’ Union)-র নেতৃত্বে চলা এই অসমিয়া জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মূল দাবি ছিল আসামের ভোটার তালিকা থেকে বহিরাগতদের নাম বাদ দেওয়া। এই আন্দোলনের কারণেই ১৯৮০ সালের সাধারণ নির্বাচন আসামে করা সম্ভব হয়নি।

১৯৮৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী আসামে একযোগে লোকসভা এবং বিধানসভা নির্বাচন করার ঘোষণা করলেন। কিছু রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি বোড়ো এবং বাঙালি সংগঠনগুলো এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাল। পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠল, চারিদিক থেকে জাতিগত সংঘর্ষের খবর আসা শুরু হল।

তখনই ঘটল ১৮ই ফেব্রুয়ারির নেলি গণহত্যা। গৌহাটি থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত নেলিতে চোদ্দটা মুসলমান অধ্যুষিত গ্রামে পরিকল্পিতভাবে গণহত্যা সংঘটিত হয়।

সন্দেহ করা হয় একটি দক্ষিণপন্থী সংগঠনের ক্যাডাররা সন্তর্পণে আসুতে যোগদান করে এই গণহত্যা করে। ঘটনার প্রাথমিক কারণ হিসাবে বলা হয়েছিল এক গুজব — মুসলমানরা জনজাতির শিশুদের হত্যা করেছে। কিন্তু আসল কারণ ছিল রাজনৈতিক।

ঘটনার চারদিন আগে ঘটা নির্বাচনে মুসলমানরা বিপুল সংখ্যায় যোগদান করেন। শুধুমাত্র সরকারি হিসাব অনুযায়ীই ১৮১৯ জনকে হত্যা করা হয়েছিল। প্রধান শিকার মহিলা এবং শিশুরা।

এই গণহত্যায় পুলিশ চার্জশিট তৈরি করে পরে তা বাতিল করে দেয়। তৎকালীন কংগ্রেস সরকার দ্বারা গঠিত তেওয়ারি এনকোয়ারি কমিশন এক বছরের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিলেও আজ পর্যন্ত সে রিপোর্ট জনসমক্ষে আনা হয়নি। কংগ্রেস, অসম গণপরিষদ, বিজেপি — কোনো সরকারই প্রান্তিক বাঙালি মুসলমানদের পাশে দাঁড়ানোর সৎসাহস দেখাতে পারেননি।

দীর্ঘ ১০০ বছরের তিক্ততাকে লালন পালন করে বৈরিতায় নিয়ে যাওয়াই আসামের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার একমাত্র লক্ষ্য। জাতিগত বিভাজন, ভাষাগত বিভাজনের ঘৃণ্য রাজনীতির বলি ভারতীয় নাগরিক প্রান্তিক বাঙালি মুসলমান চাষীরা। সেই সত্তরের দশক থেকে কিরাকোটা চরে বসতি স্থাপন করে, অনাবাদী জমিকে চাষযোগ্য করে সোনার ফসল ফলিয়েছেন এই তথাকথিত অনুপ্রবেশকারীরা। তবুও তাঁরা নাগরিক পঞ্জিতে নাম থাকা সত্ত্বেও ভিনদেশী অনুপ্রবেশকারী হয়ে যান। অথচ গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভের একাংশ এই কাল্পনিক অনুপ্রবেশের মাধ্যমে জনসংখ্যা বিন্যাসের ভবিষ্যৎ পরিবর্তন এবং তার কারণে ঘটা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায়ের ভবিষ্যতের কল্পিত দুর্দশার ভয় এবং ঘৃণার চাষ করে চলেন।

পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশ থেকে আগত উদ্বাস্তুদের নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতি দেওয়া বিজেপির এই দ্বিমুখী আচরণ আজ সারা দেশের মানুষের সামনে পরিষ্কার। আসামের বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তুরা যেমন নাগরিকত্ব হারিয়ে আজ নিরাপত্তাহীন, তেমনই ১০০ বছর ধরে বসবাস করে নাগরিক পঞ্জিতে নাম থাকা সত্ত্বেও বাঙালি মুসলমানরা ব্রাত্য।

দীর্ঘদিন ধরে ঘৃণার বীজ বপন এবং লালন পালন করার ফলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা যেমন উড়িয়ে দেওয়া যায় না, তেমনই অপর পক্ষের প্রতিরোধের সম্ভাবনাও থেকে যায়।

আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ আমাদেরই হাতে। ঐক্যবদ্ধভাবে আমাদেরই সম্মিলিত সিদ্ধান্ত নিতে হবে এই ধারাবাহিকভাবে পরিকল্পিত বিভাজনের ফাঁদে পা দেব, নাকি সংঘবদ্ধ হয়ে ভারতীয় হিসাবে ভারতীয় সংস্কৃতি ও ভাবধারাকে অক্ষুন্ন রেখে সকলে মিলে একযোগে আমাদের দেশকে প্রগতির পথে নিয়ে যাব।

মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.