‘অনেকদিন অপেক্ষা করে আছি, নাগরিক ডট নেটের জন্য আপনার একটা সাক্ষাৎকার করতে চাই কাল’, ফোনে বললাম সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরিকে। তারপর বললাম ‘ফোনে নয় কিন্তু, সামনাসামনি বসে সাক্ষাৎকার।’ তখনো তাঁর মন ভারাক্রান্ত, সদ্য মারা গেছেন তাঁর কমরেড বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, নিজের চোখেও হয়েছে অস্ত্রোপচার। বললেন ‘আরে, এতো তাড়া কিসের বাপু? আগামী সপ্তাহে চলে এসো। কথা হবে।’ মোটামুটি ভাবে ঠিক হল, ১৯-২০ অগাস্ট নাগাদ তাঁর অফিসে দেখা হতে পারে।

সে দেখা কিন্তু আর হল না। সেই ১৯ তারিখ শাসকষ্ট হওয়ায় তাঁকে ভর্তি করা হল রাজধানী দিল্লির বিখ্যাত অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সে। পার্টির পলিট ব্যুরো সদস্য ও ট্রেড ইউনিয়ন নেতা তপন সেন জানালেন যে ২৪-২৫ অগাস্টও নাকি তিনি হাসপাতালের বিছানায় উঠে বসেছেন, কথা পর্যন্ত বলেছেন। তারপর অবস্থার অবনতি হতে থাকে। আরেক পলিট ব্যুরো সদস্য নীলোৎপল বসু প্রায় এক কথাই বললেন। ইয়েচুরির শারীরিক অবস্থা নাকি ভাল ছিল না গত কয়েকদিন। ডাক্তারদের সব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ধীরে ধীরে তাঁর শরীরের হাল এতটাই খারাপ হয়ে পড়ে যে আর ফিরলেন না ইয়েচুরি।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

বৃহস্পতিবার, ১২ সেপ্টেম্বর – দুপুর গড়াবার আগেই মেঘের আড়ালে মুখ ঢেকেছিলেন সূর্যদেব। কখনো জোরে, কখনো ফোঁটা ফোঁটা, বৃষ্টি যেন ধরেই না। ঘড়ির কাঁটায় তখন প্রায় সাড়ে চারটে, আকাশের মতই থমথমে সিপিএম সদর দপ্তর এ কে গোপালন ভবন, দিল্লির গোল মার্কেটের কাছে। বর্ষীয়ান নেতা হান্নান মোল্লাসহ কিছু পার্টি সদস্য একতলায় বসে, বা দাঁড়িয়ে। বাইরে ভিড় করেছেন সাংবাদিক, ক্যামেরাপার্সনরা। উপস্থিত পলিট ব্যুরো সদস্যদের নিয়ে তখন উপরের ঘরে চলছে বৈঠক। আছেন ইয়েচুরির পূর্বসূরী প্রকাশ কারাত, তপন, নীলোৎপল, কেরলের এম এ বেবি প্রমুখ। একটু পরে ঢুকলেন সুভাষিনী আলী। বৈঠকে যোগ দিলেন, তারপরেই মেডিকাল ইনস্টিটিউট থেকে ফিরলেন বৃন্দা কারাত, ফেস মাস্কের উপর দেখা যাচ্ছিল চোখ ছলছল। বিকেল ছটা নাগাদ স্লোগানে স্লোগানে প্রয়াত কমরেডকে লাল সেলাম জানালেন নেতৃবৃন্দ। সামনের ছবিতে ইয়েচুরি তখন হাসছেন।

ইয়েচুরির এই হাসিটিই সর্বদা মনে থাকবে আমার। কর্মজীবনে আমি গত প্রায় ২০ বছর এমন কটি মিডিয়া চ্যানেলে কাজ করি যারা হামেশা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে প্রশ্ন করে গেছে, প্রায় তাড়া করে বেরিয়েছে। ইয়েচুরি কিন্তু হাসিমুখেই আমায় সর্বদা অভ্যর্থনা জানিয়েছেন। কথা বলবেন না, তাও বলেছেন হাসিমুখেই। আবার না করেও কিন্তু কখনো কখনো ‘বাইট’ দিয়ে দিয়েছেন। অমায়িক তো ছিলেনই, রাজনৈতিক কলাকৌশলেও ছিলেন সিদ্ধহস্ত। অন্যান্য দলগুলির সঙ্গে বোঝাপড়া করা বা নিজের দলের মধ্যেকার কোন্দল সামলানো – সবই হাসিমুখে সারতেন। তাঁর এই চরিত্র প্রায়ই আমাকে হরকিষেণ সিং সুরজিতের কথা মনে করিয়ে দিত। অন্যান্যদের সঙ্গে বোঝাপড়া করা, সবাইকে একসাথে নিয়ে চলা – সুরজিতের মত এইসব গুণ আর অমায়িকতা ইয়েচুরির ছিল। বাম দলগুলির বর্তমান বিপর্যয়ের মুহূর্তে ইয়েচুরির অভাব তাঁর পার্টি বোধ করবে বইকি।

তাঁর বাচনভঙ্গি, যুক্তি, তর্ক ছিল অপূর্ব। তাই বোধহয় তিনি ছিলেন অজাতশত্রু। তাঁর অমায়িকতার কারণে, সমস্ত রাজনৈতিক দলে এবং জীবনের সর্বস্তরে তাঁর বন্ধুবান্ধবের সংখ্যা ছিল প্রচুর। এমনটা বোধহয় কখনো হয়নি যে কেউ কোনো বিরোধী নেতার হাতে তাঁরই বিরুদ্ধে স্মারকলিপি তুলে দিচ্ছেন। ঠিক এমনটাই করেছিলেন ইয়েচুরি, মনে করিয়ে দিলেন তপন। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের সম্পাদক থাকাকালীন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে লেখা অভিযোগপত্র খোদ ইন্দিরার হাতেই তুলে দিয়েছিলেন ইয়েচুরি। অভিনব সেই দৃশ্য একটি সাদাকালো ছবিতে এখনো ধরা আছে।

জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পদ থেকে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর পদত্যাগ চেয়ে স্মারকলিপি পাঠ করছেন তৎকালীন ছাত্রনেতা সীতারাম ইয়েচুরি। ছবি এক্স থেকে

ছাত্র হিসাবে ছিলেন খুবই মেধাবী। সিবিএসই-র বারো ক্লাসের সর্বভারতীয় পরীক্ষায় প্রথম হন। অর্থনীতিতে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর – দুই পাঠক্রমেরই চূড়ান্ত পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে পাস করেছিলেন। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া থাকাকালীন ১৯৭৪ সালে ছাত্র আন্দোলনে যোগ দেন এবং ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের নেতা হয়ে ওঠেন। তিনবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের সভাপতি নির্বাচিত হন। তারপর ১৯৮৪-১৯৮৬ ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের সর্বভারতীয় সভাপতি ছিলেন এবং সংগঠনটিকে শক্তিশালী করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

ছাত্র রাজনীতিতে থাকাকালীনই সিপিএমের সদস্য পদ পান ১৯৭৫ সালে। দেশে জরুরি অবস্থার সময়ে রাজনৈতিক সক্রিয়তার ফলে তাঁকে গ্রেফতারও হতে হয়। পার্টির দ্বাদশ কংগ্রেসে, ১৯৮৫ সালে, তিনি কেন্দ্রীয় কমিটিতে নির্বাচিত হন। তারপর ১৯৮৯ সালে দলের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারিয়েটে এবং পার্টির চতুর্দশ কংগ্রেসে, ১৯৯২ সালে, তিনি পলিট ব্যুরোতে নির্বাচিত হন। পার্টির সাধারণ সম্পাদক হন ২০১৫ সালের ২১তম কংগ্রেসে এবং শেষ সময় পর্যন্ত কুশল কান্ডারির মত দলের হাল ধরে রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে গেছেন। তাছাড়া কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের নেতৃত্বে থেকে তিনি কমিউনিস্ট ও প্রগতিশীল শক্তির বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে অংশগ্রহণ করেন এবং সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করেন।

রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যেই আবার খুব মন দিয়ে ক্রিকেট খেলা অনুসরণ করতেন। আর ছিলেন গানের সমঝদার, সিনেমাও দেখতেন সময় পেলেই। ২০০৫-২০১৭ পর্যন্ত দুবার রাজ্যসভার সদস্য ছিলেন। তুখোড় বক্তা হিসাবে সংসদে তাঁর নাম ছিল। ২০১৭ সালে শ্রেষ্ঠ সাংসদের পুরস্কারও পান। শুধু তুখোড় বক্তা নয়, ইয়েচুরি লেখার হাতও ছিল অপূর্ব। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দলের সাপ্তাহিক ইংরিজি কাগজ পিপলস ডেমোক্রেসি সম্পাদনা করেছেন। অনেক বইও লিখেছেন। এসবের মাঝেও সময় বার করে নবীন, প্রবীণ – সকলকে মার্কসবাদ পড়াতেন।

আরো পড়ুন বামপন্থীদের ইন্ডিয়া সংকট কাটানোর সোজা রাস্তা নেই

এহেন মানুষটি ব্যক্তিগত জীবনে ঝড়ঝাপটা সহ্য করেছেন প্রচুর। প্রথম বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পর নিজেও ভেঙে পড়েছিলেন প্রায়, কিন্তু দল ও রাজনীতির স্বার্থে ঘুরে দাঁড়ান। মাত্র কবছর আগে, অতিমারীর কবলে হারান তরুণ জ্যেষ্ঠপুত্রকে। সাংবাদিক পুত্র নিজের বেতন থেকে তাঁকে কিনে দিয়েছিল একটি আইফোন, আলাদা সিম ভরে সেটি সযত্নে পকেটে রাখতেন। সেই নম্বরটি খুব কম লোককেই দিতেন।

রেখে গেলেন স্ত্রী সীমা, মেয়ে অখিলা, ছেলে দানিশ ও ভাই শঙ্করকে।

অনেক স্মৃতি তাঁকে ঘিরে। অনেক গল্প হয়েছে তাঁর সাথে। কিছু এখনো তাজা, কিছু মলিন। কিন্তু ওঁর হাসি ভোলা যাবে না। সেই হাসি এবার ফ্রেমবন্দি হয়ে টাঙানো থাকবে এ কে গোপালন ভবনে।

বিদায়, কমরেড ইয়েচুরি!

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.