আমার পদত্যাগের কারণ হল, কেন্দ্রীয় কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নামে সাম্রাজ্যবাদপন্থী জনসংঘের সঙ্গে আধা-সামরিক ফ্যাসিস্ট (আরএসএসের মতো ঝটিকা বাহিনী)-র সঙ্গে মিলে যৌথ পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা আমার মনে হয় আমাদের দলের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর; আমাদের দেশে এবং বর্হিবিশ্বে গণতান্ত্রিক জনগণের মধ্যে, আমরা সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এবং সমাজতান্ত্রিক শক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ব।

সিপিএম সাধারণ সম্পাদক এবং পলিটব্যুরো সদস্যপদ থেকে পি সুন্দরাইয়ার পদত্যাগের চিঠি, ১৯৭৫

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

গত সোমবার ভোরে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়ন (জেএনইউএসইউ) নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ঘোষিত ফলাফল অনুসারে, অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (আইসা)-র নীতীশ কুমার ১,৭০২ ভোট পেয়ে সভাপতি পদে জয়ী হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের (এবিভিপি) শিখা স্বরাজ ১,৪৩০ ভোট পেয়েছেন এবং স্টুডেন্টস ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়া (এসএফআই) সমর্থিত তৈয়বা আহমেদ ৯১৮ ভোট পেয়েছেন।

ডেমোক্র্যাটিক স্টুডেন্টস ফেডারেশন (ডিএসএফ)-এর মনীষা ১,১৫০ ভোট পেয়ে সহসভাপতি পদে জয়ী হয়েছেন, এবিভিপির নিত্তু গৌতম ১,১১৬ ভোট পেয়েছেন। ডিএসএফ সাধারণ সম্পাদক পদেও জয়ী হয়েছে। তাদের প্রার্থী মুন্তেহা ফাতিমা ১,৫২০ ভোট পেয়ে জিতেছেন, এবিভিপির পেয়েছেন কুণাল রাই ১,৪০৬ ভোট।

যুগ্ম সম্পাদক পদে এবিভিপি জয়লাভ করেছে। তাদের বৈভব মীনা ১,৫১৮ ভোট পেয়েছেন, যেখানে আইসার নরেশ কুমার (১,৪৩৩ ভোট) এবং প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের (পিএসএ) প্রার্থী নিগম কুমারী (১,২৫৬ ভোট) পেয়েছেন। ২০১৫-১৬ সালে সৌরভ শর্মার এই পদে জয়ের পর মীনার এই জয় এতদিনে এবিভিপিকে আবার কেন্দ্রীয় প্যানেলে জায়গা করে দিল। শেষবার এবিভিপি সভাপতি পদে জয়লাভ করেছিল ২০০০-০১ সালে, জয়ীর নাম সন্দীপ মহাপাত্র।

এবছরের নির্বাচনে বাম জোটে ভাঙন দেখা গেছে। একদিকে আইসা ও ডিএসএফ একজোট হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে, অপরদিকে এসএফআই এবং অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস ফেডারেশন (এআইএসএফ), বিরসা আম্বেদকর ফুলে ছাত্র সংগঠন (বাপসা) আর পিএসএ-র সঙ্গে জোট করে লড়েছে।

তিনটি কেন্দ্রীয় প্যানেল পদে তাদের জোটের জয়কে স্বাগত জানিয়েছে আইসার সদস্যরা। যদিও তাঁরা যুগ্ম সম্পাদক পদে এবিভিপির জয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং একে ক্যাম্পাসে বামপন্থী আধিপত্যের জন্য চ্যালেঞ্জ বলে অভিহিত করেছেন। এই নির্বাচনের অনতিপূর্বে ভারতের প্রধান দুই বাম দল সিপিএম ও সিপিআইএমএল লিবারেশনের মধ্যে বর্তমান ভারতের শাসনপ্রণালী ‘ফ্যাসিবাদী’ নাকি ‘নয়া ফ্যাসিবাদী’ – এই নিয়ে তাত্ত্বিক বিতর্ক শুরু হয়। অচিরেই সেই বিতর্কের আঁচ এসে লাগে দুই রাজনৈতিক দলের শিক্ষার্থী সংগঠনের জোটে। এসএফআই-আইসা জোটে ভাঙন ধরে। তবে এই ভাঙনের সবটাই যে এই বিতর্কের ফলে তা নয়। শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচনের আসন ভাগাভাগি নিয়েও দীর্ঘ মতবিরোধ রয়েছে। কখনো কখনো যে বিরোধ ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সার্বিক বাম জোটের রাজনৈতিক গুরুত্বের থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

মার্চ মাসে সিপিএমের ইংরিজি মুখপত্র পিপলস ডেমোক্রেসি-তে প্রকাশিত ‘নয়া ফ্যাসিবাদ কথার ব্যবহার সম্পর্কে নোট’ শীর্ষক নিবন্ধে সিপিএমের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে – ১৭-১৯ জানুয়ারি, ২০২৫ অনুষ্ঠিত সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পলিট ব্যুরোর খসড়া রাজনৈতিক প্রস্তাবের সঙ্গে ‘নয়া ফ্যাসিবাদ’ কথার ব্যবহার সম্পর্কে একটি নোট জারি করা হচ্ছে। যেহেতু নোটটির কিছু ভুল ব্যাখ্যা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, তাই নোটের লেখাটি নিচে প্রকাশ করা হচ্ছে।

১। খসড়া রাজনৈতিক প্রস্তাবে বলা হয়েছে, প্রতিক্রিয়াশীল হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডা আরোপ এবং বিরোধী দল ও গণতন্ত্রকে দমন করার জন্য কর্তৃত্ববাদী অভিযান নয়া ফ্যাসিবাদী বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করে। এই প্রথমবারের মত আমরা রাজনৈতিক প্রস্তাবের জাতীয় পরিস্থিতি বিভাগে ‘নয়া ফ্যাসিবাদী’ কথাটি ব্যবহার করেছি।

২। ২২তম কংগ্রেসের আগে আমরা বলেছিলাম যে কর্তৃত্ববাদী এবং হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক আক্রমণ ‘উদীয়মান ফ্যাসিবাদী প্রবণতা’ প্রদর্শন করে। ২৩তম কংগ্রেসে আমরা বলেছিলাম যে মোদী সরকার আরএসএসের ফ্যাসিবাদী এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে।

৩। নয়া ফ্যাসিবাদ কথাটির অর্থ কী? ‘নয়া’ কথাটির অর্থ নতুন বা পুরনো কিছুর সমসাময়িক সংস্করণ। নয়া ফ্যাসিবাদ কথাটি ব্যবহার করা হচ্ছে এটিকে ধ্রুপদী ফ্যাসিবাদ থেকে আলাদা করার জন্য, যার ইউরোপে যুদ্ধের সময়ে উত্থান হয়েছিল, যেমন বেনিতো মুসোলিনির অধীনে ইতালিতে এবং অ্যাডলফ হিটলারের অধীনে জার্মানিতে। সে এমন এক যুগ ছিল যখন বিশ্ব পুঁজিবাদী সংকটের ফলে ১৯২৯-১৯৩৩ সালের মহামন্দা দেখা দেয়। আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব তীব্রতর হচ্ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ – উভয়ই ছিল আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বের ফলাফল। ফ্যাসিবাদী শক্তি ক্ষমতা দখলের পর বুর্জোয়া গণতন্ত্রকে বিলুপ্ত করে অস্ত্র উৎপাদন বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য যুদ্ধকে একটি পদ্ধতি হিসাবে ব্যবহার করে। এই দেশগুলিতে একচেটিয়া পুঁজি ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলিকে সম্পূর্ণরূপে সমর্থন করেছিল এবং সংকট কাটিয়ে উঠতে চরম ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তাদের উপর নির্ভর করেছিল।

৪। নয়া ফ্যাসিবাদের কিছু উপাদান বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকের ফ্যাসিবাদের মতই। ভারতে নয়া ফ্যাসিবাদ আরএসএস এবং তার হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শ দ্বারা গঠিত, যা আমাদের দলীয় বক্তব্য অনুসারে ফ্যাসিবাদী, এবং বিজেপির শাসনকালে ক্ষমতার সুবিধাগুলিকে কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছে। হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক মতাদর্শ, নয়া উদারনৈতিক সংকট এবং বৃহৎ বুর্জোয়াদের স্বার্থে কর্তৃত্ববাদ আরোপের সমন্বয় – সবই একটি প্রোটো নয়া ফ্যাসিবাদের উপাদান।

৫। নয়া ফ্যাসিবাদ নয়া উদারনীতির সংকটের এক ফলাফল এবং এটি একটি আন্তর্জাতিক ঘটনা। নয়া ফ্যাসিবাদী শক্তি বিভিন্ন দেশে আবির্ভূত হয়েছে এবং কয়েকটিতে ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু ১৯৩০-এর দশকের বিপরীতে, বিশ্বব্যাপী অর্থ পুঁজির উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বগুলি নিস্তেজ হয়ে যায়, তাই নয়া ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা সাম্রাজ্যবাদী প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে যুদ্ধে যায় না। নয়া উদারনৈতিক সংকট এবং তার ফলে জনগণের মধ্যে সৃষ্ট অসন্তোষকে অতি দক্ষিণপন্থী এবং নয়া ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলি জনপ্রিয় বাগাড়ম্বর ব্যবহার করে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু যখন তারা ক্ষমতায় আসে তখন তারা নয়া উদারনৈতিক নীতির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে না, উলটে বৃহৎ পুঁজির স্বার্থে একই কাজ করে। ধ্রুপদী ফ্যাসিবাদের সঙ্গে আরেকটি পার্থক্য হল, নয়া ফ্যাসিবাদী দলগুলি তাদের রাজনৈতিক প্রকল্প এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য নির্বাচনকে ব্যবহার করে এবং ক্ষমতায় এলেও নির্বাচনী ব্যবস্থা তুলে দেয় না। তারা নির্বাচনী ব্যবস্থা বজায় রাখে কিন্তু বিরোধী দলকে দমন করার জন্য কর্তৃত্ববাদী পদ্ধতি ব্যবহার করে। তারা ভিতর থেকে কাজ করে দীর্ঘতর সময়ের জন্য রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় পরিবর্তন আনতে চায়।

৬। আমরা বলেছি যে বিজেপি-আরএসএসের অধীনে বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা একটি হিন্দুত্ববাদী-কর্পোরেট কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা যা ‘নয়া ফ্যাসিবাদী বৈশিষ্ট্য’ প্রদর্শন করে। আমরা বলছি না যে মোদী সরকার একটি ফ্যাসিবাদী বা নয়া ফ্যাসিবাদী সরকার। আমরা ভারতীয় রাষ্ট্রকে একটি নয়া ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র হিসাবেও চিহ্নিত করছি না। আমরা যা স্পষ্ট করে বলতে চাইছি তা হল, আরএসএসের রাজনৈতিক শাখা বিজেপির দশ বছর ধরে একটানা শাসনের পর, বিজেপি-আরএসএসের হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে এবং এর ফলে ‘নয়া ফ্যাসিবাদী বৈশিষ্ট্য’ প্রকাশ পাচ্ছে। ‘বৈশিষ্ট্য’ শব্দের অর্থ এখানে প্রবণতা, কিন্তু সেই প্রবণতা একটি নয়া ফ্যাসিবাদী সরকার ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়নি। সুতরাং রাজনৈতিক প্রস্তাবটি হিন্দুত্ব-কর্পোরেট কর্তৃত্ববাদের নয়া ফ্যাসিবাদের দিকে যাওয়ার বিপদের কথা বলছে, যদি বিজেপি-আরএসএসের বিরুদ্ধে পালটা লড়াই না চালানো হয় এবং প্রতিহত না করা হয়।

৭। এই অবস্থান সিপিআই এবং সিপিআই (এমএল)-এর থেকে আলাদা। সিপিআই মোদী সরকারকে একটি ফ্যাসিবাদী সরকার হিসাবে চিহ্নিত করেছে এবং সিপিআই (এমএল) জানিয়েছে যে একটি ভারতীয় ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

আন্দাজ করা যায়, এখানে উল্লিখিত গণমাধ্যমে ‘ভুল’ বার্তা নিয়ে ছড়িয়ে পড়া লেখাটি ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ তারিখে লিবারেশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত লিবারেশনের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্যের লেখা ‘রিকগনাইজিং ফ্যাসিজম ইন ইন্ডিয়া: ইফ নট নাও দেন হোয়েন?’ প্রবন্ধটি। তিনি সিপিএম পলিট ব্যুরো প্রণীত এই ‘নয়া ফ্যাসিবাদী প্রবণতা’-র তত্ত্বের বিশদে সমালোচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন ‘বিশ্বে সম্ভবত আর কোনো ফ্যাসিবাদী ধারার এতদিন ধরে নিজেকে টিকিয়ে রাখার, পরিবর্তিত সামাজিক-রাজনৈতিক গতিশীলতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার, শক্তি সঞ্চয় করার এবং প্রজাতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্কে ছলচাতুরির মাধ্যমে প্রবেশ করে, আজ যে ধরনের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য আরএসএস উপভোগ করছে, তা অর্জনের উদাহরণ আর নেই। একশো বছরের অস্তিত্বে আরএসএসের সমস্ত উত্থান-পতন, কৌশলগতভাবে পিছিয়ে যাওয়া এবং এগিয়ে আসার ইতিহাস, বিশেষ করে গত চার দশক ধরে তার নাটকীয় উত্থান ও শক্তিসঞ্চয় দেখলে তাদের ফ্যাসিবাদী চরিত্র সম্পর্কে কারোর বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকা উচিত নয়।’

‘…ভারতে নির্বাচন অবশ্যই হচ্ছে, কিন্তু যখন নির্বাচন কমিশন সরকারের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে এবং ভোটার তালিকা তৈরি থেকে শুরু করে ভোটগণনা পর্যন্ত সমগ্র নির্বাচন প্রক্রিয়া যখন ক্রমশ অস্বচ্ছ ও স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠছে, তখন ভারতের বিপর্যস্ত গণতন্ত্রের জন্য কি এটি কি সত্যিকারের রক্ষাকবচ হতে পারে? আমাদের মনে রাখা উচিত যে হিটলারও নির্বাচনী পথ ধরেই ক্ষমতায় এসেছিলেন এবং ধীরে ধীরে সমস্ত বিরোধী দলকে অবৈধ ঘোষণা করে ৯৯% ভোট পেয়ে স্থায়ী একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ভারতে অমিত শাহ ৫০ বছরের নিরবচ্ছিন্ন শাসনের কথা বলছেন এবং আমরা ইতিমধ্যেই বিজেপির প্রতিটি নির্বাচনে জয়লাভ করে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার মরিয়া এবং অশুভ প্রচেষ্টার অসংখ্য উদাহরণ দেখেছি। ভারতের নির্বাচন ক্রমশই প্রহসন হয়ে দাঁড়াচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দেখানোর মত একটা দৃশ্য তৈরি করতে এবং আভ্যন্তরীণ বৈধতা আদায় করতে চালানো হয়।

একথা সত্য যে বিজেপি এখন পর্যন্ত তার রাজনৈতিক যাত্রায় বেশ কিছু মিত্র এবং সহায়ক খুঁজে পেয়েছে। ঘোষিত মিত্রদের সমর্থন ছাড়াও প্রায়শই বিজেপি নয়া উদারনৈতিক এজেন্ডার কারণে এবং নরম হিন্দুত্বের ধারাবাহিকতার ভিত্তিতে বৃহত্তর সমর্থন পায়। ভিন্নমত পোষণকারীদের উপর নির্যাতন, মুসলিম এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণা এবং সহিংসতার তীব্র প্রচার; নাগরিক স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং গণতান্ত্রিকতার ক্ষয় ইত্যাদি বিষয়ে ভারতের নাগরিক পরিসরে সংবেদনশীলতা এবং সোচ্চার বিরোধিতা এখনো খুবই কম।

এহেন পরিস্থিতিতে দীপঙ্করবাবুর মতে ‘ঐতিহাসিকভাবে সিপিএমের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘাঁটি কেরালা আর পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও নির্বাচনী জটিলতা সকলেই বুঝতে পারে। কেবল আশা করা যেতে পারে যে ফ্যাসিবাদের উত্থান চিহ্নিতকরণ এবং নামকরণে সিপিএমের দ্বিধা ওই দুটি রাজ্যে দলের তাৎক্ষণিক নির্বাচনী পরিস্থিতির দ্বারা প্রভাবিত নয়। রাজ্যে ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও কেরালায় লোকসভা নির্বাচনে সিপিএমের বারবার ব্যর্থতা নিশ্চিতভাবেই পশ্চিমবঙ্গে তার ক্রমাগত ক্ষয়ের মতই উদ্বেগের বিষয়। আরও উদ্বেগজনক হল সিপিএম ভোটারদের একটি অংশ, এবং সম্ভবত, কিছু প্রাক্তন সংগঠক ও নেতার ক্রমাগত বিজেপিতে চলে যাওয়া।

আরো পড়ুন বিরোধীদের মধ্যে বিশৃঙ্খলাই বিজেপির শক্তি

দলের অবশ্যই তার স্বাধীন বৃদ্ধি এবং ভূমিকাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত, কিন্তু তা কি একটি বিস্তৃত ফ্যাসিবিরোধী ঐক্য গঠনের সমান গুরুত্বপূর্ণ কাজের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে দেওয়া উচিত? লোকসভায় বর্তমানে সিপিএমের দখলে থাকা চারটি আসনের মধ্যে তিনটি তামিলনাড়ু এবং রাজস্থান থেকে এসেছে, ইন্ডিয়া জোটের অংশ হিসাবে। তাছাড়া কোনো কমিউনিস্ট দল কি আজকের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক প্রশ্নটিকে ধামাচাপা দিয়ে সত্যিই তার শক্তি এবং ভূমিকা বাড়াতে পারে? আমরা এখনো আশা করি যে আধুনিক ভারতের এই গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে কমিউনিস্ট আন্দোলনের কোনো অংশই দ্বিধান্বিত হবে না এবং ফ্যাসিবাদ তার পূর্ণ শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগেই ভারতকে ক্রমবর্ধমান বিপর্যয় থেকে রক্ষা করার জন্য আমরা একসাথে ফ্যাসিবিরোধী প্রতিরোধের কমিউনিস্ট ধারাটিকে শক্তিশালী করতে সক্ষম হব।’

বোঝাই যাচ্ছে, এহেন তিক্ত মতবিরোধ ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে সংঘ-বিজেপির শিক্ষাক্ষেত্রের দোসর এবিভিপিকে আটকানোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদা সোভিয়েত বিপ্লবী, পরবর্তী স্তালিন আমলে আমলাতান্ত্রিক ছাঁটাইয়ের মুখে পড়া পোলিশ কমিউনিস্ট কার্ল রাদেক ১৯২২ সালে ‘স্পিচ টু ফোর্থ ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস ডিসকাশন অফ দ্য থিসিসেস অন ট্যাকটিক্স’ শীর্ষক বক্তৃতার ‘লিডারশিপ নেগোশিয়েশনস অ্যান্ড ইউনিটি ইন দ্য র‍্যাংকস’ অংশে বলেছিলেন ‘ক্ষমতার জন্য সংগ্রামের ধারণাটি বর্তমানে বিস্তৃত শ্রমিক জনতার মধ্যে বিদ্যমান নেই। বরং সমগ্র পরিস্থিতি তাদের পিছনের দিকে ঠেলে দিয়েছে, এবং শ্রমিকশ্রেণির বিশাল অংশ শক্তিহীন বোধ করছে। এই তথ্যগুলির পরিপ্রেক্ষিতে, ক্ষমতা দখল আমাদের তাৎক্ষণিক কার্যসূচিতে নেই। এটিকে একটি ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে মেনে নেওয়া উচিত।’ প্রবাদপ্রতিম কমিউনিস্ট নেত্রী ক্লারা জেটকিনের ২০ জুন, ১৯২৩ তারিখে প্রদত্ত বিখ্যাত বক্তৃতা ‘ইউনিটি এগেনস্ট ফ্যাসিজম’। সেখানে তিনি বলেছিলেন ‘ফ্যাসিবাদের পক্ষে যা গুরুত্বপূর্ণ তা হল তারা একজন শ্রেণিসচেতন সর্বহারার মুখোমুখি হয় এবং তারপর তাকে মাটিতে ফেলে দেয়। এই কারণেই শ্রমিকদের অবশ্যই দল বা ট্রেড ইউনিয়নগুলির মধ্যেকার পার্থক্যগুলিকে সরিয়ে সংগ্রামের জন্য একত্রিত হতে হবে।’

দুই ক্ষেত্রেই লক্ষণীয় যে, ফ্যাসিবাদবিরোধী যুক্তফ্রন্টের মহত্তম তাত্ত্বিক নেতারা বামপন্থীদের সাময়িক জয়ের প্রতি আসক্ত হতে বারণ করছেন এবং মৌলিকভাবে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সমস্ত মতবিরোধকে মত বিনিময়ে পরিণত করে একসাথে অন্তত গণসাংগঠনিক স্তরে চলার নিদান দিচ্ছেন। অথচ জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের এবারের শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচনে দেখা গেল, যে সময়ে লিবারেশনের মতাদর্শিক কাঠামো মেনে ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠন আইসা ক্যাম্পাসে এবিভিপি ও কর্তৃপক্ষের যোগসাজশের বিরুদ্ধে প্রচার চালাচ্ছে, তখন পশ্চিমবঙ্গ সিপিএমের মুখপত্র গণশক্তি ২০ এপ্রিল প্রকাশিত এক প্রতিবেদন লিখছে ‘যদিও এই নির্বাচনে বাপসার সঙ্গে কোনও আসন সমঝোতা করতে নারাজ ছিল আইসা। এসএফআই বাপসাকে নিয়ে লড়াইয়ের প্রস্তাব দিলে তা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে আইসা। জাতবিদ্বেষী মনোভাব থেকেই আইসা প্রস্তাব খারিজ করে দিয়েছে।’ এই ধরণের সংকীর্ণতাবাদী আচরণের পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকলে যে, কোনো ফ্রন্টেই, তা শিক্ষার্থী আন্দোলনের ক্ষেত্রেই হোক অথবা শ্রমিক-কৃষক সংগঠনের ক্ষেত্রেই হোক, প্রকৃত অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক ফ্যাসিবাদবিরোধী বাম ঐক্যের নজির গড়া সম্ভব হবে না, তা বলাই বাহুল্য।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

1 মন্তব্য

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.