বিহারের রাজধানী পাটনার দক্ষিণে ১০০ কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে একটি ছোট গ্রামে সাত একর জমিতে ধান চাষ করেন অবিনাশ কুমার। গড়ে প্রতি বছর তাঁর চাষবাসে খরচ হয় এক লাখ টাকার কাছাকাছি, আর আয় খুব বেশি ধরলে ২,৩০,০০০ টাকা। অর্থাৎ মাসে হাতে রইল ১১,০০০ টাকার কাছাকাছি। তাও যদি সে বছর ফসল ভাল হয় আর বিক্রিবাটা ঠিকঠাক থাকে। কিন্তু প্রায়ই বীজ বপন করার সময়ে অনাবৃষ্টি আর ফসল কাটার সময়ে অতিবৃষ্টির সম্মুখীন হতে হয়। মানে ধান ভাল ফলনের জন্য যা দরকার, তার একেবারে উল্টো। এখন সেই ধান কেটে, গাড়ি ভাড়া করে তা নিয়ে যেতে হবে কাছের কোনো ক্রেতার কাছে। সেই ক্রেতা – যাকে বিহারে লালা বা সাহু বলা হয় – সে ধার্য করবে দাম। এমনভাবে, যাতে তার নিজের জন্যও কিছুটা লাভ থাকে। কারণ সে আবার এই ফসল বিক্রি করবেন অন্যত্র।

বিহারে প্রত্যেক পঞ্চায়েতে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনার জন্য প্রাথমিক কৃষি সমবায় সমিতি (পিএসিএস) এবং ব্যাপার মণ্ডল বলে একটি সংস্থাকে নিযুক্ত করা হয়েছে, যেখানে সরকার নির্ধারিত মূল্যে আনাজ কেনা হয়। বিহার এগ্রিকালচারাল প্রোডিউস মার্কেট কমিটি (এপিএমসি) ইয়ার্ড বা মান্ডি পদ্ধতি অনুসরণ করে না। বহু কৃষক, বিশেষত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা, তাঁদের ফসল লালা বা সাহুদেরই বিক্রি করে থাকেন। লালার কাছে ফসল বেচার ফলে সরকারের ধার্য করা ন্যূনতম সহায়ক মূল্য বা এমএসপি থেকে এ ধরনের কৃষকরা বঞ্চিত হন। অনেকেই আবার ফসল তুলে পাড়ি দেন সুদূর পাঞ্জাবে, যদি সেখানে মান্ডিতে ফসল বেচে কিছু রোজগার হয়। তবে পাঞ্জাব সরকারের তরফে ফসলের মরসুমে রাজ্যের সীমান্তে থাকে কড়া নজরদারি, যাতে অন্য রাজ্যের ফসল তাঁদের মান্ডিতে না ঢুকতে পারে। তাই প্রায় প্রতি মরসুমেই পাঞ্জাব সীমান্তে চলে জোর কাবাডি খেলা।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

বিহারের অবিনাশকে কিন্তু সংজ্ঞা অনুযায়ী ক্ষুদ্র চাষি বলা যাবে না। যাঁরা দুই হেক্টরেরও (প্রায় পাঁচ একর) কম জমিতে চাষবাস করেন, শুধু তাঁদেরই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক হিসাবে উল্লেখ করা হয়। তাঁরা দেশের মোট কৃষকের ৮৬ শতাংশেরও বেশি। এখন অবিনাশের যদি নুন আনতে পান্তা ফুরোয়, তাহলে বোঝাই যায় এই শ্রেণির চাষিদের অবস্থা কী। দেশে চাষবাসের উন্নতির ধারণা ফলন বা উৎপাদন বৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে আছে। এই বিশালসংখ্যক কৃষকের জীবনযাত্রার মানোন্নতির কোনো লক্ষণ নেই। তাঁরা উৎপাদনের জন্য আজও পুরোপুরি প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল।

প্রাকৃতিক কারণে ফসলের ক্ষতি হলে তার জন্য আছে সরকারি বিমা প্রকল্প। সেখানে কৃষক খুব অল্প অর্থ খরচ করেই ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন। কিন্তু অবিনাশের অভিযোগ – তাঁর এলাকায় ফোন সংযোগের সমস্যা রয়েছে। ফলে কৃষকদের পক্ষে নিকটস্থ কৃষি আধিকারিক বা নিকটবর্তী সিএসসি কেন্দ্রে কল করে বা ফসলের ক্ষতি হওয়ার ৭২ ঘন্টার মধ্যে বিষয়টি জানানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। আবার কিছু চাষি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফসলের ক্ষতির তথ্য রিপোর্ট করার অ্যাপটি পরিচালনা করার অসুবিধার কথাও উল্লেখ করেছেন।

তাঁদের এত ক্ষমতা নেই যে ফসল গাড়িতে তুলে, মান্ডি তো দূরের কথা, এমনকি লালার কাছেও পৌঁছে দেবেন। কাজেই বিক্রির জন্য নির্ভর করে থাকতে হয় এলাকার এজেন্টের উপর। আবার মান্ডি পর্যন্ত যেতে পারলেও সেখানে আছে কমিশন এজেন্ট বা আরহতিয়া। তারপর আবার ফসলের গুণমানেরও বিচার হবে। হ্যাপা প্রচুর, খরচও অনেক। তাই পাশের লালার কাছে কোনোক্রমে পৌঁছে গিয়ে কিছু কম টাকায় ফসল বেচে দিলেই চাষি বেঁচে যায় আর কি।

অন্যদিকে ওই ন্যূনতম সহায়ক মূল্য বা এমএসপি কিন্তু প্রতি ফসলের মরশুমে কমিশন ফর এগ্রিকালচারাল কস্ট অ্যান্ড প্রাইসেস (সিএসিপি)-এর সুপারিশের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা ২২টি বাধ্যতামূলক কৃষি ফসলের (এবং আখের জন্য ন্যায্য ও লাভজনক মূল্য বা এফআরপি) জন্য স্থির করে। এমএসপি ২৩টি ফসলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা সত্ত্বেও প্রধানত ধান ও গমের উপর সবচেয়ে বেশি প্রযোজ্য হয়ে থাকে। দেশে এই দরে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা রাজ্যেই সবচেয়ে বেশি বেচাকেনা হয়ে থাকে। সুতরাং ওই মূল্য দেশের শতকরা ১২ শতাংশেরও কম কৃষকের হাতে আসে। তাই কিছু কৃষক সংগঠন এই এমএসপিকে একেবারে লিখিত আইনে পরিণত করার দাবি করে যাচ্ছে। কিন্তু মুশকিল হল, ঢালাও সহায়ক মূল্য দেওয়া আইন হয়ে গেলে কোষাগারে যে টান পড়বে তা পূরণ করা প্রায় অসম্ভব। একথা সরকার আর বিরোধী – দুই পক্ষই জানে।

আরো পড়ুন ফসলের এমএসপি: কেন্দ্র, রাজ্য — কেউ কথা রাখেনি

ফলে নির্মলা সীতারামণের এবারের বাজেটেও দেখা গেল সরকার উৎপাদন বাড়ানোর দিকেই বেশি নজর দিয়েছে। যেমন প্রধানমন্ত্রী ধনধান্য কৃষি যোজনার মাধ্যমে কৃষি উৎপাদনশীলতা, সেচ, সঞ্চয় এবং ঋণের সুযোগ বাড়াতে ১০০টি জেলাকে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত, দেশ যাতে ডালের ব্যাপারে আত্মনির্ভর হতে পারে তার জন্য একটি ছয় বছরের ‘মিশন’ ঘোষিত হয়েছে। তৃতীয়ত, শাকসবজি ও ফলের জন্য বিস্তৃত কর্মসূচির মাধ্যমে উৎপাদন ও সরবরাহ প্রণালীর উন্নতি এবং কৃষকদের জন্য ন্যায্য মূল্য প্রদানের কথা বলা হয়েছে। চতুর্থত, তুলা উৎপাদনশীলতার জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দ্বারা ফলন বাড়ানোর লক্ষ্য একটি পাঁচ বছরের ‘মিশন’-ও ঘোষিত হয়েছে। এছাড়া আরও কিছু পরিকল্পনার কথা বাজেটে আছে। এই ধরনের কৃষিভিত্তিক পরিকল্পনা দেশের জন্য দরকারি, অথচ তৈলবীজের ক্ষেত্রে কিন্তু তেমন কিছু দেখা গেল না।

অন্যদিকে রাজস্থানের চুরু অঞ্চলের নির্মল প্রজাপত দাবি করছেন, প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনার (পিএমএফবিওয়াই) অধীনে প্রদেয় অর্থ আদায় করতে তাঁর মত কৃষকের কঠিন সমস্যা হয়। তাঁর কথায়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাঁরা ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য প্রতিবাদ, বিক্ষোভের পথ নিতে বাধ্য হন। এই যোজনায় চাষীদের তিনটি সমান কিস্তিতে প্রতি বছর ৬,০০০ টাকা সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে দেওয়ার কথা।

উল্লেখ্য, কৃষকদের প্রত্যক্ষ লাভজনক পরিকল্পনা হিসাবে এবার কিষাণ ক্রেডিট কার্ডে ঋণের ঊর্ধ্বসীমা তিন লক্ষ টাকা থেকে বাড়িয়ে পাঁচ লক্ষ টাকা করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রত্যক্ষ সাহায্যের বেশিরভাগটাই কিন্তু ঋণ। অথচ যেখানে অবিনাশের মত কৃষক সংসার চালাতেই হিমশিম খাচ্ছেন, সেখানে ঋণ শোধ করবেন কী করে? ওদিকে আবার ২০২৪-২৫ সালের সংশোধিত অনুমানের তুলনায় কৃষি ও কৃষক কল্যাণ বিভাগে বরাদ্দ ৩,৯০৫.০৫ কোটি টাকা কমেছে। সেখানে আগামী আর্থিক বছরের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ১,২৭,২৯০.১৬ কোটি টাকা। আগে ২০২৪-২৫ সালের সংশোধিত হিসাব অনুযায়ী কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রকের জন্য বরাদ্দ ছিল ১,৩১,১৯৫.২১ কোটি টাকা। গত বাজেটে যা ছিল ১,২২,৫২৮.৭৭ কোটি টাকা।

দ্য হিন্দু সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, বরাদ্দ টাকা সবথেকে বেশি কমেছে প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনায় – ৩,৬২১ কোটি ৭৩ লক্ষ টাকা। এই যোজনায় কেন্দ্র ছাড়া রাজ্যেরও অবদান থাকে। একদিকে যেখানে শেষ সংশোধিত রাজস্ব অনুমানে এই প্রকল্পটি ১৫,৮৬৪ কোটি টাকা পায়, সেখানে বাজেটে বরাদ্দ হয়েছে ১২,২৪২.২৭ কোটি টাকা। আবার জমির সারের ক্ষেত্রেও বরাদ্দ কমানো হয়েছে। এর প্রভাব সারের ভর্তুকিতে পড়তে পারে। এবারের বরাদ্দ ১,৫৬,৫০২.৪৪ কোটি টাকা গত আর্থিক বছরের সংশোধিত অনুমানের থেকে প্রায় ২৬,৫০০.৮৫ কোটি টাকা কম। উল্লেখ্য, গত বাজেটে সার দফতরকে ১,৬৪,১৫০.৮১ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল।

সে যা-ই হোক, বাজেটের পরিপ্রেক্ষিতে আরএসএসের সঙ্গে যুক্ত কৃষক সংগঠন ভারতীয় কিষাণ সংঘ কিন্তু সরকারের পরিকল্পনাগুলিকে কৃষকের কল্যাণ এবং গ্রামের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য সহায়ক হবে বলে জানিয়েছে। ওদিকে অন্য কিছু গোষ্ঠী আবার অসন্তুষ্ট। তাদের বক্তব্য, বাজেটের ফলে কৃষিকাজে ব্যয় আরও বাড়বে। এমএসপি আইনে পরিণত করার দাবিতে দেশে মিটিং, মিছিল, প্রতিবাদে যুক্ত সংযুক্ত কিষাণ মোর্চা আন্দোলন এক বিবৃতিতে বলেছে, এই বাজেট কৃষক ও শ্রমিকদের উপর আক্রমণ। তাদের কথায়, বাজেটে এম এস স্বামীনাথনের ফর্মুলা এবং কৃষি ঋণ মকুবের একটি বিস্তৃত প্রকল্প অনুসারে বৈধ ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের দাবিকে উপেক্ষা করা হয়েছে।

প্রতিবাদী ইউনিয়ন নেতারা সি২+৫০ হারে মূল্যের দাবি করছেন। তাঁদের বক্তব্য, সরকার এ২+এফএল মূল্য গণনা করছে এবং এতে ১.৫ যোগ করছে। এখানে এ২ বলতে একটি নির্দিষ্ট ফসল যেমন বীজ, সার, কীটনাশক, লিজ নেওয়া জমি, ভাড়া করা শ্রম, যন্ত্রপাতি এবং জ্বালানি উৎপাদনে ‘ইনপুট’ খরচকে বোঝায়। আর এ২+এফএল মানে ইনপুট খরচের সঙ্গে পারিবারিক শ্রমের মূল্য যোগ করা। সি২ ব্যাপক ব্যয়ের প্রতিনিধিত্ব করে, যাতে এ২+এফএল যোগ করা হয়ে থাকে মালিকানাধীন জমির পরিণামস্বরূপ ভাড়ায় আর মূলধনের উপর সুদ, ইজারাকৃত জমির জন্য প্রদত্ত খাজনার সঙ্গে।

মনে রাখা ভাল যে অনুদানের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ ভাগচাষি এবং ক্ষেতমজুর বঞ্চিত। কারণ কেবল জমির মালিকরাই সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী আবেদন জানাতে পারেন। কাজেই উৎপাদন বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কৃষকদের সামগ্রিক উন্নয়নের কথাও ভাবতে হবে। তা না হলে মুষ্টিমেয় ধনী খেত মালিকের হাতেই থাকবে টাকা ও ক্ষমতা। তিন বছর আগে এই সামগ্রিক উন্নয়নের কথা বলেই সরকারের তরফ থেকে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তাতে আমলা আর পণ্ডিতরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ, মাত্র কয়েকজন কৃষক নেতা আছেন। তাঁরাই মাঠে কাজ করা লক্ষ কোটি কৃষকের প্রতিনিধিত্ব করছেন। দেশের বিভিন্ন শহরে সেই কমিটির সভা হয়েছে বিস্তর, কিন্তু আজও উপসংহার লেখা হয়নি।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.