মানতাশা আহমেদ

ঢাকঢোল পিটিয়ে এ কাজ শুরু হয় না। এভাবেই হয় – একটু একটু করে, জটিল আইনের মধ্যে আমলাতান্ত্রিক ভাষার নিচে সন্তর্পণে লুকিয়ে। ভাবখানা এমন যেন একটা প্রশাসনিক সংস্কার করা হচ্ছে মাত্র। তারপর একদিন দেখবেন যে জমিতে বহু প্রজন্ম ধরে প্রার্থনা করা হয়েছে, সেই জমি আর আপনার নয়। যেসব দেয়ালে ইতিহাসের সাক্ষী, সেগুলোকে ‘বিতর্কিত’ বলে ঘোষণা করে দেওয়া হবে। যা একদিন পবিত্র ছিল তা হয়ে দাঁড়াবে লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দু। শুধু সম্পত্তির জন্যে নয়; স্মৃতি, পরিচয় আর একাত্মতার জন্যে।

ওয়াকফ (সংশোধনী) আইন, ২০২৫ কেবল একটা কাগজ নয়। এ হল আইনে রূপান্তরিত এক বিশেষ ধরনের রাজনীতি। মুসলমান পরিচয়কে একটু একটু করে অদৃশ্য করে দেওয়ার সুচিন্তিত অভিযানের ধারাবাহিকতায় নেওয়া এক সিদ্ধান্ত। এ কাজ শুধু গণহিংসা বা সংবাদমাধ্যমে মুসলমানদের খলনায়ক হিসাবে তুলে ধরে করা হচ্ছে না। নীরব, সুচারু, রাষ্ট্রীয় মদতে মুসলমানদের মুছে দেওয়া হচ্ছে। এই আইন সেই প্রকল্পেরই অঙ্গ।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ওয়াকফ কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?

এই আইনের চাঁদমারি কোন জিনিসগুলো? মাদ্রাসা, মসজিদ, কবরস্থান, দরগা। এইসবের যে জমি বহুক্ষেত্রে বহু প্রজন্ম আগে বিশ্বাসের ভিত্তিতে দান করা হয়েছিল যাতে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ ভবিষ্যতেও বহুকাল ব্যবহার করতে পারেন। ওয়াকফ হল জমি বা যে কোনো সম্পত্তি, প্রথাগতভাবে যা স্বেচ্ছায় কোনো ব্যক্তি দান করেছেন ধর্মীয়, শিক্ষা সংক্রান্ত বা অন্য দাতব্য কাজে ব্যবহার করার জন্যে। কবরস্থান, পুরনো মসজিদ, মাদ্রাসা, কমিউনিটি সেন্টার ইত্যাদি এমন পরিসর যা শুধু বিশ্বাসের সঙ্গে নয়, সাংস্কৃতিক স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে।

ওয়াকফ আইন, ১৯৯৫ অনুযায়ী এই পরিসরগুলো কিছু সুরক্ষা পেত। ওই আইন ওয়াকফ সম্পত্তির অনন্য ধর্মীয় ও সামাজিক প্রয়োজনীয়তাকে স্বীকৃতি দিয়েছিল, যাতে নিশ্চিত করা যায় যে এইসব সম্পত্তি সহজে বিক্রি করা যাবে না বা অন্য কাজে লাগানো যাবে না। কোনো জমিকে ওয়াকফ বলে ঘোষণা করা হলে তা আদালতে উলটো প্রমাণ না করা গেলে ওয়াকফই থেকে যেত। কিন্তু ২০২৫ সালের সংশোধনী সেই সুরক্ষার ব্যবস্থাটাই উলটে দিল।

এই সংশোধনীর কেন্দ্রে রয়েছে নবগঠিত ইউনিফায়েড ওয়াকফ ম্যানেজমেন্ট, এমপাওয়ারমেন্ট, এফিশিয়েন্সি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যাক্ট (UMEED)। দাবি করা হচ্ছে যে এটা একটা প্রশাসনিক সংস্থা মাত্র, যা গঠন করার লক্ষ্য ওয়াকফ সম্পত্তিগুলোর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিয়ে আসা। সরকারের বয়ান অনুযায়ী, ওয়াকফ যেহেতু একটা নিয়ামক সংস্থা, ধর্মীয় সংস্থা নয়, সেহেতু এতে কিছু সংশোধন দরকার অপব্যবহার, দখলদারি আর মামলা মোকদ্দমা আটকাতে।

আইনে পরিণত হয়ে যাওয়া এই সংশোধনী বিল ওয়াকফ সম্পত্তিগুলোর ব্যবস্থাপনাকে সংহত করার লক্ষ্য নিয়ে কতকগুলো বড় বড় পরিবর্তন ঘটিয়েছে। এখনকার আইন অনুযায়ী সমস্ত ওয়াকফ সম্পত্তির ডিজিটাল নথিভুক্তি ঘটাতে হবে ছমাসের মধ্যে। মালিকানা নিয়ে বিবাদ থাকলে তার নিষ্পত্তি করার অধিকার ওয়াকফ ট্রাইব্যুনালগুলোর হাত থেকে কেড়ে নিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়েছে সরকারি আধিকারিকদের। এই আইন অনুযায়ী অমুসলমানরা ওয়াকফ বোর্ডগুলোর সিইও অথবা বোর্ড সদস্য হতে পারবেন। কোনো সম্পত্তিকে ওয়াকফ বলে ঘোষণা করার যে একক ক্ষমতা ওয়াকফ বোর্ডের ছিল, তা-ও খর্ব করা হয়েছে। যেসব সম্পত্তির কাগজপত্র নেই সেগুলোকে আর সাধারণভাবে ওয়াকফ বলে গণ্য করা হবে না এবং ওয়াকফ সম্পত্তির বার্ষিক অডিট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই আইনে অংশীদারদের আরও বেশি প্রতিনিধিত্বের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে। মহিলা এবং পেশাদার লোকজনকে যুক্ত করা হবে এবং মহিলাদের উত্তরাধিকার সুরক্ষিত করার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এই আইন ২১,০০০-এর বেশি ঝুলে থাকা দখলদারি ও সম্পত্তি সংক্রান্ত মামলার সুরাহাও করতে চায়।

সংস্কার না রাজনৈতিক ক্ষয়?

বর্তমান সরকারের কাজকর্মের ইতিহাস এই আইনকে নিয়ে আতঙ্ক বাড়িয়ে তুলেছে। ইতিমধ্যেই প্রধান সংখ্যালঘু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর বাজেট ছেঁটে ফেলা হয়েছে। মৌলানা আজাদ ন্যাশনাল ফেলোশিপের মত প্রকল্প তুলে দেওয়া হয়েছে এবং সংখ্যালঘু কল্যাণের জন্যে যেসব প্রতিষ্ঠান আছে সেগুলোকে দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে। এসবই নীতি নির্ধারণে মুসলমানদের অংশগ্রহণ কমিয়ে ফেলার সুচিন্তিত ব্যবস্থার লক্ষণ। এর পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান সামাজিক শত্রুতা, নির্দিষ্টভাবে মুসলমানদের জীবনধারণ কঠিন করে তুলতে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া, বুলডোজার রাজনীতি এবং ক্রমাগত মুসলমানদের অস্তিত্বকেই বিপজ্জনক বলে ভাবতে শেখায় – সংবাদমাধ্যমের এমন প্রচার তো আছেই। এর কোনোটাই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এগুলো মিলেমিশে একটা ছক। কলকাতার আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় আর দিল্লির জাকির হুসেন কলেজের মত প্রতিষ্ঠানের শিকড় কিন্তু ওয়াকফে। মূলধারার শিক্ষায় মাদ্রাসাগুলোর ধর্মশিক্ষা আর আধুনিক শিক্ষার সংমিশ্রণে ক্রমপ্রসারণ হাজার হাজার অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মুসলমান পরিবারকে সাধ্যের মধ্যে শিক্ষা পাওয়ার সুযোগ জুগিয়েছে।

এ প্রশ্নও তোলা দরকার যে সংস্কার যদি প্রয়োজন হয়েও থাকে, কেন তা সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণকে কেন্দ্রে রেখে করা গেল না? ওয়াকফ ট্রাইব্যুনালগুলোকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার বদলে সেগুলোকে শক্তিশালী করা গেল না কেন? কেন মুসলমান পেশাদার, নাগরিক সমাজ আর পাবলিক অডিটরদের তদারকির ব্যবস্থা করে বোর্ডগুলোকে আরও স্বচ্ছ করা যায় না? দায়বদ্ধতা তো স্বায়ত্তশাসনের পরিপন্থী নয়। সংস্কার আর প্রতিনিধিত্ব একসঙ্গেই থাকতে পারে, কিন্তু তার জন্য বিশ্বাসের বাতাবরণ দরকার।

আরো পড়ুন ‘ঔরঙ্গজেবের চেয়ে বেশি মন্দির ধ্বংস করেছেন মোদী’

এই নতুন আইন সরকারি সংস্থাগুলোকে ওয়াকফ সম্পত্তিগুলোকে ‘ডি-নোটিফাই’ করার ক্ষমতাও দিয়েছে। মানে এখন থেকে যদি তাদের মনে হয় একখণ্ড জমিতে ‘অসঙ্গতি’ আছে, তাহলে তারা সেই জমির ওয়াকফ সত্তা কেড়ে নিতে পারে। এখানে জরুরি কথাটা হল – কোনো আদালতের স্বাধীন রায় ছাড়াই এ কাজ করা যাবে। কয়েকজন আমলা মিলেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিতে পারেন যে একটা কবরস্থান আর কবরস্থান নয়। অমনি আচমকা প্রোমোটারদের, খনির খোঁড়ার কোম্পানিগুলোর আর সরকারি প্রকল্পে যারা কাজ করে তাদের কপাল খুলে যাবে।

একেকটা পরিবারের কয়েক প্রজন্ম জমি দান করে এই বিশ্বাসে যে সেটা কয়েক শতাব্দী ধরে তাদের সম্প্রদায়ের কাজে লাগবে। তাদের পূর্বপুরুষের কবরের অসম্মান হবে না। তারা আশা করে, যে মাদ্রাসায় শিশুরা শিক্ষা পায় সেটা টিকে থাকবে। এখন থেকে এতসব একজন সরকারি কেরানি কলমের এক খোঁচায় নস্যাৎ করে দিতে পারে জনস্বার্থের যুক্তিতে। আমরা জানি, জনস্বার্থ হল পবিত্র (এবং বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য)।

ছকটা অগ্রাহ্য করা কঠিন এবং ভুলে থাকা অসম্ভব

ওয়াকফ সংশোধনী এমন একটা ছকের অংশ যা অগ্রাহ্য করা শক্ত। মুসলমানদের পাড়ায় বুলডোজারের দাপট; আসাম, উত্তরপ্রদেশ আর মধ্যপ্রদেশে মাদ্রাসাগুলোকে চাঁদমারি করে তৈরি আইন; চুপচাপ ঐতিহাসিক দরগাগুলোকে ‘বিতর্কিত সম্পত্তি’ তকমা দিয়ে দেওয়া; জমির মালিকানা ‘প্রমাণ’ করে এমন নথির জন্য আক্রমণাত্মক দাবি, যাকে প্রায়শই ব্যবহার করা হচ্ছে যেসব গরিব মানুষের কাগজপত্র থাকে না তাঁদের বিপদে ফেলতে।

বুঝতে অসুবিধা হওয়া উচিত নয় যে এই আইন ওয়াকফ দুর্নীতির (যার অস্তিত্ব অবশ্যই আছে এবং যার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত) মোকাবিলা করার জন্যে তৈরি করা হয়নি। এর আসল উদ্দেশ্য মুসলমান পরিসরের ধারণাটাকেই অবৈধ বলে প্রতিষ্ঠা করা। এর উদ্দেশ্য প্রত্যেকটা কবরস্থানকে সন্দেহজনক, প্রত্যেকটা মসজিদকে ‘উন্নয়ন’-এর পথে বাধা, প্রত্যেকটা মাদ্রাসাকে বিপজ্জনক বলে দেখানো। আর কোনো সম্প্রদায়ের অস্তিত্বকেই সন্দেহজনক বলে প্রতিষ্ঠা করতে পারলে তাদের জমি ছিনিয়ে নেওয়া কেবল সহজ হয় না, রীতিমত দেশপ্রেমিক দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়।

ওয়াকফ সম্পত্তিগুলো ‘বেআইনি’ দখলদারি নয়। অথচ এই যুক্তিটাই বারবার ব্যবহার করা হয়েছে এনআরসি থেকে সিএএ, হিজাব নিষিদ্ধ করা, ধর্মান্তরবিরোধী আইন, অধিকার কেড়ে নেওয়ার আইনকে প্রশাসন চালানোর ব্যবস্থা বলে দেখানোর ফন্দি ফিকিরে। এর প্রত্যেকটাকেই এমন চেহারা দেওয়া হয়েছিল যেন এগুলো প্রশাসনিক প্রয়োজন। কিন্তু ছকটা খেয়াল করলে পরিষ্কার বোঝা যায় যে এগুলো সবই সংখ্যালঘুদের প্রান্তিক করে দেওয়া, তাদের সাংবিধানিক অধিকার ক্রমশ কমিয়ে দেওয়া এবং বৈচিত্র্যকে বিপজ্জনক বলে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা। মিলিয়ে নেবেন, এরপর হাত বাড়ানো হবে আদিবাসীদের জমির দিকে।

ইতিমধ্যেই উত্তরপ্রদেশে ওয়াকফের জমি দখল করা হচ্ছে বিদ্যুৎগতিতে। আসামে রাজ্য সরকার সমস্ত মাদ্রাসার সমীক্ষা করছে, যার স্পষ্ট উদ্দেশ্য হল অনেকগুলোকে বন্ধ করে দেওয়া। গুজরাট, রাজস্থান আর মধ্যপ্রদেশে কবরস্থানে বুলডোজার চালানো হচ্ছে

ভয়ানক ঘটনার কোনো খামতি নেই। প্রথমে ইতিহাস বইগুলো নতুন করে লিখে দাবি করুন যে কয়েকশো বছর আগেকার মুসলমান শাসকরা আক্রমণ করে ‘শোষণ’ চালিয়েছিল। তারপর আজকের মুসলমানদের ‘বহিরাগত’ আর ‘লুটেরা’ বলে দেগে দিয়ে সবার চোখে দানবে পরিণত করুন। তারপর তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো, সম্পত্তি আর উপাসনাস্থলগুলোকে আক্রমণ করুন। শেষমেশ তাদের জমি, তাদের উত্তরাধিকার, কালের ধারায় তাদের পদচিহ্ন পর্যন্ত মুছে দিন।

কিছু বললেই বলা হবে, এগুলো অতীতে ওরা আমাদের থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিল। আমরা অতি ভদ্র, তাই আটকাইনি।

নিবন্ধকার স্বাধীন সাংবাদিক। প্রধানত শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে লেখালিখি করেন। অতীতে ডেকান হেরাল্ড ও দ্য হিন্দু কাগজে কাজ করেছেন। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.