শর্মিষ্ঠা পাল ও সুগত ঘোষ
সম্প্রতি দিল্লির অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক সব্যসাচী দাসের লেখা একটি গবেষণাপত্রকে (Democratic Backsliding in the World’s Largest Democracy) কেন্দ্র করে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। গবেষণাপত্রটি গতমাসে বোস্টনের NBER সম্মেলনে পাঠ করা হয় এবং SSRN নামক ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়। ওই ওয়েবসাইটের তথ্য অনুসারে ইতিমধ্যেই প্রায় ২৯,০০০ বার নিবন্ধটির মর্মার্থ পড়া হয়েছে এবং ২১,০০০ বার এটি ডাউনলোড করা হয়েছে। তবে গবেষণাটির পদ্ধতিগত প্রামাণ্যতা এবং ফলাফলের গুরুত্ব ছাপিয়ে ভারতীয় গণতন্ত্রের স্বার্থে গবেষণাটি কাম্য কি কাম্য নয় – এই বিতর্কই মুখ্য হয়ে উঠেছে।
The BJP won the 2019 parliamentary elections in India: but was it ALL fair and square?
This astonishing new working paper by @sabya_economist provides scientific evidence that suggests vote(r) manipulation by BJP.
And no, this is NOT about EVMs.https://t.co/H99CGJPhTV
Thread🧵 pic.twitter.com/YU1idLcqXw— M.R. Sharan (@sharanidli) July 31, 2023
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
অর্থনীতির গবেষক হিসাবে এই বিতর্কের একটি যৌক্তিক উত্তর খোঁজাই আমাদের উদ্দেশ্য। এই প্রসঙ্গে আলোচ্য গবেষণাটির ফলাফল যেমন আমরা বিবেচনা করব, তেমনই এই জাতীয় বিতর্কিত অথবা স্পর্শকাতর আর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে গবেষকরা কী ধরনের বাধার সম্মুখীন হন, সে ব্যাপারেও আলোকপাত করব।
আলোচ্য গবেষণাটির জন্য প্রয়োজনীয় পরিসংখ্যান ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের পরবর্তী সময়ে সংগ্রহ করা হয়। যেসব লোকসভা কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন প্রতিনিধি নতুন প্রতিনিধির বিরুদ্ধে স্বল্প ব্যবধানে জিতেছেন, সেরকম এলাকাগুলিতেই পরিসংখ্যান সংগ্রহ করা হয়। নির্বাচন কমিশনের তথ্য ব্যবহার করে অধ্যাপক দাস দেখিয়েছেন যে এরকম স্বল্প ব্যবধানে জেতা কেন্দ্রগুলিতে ক্ষমতাসীন বিজেপি প্রার্থীর জয়ের হার পরাজয়ের হারের তুলনায় অনেকটা বেশি, এবং এ জিনিস মূলত বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলিতে দেখা গেছে। পূর্বতন লোকসভা নির্বাচন বা ২০১৯ ও তার পরবর্তী বিধানসভা নির্বাচনগুলিতে এই ধরনের কোনো ব্যাপার বিজেপি বা কংগ্রেস কারোর ক্ষেত্রেই দেখা যায়নি।
এমন হওয়ার কারণ খুঁজতে ২০১৯ সালের জাতীয় নির্বাচন সমীক্ষার (NES) তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। দিল্লিরই সেন্টার ফর স্টাডি অফ ডেভেলপিং সোসাইটিজ (CSDS)-এর তরফে নির্বাচন পরবর্তী সময়ে করা এই সমীক্ষাটিতে প্রার্থীদের প্রচার সংক্রান্ত তথ্য সংকলিত হয়। তবে বিজেপির জেতা তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ কেন্দ্রগুলিতে বিজেপির সঙ্গে অন্য কোনো দলের প্রচারে উল্লেখযোগ্য কোন তফাত দেখা যায়নি। তাহলে ফলাফলের তফাতের কারণ কি নির্বাচনী কারচুপি? ২০১৪ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যেকার ভোটার তালিকা বিশ্লেষণ করে অধ্যাপক দাস দেখাচ্ছেন যে বিজেপির এই স্বল্প ব্যবধানে জেতা কেন্দ্রগুলিতে ভোটার সংখ্যার বার্ষিক বৃদ্ধির গড় হার কমেছে এবং মুসলমান ভোটারের সংখ্যা যে কেন্দ্রগুলিতে বেশি সেখানে এই হ্রাসের প্রবণতাও বেশি। এই পর্যবেক্ষণ কিন্তু অঙ্গুলিনির্দেশ করছে নির্বাচনী কারচুপির দিকে।
আরো পড়ুন সংসদ ভবন উদ্বোধনে একনায়কতন্ত্রের আস্ফালন
নির্বাচন কমিশন দ্বারা প্রকাশিত ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের পরিসংখ্যান থেকে অধ্যাপক দাস নির্বাচনী কারচুপির সম্ভাব্য ইঙ্গিত খুঁজতে চেয়েছেন। প্রথমে নির্বাচন কমিশন সাতটির মধ্যে চারটি পর্যায়ের (বা ৫৪৩টির মধ্যে ৩৭৩টি নির্বাচনী কেন্দ্রের) ভোটগণনার ফল প্রকাশ করে। কিন্তু এর পরে কমিশন যখন কেন্দ্র ধরে ধরে ভোটগণনার ফল প্রকাশ করে, তার সঙ্গে পূর্বতন তথ্যের কিছু অসঙ্গতি লক্ষ্য করা যায়। প্রশ্নের মুখে পড়ে তাদের ওয়েবসাইট থেকে প্রথম পরিসংখ্যানটি সরিয়ে নেয় নির্বাচন কমিশন। অধ্যাপক দাস দেখাচ্ছেন যে বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলিতে বিজেপির স্বল্প ব্যবধানে জেতা কেন্দ্রগুলির ক্ষেত্রে এই অসঙ্গতির মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এরপর বুথ পর্যায়ের তথ্য ব্যবহার করে গবেষক দেখান যে মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকাগুলিতেই এমন কারচুপি ব্যাপক হারে উপস্থিত।
যদিও গবেষণাপত্রটি এখনো কোনো প্রামাণ্য জার্নালে প্রকাশিত নয়, বোস্টনের NBER সম্মেলনের সূত্রে এটি অন্যান্য গবেষকদের দ্বারা নিরীক্ষিত। বিজেপি সমর্থকদের সমালোচনা সত্ত্বেও একাধিক অর্থনীতিবিদ গবেষণাটির পক্ষে সরব হয়েছেন। কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন, রাজ্য নির্বাচন কমিশন এবং CSDS-এর তরফে প্রকাশিত পরিসংখ্যান ছাড়া এই গবেষণাটি সম্পূর্ণ হতে পারত না। গবেষণাটির পদ্ধতিগত খুঁটিনাটি নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে (এবং যে কোনো গবেষণাপত্রের মূল্যায়নের ক্ষেত্রেই তা স্বাভাবিক), কিন্তু গণতন্ত্রের সুরক্ষার দোহাই দিয়ে এই জাতীয় গবেষণা বা নির্বাচন সংক্রান্ত পরিসংখ্যান প্রকাশ না করার দাবি গণতন্ত্রের পক্ষেই আশঙ্কাজনক এবং অনাকাঙ্ক্ষিত। ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বিশ্ব গণতন্ত্র সূচকে (Global Democracy Index) ভারত ক্রমশ পিছিয়ে পড়েছে; ডেমোক্র্যাসি রিপোর্ট (২০২০), যুক্তরাষ্ট্রের ফ্রিডম হাউস সংস্থা, এবং V-dem পরিসংখ্যান অনুযায়ীও ভারতীয় গণতন্ত্র ক্রমশ নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্রের দিকে এগোচ্ছে। সুতরাং শাসক দলকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো নিরপেক্ষ গবেষণা গণতন্ত্রকে বিপদে ফেলার পরিবর্তে গণতন্ত্রের সুস্থতার জন্যেই জরুরি।
শর্মিষ্ঠা সারে বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্য এবং সুগত ব্রুনেল বিশ্ববিদ্যালয়, লন্ডনে অর্থনীতির অধ্যাপক। মতামত লেখকদের
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।





