শ্রাবণ-ঘন-গহন মোহে সবার দিঠি এড়িয়ে এক তরুণী চলে গেলেন শ্মশানের দিকে, পানিহাটীতে। এরকম অসামান্য যাত্রা আমরা শেষ কবে দেখেছি? সে রাত্রে যখন রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর শব নিথর হয়ে পড়ে আছে শবাগারে, তখনই সেই তরুণী ৩৬ ঘন্টা হাড়ভাঙা খাটুনির পর গিয়েছিলেন বিশ্রাম নিতে। তারপরের চিত্রনাট্য অতীব দক্ষতায় রচিত। উইলিয়ম শেক্সপিয়রের মত প্রতিভাধর না হলে এমন চিত্রনাট্য লেখা মুশকিল। আমার মনে পড়ছে হ্যামলেটের সেই অবিস্মরণীয় সংলাপ ‘How now, Horatio! You tremble and look pale./Is not this something more than fantasy?’ আসলে ঘটনাটির সঙ্গে যুক্ত লোকেরা হয়ত ভেবেছিলেন, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের প্রয়াণে যে উদ্বেল জনতার শোকোচ্ছ্বাস দেখা যাবে, সেই জনতা খেয়ালই করবে না শহরের অন্য এক প্রান্তে আরেকটি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া। ফলে চিত্রনাট্যে কিছুটা অসঙ্গতি থেকে গেলে ক্ষতি নেই, শুটিং ফ্লোরে সামলে নেওয়া যাবে। আমাদের অভিজ্ঞতা সেরকমই বলে। তবে মহাকবিদেরও ভুল হয়। হ্যামলেট নাটকের দৃশ্যে যেমন মধ্যরাতে মোরগ ডেকে উঠেছিল। আর জি করেও তেমন কিছু কিছু ভুল থেকে গিয়েছিল। সেই ভুলের ফাঁক দিয়েই জনতা কখনো কখনো উঁকি মারার সুযোগ পায়।
যেমন তারা উঁকি মেরেছিল ১৭৮৯ সালের ১৪ জুলাই, বাস্তিল দুর্গের সামনে। সেটা অরাজনৈতিক ছিল কিনা আমি জানি না। টিপু সুলতান জ্যাকোবিন সংঘের সদস্যপদ চেয়েছিলেন। জ্যাকোবিন সংঘ অরাজনৈতিক ছিল কিনা তাও বলতে পারব না। রুশ বিপ্লব অরাজনৈতিক ছিল কিনা বলতে পারব না। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম, এমনকি মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বদানকালেও, অরাজনৈতিক ছিল কিনা বলতে পারব না। কিন্তু আমাদের আজকের কলকাতায় বুদ্ধিজীবী বলেন, যে মিছিল অরাজনৈতিক না হলে তিনি যেতে পারবেন না। আর আমার আবার মনে পড়ে শার্ল বোদলেয়ার আর সেই তুচ্ছ বেশ্যার গল্প। কবি তখন স্তব্ধপ্রায় ল্যুভর চিত্রশালার সামনে। সেই রূপোপজীবিনী তাঁকে শুধোয় ‘ছি ছি! এই উলঙ্গ ছবিগুলো দেখাতে ওদের লজ্জা করে না!’
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
সত্যিই তো। লজ্জা করা উচিত। একজন ধর্ষিত নারীর ময়না তদন্তের রিপোর্ট দেখাতে লজ্জা করা উচিত। আমাদের অবশ্য লজ্জা করে না। কারণ আমরা জানি, আমরা সকলেই প্লেটোনিক প্রেমের পরিণামে জন্মেছি এবং লিখছি, নাটক করছি, ছবি করছি অথবা গান গাইছি। আমাদের সকলেরই যিশুখ্রিস্টের মত ‘immaculate conception’। তার মধ্যে কোনো রাজনীতি নেই। কোনো যৌন মিলনও নেই। ‘আমরা সব নিরালম্ব, বায়ুভূত’ – সুবর্ণরেখা ছবিতে হরপ্রসাদ বলেছিল। আমার কলকাতায় থাকতে কষ্ট হয়, কেননা আমি দেখি আমাদের অকুস্থল কত সংবেদনহীন হয়ে গেছে। আমরা ধারাবাহিক spectacle-এর মধ্যে দিয়ে চলেছি। আমরা সাজুগুজু করে মিছিলে আছি না ঘামে ভিজে মিছিলে আছি সেটা বড় কথা নয়। আমাদের ছবি উঠছে, আমরা পদযাত্রায় আছি, আমরা প্রতিবাদ করছি। আমরা জানি যে এই প্রতিবাদের আগে এবং পরে আমাদের খাদ্য, পানীয়, গ্লুকোজ লেভেল – সবই ঠিক থাকবে। পৃথিবীর কোথাও একটি পাতাও বিনা কারণে চ্যুত হবে না। শুধু আমাদের একটি মেয়ে মরে গেল। মরে গেল তো গেল। ‘জন্মিলে মরিতে হবে,/অমর কে কোথা কবে’ – মহাকবি মধুসূদন তো বলেই গেছেন। সুতরাং কী কাজ মিছিলে? কী কাজ প্রতিবাদ করে?
গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ থাকলে বলতেন এটি একটি পূর্বনির্ধারিত হত্যার ধারাবিবরণী। আমরা বলতে পারব না। কারণ আমরা আমাদের ছোট্ট রাজ্যের ছোট্ট ছোট্ট পুরস্কার, অনুদান – এসব নিয়ে ব্যস্ত থাকব এবং ক্রমশই আমাদের ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হবে। বিকেল শেষ হয়ে এল, এবার সন্ধ্যা। ‘যদিও সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে,/সব সঙ্গীত গেছে ইঙ্গিতে থামিয়া’, তবু আমরা বিচিত্রানুষ্ঠানে মিলিত হব। সমস্ত কলকাতা শহরই আজ একটা বিচিত্রানুষ্ঠান। ‘ঈশ্বর, আমারে একবার কইলকাতায় নিয়া যাবা?’ আমি জানি না, এই প্রশ্নের উত্তরে আমরা জিপিএস দেখে বলতে পারব কিনা কলকাতা কোথায়। কলকাতা তো একসময় বীণা দাসের, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের, কল্পনা দত্তের ছিল। আজ আমাদের, কাজেই জিপিএসও হয়ত ভুল করবে। তবে আজকের সমাজে অসম্ভব বলে কিছু নেই। কোনোটাই শকিং নয়, সবই বাস্তবানুগ। এই বাস্তববাদের আতঙ্ক থেকে আমরা কবে মুক্তি পাব?
আরো পড়ুন কর্মস্থলে যৌন হেনস্থার জন্য ভারতে কমছে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা
খুব সহজে জনপ্রিয় লব্জে বলতে পারতাম ‘মাস্টারমশাই, আপনি কিছুই দেখেননি।’ কিন্তু সমস্যা হল, মাস্টারমশাই সবকিছুই দেখেছেন। অয়দিপাউসের একটা সুবিধা ছিল – সে জেনেশুনে মাতৃগমন করেনি। আমরা সকলেই সজ্ঞানে, সচেতনভাবে এবং সুচতুরভাবে মাতৃধর্ষণ সম্পন্ন করেছি। আমাদের হাতে অয়দিপাউস এষণার ফাঁকিটুকুও আর রইল না। ধন্যবাদ, কলকাতা। বের্টোল্ট ব্রেশটের আরটুরো উই এবার নাটকের পাতা থেকে উঠে এসে শারদোৎসবের প্রধান অতিথি হোন। আমরা সকলেই করজোড়ে বলব ‘মাতৃমন্দির-পুণ্য-অঙ্গন কর’ মহোজ্জ্বল আজ হে।’
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








