শাসকের বদান্যতায় ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত ভোট কতটা গণতান্ত্রিক হয়েছে সে সম্পর্কে আমাদের প্রত্যেকের ধারণা এখন পরিষ্কার। মনোনয়ন পর্ব থেকে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত প্রায় ৬০ জন প্রান্তিক নাগরিকের লাশের বিনিময়ে নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। তারপর ভোটগণনার দিনও শাসকের দৌরাত্ম্য ও নির্লজ্জের মত প্রশাসনকে ব্যবহার করে জোর করে জয় হাসিল করা আগামী দিনে ভোট বিশেষজ্ঞদের কাছে নিশ্চিতভাবে গবেষণার বিষয় হবে।

নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে আদালতে মামলা চলছে, একইসঙ্গে বোর্ড গঠনও হয়ে গেছে বহু জায়গায়। নির্বাচনে সন্ত্রাস বা বিডিও, এসডিও-দের নির্বাচনে ‘উল্লেখযোগ্য’ ভূমিকা এই লেখার বিষয় নয়। বাম জমানায় কংগ্রেস নেতা অধীররঞ্জন চৌধুরী বলেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন “বডি কনট্যাক্ট গেম”। লড়ে নিতে হয়। আশা করি এখন তিনি তেমন মনে করেন না। যদিও মুর্শিদাবাদ ও মালদা জেলায় এবং কিছুটা উত্তর দিনাজপুরে বাম-কংগ্রেস জোট শাসক দলকে বেশ লড়াই দিয়েছে। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে এই তিন জেলাতেই কিন্তু বিরাট সংখ্যক মানুষ সংখ্যালঘু।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

বিখ্যাত ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ নেভিল কার্ডাস বলেছিলেন, স্কোরবোর্ড একটা গাধা। কিন্তু ২০২৩ সালে দাঁড়িয়ে একথা বলার উপায় নেই। এখন তথ্য যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ। তথ্য বলে দেয় আগামীদিনে কী হবে? এই যেমন ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের নিরিখে ভোট বিশেষজ্ঞরা এখন থেকেই আগামী লোকসভা নির্বাচনের রূপরেখা ঠিক করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। যেমন ধরুন উত্তরবঙ্গ বিজেপির গড়, কিন্তু পঞ্চায়েত নির্বাচনে তারা শাসক তৃণমূলের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। তাই পরিসংখ্যান দিয়েই বিচার করতে হবে আগামী লোকসভা নির্বাচনে আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, রায়গঞ্জ, বালুরঘাট, মালদহ উত্তর এবং মালদহ – এই আট লোকসভা কেন্দ্রের ফলাফল কী হবে? এই আট কেন্দ্রের মধ্যে মাত্র একটা কেন্দ্র (মালদহ) কংগ্রেসের দখলে আছে। বাকি সাতটাই বিজেপির দখলে। ২০২১ সালের বিধানসভার নিরিখে বিজেপির প্রাপ্ত আসনের অন্তত ৬০% উত্তরবঙ্গের, তারপরেও ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিজেপির এমন ভরাডুবি কেন হল?

শাসকের সন্ত্রাস তখনই সম্ভব হয়, যখন বিরোধীদের সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়ে। বিরোধীরা কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে না। অবশ্যই পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা থাকে। তারপরেও মালদা, মুর্শিদাবাদে বাম-কংগ্রেস যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, সেই তুলনায় বিজেপি উত্তরবঙ্গে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করেছে। একটা পরিসংখ্যান দিলে বিষয়টা পরিষ্কার হবে।

উত্তরবঙ্গে জেলা পরিষদের ফলাফল

আলিপুরদুয়ার: তৃণমূল ১৮, বিজেপি ০। কোচবিহার: তৃণমূল ৩২, বিজেপি ২। দক্ষিণ দিনাজপুর: তৃণমূল ২১, বিজেপি ০। জলপাইগুড়ি: তৃণমূল ২৪, বিরোধী ০। মালদহ: তৃণমূল ৩৪, কংগ্রেস ৫, বিজেপি ৪। উত্তর দিনাজপুর: তৃণমূল ২৩, কংগ্রেস ৩, বিজেপি ০।

অর্থাৎ জেলা পরিষদে বিজেপি উত্তরবঙ্গে মাত্র ছটা আসন পেয়েছে, অথচ উত্তরবঙ্গে তাদের সাংসদই সাতজন।

আরো পড়ুন উত্তরবঙ্গ থেকে কি উবে যাওয়ার পথে বিজেপি?

সাদা চোখে দেখলেও উত্তরবঙ্গে গত লোকসভা ও বিধানসভার নিরিখে পঞ্চায়েত নির্বাচনে সিংহভাগ আসন পাওয়ার কথা ছিল বিজেপির। তেমন হল না কেন? প্রশ্নটা এখানেই। শুধুই কি সন্ত্রাস? সন্ত্রাস বিজেপির ফলাফল খারাপ হওয়ার কোনো অজুহাত হতে পারে না। সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং বিজেপির তৃণমূলীকরণই এই ফলাফলের প্রধান কারণ। উত্তরবঙ্গের বিজেপি সাংসদ, বিধায়ক, মন্ত্রীরা নিবিড়ভাবে নিচুতলায় সংগঠনের যত্ন কতটা নিয়েছেন সে বিষয়ে প্রশ্ন আছে। রায়গঞ্জের সাংসদকে নিজের এলাকায় দেখা যায় কালেভদ্রে। বিধানসভা নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে তৃণমূল সরকার এমন কোনো কাজ করেনি যাতে আরএসএস অসন্তুষ্ট হতে পারে। বিধানসভা নির্বাচনে উত্তরবঙ্গে বিভিন্ন বিধানসভায় যাঁরা বিজেপির অঞ্চল স্তরের নেতৃত্বে ছিলেন, তাঁদের অধিকাংশই শাসক দলের বিধায়কদের সঙ্গে ভিড়ে গেছেন উপার্জনের তাগিদে, পঞ্চায়েতে ঠিকাদারি করার প্রয়োজনে। যৌথভাবে রামনবমী উদযাপনের মধ্য দিয়ে তৃণমূল-বিজেপি ভোটারদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে, তৃণমূল আর বিজেপিকে ভোট দেওয়ার মধ্যে কোনো তফাত নেই। অনেক জায়গায় বিজেপি নেতা নিজের দলে টিকিট না পেয়ে তৃণমূলে ভিড়েছে, আবার উল্টো ঘটনাও ঘটেছে। এক কথায়, উত্তরবঙ্গে আরএসএস এবারের নির্বাচনে বিজেপিকে জেতাতে মরিয়া হয়নি। ২০১৮ পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিজেপির প্রচারে যে উন্মাদনা ছিল তার বিন্দুমাত্র এবারের নির্বাচনে দেখা যায়নি। আদর্শগত অবস্থান থেকেও বিজেপি কর্মীদের অবনতি হয়েছে। শাসক রাজ্যে যে লোভের জাল বিস্তার করেছে তা পুরো মাত্রায় বিজেপি কর্মীদেরও গ্রাস করেছে। সংখ্যালঘু এলাকায় তৃণমূল বাম-কংগ্রেস জোটের কাছে যেটুকু ধাক্কা খেয়েছে, সেই ক্ষতি বিজেপি ভোট পুষিয়ে দিয়েছে। শাসকের বিপুল অর্থের কাছে বিক্রি হয়েছে বিজেপির সংগঠন।

তাহলে আগামী লোকসভা নির্বাচনে উত্তরবঙ্গে ফলাফল কীরকম হবে? পঞ্চায়েতের মত তৃণমূলেরই একচ্ছত্র আধিপত্য থাকবে? এটাই এখন বড় প্রশ্ন। বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব চেষ্টা করছে রাজ্য ভাগের ইস্যু আবার তুলে ধরে সংখ্যাগরিষ্ঠ তফসিলি উপজাতি, আদিবাসী এবং মতুয়া ভোটব্যাঙ্ক ২০১৯ সালের মত নিজেদের দিকে টেনে আনতে। এই লক্ষ্যে পশ্চিমবঙ্গ ভাগের অন্যতম প্রবক্তা অনন্ত মহারাজকে রাজ্যসভার সাংসদ করেছে। হয়ত রাজ্যসভায় পশ্চিমবঙ্গকে ভাগ করে উত্তরবঙ্গকে নিয়ে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল অথবা নতুন রাজ্য গঠনের প্রসঙ্গ বারবার তোলা হবে। এছাড়া বিজেপির কাছে তেমন কোনো অস্ত্র নেই। মোদি ম্যাজিক এখন অনেকটাই ম্রিয়মান। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের রাজ্যের রাজনীতিতে পঞ্চায়েত যার, বিধানসভা, লোকসভা তার। একজন গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্য পঞ্চায়েতের নানা প্রকল্পের মাধ্যমে নিজের বুথের ২৫০-৩০০ ভোট অনায়াসে ধরে রাখতে পারেন। একবার ভাবুন, হিন্দু বুথে তৃণমূল পঞ্চায়েত সদস্য ৭০০ ভোটের মধ্যে ৩০০ ভোট নিজের দলের প্রার্থীর জন্য ধরে রেখেছেন। তাহলে বিজেপির হাতে থাকল ৩০০ মত। বাকি ১০০ ভোট অন্য দলগুলোর। পাশের সংখ্যালঘু বুথে ৮০০ ভোটের মধ্যে বিজেপি ০-৫ ভোট পাচ্ছে। তাহলে ফলাফল কী হতে পারে – সহজেই অনুমান করা যায়।

সোজা কথায়, আগামী লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল ঠিক করে দেবে ঠিক কতগুলো আসন তারা বিজেপিকে উপহার দেবে উত্তরবঙ্গে। এসব পড়ে নিন্দুকরা আবার বলবেন সেটিং তত্ত্ব।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.