যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সদ্য পা রাখা ছাত্রটির মর্মান্তিক মৃত্যুতে গোটা সমাজ কেঁপে উঠেছে। স্বাভাবিক। এই মৃত্যু তো শুধু মর্মান্তিকই নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে চরম বীভৎসতা। দমকা একটা বিষাক্ত হাওয়া এক ফুঁয়ে যেন নিভিয়ে দিয়ে গেল স্বপ্নে ভরা তাজা একটি প্রাণের প্রদীপ। চরাচর এখন অন্ধকার।
পাড়ার আড্ডায়, দোকানে বাজারে পারস্পরিক আলোচনায়, সোশাল মিডিয়ার পোস্টে মানুষ এলোপাথাড়ি হাতড়াচ্ছেন এই অন্ধকারের উৎস। ফুঁসে উঠে কেউ কর্তৃপক্ষকে দোষারোপ করছেন, কেউ গোটা বিশ্ববিদ্যালয়টার বিরুদ্ধেই ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন, যেসব সিনিয়র আর প্রাক্তন ছাত্র হোস্টেলে আসর জমিয়ে বসে আছে, তাদের গালমন্দ করছেন। কেউ বা ছাত্রস্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কহীন এক ধরনের ছাত্র রাজনীতি, স্বাধীনতার নামে তাদের উচ্ছৃঙ্খল স্বেচ্ছাচারের দিকে আঙুল তুলছেন।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
ছাত্রটির মৃত্যুর দায় উপরের সবকটি বিষয়ের উপরেই হয়ত কোনো না কোনোভাবে বর্তায়। কিন্তু যে মূল প্রশ্নটি ভাবাচ্ছে তা হল বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলের বাসিন্দা ছাত্র বা সদ্যপ্রাক্তনদের তরুণ প্রাণগুলি এমন ভয়ানক ধর্ষকাম হয়ে উঠল কী উপায়ে? কোন সে মানসিক স্থিতি যা জোটবদ্ধ ক্ষমতাশালীদের হামলার মুখে পড়ে আতঙ্কে কাঁপতে থাকা এক তরুণের প্রতি সহানুভূতি সৃষ্টি করার বদলে বীভৎস উল্লাসে উৎকট নিপীড়ন চালাতে প্ররোচনা দেয়? ফাঁদে পড়া কিশোরটি যখন মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছে, ঠিক তখন নিজেদের অপরাধ আড়াল করার কৌশল খুঁজতে বারবার বৈঠকে বসতেও কিন্তু ভুল হয় না ঠান্ডা মাথার এই অপরাধীদের।
এই অপরাধীরা তো আপনার-আমার ঘরেরই সন্তান। দরিদ্র বা মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা, কষ্ট করে বড় হওয়া মেধাবি সব ছেলেপুলে। ছোট থেকে নিশ্চয়ই এরা এমন ছিল না। চলার পথে কোথা থেকে নোংরা নর্দমার পাঁক এসে সমস্ত নির্মলতা হঠিয়ে এদের মনোজগৎ এমন বিষাক্ত করে তুলল? আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই কদর্য নির্যাতন ছাত্রদের মধ্যে নতুন তো নয়, বিশেষ একজন ছাত্রের বিষয়ও নয়। দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে এই নোংরামি। মর্মান্তিক এক মৃত্যু সেই জমে থাকা কচুরিপানায় ঢিল ছুঁড়ে দিয়ে গেল মাত্র। সামনে এনে দিয়ে গেল একটা ফেনোমেনাকে৷
এই ফেনোমেনা – এই ধর্ষকামী মানসিকতার বাড়বাড়ন্তের উৎস কি সমাজের গভীরেই লুকিয়ে নেই? কারণ সামাজিক চিন্তাই তো ব্যক্তি–মানসিকতায় প্রতিফলিত হয়। আমরা আজ রয়েছি সর্বাধিক লাভের আশায় দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে প্রাণান্তকারী দৌড় প্রতিযোগিতায় ছুটে চলা ব্যক্তিস্বার্থকেন্দ্রিক একটি সমাজব্যবস্থার মধ্যে। বিকাশের পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে এই সমাজের যৌবন আজ কালের স্রোতে মৃত্যুশয্যায় গিয়ে পৌঁছেছে। গোটা সমাজের সম্পদ আজ জমা হয়েছে মুষ্টিমেয় মানুষের হাতের মুঠোয়। বেঁচে থাকার লড়াইয়ে দীর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। তাদের ব্যক্তিস্বার্থ পূরণের সুযোগটাও তাই অত্যন্ত সীমিত। বাঁচতে চেয়ে, একটু ভালভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ হস্তগত করতে গিয়ে তাই বোধহয় ভয়ঙ্কর এক দৌড়ে সামিল আমরা সবাই। কেউ কাউকে এক ইঞ্চি জায়গা ছাড়তে রাজি নই। তাই মায়া নেই, মমতা নেই, স্নেহ ভালবাসা সহমর্মিতা নেই। আছে শুধু ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার মরণপণ লড়াই।
আরো পড়ুন গণটোকাটুকি: পরিবর্তনের যুগে প্রত্যাবর্তন
এই লড়াইয়ে আমার সঙ্গী শুধু আমার ছায়া – আর কেউ নয়। সমাজে বাস করেও, সমাজ থেকে আমার সবটুকুর সংস্থান করেও তাই আমি আজ সমাজবিচ্ছিন্ন, একা। আমার চারপাশে উদ্যত অজস্র কাঁটাওয়ালা বুটজুতো। বাগে পেলেই পিষে দেবে আমায়, হারিয়ে দেবে প্রতিযোগিতায়। আমিও তাই উঁচিয়ে রেখেছি আমার হিংস্র চাবুক। সুযোগ পেলেই আরও দুর্বল কারোর পিঠে মেরে শুনতে চাইছি তার আর্তনাদ। বিকৃত তৃপ্তিতে ভরে উঠছে আমার নিজের আহত, প্রতি মুহূর্তের অনিশ্চয়তার উদ্বেগে ভরা ব্যক্তিসত্তা। তাই হোস্টেলে আমার নিজস্ব সাম্রাজ্যে কোনো নতুন অতিথি ভীরু পায়ে আশ্রয় নিতে চাইলে আমি তার দিকে আমার হাত সাদরে বাড়িয়ে দিতে পারি না, তীক্ষ্ণ নখ দিয়ে বরং ফালাফালা করে দিতে চাই তার কোমল শরীর, মন। দাদাগিরি করার উদগ্র বাসনায় আমি তার সত্যিকারের দাদা হয়ে উঠতে পারি না৷ আমি হোস্টেলের ‘বাবা’ হই। স্নেহময় পিতা আর হয়ে ওঠা হয় না আমার।
প্রথম বর্ষের ছাত্রটির মৃত্যুর তদন্ত চলছে, আইন অনুযায়ী দোষীরা হয়ত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পাবে। যদি পায়, আমরা খুশি হব। কিন্তু নিশ্চিন্ত হতে পারব কি? নিজের সন্তানকে উচ্চশিক্ষার জন্য অন্য শহরে পাঠিয়ে রাতে ঘুম আসবে তো আমার? নিশ্চিত ভাবে বলা যায় – আসবে না। কারণ কয়েকজন অপরাধীর শাস্তি হলেই পরিস্থিতি বদলাবে না। এই পচা গলা সমাজব্যবস্থা প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে জন্ম দিতে থাকবে এমন অসংখ্য বিকৃত মানসিকতার ধর্ষকাম উৎপীড়কদের। এক গ্রাসে তাদের ক্ষিদে মিটবে না, তাদের থাবা ধেয়ে আসবে আমার-আপনার সন্তানদের দিকেও।
তাই আঙুল তুলতে হবে এই মরতে বসা সমাজটার দিকেই। যতক্ষণ না আমরা সবাই মিলে সামিল হব বিকৃত এই সমাজ–শবদেহের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মহাসংগ্রামে, অন্ধকার কাটবে না। কাটতে পারে না।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







