“Every relationship of domination, of exploitation, of oppression, is by definition violent, whether or not the violence is expressed by drastic means. In such a relationship, dominator and dominated alike are reduced to things – the former dehumanized by an excess of power, the latter by lack of it.” – Paulo Freire
এই লেখার শুরুতেই দুটি কথা বলে নিতে হবে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
এক, আমি কস্মিনকালেও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম না। আমার পড়াশোনা চিরদিনই উত্তরবঙ্গের একটি মফস্বল শহরে, সেখানেই কলেজের পাঠ এবং পরে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন হোস্টেলেই কাটিয়েছি বছর দুয়েক, হোস্টেল শেষে বাইরে আরও বছর দুয়েক। এই সময়কালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের দায়িত্বে ছিল ভারতের ছাত্র ফেডারেশন (এসএফআই), ছেলেদের তিনটি হোস্টেলেও সরাসরি না হলেও রিক্রিয়েশন ও মেস ম্যানেজার হিসাবে এসএফআই কর্মীরাই কাজ করত। মেয়েদের হোস্টেলে অবশ্য এতটা আধিপত্য ছিল না। তা বলে বিরোধীরা ছিল না এমন নয় – স্টুডেন্টস ফোরাম ছিল। স্টুডেন্টস ফোরাম একসময় এসএফআইয়ের অন্তর্দ্বন্দ্বের ফলে তৈরি হয়েছিল, কিন্তু আমাদের সময় তা ছিল মূলত এসএফআইবিরোধী সমস্ত দলের সম্মিলিত মঞ্চ, যেমন ডিএসও, টিএমসিপি, সিপি, এবিভিপি, ছাত্র ব্লক, আকসু (কামতাপুর পিপলস পার্টির ছাত্র সংগঠন।)। অবশ্য নামে ফোরাম ছিল অরাজনৈতিক। সেইসময় কামতাপুর আন্দোলন খুব শক্তিশালী সমস্ত উত্তরবঙ্গ জুড়েই, যার প্রভাব উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যেও ছিল। তা সত্ত্বেও ক্যাম্পাসে এসএফআইয়ের বিভিন্ন কাজকর্ম ছাত্রছাত্রীদের কিছু সদর্থক বার্তা দিয়েছিল, যার মধ্যে হোস্টেলগুলিতে র্যাগিংমুক্ত পরিবেশ গড়ে তুলতে নিরন্তর লড়াই উল্লেখযোগ্য ছিল। সত্যি কথা বলতে, ছেলেদের বা মেয়েদের হোস্টেলে (ছাত্রদের তিনটি ও ছাত্রীদের তিনটি, মোট ছটি) যেন কোনোভাবেই নতুন ছাত্রছাত্রীদের উপর কোনো শারীরিক বা মানসিক অত্যাচার না করা হয় সেদিকে সবার কড়া নজর ছিল। প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রছাত্রীদের একসঙ্গেই হোস্টেলে থাকত, কিন্তু কোনো র্যাগিংয়ের ঘটনা যাতে না ঘটে সে বিষয়ে সবাই সচেতন থাকত। এমনকি সামান্য কোনো ঘটনা ঘটলেও আমরা সক্রিয় হয়ে উঠতাম। যেমন মনে পড়ে যখন আমরা সিনিয়র, ভূগোল বিভাগের এক ছাত্র একটি ছোট ঘটনা ঘটিয়েছে খবর পেয়ে তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো হয়েছিল। বিভাগের মতই হোস্টেলেও নবীনবরণ হত বটে, কিন্তু সে ছিল এক আনন্দোৎসব। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি হল, এর দ্বারা সিনিয়র ও জুনিয়রদের মধ্যে সহজ ও নিবিড় বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠতে কোনো অসুবিধা হয়নি।
এমনিতেই উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় রাজ্যের একটি প্রান্তিক বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে উত্তরবঙ্গের প্রতিটি জেলার সামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা অংশের প্রচুর ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা করত। তাদের মধ্যে ভাষাগত, সাংস্কৃতিক কিংবা সম্প্রদায়গত নানা পার্থক্যও ছিল। তার জন্য তাদের কোনোদিন কোনোভাবে বৈষম্যের শিকার হতে হয়নি। না হোস্টেলের ভিতরে, না বাইরে। ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত সকলেই এ বিষয়ে সতর্ক ছিল। আকসুর রাজনীতি জাতিভিত্তিক হলেও সে রাজনীতি ক্যাম্পাসের ভিতরে চালানোর সুযোগ দেওয়া হয়নি। অন্তত নতুন-পুরনো ছাত্রছাত্রী সম্পর্কে তার কোনো প্রভাব ছিল না। এই সচেতনতা বাম ছাত্র রাজনীতির একজন সক্রিয় কর্মী হিসাবে আমার ভিতরেও যে স্থায়ী হয়েছিল এবং আজও দৃঢ় হয়ে আছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এর জন্য আজও গর্ববোধ করি।
বছর আষ্টেক আগে নতুন রাজনৈতিক জমানায় দেখলাম উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের হোস্টেলে একটি র্যাগিংয়ের ঘটনায় খুব হইচই হল। সেদিন খুব লজ্জিত বোধ করেছিলাম, আমার মত বহু প্রাক্তনীও, যাদের মধ্যে অনেকেই এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, কর্মী – সবাই প্রতিবাদে মুখর হয়েছিলেন। ফলত আর সেরকম ঘটনার কথা শোনা যায়নি।
আজ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনায় একটি ছাত্রমৃত্যুকে (আসলে তো একরকম হত্যাই) নিয়ে গুটিকতক কথা বলার সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরের পরিস্থিতি সম্পর্কে, বিশেষ করে হোস্টেলের ভিতরের, আমার যে কোনো সম্যক ধারণা নেই সেটি লেখার শুরুতেই স্বীকার করে নিয়েছি। যদিও বহুবছর ধরে শিক্ষকতার সূত্রে যাদবপুরে পড়াশোনা করা আমার ছাত্রছাত্রী, পরিচিত মানুষ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে যে তথ্যগুলি জেনেছি, তার মাধ্যমে পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি সামগ্রিক ধারণা করে নেওয়া যায়।
দ্বিতীয়ত, ঘটনাটি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে ঘটলেও একে শুধুই যাদবপুরের নিজস্ব সংস্কৃতি বলে কোনো সরলরৈখিক ধারণাকে প্রশ্রয় দেওয়ায় আমার সায় নই। এই ঘটনা ভারতের যে কোনো প্রান্তে কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে, হোস্টেলের ভিতরে ঘটতেই পারে, ঘটেও। তার বহু তথ্যপ্রমাণ গণপরিসরেই রয়েছে। সমস্ত ক্ষেত্রেই র্যাগিংয়ের ঘটনাগুলির মধ্যে অথবা তার কারণগুলির মধ্যে মিল পাওয়া যাচ্ছে। যাদবপুর কোনো ব্যতিক্রম নয়। বিশেষ করে দেশের মেডিকাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলিতে নতুন ছাত্রছাত্রীদের উপর যেভাবে র্যাগিং হয়ে থাকে, যাদবপুরের ঘটনাটিকে সেভাবেই বিশ্লেষণ করা দরকার। এক্ষেত্রে নামটি অমন কচরু হতে পারে বা রোহিত ভেমুলা – কোনোভাবেই আলাদা করা যাবে না। র্যাগিং যে ভাবে শিক্ষাঙ্গনকে রক্তাক্ত করেছে, তা সে হিমাচলের কাংরা হোক অথবা পশ্চিমবঙ্গের যাদবপুর, তার নেপথ্যের কাহিনি কিন্তু আলাদা নয়। সবই প্রায় একই ছকে বাঁধা এবং প্রগতিশীল সমাজের গালে সজোরে থাপ্পড়।
আরো পড়ুন প্রেসিডেন্সি: নীতি পুলিসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ প্রয়োজন
তবে যাদবপুরকে অবশ্যই এক জায়গায় আলাদা করা যায়, তা হল তার রাজনীতি। নিঃসন্দেহে এখনো যাদবপুর বামপন্থী রাজনীতির এক শক্তিশালী কেন্দ্র। এর কিছুটা কৃতিত্ব নিঃসন্দেহে ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের, কিন্তু তা মূলত আর্টস ফ্যাকাল্টিকেন্দ্রীক। বাকিটা বিভিন্ন পরিচয়ের, কখনো বা নিজেদের স্বাধীন বলে পরিচয় দেওয়া বাম, অতি বাম বা প্রগতিশীল নাগরিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছাত্রছাত্রীদের হাতে। এরা নানা সময়ে নানা নামে নানা আন্দোলন করেছে। আজকের ঘটনার প্রেক্ষিতে অনেকেই এই ‘হোক কলরব’ স্লোগানটিকে নিয়ে ব্যঙ্গ করছেন, কিন্তু যাবতীয় অনাচার আর স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের যে সংস্কৃতি ওই স্লোগানে মুখরিত, তা যে এই আধিপত্যকামী পুঁজিনিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রীয় ভাবনার বিপ্রতীপে আশার আলো – তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই।
আসলে যা যাদবপুরকে অন্যদের থেকে আলাদা করে, তা ঘটনার পরের ঘটনাবলী, যার লক্ষ্যবস্তু অবশ্যই প্রগতিশীল বামপন্থী ছাত্র রাজনীতি তথা সামগ্রিক বামপন্থা। এই বক্তব্যের সত্যতা বিগত কয়েকদিনের নানা দাবি, পাল্টা দাবির মধ্যে স্পষ্ট। বাম রাজনীতি বনাম সম্মিলিত স্বাধীন, অরাজনীতির নামে সুবিধাবাদী রাজনীতির দ্বন্দ্ব পরিষ্কার হয়ে গেছে। বাম রাজনীতির সঙ্গে চরম সাম্প্রদায়িক দুর্নীতিপরায়ণ রাজনীতির দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক দখলের দ্বন্দ্ব। মিথ্যা বয়ান প্রতিষ্ঠার দ্বন্দ্ব। উদ্দেশ্য একটাই, র্যাগিংয়ের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংগ্রামকে দুর্বল করা এবং ক্যাম্পাসের দখল নেওয়া। যাদবপুর এখানেই ব্যতিক্রম। এখানে র্যাগিং তথা হত্যার পরে জোটবদ্ধ লড়াইয়ের পরিবর্তে রাজনৈতিক দখলদারির নোংরা যুদ্ধ শুরু হয়েছে। বিভিন্ন অবস্থানে দাঁড়িয়ে থাকা নানা গোষ্ঠীর কারণ মূল লড়াইটিই বিভাজিত। হয়ত ইচ্ছা করেই এমন পরিস্থিতি করে রাখা হয়েছে।
(চলবে)
– মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








