মঞ্জিমা দাশগুপ্ত
মেন গেট দিয়ে সোজা ঢুকে যান পোর্টিকো অব্দি। ডানদিকে ঘুরলেই পাবেন স্বর্গের সিঁড়ি। “গর ফিরদৌস বার রু-এ-জমীন অস্ত”… প্রেম, পলিটিক্স, পড়াশোনা – প-এ প্রেসিডেন্সি। যেদিকেই তাকাবেন, দেখতে পাবেন দেওয়াল জোড়া হল অফ ফেমের পাশে সাদা-হলুদ কাগজে মোড়া পোস্টারে প্রেম আর বিদ্রোহের গল্প বলে যাচ্ছে প্রজন্ম চত্বর। এই প্রেসিডেন্সিতেই ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও করছে কর্তৃপক্ষ। এই প্রেসিডেন্সিতেই চলছে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে কর্তৃপক্ষের ব্ল্যাকমেলিং রাজনীতি। এবার নেমে আসুন সিঁড়ি দিয়ে, চলে যান ইউনিয়ন রুমের দিকে। আপনার বাঁদিকে ছোটখাটো একটা জটলায় গিটার হাতে গান গাইছে মফস্বল থেকে স্বপ্ন বুনতে আসা ছেলেটা। তার গানের সুরে মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকা মেয়েটি কলকাতার কেতাদুরস্ত পাড়া থেকে এসেছে ইকোনমিক্স পড়তে। আপনার ডানদিকে একটা পথচলতি মিছিল, তাতে রামধনু পতাকা নিয়ে একদল ছেলেমেয়ে গেয়ে যাচ্ছে দিন বদলের গান। “গর ফিরদৌস বার রু-এ-জমীন অস্ত”। ধরে নিন, আপনি এসেছেন ভরা মার্চের কোনো কালবৈশাখী সন্ধেয়। আপনার চারপাশে ফেটে পড়ছে ভিড়। উচ্ছ্বসিত ভিড় থেকে ভেসে আসছে একেকটা ঝোড়ো দিনের সুর, আর ভরা মাঠের ওপার থেকে ভেসে আসছেন অঞ্জন দত্ত। কালো জামা পরে প্রশ্ন করছেন “সবাই কেন গাইতে গেলে প্রেমের গানই গায়?”
এর উত্তর সহজেই আপনি দিতে পারতেন, কিন্তু এই মুহূর্তে পারছেন না। কারণ লাভার্স লেনের কাঠচাঁপা ফুল আর ফিজিক্সের সিঁড়ির ছাতিম ফুলের সুবাসের ককটেলে একটা অদ্ভুত ঘ্রাণ আপনাকে আনমনা করে দিয়েছে। আপনি আপনার যৌবনের নস্ট্যালজিয়ায় বিহ্বল। “গর ফিরদৌস বার রু-এ-জমীন অস্ত…” আপনি জানেন ২০৭ বছর ধরে প্রতিস্পর্ধার প্রতীক হয়ে কলেজ স্ট্রিটে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে প্রেসিডেন্সি। কত নকশাল নেতার রক্তের টান আছে ওই কলেজপাড়ায়। কত তরুণ ছাত্রনেতার স্লোগানে গমগম করছে ইতিহাসের পাতা।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
ওরা আপনার কলেজবেলা কেড়ে নিতে চাইছে, ওরা আপনার থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে প্রথম যৌবন। ওরা লাভার্স লেনে আপনার প্রথম প্রেমের প্রতিশ্রুতিগুলোকে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে, আর আপনি ভাবছেন সবাই কেন গাইতে গেলে প্রেমের গানই গায়। আপনি ভেবেই চলেছেন। আসলে যদি একটু ফ্ল্যাশব্যাকে যান, দেখবেন অনেক আগেই এই বুলডোজার আপনার কলেজ গেট ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে গেছে। ভেঙে ফেলতে চেয়েছে ডিরোজিওর চেতনাকে, গুঁড়িয়ে দিতে চেয়েছে শিরদাঁড়া আর শিরোনাম। তবু শিরোনামহীন প্রেসিডেন্সি টিমটিম করে সোডিয়াম ভেপারে টিকে গেছে তার নিজস্বতায়।
১০ এপ্রিল ২০১৩। তৃণমূলী গুণ্ডাবাহিনী এসে ভাংচুর করে গেল আপনার সাধের বেকার ল্যাব। কলেজ জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কাচের টুকরো আর কাঠের তক্তা। প্রেসিডেন্সি আক্রমণের দিন কে বেশি মার খেয়েছিল কিংবা হুমকির সম্মুখীন হয়েছিল আপনার জানা নেই। কিন্তু এটুকু আলবাৎ জানা আছে, যে আপনারই নিকটজনরা কেউ ল্যাবে কেউ পোর্টিকোর সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে মার খাচ্ছিল, কেউ প্রতিরোধের জন্য আপ্রাণ খুঁজছিল চেনা মুখ। আরও পাঁচ বছর পরের কথা। আরও একটা ১০ এপ্রিল, আরও একবার হাঙ্গামা। আরও একবার আহত বহু কমরেড। আরও একবার কমরেডকে আগলে মেডিকাল কলেজে নিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশের উদ্দেশে ছুঁড়ে দেওয়া ঘেন্না আপনি দেখেছেন। পুলিশের নির্লজ্জ আক্রমণে ছিঁড়ে যাওয়া কমরেডদের জামা, কেটে যাওয়া কাঁধ, আটকে আসা প্রশ্বাস সযত্নে রেখে দিয়েছেন। মনে রেখে দিয়েছেন, সেদিন পিছন ফিরে ঠিক কাকে কাকে দেখেছিলেন পাশে দাঁড়াতে। কাকে দেখেছিলেন নির্লজ্জ নৈঃশব্দে ক্যান্টিনের দিকে ফিরে যেতে। আরেকটা ১০ এপ্রিল মুচকি হেসে কোনো প্রাক্তন ছাত্রনেতার প্রেমে পড়ে যাওয়ার দিন। সেদিন থেকেই আস্তে আস্তে পাল্টে যাচ্ছিল আপনার ঠিকানা।
সাল ২০১৪। ক্যাম্পাসে এলেন নতুন উপাচার্য অনুরাধা লোহিয়া। রাতারাতি প্রেসিডেন্সির ভোল পাল্টে দিলেন যিনি। স্বর্গরাজ্য থেকে নরককুণ্ডে পৌঁছে দিলেন। একে একে অস্ত যাওয়া তারার মত সকালের আকাশ থেকে নিরুদ্দেশ হয়ে গেলেন প্রবীর দাশগুপ্ত থেকে সোমক রায়চৌধুরীরা। এই ক্যাম্পাসে কুকুরকে খাওয়ানোর মতো ‘জঘন্য অপরাধে’ নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয় দুজন পশুপ্রেমীর প্রবেশ। প্রেসিডেন্সির ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আনন্দদা, বাদামকাকুদের প্রবেশ নিষেধ করলেন লোহিয়া – আপনি শুনলেন। কানাঘুষো শুনতে পেলেন, মানিয়ে নিতে পারছেন না কেউ। আপনি বোঝেননি।
২১ আগস্ট ২০১৫। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির কাছ থেকে ২০০ কোটির ‘দান’ পেল প্রেসিডেন্সি। নতমস্তক উপাচার্যের সেই ছবি খুব ঘুরেছিল বাজারে। সম্ভবত সেই প্রথম আপনি দেখেছিলেন ক্ষমতার সামনে মেরুদণ্ড কতটা নুয়ে পড়তে পারে। ছাত্র আন্দোলনের কফিনে সেদিনই শেষ পেরেক পোঁতা হয় প্রেসিডেন্সিতে। প্রতিষ্ঠা হয়ে গিয়েছিল যে প্রেসিডেন্সি পারে না। ওরা গেট ভেঙে দিল, শতাব্দীপ্রাচীন গাছ নিয়ে গেল হলুদ ক্রেন। সঙ্গে নিয়ে গেল প্রেসিডেন্সির মজ্জাগত লড়াই। প্রেসিডেন্সি আটকাতে পারল না। বইয়ের দোকান হটিয়ে একদিন পেল্লাই নতুন গেট বসল। গাছপালা কেটে ছেঁটে বসল বিকট পিনাকেল স্ট্রাকচার। হেরিটেজ বিল্ডিংয়ে বসল টাইলস। সাজল নতুন মিউজিয়াম। একে একে পুরনো যারা সবাইকে ছুটি দিয়ে দিলেন উপাচার্য লোহিয়া। ছুটিতে গেল প্রমোদদা, ছুটিতে গেল ছাত্র আন্দোলন, ছুটি নিল বটগাছ আর বিপ্লব। পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে সাজানো হল নতুন টয়লেট, মার্বেলে মুড়ে ফেলা হল সেইসব দেওয়াল যেখানে বিদ্রোহের চিহ্ন লিখে রেখেছিল ছাত্রছাত্রীরা। একে একে প্রাক্তনীদের নিষিদ্ধ করা হল ক্যাম্পাসে। তারপর ইডেন হোস্টেল, হিন্দু হোস্টেল পর্যন্ত লুটে নিয়ে নোটিস দিল নতুন ঠিকানার।
তারপর কী হল? আপনিও জানেন। তথ্যে আসুন। বেকার ল্যাবের ফান্ড থেকে উন্নততর গবেষণা, যে সেকেন্ড ক্যাম্পাস কর্পোরেট কায়দায় ঢেলে সাজাল কর্তৃপক্ষ, তার কী হাল? আপনি কি গেছেন নিউটাউনের সেই টুইন টাওয়ারে? গেলেও নিশ্চয়ই ঢুকতে পারেননি। কার্ড পাঞ্চ না করে সেই ক্যাম্পাসে প্রবেশ নিষিদ্ধ। হিংসুটে দৈত্যের ওই সাজানো বাগানে ছাত্রদের প্রবেশাধিকার নেই। ডিপার্টমেন্টগুলোতে রাজনীতি করা ছাত্রদের বিরুদ্ধে ক্রমে জারি হচ্ছে ফতোয়া। গবেষণাগারগুলোতে গবেষণার জিনিসপত্র নেই, শিক্ষক নেই, এমনকি ছাত্রও নেই। প্রতিবছর আপনি কাগজে দেখেন আসন ফাঁকা থাকছে লোহিয়ার নিজস্ব কর্পোরেট অফিসে। সেই অফিসের কেতাদুরস্ত কর্মচারীরা ছাত্রদের ব্যক্তিগত মুহূর্ত বন্দি করছে পেন ড্রাইভে। এই প্রেসিডেন্সিতে খোলা হাওয়া নেই, একান্ত মুহূর্তের নিশ্চিন্ততা নেই।
আরো পড়ুন আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিগ্রহ অন্ধকারে আলো ফেলেছে
অস্কার এবং নোবেল পুরস্কার – প্রাক্তনীদের মধ্যে এই দুই পুরস্কারেরই প্রাপক থাকার ইতিহাস রয়েছে দেশের একটিমাত্র কলেজ, অধুনা বিশ্ববিদ্যালয়ের। সেই প্রতিষ্ঠানের নাম প্রেসিডেন্সি। “গর ফিরদৌস বার রু-এ-জমীন অস্ত”। সত্যজিৎ রায়, অমর্ত্য সেন, অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রেসিডেন্সির কফিনে শেষ পেরেক ভেবে নিজেরই অন্তর্জলী যাত্রা শুরু করেছেন লোহিয়া। হিন্দু হোস্টেল ফিরেছে। টাইলসের ওপর স্প্রে পেন্ট দিয়ে ছাত্ররা ফের লিখেছে “ভিসি সে ভি আজাদী”। লাভার্স লেনে ফের গুঞ্জন শুরু করেছেন একদল তরুণ ছেলেমেয়ে।
আপনার প্রথম প্রেমের প্রতিশ্রুতি প্রেসিডেন্সিকে হারিয়ে যেতে দেবেন না, আগলে রাখুন। আগলে রাখুন পলিটিক্স আর পড়াশোনা। যতবার নীতি পুলিস খাড়া করে নিজেদের ব্যর্থতার দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে দিতে চাইবে স্বৈরাচারী লোহিয়া এণ্ড কোং, যতবার ব্যক্তিগত মুহূর্ত পেন ড্রাইভে সংগ্রহ করে হুমকি দেবে এই মনুবাদী কর্তৃপক্ষ, ততদিন কর্তৃপক্ষকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে স্বর্গের ওই সিঁড়ি থেকে “সূর্যাস্ত দেখিবার সাধ জাগিয়ে” মফস্বলী প্রেমিকের গোপন ডাকনাম মুখে নিয়ে কুসুমরা ঘুরে বেড়াবে ৮৬/১-এ। প্রেসিডেন্সি লং লিভ।
প্রেসিডেন্সির প্রাক্তনী, সাহিত্যের গবেষক। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








