মানুষটি চেয়ারে বসে আছেন, জনা চারেক প্রাইভেট এজেন্সির নিরাপত্তারক্ষী অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে আছেন। সন্তানসম বীরপুঙ্গবরা চেয়ারে বসা ভদ্রলোককে জঘন্য ভাষায় অবিরাম আক্রমণ করে চলেছে।

এই ভাইরাল দৃশ্য কয়েকদিন আগেই আমরা দেখেছি। চেয়ারে বসা ভদ্রলোক প্রফেসর মহম্মদ আলি, আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া — দেশ বিদেশের কমপক্ষে দশটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে এখন পর্যন্ত তাঁর ১৪৭টি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। ছাত্র আন্দোলনের নামে লেখার অযোগ্য গালাগাল এই অধ্যাপককে নিঃশব্দে হজম করতে হয়েছে, ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কে কদর্যতার এক নতুন অধ্যায় রচিত হয়েছে।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

পিএইচডি সংক্রান্ত তালিকায় বেনিয়ম ছিল কিনা, বা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের টাকা নয়ছয় হয়েছে কিনা, তা নিয়ে আন্দোলন হতেই পারে। এ কেমন আন্দোলন যেখানে সভ্যতার লেশমাত্র নেই?

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ছাত্র আন্দোলন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় বা যাদবপুরে আকছার ছাত্ররা আন্দোলন করে থাকে। ফি বৃদ্ধির বিরোধিতা থেকে শুরু করে লাইব্রেরীর দাবি, হোস্টেলের সমস্যা থেকে শুরু করে নতুন কোর্স চালু করা, এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরের বৃহত্তর সামাজিক, রাজনৈতিক দাবি নিয়েও ছাত্র রাজনীতি চলতেই থাকে। এইসব চেনা দৃশ্যপটে অগণতান্ত্রিক, রুচিহীন আচরণ আর আস্ফালনের একাধিক ঘটনা যুক্ত হচ্ছে। গত কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গে ধারাবাহিকভাবে শিক্ষক নিগ্রহের ঘটনা ঘটছে। আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ এপ্রিলের ঘটনা মোটেই বিচ্ছিন্ন নয়।

খবরে প্রকাশ, ঘটনার সূত্রপাত পাঁচ পড়ুয়ার পিএইচডি সুযোগ পাওয়া নিয়ে। সম্প্রতি পিএইচডি শিক্ষার্থীদের তালিকায় যে পাঁচ জনের নাম প্রকাশিত হয়েছে, তাদের নিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রাক্তন সভাপতি গিয়াসউদ্দিন মণ্ডল এবং বেশকিছু সাধারণ পড়ুয়ারও আপত্তি আছে। তালিকায় নাম রয়েছে তৃণমূলের রাজ্য কমিটির সদস্য, তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদকের। পড়ুয়াদের বক্তব্য, কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে তারা এই সুযোগ পেয়েছে। তারা তৃণমূলের সক্রিয় কর্মী, অন্য সংস্থায় কর্মরত। এরা পিএইচডি করার সুযোগ পাওয়ার যোগ্য নয়, তবু এদের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এর মধ্যে দুর্নীতি আছে। উপাচার্য মহম্মদ আলিকে অভিযুক্ত করে আন্দোলনের নামে তাঁকে অপদস্থ করার এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই নানারকম প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। কেউ ঘটনার দায় ঝেড়ে ফেলতে ব্যস্ত, কেউ ঘটনাকে নিতান্ত সাধারণ এবং ছোট ঘটনা প্রমাণ করতে চান। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ রাজ্য রাজনীতির একাধিক প্রসঙ্গও আলোচনায় উঠে আসছে।

প্রধান অভিযুক্ত গিয়াসউদ্দিনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি নষ্ট, উপাচার্যকে হেনস্থা, ক্যাম্পাসে বিশৃঙ্খলা তৈরি করার মত বেশ কয়েকটি কারণে আগেই বহিষ্কার করা হয়েছিল। সেই গিয়াসউদ্দিন কার বলে বলীয়ান হয়ে পুনরায় একই ধরনের ঘটনা ঘটাল? আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃণমূল ছাত্র পরিষদের বর্তমান সম্পাদক ওয়াদিল আলমের বয়ান অনুযায়ী, গিয়াসউদ্দিন এখন বিরোধী দলের সাথে যুক্ত। বছর তিনেক আগেই নাকি তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারের পর ছাত্র পরিষদ থেকেও বহিষ্কার করা হয়েছে। তৃণমূলের ছাত্র পরিষদের রাজ্য সভাপতি তৃণাঙ্কুরেরও একই বক্তব্য। অথচ ২০১৯ সালে বহিষ্কৃত গিয়াসকে ২০২০ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর তৃণমূলের প্রচারে বক্তব্য রাখতে দেখা গেছে বলে অভিযোগ। নেতা, মন্ত্রীরা দাবি করছেন এই প্রাক্তন ছাত্রনেতার সাথে তৃণমূলের কোন সম্পর্ক নেই। কিন্তু একের পর এক ছবি, অডিও ক্লিপ প্রকাশ পাচ্ছে যা বলছে অন্য কথা। গিয়াস নিজেও জোর গলায় তৃণমূলী হওয়ার প্রমাণ দিতে চেয়েছে।

তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ মন্তব্য করেছেন, তৃণমূল ছাত্রপরিষদকে কালিমালিপ্ত করতেই এই ঘটনাটি পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছে। বিরোধীদের সমালোচনার সুবিধা করে দেওয়ার জন্যই এই ভিডিও এভাবে সাজিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। গত কয়েক দিনে রাজ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক হত্যায় পুলিসের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এবার শিক্ষাঙ্গনের ঘটনাতেও পুলিস কাঠগড়ায়। গিয়াসউদ্দিন গ্রেপ্তার হয়েছে, কিন্তু তার সঙ্গীরা গ্রেপ্তার হল না কেন?

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর মতে বিক্ষোভ চলাকালীন উপাচার্যকে “একটু কটু, খারাপ” কথা বলা হয়েছিল। এই সামান্য খারাপ কথাকে কেন্দ্র করে এত মাতামাতি তাঁর পছন্দ হয়নি বলে জানিয়েছেন। সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসঙ্গ। প্রশ্ন তুলেছেন, বিশ্বভারতীর উপাচার্য যা করছেন তার জন্যে কি তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন? মুখ্যমন্ত্রী সগর্বে ঘোষণা করেছেন “আমাদের এখানে পুলিশ অ্যাকশন নেয়”।

কিন্তু উপাচার্য বারবার অভিযোগ করেছেন ঘটনা চলাকালীন ফোন করলেও পুলিস সাহায্য করেনি। সরকারপক্ষ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও তর্ক কিন্তু বেড়েই চলেছে। অনেকে আনিস খান হত্যাও এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে মনে করছেন। আনিস এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্র ছিলেন। সিএএ, এনআরসি, কেন্দ্রীয় কৃষি আইনের বিরোধিতা ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকাঠামোর উন্নয়নসহ পড়ুয়াদের বিভিন্ন দাবি দাওয়া এবং সর্বোপরি বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি দখলের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সামিল ছিলেন তিনি। তাঁর হত্যার পিছনে সেটিও একটি কারণ হতে পারে বলে অনেকের মত।

সাধারণ পড়ুয়াদের একাংশের বক্তব্য, পিএইচডি তালিকা আসল ইস্যু নয়, আসল কথা তৃণমূল ছাত্র পরিষদের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব। যেখানে সাধারণ পড়ুয়ারা আন্দোলন করছিল জমি দখলের বিরুদ্ধে, আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকাঠামোর বেহাল দশা এবং উন্নতিকল্পে ফান্ডিং বন্ধের বিরুদ্ধে, বিভিন্ন স্কলারশিপ বন্ধের বিরুদ্ধে, সেখানে গিয়াসের দলবল আন্দোলন করছিল উপাচার্যের বিরুদ্ধে। তিনি তহবিল তছরুপ করেছেন, কোনো উন্নয়নমূলক কাজ করেননি বলে অভিযোগ এনেছিল গিয়াসের গোষ্ঠী। দীর্ঘকাল সেই আন্দোলন চলছে, একাধিকবার হাঙ্গামাও হয়েছে। তাতে অসুবিধায় পড়েছিলেন সংখ্যালঘু উন্নয়ন দপ্তরের লোকেরাও। তাঁদের নিরাপত্তার ঘাটতিতে নাকি উপাচার্যের উপর বেজায় চটেছিলেন মন্ত্রী মহম্মদ গোলাম রব্বানি। সেই ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে উপাচার্য পদত্যাগ করতেও চেয়েছিলেন।

বাংলায় প্রতিদিন শিক্ষক-ছাত্র সম্পর্কের অবনতি ঘটছে, গোটা শিক্ষাব্যবস্থা তছনছ হয়ে যাচ্ছে। অধ্যাপিকাকে তৃণমূল নেতা আরাবুল হোসেনের জগ ছুড়ে মারা, ছাত্রদের রায়গঞ্জ কলেজের অধ্যক্ষকে হেনস্থা অথবা যাদবপুর বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষককে কাউন্সিলরের চড় মারা — এই ঘটনাগুলির মধ্যেই আলিয়ার ঘটনার বীজ নিহিত ছিল। উল্লিখিত ঘটনাগুলির কোনোটির বেলাতেই যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে অপরাধীরা নির্ভয়।

নিবন্ধকার সাংবাদিকতার ছাত্রী। সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে আগ্রহী। মতামত ব্যক্তিগত

আরো পড়ুন

বিশ্বভারতীতে ঠিক কী হচ্ছে?

Leave a Reply