ছবিটার নাম বাধাই দো। ছবির মূল বিষয়বস্তু, এককথায় বলতে গেলেল্যাভেন্ডার ম্যারেজ’।

‘ল্যাভেন্ডার ম্যারেজ’ ব্যাপারটা খায় না মাথায় দেয়? এ হল সেই বিয়ে, যেখানে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোনোরকম শারীরিক সম্পর্কের প্রত্যাশা থাকে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পূর্ববর্তী হলিউডের আনাচে কানাচে বেশ কিছু ল্যাভেন্ডার ম্যারেজের গল্প কানাঘুষো শোনা যেত।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

কারা আবদ্ধ হতেন এরকম অদ্ভুত বিবাহবন্ধনে? সাধারণত, এই ধরনের সম্পর্ক দেখা যেত একজন সমকামী নারী এবং একজন সমকামী পুরুষের মধ্যে। যেহেতু প্রকাশ্যে সমপ্রেমী হওয়া সে আমলে সম্ভব ছিল না, সেহেতু প্রভাবশালী সমকামী নরনারী নিজেদের মধ্যে বিয়ে করে সমাজের কাছে মুখরক্ষা করতেন। কিন্তু ভিতরে ভিতরে তাঁদের অনেকেরই সমলিঙ্গের একজন করে ভালবাসার মানুষ ছিল। এই প্রসঙ্গে চারের দশকে হলিউড কাঁপানো নায়িকা বারবারা স্ট্যানউইক ও অভিনেতা রবার্ট টেলরের ‘বিখ্যাত’ ল্যাভেন্ডার ম্যারেজ উল্লেখ্য। উইজার্ড অফ ওজ খ্যাত জুডি গারল্যান্ডের বিয়েও সেকালের হলিউডের আরেক স্মরণীয় ল্যাভেন্ডার ম্যারেজ।

এইসব হলিউডি নাটকের প্রায় ১০০ বছর পরে ভারতের পটভূমিকায় আমরা পেলাম বাধাই দো। ছবির শুরুতে একটু চিন্তাই হচ্ছিল। ১৯৯৯ সালের হাম দিল দে চুকে সনম ছবিতে যেমন জোর করে পরিবারের পছন্দ অনুযায়ী মেয়ের বিয়ে দেওয়ার জয়গান গাওয়া হয়েছিল, তেমন আরেকটা প্রতিক্রিয়াশীল ছবি দেখতে হবে নাকি? কিন্তু সত্বর ভুল ভেঙে গেল। ২০২২ সালের বলিউড আর ১৯৯৯ সালের বলিউডের কোনো তুলনাই হয় না।

এ ছবিতে ল্যাভেন্ডার বিয়ের উপস্থাপনায় বারবার সেই বিবাহের অন্তর্নিহিত শূন্যতা, সত্যিকারের ভালবাসার মানুষটার হাত নিজের পরিবারের সামনে ধরতে না পারার যন্ত্রণা, আর সেই মানুষটার সাথে প্রকাশ্যে সংসার করে উঠতে না পারার হাহাকারটুকু বারবার প্রকট হয়ে ওঠে। প্রকট হয় ভারতের পরিবারতন্ত্রের বিষাক্ত দিকটাও। তারই মধ্যে সমপ্রেমীদের সন্তান দত্তক নিতে না পারার আইনি বাধাও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হয়।

স্পয়লার দেবো না, কিন্তু এটুকু বলে রাখি, আমার মতে এ ছবির সবথেকে বড় সাফল্য দুজন সমকামী পুরুষকে শুধু পুরুষ হিসাবে এবং দুজন সমকামী নারীকে শুধু নারী হিসাবেই দেখানো। ঋতুপর্ণ ঘোষ ছাড়া একবিংশ শতকের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সম্পর্কে কোনো ধারণা না থাকা গড়পড়তা বাঙালি দর্শকের জন্যে এ ছবি একটা মাইলস্টোন। সমপ্রেমী পুরুষ মানেই সে মেয়েলি হবে আর সমপ্রেমী নারী মানেই পুরুষালি হবে — এই ধারনার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। অথচ দুঃখজনকভাবে, এই ভুল ধারণাটাই বেশিরভাগ ভারতীয় তথা বাঙালি পোষণ করে থাকেন। এই ধারনার ঊর্দ্ধে উঠে বাস্তবসম্মত চরিত্র চিত্রণের জন্য বাধাই দো ছবিকে কুর্নিশ।

আরেকটা বিষয় লক্ষণীয়। এই ছবির প্রত্যেক সমপ্রেমী চরিত্রই অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী এবং নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে মোটামুটি সফল। অর্থাৎ পারিবারিক প্রতিক্রিয়া এবং আইনগত বৈষম্যটুকু না থাকলে, এই মানুষগুলো এমনকিছু লাঞ্ছিত, বঞ্চিত নন। সমাজের সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে নিজেদের অর্থনৈতিক অবলম্বনটুকু এঁরা প্রত্যেকেই আদায় করে নিয়েছেন। আর সেটা করেছেন বলেই, এই ছবি প্রান্তিক মানুষের আরও দুঃখের পাঁচালিতে পর্যবসিত হয়নি। অ্যান্ডারসন কুপার থেকে এলেন ডিজেনেরাস — কেউই লাঞ্ছিত, বঞ্চিত নন। সেই কারণেই তাঁরা সমপ্রেমের আইনি স্বীকৃতির জন্য প্রতিক্রিয়াশীল খ্রিষ্টানদের চোখে চোখ রেখে লড়াই চালিয়ে যেতে পেরেছেন। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া সমপ্রেমীদের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অনুদানের ব্যবস্থা করেছেন, এখনো করছেন। এই প্রসঙ্গে ভারতের মহারাজ মানবেন্দ্র সিং গোহিলের নামও উল্লেখ্য।

এই ছবির অভিনেতা, অভিনেত্রীরা প্রায় প্রত্যেকেই অসাধারণ কাজ করেছেন। তবে আলাদা করে শার্দূলের চরিত্রে রাজকুমার রাও এবং সুমির চরিত্রে ভূমি পেড়নেকরের অভিনয় মনে দাগ কেটে যায়। কয়েকটি দৃশ্যে শার্দূলের কস্টিউম ডিজাইনে টম অফ ফিনল্যান্ডের ছায়া রয়েছে। রিমঝিমের চরিত্রায়নেও ইউরি মাঙ্গার (মেয়েদের মধ্যে সমপ্রেম নিয়ে জাপানি কার্টুন সিরিজ) অনুপ্রেরণা খুঁজে পাওয়া যায়। এ দুটো কাজ যদি সচেতনভাবে করা হয়ে থাকে তাহলে তা প্রভূত প্রশংসার যোগ্য।

হাঁটি হাঁটি পা পা করে বলিউডও বড় হচ্ছে। এরকম গুরুত্বপূর্ণ অথচ সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে ঝরঝরে আধুনিক কাজ হচ্ছে। তথাকথিত প্রান্তিক মানুষদেরও, শুধুমাত্র অবিচারের শিকার বানিয়ে রাখা হচ্ছে না। প্রগতিশীল বাঙালি কবে বড় হবে? আদৌ হবে তো?

মতামত ব্যক্তিগত

আরো পড়ুন

সমান্তরাল: একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় পটলের অম্বল

Leave a Reply