সাংস্কৃতিক জগতে নস্টালজিয়া-সাইকেল বলে একটা কথা চালু আছে। নস্টালজিয়া-সাইকেল ব্যাপারটা, খুব সহজ কথায় বলতে গেলে, ২০-৩০ বছর অন্তর অন্তর কিছু সামাজিক-সাংস্কৃতিক উপাদানকে ফিরে দেখার প্রবণতা। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৭৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত স্টার ওয়ার্স প্রথম ট্রিলজির ঠিক ২২ বছর পরে ১৯৯৯ সালে স্টার ওয়ার্স: এপিসোড ওয়ান মুক্তি পাওয়া, বা ১৯৮৪ সালে জেরেমি ব্রেটের শার্লক হোমস মুক্তি পাওয়ার ২৫-৩০ বছর পরে আমেরিকায় এলিমেন্টারি (২০১২)  আর ইংল্যান্ডে শার্লক (২০১০) — এই দুই টিভি সিরিজের মুক্তি। এখন প্রশ্ন হল, হঠাৎ কলকাতার পটভূমিকায় বানানো ২০১৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সমান্তরাল ছবির সমালোচনায় এইসব প্রসঙ্গ আসছে কোত্থেকে?

তার কারণ, বিগত কয়েক বছর ধরেই দেখছি কলকাতার বাংলা ছবিতে একটা অকারণ বিদঘুটে নস্টালজিয়া-সাইকেল ঘুরে ফিরে আসছে। সমান্তরাল সেই সাইকেলেরই শিকার। কী নিয়ে এই নস্টালজিয়া? এই প্রশ্নের উত্তর হল — নব্বইয়ের দশকের কলকাতা।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

বাস্তবে ২০১৭ সালের কলকাতায় কিন্তু হলুদ ট্যাক্সির এতো রমরমা ছিল না, যতটা পরিচালক দেখাতে চেয়েছেন। ওলা, উবার, ইন্ডিগো, সুইফট ডিজায়ার — এইসবই তখনো বেশি চোখে পড়ত। ২০১৭ সালে বৃহত্তর কলকাতার অধিবাসীদের মধ্যে কতজন বাড়ির মধ্যে ওরকম উত্তর কলকাতার স্টিরিওটিপিকাল ফুটবলমাঠ-প্রতিম উঠোন, চিলেকোঠার ঘর বা ডিজাইনার সিঁড়ি বাস্তবে দেখে অভ্যস্ত — তাতেও সন্দেহ আছে। কিন্তু ওই যে বললাম — নস্টালজিয়া-সাইকেল। নব্বইয়ের দশকের নস্টালজিয়া। আর সেই নস্টালজিয়ার উপর ভিত্তি করেই সিনেমাটোগ্রাফার, পরিচালক, এডিটর — সবাই মিলে দু ঘন্টা ধরে আলপনা দিয়ে গেছেন। এরকম কিন্তু ছিল না। দশ বছর আগেও পাল্টে যাওয়া একবিংশ শতাব্দীর কলকাতা নিয়ে কিছু ছবি হয়েছে। অন্তহীন বা অনুরণন-এর মতো ছবিতে হাল্কা আলপনা দেবার প্রবণতা দেখা গেলেও এরকম নষ্ট-নস্টালজিয়ার নির্লজ্জ উদযাপন ছিল না। ২০১২ সালে মৈনাক ভৌমিকের বেডরুম ছবিতেও পাল্টে যাওয়া মহানগরীর যথেষ্ট আধুনিক দৃশ্যায়ন করা হয়েছিল, যাতে একফোঁটা সাংস্কৃতিক হ্যাংওভার ছিল না। কিন্তু বেডরুম ছবিতে সমান্তরালের মতো গভীর একটা বিষয় নিয়ে কাজ করার সুযোগ ছিল না। আর এই কলকাতা-ক্যালেন্ডার বানানোর চক্করে পড়ে সমান্তরাল ছবির মূল বিষয়বস্তুর এক অবাঞ্ছিত লঘুকরণ ঘটেছে।

এবার আসি সেই বিষয়বস্তুর কথায়। অর্ক (ঋদ্ধি সেন) বহুদিন পরে মামাবাড়ি ফিরে জানতে পারে যে তার অসুস্থ মেজমামাকে (পরমব্রত) ছাদের ঘরে আটকে রাখা হয়েছে, কিন্তু কথাবার্তা বলে সে কোন অসুস্থতার চিহ্ন খুঁজে পায় না। ক্রমশ সে বুঝতে পারে যে তার মামাবাড়ির সকলে তার কাছ থেকে মেজমামার ব্যাপারে কিছু একটা লুকোচ্ছে।  ছবির শেষে এসে সে জানতে পারে, তার মামা জন্মগতভাবে আন্তঃলিঙ্গ (intersex), এবং বাড়ির সকলে সারাজীবন ধরে সেই সত্যটাকে লুকোবার চেষ্টা করে চলেছে। এইখানে বেশ কিছু মারাত্মক সমস্যা রয়েছে। এক এক করে বলি।

একেবারে শেষের দিকের এক দৃশ্যে আমরা দেখি তার মেজমামা তাকে বলছে, “আমি তো আসলে একটা মেয়ে। আমার শরীর মন সবকিছু জুড়ে একটা মেয়ে”। এই সংলাপ তো আন্তঃলিঙ্গ মানুষের সংলাপই নয়! এ তো জেন্ডার ডিস্ফোরিক রূপান্তরকামী মানুষের সংলাপ! দুটো কখনোই এক জিনিস নয়! এখানেই শেষ নয়। আরেক দৃশ্যে দেখছি অর্ক তার মেজমামার ঘরের দরজায় কান পেতে শুনছে, তার মামা নিজেকেই বলছে, ‘তোমাকে কত ভালবাসি, এতদিন আসোনি কেন ?’ এই সংলাপ কি আদৌ কোনো রূপান্তরকামী মানুষের সংলাপ? এ তো আত্মরতি (Narcissism)। তার সাথে রূপান্তরকামিতার কী সম্পর্ক? এই প্রশ্নটার একটা ‘উত্তর’ আছে।  আটের দশকে মনস্তত্ত্ববিদ রে ব্ল্যাঞ্চারড বলেছিলেন রূপান্তরকামী মানুষদের একাংশ নিজেদের অন্তরেই এক বিপরীত লিঙ্গের মানুষকে আবিষ্কার করেন, এবং তারই প্রেমে পড়ে যান। এই ব্যাপারটার তিনি নামকরণ করেছিলেন ‘অটোগাইনোফিলিয়া’ । স্পষ্টতই এই ছবিতে মেজমামাকে পরিচালক অটোগাইনোফিলিক হিসাবেই উপস্থাপন করতে চেয়েছেন। এবং এটা মারাত্মক ভুল বললেও কম বলা হয়। তার কারণ, বেশীরভাগ রূপান্তরকামী মানুষ অটোগাইনোফিলিয়ার তত্ত্বকে শুধু প্রত্যাখ্যানই করেন না, তাঁরা মনে করেন অটোগাইনোফিলিয়ার তত্ত্ব রূপান্তরকামীদের জন্য চূড়ান্ত অবমাননাকর।

দুঃখের ব্যাপার, এই সামান্য পড়াশোনাটুকু পরিচালকমশাই ছবিটা বানানোর সময় করেছেন বলে মনে হল না। আরো দুঃখের ব্যাপার, এই জটিল বিষয়গুলো টুকটাক অন্বেষণ করার যথেষ্ট সুযোগ ছিল এই ছবিতে। ২০১৭ সালের পৃথিবী কিন্তু সোফি উইলসন, ল্যাভার্ন কক্স, বাক এঞ্জেল বা মানবী বন্দ্যোপাধ্যায় পরবর্তী পৃথিবী। এই পৃথিবীতে অর্ক বড় হয়েছে, এই পৃথিবীতে অর্ক ফেসবুকে প্রেম করেছে তিতলির সাথে, এই পৃথিবীতে তিতলির দাদা (সিধু) কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনস্তত্ত্বে পিএইচডি করে ফিরেছেন। এই পৃথিবী পুরোপুরি অর্কের পৃথিবী এবং এই পৃথিবীর প্রেক্ষিতে অর্কের মেজমামাকে (আসলে মেজমাসিকে) আমরা দেখলামই না। অর্কর দুই মামী দুই মেরুর মানুষ, একজন আপাদমস্তক ঘরোয়া (অপরাজিতা) এবং অন্যজন (তনুশ্রী চক্রবর্তী) আদবকায়দায় আধুনিকা। দুজনেই যথেষ্ট দক্ষতার সাথে এই ছবিতে অভিনয় করেছেন, কিন্তু দুই বৃত্তের এই দুই মানুষ তাদের নিজের মত করেই কতটা ট্রান্স-ইনক্লুসিভ হতে পারতেন সেটাও পরিচালক খোঁজার চেষ্টা করলেন না। সিধুর চরিত্রটা অসীম সম্ভাবনাময়, এবং তার সাথে মেজমামার কখনো দেখাই হল না, যেটা হলে হয়ত খুব অন্যরকম এবং শিক্ষামূলক কিছু সংলাপ আমরা শুনতে পেতাম। সেসব তো হলই না, উপরন্তু পরমব্রতকে কাঁদিয়ে কাটিয়ে, ছোটবেলায় স্কুলের চতুর্থ শ্রেণীর এক কর্মীর হাতে তার যৌন নিগ্রহের ঘটনার বীভৎসতা জুড়ে দিয়ে, ছবির শেষে আত্মহত্যা করিয়ে তবে পরিচালকবাবুর শান্তি হল।

তার মানে কি সমান্তরাল খারাপ ছবি ? একেবারেই না! যে সমালোচনাগুলো করছি, একটা ছবির ন্যূনতম কিছু গুণ না থাকলে এ জাতীয় সমালোচনা করতাম না। শুধু তাই নয়, পরিচালনায় যতই ভুলভ্রান্তি থাক, অভিনয় নিয়ে প্রায় কিছুই বলার নেই। প্রত্যেকেই নিজের নিজের চরিত্রে চমৎকার মানিয়ে গেছেন। ক্যামেরার কাজ, তা সে যতই আলপনা দিতে ব্যবহার করা হোক না কেন, দিনের শেষে যথেষ্ট নয়নাভিরাম। বিষয় নির্বাচনের জন্যও পরিচালকের সাধুবাদ প্রাপ্য।

কিন্তু ওই পর্যন্তই। আসলে পরিচালক ১৯৯৭ সালের গল্প বলবেন না ২০১৭ সালের, সেটাই ঠিক করে উঠতে পারেননি। আন্তঃলিঙ্গ মানুষের গল্প বলবেন নাকি একজন বৃহন্নলার, সেটাও বুঝে উঠতে পারেননি। পরিশেষে যা হবার তাই হয়েছে। বাজার থেকে পটল কিনে এনে, তিনি সে পটলকে আলু দিয়ে ঝোল রান্না করবেন, নারকেল দিয়ে দোলমা বানাবেন, নাকি লম্বা লম্বা করে কেটে ভাজবেন — এই সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে ভুগতে শেষাবধি পটলের অম্বল বানিয়েছেন। এক অসীম সম্ভাবনাময় পটলের অম্বল!

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.