অর্ক মুখার্জি

আগামী ১৩ নভেম্বর বাংলার ছটি বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনের দিন ধার্য করা হয়েছে। আর জি কর কাণ্ডের পর এই উপনির্বাচনগুলিতে কী ফলাফল হয় তার দিকে নজর থাকবে রাজনৈতিক বোদ্ধাদের। শাসক তৃণমূল আর জি কর কাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব এড়িয়ে ভোট শতাংশ ধরে রাখতে পারে কিনা বা বিরোধীরা ভোট শতাংশ বাড়াতে পারে কিনা সেদিকে নজর থাকবে রাজ্যের সকলের। পশ্চিমবঙ্গের উপনির্বাচনগুলির গত কয়েক বছরের গতিপ্রকৃতি লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, শাসক তৃণমূল উপনির্বাচনে ভোট শতাংশ বাড়িয়ে আসন দখল করে। ব্যতিক্রম সাগরদীঘি উপনির্বাচন। সেখানে বাম-কংগ্রেস জোট তৃণমূলকে পরাজিত করে এবং জোট প্রার্থী বায়রন বিশ্বাস হিসাবে জয়ী হন, যদিও তিনি জয়ের কিছুদিন পরেই তৃণমূল কংগ্রেসে যোগদান করেন। এবারের উপনির্বাচনে বাম-কংগ্রেস জোট হয়নি। বামফ্রন্ট বরং কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে বৃহত্তর বাম ঐক্যের লক্ষ্যে সিপিআই (এমএল)-কে নৈহাটি এবং হাড়োয়া আসনটি ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ)-কে ছেড়ে দিয়েছে।

প্রতিবেশী রাজ্য ঝাড়খণ্ডে আগামী ১৩ ও ২০ নভেম্বর দুই দফায় বিধানসভা নির্বাচন হবে এবং মহারাষ্ট্রের বিধানসভা নির্বাচন এক দফায় ২০ নভেম্বর। বাংলার উপনির্বাচনের ফলাফল ওই দুই রাজ্যের ফলাফলের সঙ্গেই আগামী ২৩ তারিখ ঘোষিত হবে। বাংলার ছটি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে বাঁকুড়ার তালডাংরা বিধানসভাও রয়েছে। ১৯৫২ সালের প্রথম বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রার্থী পূরবী মুখোপাধ্যায় এই কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনিই বিধায়ক ছিলেন। ১৯৬৯ সালে কংগ্রেস প্রথমবার ওই আসনটি হারে। সিপিএম প্রার্থী মোহিনীমোহন পণ্ডা নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালেও তিনি জেতেন, কিন্তু ১৯৭২ সালের লড়াইয়ে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রার্থী ফণিভূষণ সিংহবাবু জয়ী হন। তবে ১৯৭৭ সাল থেকে সিপিএমকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। তালডাংরা সিপিএমের শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত হয়। ২০১৬ সাল পর্যন্ত এই বিধানসভা কেন্দ্রে সিপিএমই জিতে এসেছে। এমনকি ২০১১ সালে যখন বামফ্রন্ট দীর্ঘ ৩৪ বছর পরে ক্ষমতাচ্যুত হয়, সেবারও এই কেন্দ্র থেকে সিপিএম বিধায়ক মনোরঞ্জন পাত্র জিতেছিলেন। ২০১৬ সালের নির্বাচনে সমীর চক্রবর্তীর কাছে প্রবীণ সিপিএম নেতা তথা কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অমিয় পাত্র পরাজিত হন এবং ৩৯ বছর পর তালডাংরা বামেদের, বলা ভাল সিপিএমের, হাতছাড়া হয়। ২০২১ সালের লড়াইয়ে সিপিএম এবং তৃণমূল – দুই পক্ষই প্রার্থী পরিবর্তন করে। সিপিএমের হয়ে লড়েছিলেন মনোরঞ্জন পাত্র আর তৃণমূল দাঁড় করিয়েছিল জেলার রাজনীতির পোড়খাওয়া মুখ অরূপ চক্রবর্তীকে। বিজেপির হয়ে লড়েন শ্যামলকুমার সরকার। ২০২১ সালে বিজেপি বাঁকুড়া জেলার কিছু কেন্দ্রে ভাল ফল করলেও তালডাংরায় শেষ হাসি হেসেছিলেন অরূপই। ২০২৪ সালে তৃণমূল তাঁকে বাঁকুড়া লোকসভা থেকে প্রার্থী করে এবং গতবারের বিজেপি সাংসদ সুভাষ সরকারকে হারিয়ে তিনি সাংসদ নির্বাচিত হন। তাই তিন বছরের মধ্যেই উপনির্বাচন হচ্ছে তালডাংরায়।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এই বিধানসভা কেন্দ্রে মোট ভোটার ২,৬৪,০০০। সিমলাপাল ব্লকে ভোটার সংখ্যা ১,৩০,০০০। আর একটি উল্লেখযোগ্য পরিসংখ্যান হল, সিমলাপাল ব্লকের ১,৩০,০০০ ভোটারের মধ্যে কমবেশি ৪৫% উৎকল সমাজভুক্ত। স্বাভাবিকভাবেই তালডাংরা বিধানসভা এলাকায় উৎকল ভোটের একটা প্রভাব রয়েছে। স্থানীয় উৎকলদের মতে পশ্চিমবঙ্গে উৎকলদের আবির্ভাব প্রায় ৮০০ বছর আগে সুলতানি আমলে। তাই বাঙালিয়ানার সঙ্গেই তাঁদের শিকড়ের যোগ বেশি। এবার তাই ভোটে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তৃণমূল, সিপিএম এবং কংগ্রেস কিছুটা হলেও এই অঙ্ককে মাথায় রেখে উৎকল সম্প্রদায় থেকেই নিজেদের প্রার্থী বেছেছে, যদিও কোনো দলের নেতাই তা স্বীকার করছেন না। তৃণমূল প্রার্থী করেছে শিক্ষক নেতা ফাল্গুনী সিংহবাবুকে। অন্যদিকে সিপিএম প্রার্থী দেবকান্তি মহান্তি আর এবার জোট না হওয়ায় কংগ্রেস প্রার্থী তুষারকান্তি ষন্নিগ্রাহী। বিজেপি অবশ্য প্রার্থী করেছে প্রাক্তন তৃণমূল নেত্রী এবং বাঁকুড়া পৌরসভার ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার অনন্যা রায় চক্রবর্তীকে।

আরো পড়ুন বিজেপির জন্য পরিস্থিতি সহজ করে দিলেন বায়রন

তালডাংরা বিধানসভার এক বড় অংশের মানুষ সরাসরি সরকারের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের গ্রহীতা। উপনির্বাচন বলে মানুষের মধ্যে এমনিতেই উৎসাহ কম। তবে তৃণমূলের গোষ্ঠী রাজনীতির সমীকরণে কিছু নেতার প্রার্থী পছন্দ হয়নি বলে তাঁদের তেমনভাবে প্রচারে দেখা যাচ্ছে না। গত কয়েকবছর এঁরা ভোট ‘ম্যানেজ’ করতেন। যদিও প্রার্থীর পিছনে রয়েছেন বাঁকুড়া জেলা তৃণমূলের অন্যতম অভিজ্ঞ পোড়খাওয়া ভোট ম্যানেজার। জেলা রাজনাতিতে তাঁর প্রভাব গভীর। অনেকে বলছেন প্রার্থী এখানে ছায়া, তিনি নিজেই প্রার্থীর হয়ে লড়ছেন। পেশায় শিক্ষক প্রার্থী এলাকায় জনপ্রিয়। ভাবমূর্তি স্বচ্ছ। ব্লক সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন, তাঁর আমলে তাঁর এলাকা থেকে তৃণমূল লিড পেয়েছে। মানুষ যে তাঁর উপরে খুব রুষ্ট, ক্ষোভে ফুঁসছেন – এমন নয়। এই বিধানসভার প্রায় সবটাই গ্রামীণ এলাকা। বহু এলাকার মানুষ প্রান্তিকও বটে। এইসব এলাকায় আর জি কর আন্দোলনের আঁচ হয়ত পৌঁছেছে মোবাইল বা টিভির খবরের মাধ্যমে, কিন্তু এমন আঁচ নেই যা তৃণমূলকে রাজনৈতিকভাবে পুড়িয়ে দিতে পারে। লড়াই বরং তীব্রতর সিপিএম আর বিজেপির মধ্যে। ভোট ফেরানো আর ভোট ধরে রাখার লড়াই। ২০২৪ সালে এই লড়াইয়ে ভাল করলে স্বাভাবিকভাবেই জেলার নিচুতলার কর্মীরা চাঙ্গা হবেন এবং ২০২৬ সালের লড়াইয়ে সেই উৎসাহ রসদ জোগাবে। তবে ভাল করা মানে কিন্তু জেতা নয়, ভোট বাড়ানো।

স্থানীয় বিজেপিতে প্রার্থীকে নিয়ে ক্ষোভ আছে। অনন্যা তালডাংরার মেয়ে হলেও বিবাহসূত্রে থাকেন বাঁকুড়ায়। তাছাড়া কিছুদিন আগের তৃণমূল যোগ একটু হলেও কট্টর বিজেপি সমর্থকদের কাছে অস্বস্তিকর। বাঁকুড়ার তৃণমূল সাংসদ প্রচারে এসে বিজেপি প্রার্থীর গায়ে এখনো তৃণমূলের গন্ধ লেগে রয়েছে বলে কটাক্ষ করেছেন এবং ‘জালি তৃণমূল’ বলে বিঁধেছেন। সুভাষ সরকার বিজেপি সাংসদ থাকাকালীন যে তালডাংরা বিধানসভা ক্ষেত্রের জন্য খুব কিছু করেছেন তাও নয়। বলা যেতে পারে, মনে রাখার মত কিছুই করেননি।

একশো দিনের কাজ অনেক মানুষের একটু ভাল করে বাঁচার অর্থনৈতিক রসদ ছিল। কেন্দ্র-রাজ্য সংঘর্ষে সেই কাজ বন্ধ। অনেকের টাকা আটকে আছে। সুভাষবাবু সেসব নিয়ে সংসদে কোনো কথা বলেননি। অন্তত প্রকৃত জব কার্ড হোল্ডারদের বকেয়া টাকা পাইয়ে দিতেও কোনো ব্যবস্থা নেননি। বাম আমলে আদিবাসী উন্নয়নের লক্ষ্যে গড়ে ওঠা লাম্পসগুলিতে দীর্ঘদিন ভোট হয়নি। স্থানীয় কংসাবতী প্রকল্পেও সেভাবে স্থানীয়দের কাজের সুযোগ নেই। বিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষকের অভাবে ফলে জঙ্গলমহল জুড়ে শিক্ষা ধুঁকছে। সিমলাপাল ব্লকের দুটি জুনিয়র হাইস্কুল বর্তমানে শিক্ষকশূন্য। পান চাষিদের মধ্যেও সরকারি গুরুত্ব না পাওয়ার জন্য ক্ষোভ রয়েছে। কিন্তু নির্ভরযোগ্য বিরোধী নেই, তাই সমস্যা থাকলেও বেশিরভাগ মানুষের কাছে একমাত্র বিকল্প তৃণমূল।

কংগ্রেসের কিছু কিছু এলাকায় ভোট রয়েছে। তার বাইরে কোথাও ভোট পেতে পারে বলে বোধহয় স্থানীয় কংগ্রেস নেতারাও বিশ্বাস করেন না। বরং সিপিএম ভোট বাড়াতে চেষ্টা করছে। মাঠে ময়দানে প্রচারের পাশাপাশি ডিজিটাল প্রচারে জোর দেওয়া হচ্ছে। এমনকি এই ভোটকে সামনে রেখে পার্টি প্রথাগত প্রচার কৌশল থেকে বেরিয়ে একটু ভিন্ন পথে হাঁটছে। সিপিএমের তরফ থেকে তালডাংরার লক্ষ্মীসাগরে ভাইফোঁটার দিন প্রতীকী গণফোঁটার আয়োজন করা হয়েছিল। এই কর্মসূচিতে ধর্ম নির্বিশেষে মেয়েরা ছেলেদের এবং ছেলেরা মেয়েদের ফোঁটা দিয়েছে। স্থানীয় পার্টি নেতৃত্ব মনে করে, রাজ্য এবং দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে মহিলাদের আরও বেশি সুরক্ষা প্রয়োজন। তাই সেখানে প্রচলিত বাক্যবন্ধের সঙ্গে সঙ্গে পার্টির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ‘বোনের কপালে দিলাম ফোঁটা, বিপদের দুয়ারে পড়ল কাঁটা’ বাক্যবন্ধ ব্যবহৃত হয়েছিল। এক সিপিএম যুবনেতার মতে ‘অন্যান্যবার শাসক দলের যারা ভোট করাত তাদের একটা অংশ গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের কারণে নিষ্ক্রিয়। তাই এবার মানুষ, বিশেষ করে শাসকবিরোধী মতাদর্শের মানুষ, চাপ ছাড়াই ভোট দিতে যেতে পারবে এবং তাই সিপিএমের ভোট বাড়বে।’ এই গণফোঁটার আয়োজন সিপিএমের ভোট কতটা ফেরাতে পারবে তা সময়ই বলবে। তবে তৃণমূল শিক্ষক প্রার্থীর বিধায়ক হওয়ার পথে কিছু ছোট ছোট কাঁটা থাকলেও বিধানসভার দরজা বন্ধ করার মত তেমন বড় কাঁটা দেখা যাচ্ছে না।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.