পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর সামনে নতজানু হয়ে বাঁচার আর্জি জানাচ্ছেন জেলা পরিষদে বিরোধী দলের পরাজিত প্রার্থী। ঘটনাস্থল মালদা জেলার বামনগোলা। মিডিয়া মারফত সেই ছবি আমরা প্রায় সকলেই দেখেছি। রাজ্যের অন্য এক জায়গায় গণনায় কারচুপির প্রতিবাদ করায় কান ধরে ওঠবোস করতে হয়েছে অন্য এক বিরোধী দলের মহিলা প্রার্থীকে। রাজ্য পুলিশ, কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতিতেই হয়েছে এসব ঘটনা। ১৪৪ ধারার অজুহাতে একজন বিধায়ককে তাঁর নির্বাচিত এলাকায় ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। তিনি একা যেতে চাইলেও নয়। রাষ্ট্র এভাবেই গণতন্ত্র হত্যা করে চলেছে। সে নীরব নয়, নিষ্ক্রিয় নয়। সক্রিয়, রীতিমত হিংস্র। গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে, স্বৈরতন্ত্রের পক্ষে।

রাজ্যের পঞ্চায়েত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মৃতের সংখ্যা এখনই পঞ্চাশের অধিক, আহত আরও অনেকে। মনোনয়ন পত্র পেশ থেকে ভোট গণনা পর্যন্ত সরকার ও শাসক দলের মেলবন্ধনে একের পর এক বেনিয়ম। শুধু পুলিশ নয়, ব্লক উন্নয়ন আধিকারিকদের একাংশের খোলামেলা দলদাসের মত আচরণে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করা হয়েছে। রাজ্য নির্বাচন কমিশন নাকি স্বাধীন সংস্থা। মানুষের কাছে এর থেকে বড় রাষ্ট্রীয় কৌতুক আর কী হতে পারে? নির্বাচন কমিশন ঘটা করে ভোটদানের মহান কর্তব্য নিয়ে নাগরিকের কাছে প্রচার করে, অবাধ ভোটের আশ্বাস দেয়। সেই আশ্বাস যখন মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়, প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গেলে, ভোটদানের মহান কর্তব্য পালন করতে গেলে মানুষের প্রাণ যায়, মান যায়, সম্পত্তি নষ্ট হয়, তখন কর্তব্যে গাফিলতির জন্য স্বাধীন সংস্থার কার্যত পরাধীন হুকুম মেনে চলা কর্তার শাস্তি হবে না কেন?

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

যে মহিলা নতজানু হয়ে নিরাপত্তা প্রার্থনা করছেন, নিরাপত্তা বাহিনী (রাজ্য পুলিশ বা কেন্দ্রীয় বাহিনী) তাঁর কাছে নতজানু হবে না কেন? নাগরিকের জন্য রাষ্ট্র না রাষ্ট্রের জন্য নাগরিক? সংবিধান প্রত্যেককে সসম্মানে বাঁচার অধিকার দিয়েছে। রাষ্ট্র সেই অধিকার দিতে না পারলে ক্ষমাপ্রার্থী কার হওয়ার কথা? অথচ বাস্তবে উল্টোটাই হয়। যেমন রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা উন্নয়ন পে-লোডার দিয়ে বিরোধী প্রার্থীর দোকান গুঁড়িয়ে দিয়েছে হুগলী জেলার চণ্ডীতলা ১ ব্লকে। সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে, নবাবপুর পঞ্চায়েতের ভগবতীপুরে দুই বিরোধী প্রার্থীর দোকান পে-লোডার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পে-লোডার ব্যবহার করা যে প্রশাসনের মদত ছাড়া সম্ভব নয়, সেটা বুঝতে অসুবিধে হয় না। এই পে-লোডার দিয়েই মাটি চুরি করা মা-মাটি-মানুষের সরকারের আমলে পরিচিত দৃশ্য। চণ্ডীতলায় রাতারাতি এভাবে মাটি চুরি করে জমির চরিত্র বদলে দেওয়া হয়। পঞ্চায়েত, ব্লক ল্যান্ড রেভিনিউ অফিসারের দফতরের যৌথ উদ্যোগে এই অপকম্ম গোটা রাজ্যেরই পরিচিত দৃশ্য। পঞ্চায়েত দখল মানে এই অপকম্মের ক্ষমতা হাতে আসা। তাই তাকে বিন্দুমাত্র চ্যালেঞ্জ করলেই পে-লোডার দিয়ে দোকান গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এমনভাবেই কয়েক বছর আগে দক্ষিণ চব্বিশ পরগণায় বিরোধী দলের লোকের বাড়ি ভাঙার অভিযোগ উঠেছিল।

পঞ্চায়েত নির্বাচন সংক্রান্ত মামলায় কয়েকদিন আগেই কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি বলেছেন, ভোটে জিতলে টাকা আয় করা যায় বলেই এত কিছু হচ্ছে। তাঁর এই পর্যবেক্ষণ যে কতখানি সত্য তা সাধারণ মানুষ হাড়ে হাড়ে জানেন। ঘটনাচক্রে হুগলী জেলারই জাঙ্গিপাড়া ব্লকে রাস্তায় ব্যালট পড়ে থাকার অভিযোগের মামলায় তাঁর এই পর্যবেক্ষণ। চণ্ডীতলা ১ ব্লকের অবস্থান জাঙ্গিপাড়া ব্লকেরই পাশে।।অথচ ভোটের আপাত (কারণ আদালতের নির্দেশে এখনো কোনো ফলাফলকেই চূড়ান্ত বলা যাচ্ছে না) ফলাফল বলছে, চণ্ডীতলা ১ ব্লকের প্রতিটি পঞ্চায়েতই শাসক দল নিরঙ্কুশভাবে দখল করেছে। রাজ্যজুড়ে পরাজিত ও বিজয়ী বিরোধী প্রার্থীদের উপর চলছে অত্যাচার। ত্রিশঙ্কু পঞ্চায়েতগুলিতে অত্যাচার আরও বেশি। পুলিশ প্রশাসন কোথাও নিষ্ক্রিয়, কোথাও আবার শাসকের দাস হয়ে অতি সক্রিয়।

বিরোধীশূন্য করে দেওয়াই এখন দেশজোড়া ক্ষমতার ভাষা। আর সেই ক্ষমতার অন্যতম প্রতীক হল বুলডোজার। উন্নয়নের নামে যা দিয়ে মানুষকে ভিটে থেকে, জীবিকা থেকে উচ্ছেদ করা যায়। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন রাজ্যে এই বুলডোজার দিয়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। দিল্লি, উত্তরপ্রদেশের সেই বুলডোজাররাজ কায়েম হয়েছে আমাদের প্রতিবেশী রাজ্য আসামেও। এখন এই রাজ্যেও তার সদম্ভ পদচারণ।

বিরোধীশূন্য করার কলাকৌশলে বিজেপি, তৃণমূলের কোনো পার্থক্য নেই। প্রধানমন্ত্রী থেকে মুখ্যমন্ত্রীর একই আস্ফালন। প্রধানমন্ত্রী কেন্দ্র ও রাজ্যে ডবল ইঞ্জিন সরকারের কথা বলেন, মুখ্যমন্ত্রী রাজ্য এবং পৌরসভা বা পঞ্চায়েতে ডবল ইঞ্জিনের কথা বলেন। ভোটে হেরেও বিরোধী দলের বিধায়ক কিনে বিজেপি একাধিক রাজ্যে সরকার গড়েছে। তৃণমূলও একই কায়দায় পৌরসভা বা পঞ্চায়েত গড়ছে। জনমতের প্রতি বিন্দুমাত্র সম্মান দেখানোর সহিষ্ণুতা তাদের নেই। বরং বিরোধী দলের জনপ্রতিনিধিকে নিজেদের পক্ষে টেনে আনাই বীরত্ব। জনমতকে অবজ্ঞা করাই সাফল্যের মাপকাঠি। গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে যে তৃণমূল নেতা বিরোধীশূন্য পঞ্চায়েত করলে প্রকাশ্যে আর্থিক পুরস্কার ঘোষণা করেছিলেন, তিনিই এখন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা। তিনি দল বদলেছেন, মত বদলাননি। কারণ দুই দলের নীতি একই। রাজ্যের সংসদীয় রাজনীতিতে এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে?

 

অনেকে দলহীন পঞ্চায়েতের কথা বলছেন। ভোটে হিংসা না হলেই তাকে গণতান্ত্রিক বলা যায় না। ভোটের প্রচার থেকে শুরু করে বোর্ড গঠনে বিপুল পরিমাণ অর্থের খেলা থাকলে আর যা-ই হোক গণতন্ত্র থাকে না। অনেক রাজ্যেই বড় বড় কোম্পানি গ্রামসভা বা জনশুনানি এড়িয়ে জল, জমি, জঙ্গল, খনি দখলের সুযোগ আরও বেশি পায়।

 

রাজ্যের পঞ্চায়েত নির্বাচনের হিংসা নিয়ে নানা বিশেষজ্ঞ নানা মত দিচ্ছেন। একটি পরিচিত ভাষ্য হল, এটি চিরায়ত বা দীর্ঘকালীন সমস্যা। বাম আমলেও হত। মৃত্যুর সংখ্যাতত্ত্ব দিয়ে দেখানো হচ্ছে, আগের থেকে অবস্থা এখন অনেক ভাল। শাসক দল একথা বলবে – এটাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে নানা বৈদ্যুতিন চ্যানেলে টক শোর তর্কযুদ্ধে যুক্তির থেকে অপযুক্তির দরই বেশি। বিচারবোধের চেয়ে বাকচাতুর্য বেশি মূল্যবান। তাতে নাকি টিআরপি বাড়ে। তাই এ রাজ্যের প্রসঙ্গ উঠলেই শাসক দলের প্রতিনিধি আগের বাম রাজত্ব বা বর্তমানের অন্য রাজ্যের তুলনা টানেন। বিরোধী দল তার উলটো। এই তরজায় আড়ালে চলে যায় নাগরিকের অধিকারের কথা। রাজনৈতিক দলের, বিশেষত যারা ভোট রাজনীতির গণ্ডিতে আবদ্ধ, তাদের দলের প্রতিনিধিরা সেটাই করবেন। কিন্তু তথাকথিত নিরপেক্ষ অনেক বিশেষজ্ঞও এসব কথা বলে হিংসাকে বৈধতা দেন। নিরপেক্ষতার এই মুখোশ অতি মারাত্মক বস্তু। ভোট মানেই হিংসা, রাজনীতি মানেই হিংসা। তাই এসবের থেকে দূরে থাকাই ভাল – এমনটাই একদল লোক প্রতিপন্ন করতে চায়।

রাজ্যে ভোট নিয়ে হিংসার সমাজতাত্ত্বিক চর্চাও অনেকে করছেন। বাংলার রাজনীতিতে নাকি এই হিংসার বীজ আছে, অন্য রাজ্যে এসব হয় না। ভোটে হিংসা বা সরাসরি রাজনৈতিক হিংসা না হলে তাকে কি হিংসা বলা যায় না? গুজরাটের গণহত্যা, গোরক্ষার নামে মানুষ খুন কি অহিংস না অরাজনৈতিক? অনেকে দলহীন পঞ্চায়েতের কথা বলছেন। ভোটে হিংসা না হলেই তাকে গণতান্ত্রিক বলা যায় না। ভোটের প্রচার থেকে শুরু করে বোর্ড গঠনে বিপুল পরিমাণ অর্থের খেলা থাকলে আর যা-ই হোক গণতন্ত্র থাকে না। অনেক রাজ্যেই বড় বড় কোম্পানি গ্রামসভা বা জনশুনানি এড়িয়ে জল, জমি, জঙ্গল, খনি দখলের সুযোগ আরও বেশি পায়। কর্পোরেটতন্ত্রের দালালি করে মানুষকে সর্বস্বান্ত করতে দলহীন পঞ্চায়েতগুলোর সুবিধা আরও বেশি। প্রতিরোধ হলেই কর্পোরেটের পক্ষে দাঁড়িয়ে সরকার মানুষের উপর আক্রমণ নামিয়ে আনে। মানুষের পঞ্চায়েত, গণতন্ত্র সেখানেও অধরা।

 

ভোটে হিংসা বা সরাসরি রাজনৈতিক হিংসা না হলে তাকে কি হিংসা বলা যায় না? গুজরাটের গণহত্যা, গোরক্ষার নামে মানুষ খুন কি অহিংস না অরাজনৈতিক?

 

রাজনৈতিক হিংসায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় গরিবের। তাঁদেরই প্রাণ যায় বেশি। বাড়ি বা দোকান ঘর ভাঙে বেশি, কাজ হারানোর ভয় বেশি। তাই অনেকে বলে থাকেন, গরিবদের এতে না জড়ানোই ভালো। গরিব দরদী সেজে গরিবদের দুর্বল করার এর চেয়ে ভাল পথ আর নেই। এবারের ভোটেই এই লেখকের তেমন তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে।

ঘটনাস্থল হুগলী জেলার আরামবাগ মহকুমা। বিরোধী দল থেকে জেলা পরিষদের প্রার্থী হয়েছিলেন টোটোচালক এক যুবক। রাজ্য সড়কের ধারে ছোট মাটির বাড়ি, নিরাপত্তার বিন্দুমাত্র ব্যবস্থা নেই। বিরোধী দলের প্রার্থী বলে রাতে দুষ্কৃতীদের হুমকি হজম করতে হয়েছে। থানা থেকে নির্বাচন কমিশন – কেউ নিরাপত্তা দিতে পারেনি। পুলিশ থেকে মহকুমা শাসকের দফতর একই কথা আউড়ে গেছে – সব প্রার্থীকে নিরাপত্তা দেওয়ার মত বাহিনী নেই। থানা থেকে আবার প্রার্থীকে পাহারা দিতে হবে এমন অর্ডারের কপি চাওয়া হল। প্রার্থীকে নিরাপত্তা দেওয়া যেন পুলিশের স্বাভাবিক কাজের মধ্যে পড়ে না। অর্ডার কপি চাই! তাহলে নির্বাচন কমিশন নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যবস্থা করবে না কেন? দায়িত্বটা প্রার্থীর না নির্বাচন কমিশন ও রাজ্য প্রশাসনের? নিরাপত্তা দেওয়া তো দূরের কথা, পুলিশ প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন কেউই অভিযোগপত্রের প্রাপ্তি পর্যন্ত স্বীকার করেনি। শেষে প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহারে বাধ্য হন। ভোট ঘোষণার কিছুদিন আগেই রাজ্যের শাসক দলের নবজোয়ার যাত্রায় পুলিশি নিরাপত্তায় কিন্তু ওই থানাটি এতটুকু শিথিলতা দেখায়নি। সব নাগরিকের সমানাধিকারের অপূর্ব নিদর্শন। আসলে এসবই আমাদের নাগরিকদের কাছে গা-সওয়া হয়ে গেছে। প্রতিবাদ না করে আমরা এসব মেনেও নিয়েছি।

প্রার্থীর যদি রাস্তার ধারে মাটির বাড়ি না হয়ে পাকা বাড়ি হত, তিনি যদি টোটো না চালিয়ে ভাল চাকরি বা ব্যবসা করতেন, তাহলে হয়ত তাঁকে মনোনয়ন প্রত্যাহার করতে হত না। গরিবকে হাতে ও ভাতে মারা সহজ। তাই ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করার সামর্থ তাঁদের কম। অথচ এই মানুষদের জন্যই পঞ্চায়েত ব্যবস্থা। তাঁরা যদি ভোটেই না লড়তে পারেন, আর্থিক ও সামাজিক প্রতিপত্তিশালীরাই পঞ্চায়েতের মাথা হন, তাহলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। কাজের সুযোগ যত কমে, আর্থিক সংকট যত বাড়ে, রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন তত বাড়ে। রাজনৈতিক ক্ষমতা কুক্ষিগত হয়, পঞ্চায়েত আর মানুষের থাকে না। তখন বিরাজনীতিকরণের কথা বলা মানে স্বৈরাচারকেই স্বীকৃতি দেওয়া। গরিব মানুষ যদি পঞ্চায়েত ভোটেও অংশ না নিতে পারেন, পঞ্চায়েতের মোড়লদের বশংবদ থাকতে বাধ্য হন, তাহলে শ্মশানের শান্তি আসতে পারে। কিন্তু তাকে আর যা-ই হোক গণতন্ত্র বলা চলে না।

আরো পড়ুন জনসংযোগ যাত্রা নয়, জনগণের অধিকার হরণ

গরিব মানুষকে এমনিতেই প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভর থাকতে হয়। পঞ্চায়েত থেকে শুরু করে শাসক দল, সরকারি কর্তাদের প্রজা হওয়াই আজও তাদের ভবিতব্য। প্রকৃতই মানুষের পঞ্চায়েত হলে, গণতন্ত্র থাকলে এই সম্পর্ক অনেকখানি বদলাত। কিন্তু ক্ষমতা এতটুকু রাস্তা ছাড়তে রাজি নয়। রাষ্ট্র, শাসক অসহিষ্ণু হলে রাজনৈতিক উদাসীনতা, রাষ্ট্রের প্রতি সহিষ্ণু হওয়া ফ্যাসিবাদের পথই প্রশস্ত করে। সাধারণ মানুষকে নিষ্ক্রিয় থাকার বদলে এই ক্ষমতার আস্ফালনকেই প্রশ্ন করতে হবে।

পঞ্চায়েত ভোট দেখিয়ে দিল আইনের ফাঁক গলে, আদালতকে ফাঁকি দিয়ে কীভাবে মানুষের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া যায়। কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকার সংবিধান, আইন – সবকিছু অমান্য করার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। ক্ষমতার আস্ফালন এমন চরমে পৌঁছেছে যে, হাসপাতালে সাংবাদিক সম্মেলন করে রাজ্যের শাসক দলের সর্বভারতীয় নেতা বিচারকদের বিরোধিতা করছেন। বিচারকদের আক্রমণ করার এক্তিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তো রয়েছেই। কিন্তু সরকারি হাসপাতাল চত্বরে এমন সাংবাদিক সম্মেলন করার অভব্যতা ক্ষমতারই আস্ফালন। নুন আনতে পান্তা ফুরনো লোকেদের সংবিধান, আদালতের ক্ষমতা, আইন নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় বা সামর্থ নেই। বাস্তবে তাঁরা দেখছেন, শাসক দল যা খুশি তাই করতে পারে। পঞ্চায়েতের মোড়ল আর সরকারি কর্তারাই ক্ষমতা ভোগ করে। আইনকে ফাঁকি দিলেও তাদের শাস্তি হয় না। গণতন্ত্র ভূলুণ্ঠিত।

আসলে প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক কাঠামোয় ভোট দেওয়া ছাড়া গরিবের আর কতটুকু অধিকার আছে? ক্ষমতা পেয়ে সরকার যা খুশি তাই করতে পারে। মানুষের ভোট লুঠ হলেও বাস্তবে কিছু করার থাকে না। পঞ্চায়েতের অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র কথার কথা হয়েই থেকে যায়। ভোটে জেতা মানে দাঁড়ায় পঞ্চায়েতে মাতব্বরির লাইসেন্স পাওয়া। পঞ্চায়েত আইন, গ্রামসভা, গ্রাম সংসদ – এসবের বাস্তবে দাম নেই। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে কামান বসানো থেকে বুলডোজার দিয়ে বিরোধীদের উচ্ছেদ, আদিবাসীর মুখে প্রস্রাব করা থেকে প্রতিবাদী মহিলাকে কান ধরে ওঠবোস করানো – রাষ্ট্রের ক্ষমতার আস্ফালন বাড়তেই থাকে। গরিব মানুষের অধিকার বুঝে নেওয়ার লড়াই ছাড়া গণতন্ত্র আসতে পারে না। সেই লড়াই জয়যুক্ত হলে তবেই রাষ্ট্র প্রত্যেক নাগরিকের সসম্মানে বাঁচার অধিকারকে কুর্নিশ করতে বাধ্য হবে। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী নাগরিককে নিরাপত্তা না দিতে পারলে তার সামনে নতজানু হবে। অধিকার রক্ষা ও আদায়ের সেই লড়াই পারে রাষ্ট্রের এই সর্বগ্রাসী ভূমিকাকে চ্যালেঞ্জ করতে।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.