স্মৃতি বড়ই ক্ষণস্থায়ী। সে নিজে বাঁচতে পারে না, তাকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। রাজনৈতিক পরিসরে তো আরও বেশি করে। একটি ইস্যুর গায়ে আরেকটি ইস্যু আছড়ে পড়ে, তার গায়ে আরেকটি। মানুষ ভুলতে শুরু করেন। প্রতিদিনের জীবনযন্ত্রণায় জীর্ণ, বেঁচে থাকার নিরন্তর সংগ্রামে ক্লান্ত মানুষ ভুলে যান কেমন করে তাঁর গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। অথবা ভোলেন না, কিন্তু সেই নির্জীব মনে রাখা জন্ম রাজনৈতিক প্রতিরোধ প্রসব করতে পারে না।

সচেতন রাজনৈতিক শক্তির কাজ হল জনতাকে তার দুঃসহ বেঁচে থাকার দগদগে স্মৃতিগুলির সামনে প্রতিনিয়ত দাঁড় করানো, মনে করিয়ে দেওয়া। বারবার, নিরন্তর। এই স্মৃতিই সংগঠিত করে আর স্মৃতিকে উস্কে দেয় কর্মসূচি। সঠিক সময়ে সঠিক কর্মসূচি। যে মানুষ শাসকের বন্দুকবাজের সামনে বুক টান করে দাঁড়ান, ঘর পুড়ে যাবে জেনেও যিনি বুথ আঁকড়ে পড়ে থাকেন,  ব্যালটবাক্স লুঠ রুখতে গিয়ে যাঁর প্রিয়জন ঝাঁঝরা হয়ে যান বুলেটে, জয়ী প্রার্থীকে হারিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদ করতে গিয়ে যাঁর গলায় বুলেট লাগে, সেই মানুষগুলির অদম্য লড়াই, নাছোড় প্রতিরোধের পুষ্টির জন্য প্রয়োজন সাহসী কর্মসূচি। সেই কর্মসূচিই প্রাণিত করে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে। যদি কর্মসূচির খাবার না দেওয়া হয় ওই মুখে, অথবা যদি অতিসাবধানী হয়ে কম করে দেওয়া হয়, তাহলে প্রতিরোধের মৃত্যুর সম্ভাবনা বাড়ে অপুষ্টিতে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

গত কয়েকটা দিনে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঠিক যেন চার্লস ডিকেন্সের সেই লাইনগুলির মত। আমরা হয়ত সত্যিই গত কয়েক বছরের সবচেয়ে ভাল সময়ে বাঁচছি, যে সময় একই সঙ্গে সবচেয়ে কুৎসিতও বটে। পঞ্চায়েত নির্বাচন কার্যত প্রহসনে পরিণত হল। ভোটের দিন তো বটেই, গণনাকেন্দ্রেও নির্লজ্জ জালিয়াতি, ভোট লুঠের সাক্ষী থাকল বাংলা। একের পর এক জেতা প্রার্থীকে হারিয়ে দেওয়া হল। ঠিক যেন ২০১৮ সালের ছবি, অথবা তার চেয়েও খারাপ। পথে, ঘাটে, বাজারে, দোকানে সর্বত্র ছিছিক্কার করছেন সাধারণ মানুষ। শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের অনেকেও লজ্জিত। শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় সমেত একাধিক বিধায়ক এই নির্লজ্জ ভোট লুঠের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন। গণনাকেন্দ্রের বাইরে কাঁদতে কাঁদতে জয়ী তৃণমূল প্রার্থী বলেছেন, “এভাবে তো জিততে চাইনি আমি”।

একইসঙ্গে এই পঞ্চায়েত নির্বাচন সামান্য হলেও আশার আলো দেখাচ্ছে বাংলার ধর্মনিরপেক্ষ জনতাকে। একুশের বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকে বিজেপি ক্রমশ শক্তি হারাচ্ছে। গত দুবছরে প্রতিটি নির্বাচনে বিজেপির ভোট কমেছে, ভোট বাড়িয়েছে বাম-কংগ্রেস-ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট শিবির। পঞ্চায়েত নির্বাচনের ফল বলছে, এমন ভোট লুঠের পরেও বাম-কংগ্রেস-আইএসএফ জোটের ভোট ১০% বেড়েছে গত বিধানসভা নির্বাচনের তুলনায়। বিজেপির কমেছে প্রায় ১৫%। আসনের বিচারে বিজেপি এগিয়ে থাকলেও রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় শাসকের সঙ্গে সমানে সমানে টক্কর দিচ্ছেন বাম ও আইএসএফ কর্মীরা। বহু বছর পর এই প্রথম খানিকটা প্রতিরোধ গড়ে উঠছে। কোনো কোনো এলাকায় প্রায় দেড় দশক পর লাল আবির উড়ছে। বস্তুত শাসককে প্রতিরোধ যেটুকু করার, তা বাম-কংগ্রেস-আইএসএফ জোটই করেছে। বিজেপি করেনি।

আরো পড়ুন আমাদের গুলিবৃষ্টির মধ্যে ঠেলে দিল পুলিস

গণনার দিন সিপিএমের একাধিক নেতা, কর্মী, সংগঠকের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তাঁরা জল্পনা করছিলেন পার্টি এই প্রহসনের নির্বাচনের প্রেক্ষিতে ঠিক কী কর্মসূচি নিতে পারে। কেউ বলছিলেন রাজ্যে সাধারণ ধর্মঘট ডাকা উচিত, কারও মত ছিল অনির্দিষ্টকালের জন্য নির্বাচন কমিশনের দফতর ঘেরাও করা দরকার। বাস্তবে কী হল? একটি নিরামিষ মিছিল। যার একমাত্র প্রাপ্তি একুশের বিধানসভা নির্বাচনের আগে হওয়া ব্রিগেডের পর এই প্রথম বাম, কংগ্রেস ও আইএসএফের যৌথ সমাবেশ।

কলকাতায় বামপন্থীরা মাঝেমধ্যে এই ধরনের মিছিল করেই থাকেন। কখনো সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতায়, কখনো কেন্দ্রীয় বা রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে। মিছিলে লোকসমাগম ভালোই হয়। কোনো বহুতলের ছাদ থেকে ছবি তোলা হয়। জমাট ভিড়ের ছবি। কেবল প্রতিবাদটা জমাট বাঁধে না। যাঁদের বিরুদ্ধে লড়াই তাঁদের কিছু যায় আসে না।

সত্যি বলতে, পঞ্চায়েত নির্বাচনের আঁচ কলকাতার রাস্তায় এসে পড়ল না। একটিও অবরোধ হল না, ব্যারিকেড ফাইট হল না, শাসক দলের তাঁবেদার কমিশনের দফতর অবরুদ্ধ হল না। কোনো বড়সড় বিক্ষোভ কর্মসূচিই নেওয়া হল না কোত্থাও। ওই যে বললাম — স্মৃতির আয়ু বড় কম, তাকে বাঁচিয়ে না রাখলে মরে যায়। পঞ্চায়েত নির্বাচনের বীভৎস অভিজ্ঞতার গায়েও ইতিমধ্যেই ধুলো জমতে শুরু করেছে। আগামী সপ্তাহে এই ধুলোর পরত আরও পুরু হবে। তার পরের সপ্তাহে অনেকখানি পিছনে চলে যাবে গলায় গুলি খাওয়া মানুষের মুখ, অর্ধশতাধিক মৃত্যু, নির্বাচনী প্রহসন।

পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ জনতার বড় অংশ এই পঞ্চায়েত নির্বাচনে প্রাণের মায়া ত্যাগ করে প্রতিরোধ করেছেন। কলকাতার কাজ ছিল সেই প্রতিরোধকে পুষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় খাবার জোগানো। তা করা হল না। রাজ্যের বাম নেতৃত্ব কলকাতাকে পথে নামতে বাধ্য করলেন না।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.