অর্ক মুখার্জি

মেদিনীপুর বিধানসভা কেন্দ্র ১৯৫৭ সালে গঠিত হয়েছিল। পশ্চিমবাংলার প্রথম বিধানসভা নির্বাচন, অর্থাৎ ১৯৫২ সালে, এই কেন্দ্র ছিল না। ১৯৫৭ সালে নাড়াজোল রাজবাড়ি থেকে কংগ্রেস প্রার্থী করেছিল অঞ্জলি খানকে। স্থানীয় প্রবীণদের দাবি করেন যে সেইসময় নাড়াজোল রাজবাড়ির মেদিনীপুর অঞ্চলে রীতিমত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব ছিল। এর অন্যতম কারণ হল দেশের স্বাধীনতা আন্দোলন এবং স্বাধীনোত্তর দেশের রাজনীতিতে এই রাজপরিবারের প্রত্যক্ষ ভূমিকা। শিল্প, শিক্ষা এবং সংস্কৃতির চেতনায় এই রাজবাড়ি সত্যিই সমৃদ্ধ ছিল। তাই ১৯৫৭ সালে অঞ্জলি দেবীর জিততে কোনো অসুবিধা হয়নি। অঞ্জলির উদ্যোগেই ১৯৬৬ সালে নাড়াজোল রাজবাড়ির কিছু অংশ জুড়ে নাড়াজোল রাজ কলেজ স্থাপিত হয়েছিল। ১৯৬২ সালের ভোটে কংগ্রেস প্রার্থী বদল করেও জিতেছিল। সেবার কংগ্রেস প্রার্থী হিসাবে জয়ী হয়েছিলেন সামসুল বারি। এরপর মেদিনীপুরের রাজনৈতিক হাতবদল হয়।

দিন যত এগিয়েছে, নতুন ক্যালেন্ডার যত পুরনো হয়েছে, তত মেদিনীপুর জুড়ে লাল প্রভাব বেড়েছে। ১৯৬৭ এবং ১৯৬৯ সালে এখান থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন সিপিআইয়ের কামাখ্যা ঘোষ। ১৯৭২ সালের অস্থির নির্বাচনেও মেদিনীপুর ভরসা রেখেছিল বাম তথা সিপিআই প্রার্থী বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায়ের উপর। তার আগের বছর, অর্থাৎ ১৯৭১ সালের নির্বাচনেও তিনিই জয়ী হয়েছিলেন। ১৯৭৭ সালের ভোটে জনতা পার্টির বঙ্কিমবিহারী পাল জিতলেও ১৯৮২, ’৮৭, ’৯১ – পরপর তিনটে নির্বাচনে জিতে মেদিনীপুরকে সিপিআইয়ের শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত করেছিলেন বিশ্বনাথ। ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালে জেতেন সিপিআইয়ের পূর্ণেন্দু সেনগুপ্ত। ২০০৫ সালের অক্টোবরে পূর্ণেন্দু মারা গেলে সামনে বিধানসভা ভোট থাকায় কোনো উপনির্বাচন হয়নি। ২০০৬ সালে সিপিআই প্রার্থী হন সন্তোষ রানা এবং জেতেন। ২০১১ সালের পালাবদলের ভোটে মেদিনীপুর হাতছাড়া হয় সিপিআইয়ের। ২০১১ এবং ২০১৬ সালের ভোটে তৃণমূল প্রার্থী ছিলেন মৃগেন্দ্রনাথ মাইতি। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে তিনি মারা যান। সামনে বিধানসভা নির্বাচন ছিল বলে সেবারও কোনো উপনির্বাচন হয়নি। ২০২১ সালে প্রার্থী হন অভিনেত্রী জুন মালিয়া। মেদিনীপুর তাঁকে নিরাশ করেনি।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

রাজনৈতিক ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে মেদিনীপুর কেন্দ্রে অতীতে উপনির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি হলেও আগে কখনো উপনির্বাচন হয়নি। এবারই প্রথম।

মেদিনীপুর বিধানসভায় শহরাঞ্চলের পাশাপাশি বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলও রয়েছে। এই বিধানসভায় রয়েছে মেদিনীপুর পৌরসভার ২৫টি ওয়ার্ড, মেদিনীপুর সদর ব্লকের চারটি গ্রাম পঞ্চায়েত – চাঁদরা, ভেরুয়া, কঙ্কাবতী, মণিদহ আর শালবনি ব্লকের পাঁচটি গ্রাম পঞ্চায়েত – কর্ণগড়, গরমাল, সাতপাটি, কাশীজোড়া এবং পাখিবাঁধ। মোট ভোটার ২,৯১,০০০। শহরাঞ্চলের (মেদিনীপুর সদর ব্লক) ভোটার সংখ্যা ১,৫১,০০০; গ্রামাঞ্চলে রয়েছে ১,৪০,০০০।

ঘাসফুল শিবির এবার প্রার্থী করেছে সুজয় হাজরাকে, বিজেপির হয়ে ময়দানে আছেন শুভজিৎ রায়, বাম শিবিরের সিপিআই প্রার্থী মণিকুন্তল খামরুই এবং কংগ্রেস প্রার্থী শ্যামলকুমার ঘোষ।

তৃণমূল প্রার্থী সুজয় তৃণমূলের মেদিনীপুর সাংগঠনিক জেলা সভাপতি। তৃণমূলের এক সূত্রের দাবি, সুজয় একজন দক্ষ ক্রীড়া সংগঠক এবং খেলার মাঠের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ তাঁকে আসন্ন ভোটে আলাদা রাজনৈতিক ফায়দা দেবে। প্রবীণ তৃণমূল নেতা এবং দুবারের বিধায়ক প্রয়াত মৃগেন্দ্রনাথ মাইতির খুব কাছের লোক ছিলেন। জেলা রাজনীতির প্রথম পাঠ তাঁর কাছ থেকেই গ্রহণ করেন। সুজয়ের স্ত্রী মেদিনীপুর পৌরসভার কাউন্সিলর। স্বামীর প্রচারে তিনি বেশ সক্রিয় । তৃণমূল আর জি কর নিয়ে ক্ষোভকে মাথায় রেখে মহিলাদের সামনে রেখে প্রচার করার কৌশল বেছে নিয়েছে। এবার সুজয়ের প্রচারে গ্রামীণ মহিলাদের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। তৃণমূল সাংগঠনিক জোরেই এই উপস্থিতিকে সফল করছে। বিরোধীদের অবস্থা শোচনীয়, তাই মাঠ প্রায় ফাঁকা। আসলে তৃণমূলের কাছে এবারে এক অন্য পরীক্ষা। জয় কি স্বস্তির হবে, নাকি জয়ের মধ্যেও অস্বস্তির কাঁটা খচখচ করবে?

প্রধান বিরোধী বিজেপির প্রার্থী শুভজিৎ দিলীপ ঘোষের অনুগামী বলে পরিচিত। বিজেপির একাংশের দাবি অনুযায়ী, ২০০৪ সাল থেকে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ করেন তিনি। প্রার্থী হয়ে দেখাও করেছেন দিলীপের সঙ্গে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে আবার এক বিজেপি নেতা নান্টু কুইলা নির্দল প্রার্থী হয়েছেন। এমনিতেই মেদিনাপুরে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে জর্জরিত বিজেপি। লোকসভা ভোটের জেতা আসন হারার পর দলের বিভিন্ন নেতার বিরুদ্ধে উপদলীয় কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠেছিল। এমনকি লোকসভা ভোটের পর মেদিনীপুর বিজেপি পার্টি অফিসে লোকসভার ফল এবং ভোটের খরচ নিয়ে আলোচনার সময়ে হাতাহাতিও হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই এ অবস্থায় গ্রামীণ অংশে বিজেপির রাজনৈতিক সংগঠন দুর্বল।

আরো পড়ুন তৃণমূলের অন্দরে অভিষেকের মুঠি শক্ত হল; মোদী ও বামেরা প্রত্যাখ্যাত

একসময় সিপিআইয়ের শক্ত ঘাঁটি হলেও এই এলাকায় সিপিআই এখন বড় দুর্বল এবং ক্ষয়িষ্ণু শক্তি। তৃণমূলের রাজনৈতিক মোকাবিলা করার জন্য ন্যূনতম যে শক্তি দরকার সেটুকুও নেই। জেলা পার্টি অফিসের একটা অংশ ভাড়া দেওয়া রয়েছে প্যাথোলজি কেন্দ্র হিসাবে। মেদিনীপুর শহরে কিছু কর্মী থাকলেও গোটা বিধানসভা এলাকা জুড়ে ভোট করানোর জোর নেই। ভরসা সেই বড় শরিক সিপিএম। তবে সিপিএমের গ্রামীণ অঞ্চলে প্রভাব থাকলেও উপনির্বাচনে সব বুথে লোক বসানোর ক্ষমতা নেই। ভাবতে অবাক লাগতে পারে, কিন্তু নির্মম সত্য হল, ক্ষমতা থেকে অপসারিত হলে রাজনৈতিক স্থবিরতা ও সঠিক চর্চার অভাবে কীভাবে কয়েক বছরের মধ্যেই একটা দলের রাজনৈতিকভাবে কঙ্কাল বেরিয়ে পড়তে তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ মেদিনীপুরের সিপিএম।

অর্থাৎ বিরোধীরা চাপ সৃষ্টি করার জায়গায় নেই। তবু কাঁটার কথা বললাম কেন?

তৃণমূলের অন্দরে কান পাতলেই শোনা যাবে, প্রার্থী সুজয় তৃণমূলেরই ‘অটোমেটিক চয়েস’ নন। জুন অভিনেত্রী হিসাবে রাজনীতিতে যোগদান করলেও তারপর থেকে কিন্তু কেবলমাত্র মুখ হিসাবে রাজনীতি করেননি, জেলা রাজনীতির মাথা হওয়ার চেষ্টা করেছেন। রাজনীতিতে মুখ আর মাথার পার্থক্য অনেক । প্রথমটা কেবল আনুগত্যের সঙ্গে যুক্ত, দ্বিতীয়টা ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে। স্বাভাবিকভাবেই, প্রথমে বিধায়ক, পরে সাংসদ হিসাবে জেলা রাজনীতিতে যত জাল বোনার চেষ্টা করছেন জুন, তত জটিল হচ্ছে সমীকরণ। স্থানীয় রাজনৈতিক বোদ্ধাদের দাবি, সেই সমীকরণ অনুযায়ী মেদিনীপুরের এক গোষ্ঠী জুনের অনুগামী। সেই গোষ্ঠীতে শহর তৃণমূলের পুরপ্রধান এবং তৃণমূল ছাত্র পরিষদের জেলার নেতাও রয়েছেন। তৃণমূলের উপরতলাও এর আঁচ পেয়েছে। তাই ভোটের দায়িত্বে রাখা হয়েছে প্রাক্তন কংগ্রেস এবং প্রবীণ তৃণমূল নেতা মানস ভুঁইয়াকে। সাংসদের ঘনিষ্ঠ নেতারা একটু চুপচাপ। বিরোধীদের দাবি – তৃণমূল প্রার্থীর জমির দালালির সঙ্গে যুক্ত। জুন অবশ্য বিধায়ক থাকাকালীন যথেষ্ট কাজ করেছেন।

তবে সারা রাজ্যের মত এখানে নিয়োগে স্থবিরতা নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে। মেদিনীপুরের বহু যুবক-যুবতী বাম আমলে স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা দিয়ে শিক্ষকতায় ঢুকেছিলেন। এসএসসি প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই ধারায় ছেদ পড়েছে। তাই শহুরে নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভ আছে, কারণ শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়েছে বা কম বেতনে বেসরকারি জায়গায় কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে। অনেকের আবার মেদিনীপুর হাসপাতালে দালাল চক্র এবং অপারেশনের জন্য নার্সিং হোমে ভর্তি করানো ও অন্যায়ভাবে স্বাস্থ্যসাথী কার্ড ব্যবহার করা নিয়ে অভিযোগ আছে। তবে বিরোধীদের আরও মারাত্মক অভিযোগ হল – পুলিস প্রশাসন তৃণমূলকে জেতানোর জন্য সক্রিয়। রাঙামাটিতে সভা করতে এসে বিজেপি নেতা শমীক ভট্টাচার্য বলেছেন ‘এখানে লড়াই তৃণমূলের সঙ্গে নয়, তৃণমূলের পুলিশের সঙ্গে।’ ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের নিরিখে মেদিনীপুর শহরাঞ্চলে তৃণমূল পিছিয়ে ছিল। সেই ঘাটতি ঢেকে দিয়েছিল গ্রামাঞ্চল। বিজেপি এবং তৃণমূল প্রার্থীর মধ্যে ব্যবধান ছিল ২,২০০। এবার তৃণমূল দাবি করছে জয়ের ব্যবধান হবে ৫০,০০০। ২৩ নভেম্বরের ফলে ব্যবধান তার চেয়ে যত কমবে, ২০২৬ সালে জন্য তৃণমূলের অস্বস্তি তত বাড়বে।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.