দীপক গিরি

গত সোমবার (২১ অক্টোবর) নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে জুনিয়র ডাক্তারদের সভার লাইভ স্ট্রিমিংয়ে এ রাজ্যের আমজনতা এক অভূতপূর্ব প্রতিবাদের সাক্ষী রইলেন। আমরা দেখলাম, কী নির্লজ্জভাবে এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হুমকি সংস্কৃতি এবং ধর্ষকদের পক্ষ নিলেন। পাশাপাশি আমরা দেখলাম ডাঃ অনিকেত মাহাতো, ডাঃ কিঞ্জল নন্দ, ডাঃ আসফাকুল্লা নাইয়া এবং ডাঃ দেবাশিস হালদারের তৎক্ষণাৎ বলিষ্ঠ প্রতিবাদ। তুলনা করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না, তবে বর্তমান যদি সমৃদ্ধ অতীতের মশালবাহক হয়, তাহলে রাজ্যবাসী হিসাবে তাঁদের প্রতিবাদের দৃশ্য স্বস্তির কথাই বটে। স্বৈরাচারী শাসকের দুর্গে, প্রবল ক্ষমতাশালী মুখ্যমন্ত্রীর সামনে এমন তীক্ষ্ণ ও জোরালো প্রতিবাদ আমাদের স্মরণ করায় ক্ষুদিরাম বসু, ভগৎ সিং, বিনয়-বাদল-দীনেশদের ঐতিহ্য। সেদিনের মত আজও সাধারণ মানুষের ভরসা তারুণ্যের সাহস, খাপখোলা তলোয়ারের মত স্পর্ধা।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মনে পড়ে যায়, আজ থেকে ৯৫ বছর আগে, ১৯২৯ সালে ভগৎ সিংরা দিল্লির কেন্দ্রীয় আইনসভায় সশব্দ বোমা নিক্ষেপ করে অত্যাচারী ব্রিটিশ সরকার ও তার তাঁবেদারদের সন্ত্রাস ও দখলদারির বিরুদ্ধে বলেছিলেন, ‘বধিরকে শোনাতে উচ্চকণ্ঠের প্রয়োজন।’ সোমবার সেরকমই দুর্জয় সাহসে ও উচ্চকণ্ঠে শাসকের চোখে চোখ রেখে অনিকেতরা মুখ্যমন্ত্রীর অপরাধীদের পক্ষাবলম্বনের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রতিবাদ জানালেন। তারপর থেকেই সোশাল মিডিয়ায় অনিকেতকে কেউ বাঘের বাচ্চা বলছেন, কেউ বাহুবলী বলছেন, ভরিয়ে দিচ্ছেন প্রশংসায়। কয়েকদিন আগে যাঁর নাম কেউ জানতাম না, সেই ছেলেটিই যেন নিপীড়িত আমজনতার প্রতিনিধি হিসাবে তাদের ক্ষোভ বিক্ষোভের কথা তুলে ধরে অত্যাচারী শাসকের সম্মুখে প্রতিবাদ ব্যক্ত করেছেন।

কীভাবে অভয়ার বিচারের দাবিতে গত আড়াই মাসের এই লড়াইয়ে সাধারণ ডাক্তারি ছাত্রছাত্রীদের থেকে সমস্ত স্তরের আমজনতার গভীর আস্থা অর্জন করল অনিকেতদের ওয়েস্ট বেঙ্গল জুনিয়র ডক্টর্স ফ্রন্ট (ডব্লিউবিজেডিএফ)? কীভাবে অনিকেত অনেকের কাছের মানুষ হয়ে উঠলেন? শান্তশিষ্ট ও বিনয়ী স্বভাবের অনিকেত কীভাবে এত বলিষ্ঠতা অর্জন করলেন? এই প্রশ্নগুলো এখন অনেকের মনেই ধাক্কা দিচ্ছে। তবে এ প্রশ্নের একটা উত্তর অনিকেত নিজেই দিয়েছেন। তিনি গত ২২ অক্টোবর এবিপি আনন্দে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন যে অভয়ার বিচারের দাবিতে কোটি কোটি মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন এই আন্দোলনে এক নৈতিকতার জন্ম দিয়েছে। আবার ব্যক্তিগতভাবে এদেশের বড় মানুষ এবং মহাপুরুষদের জীবন চর্চা করে তিনি যে নৈতিকতা অর্জন করেছি তাকে আন্দোলনের সহযোদ্ধাদের মধ্যে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা তিনি করেছেন। এই দুই নৈতিকতার সংমিশ্রণই এমন বলিষ্ঠ ও অকুতোভয় প্রতিবাদের ভিত্তি।

ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেক্ষিতে মহান দেশনায়ক নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর একটি উক্তি আজ খুব প্রাসঙ্গিক বলে মনে হচ্ছে। দেশের যুবক ও ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন, ‘তোমরা হয়তো মনে কর যে মহাপুরুষেরা বড় হইয়াই জন্মান – তাহাদিগকে চেষ্টা করিয়া বা সাধনা করিয়া বড় হইতে হয় না। কিন্তু এ ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। যত মহাপুরুষ আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন তাহাদের জীবন যদি বিশ্লেষণ কর, তাহা হইলে দেখিবে যে প্রত্যেকের জীবনে আছে অসীম অধ্যবসায়, অক্লান্ত চেষ্টা গভীর সাধনা ও অবিরত পরিশ্রম। তোমরা যদি সেরূপ চেষ্টা ও সাধনা করিতে পারো তাহা হইলে তোমরাও একদিন মহাপুরুষের আসনে বসিতে পারিবে…।’ সেদিন ব্রিটিশ শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে হাজার হাজার ছাত্র যুবক ঐতিহাসিক আগস্ট আন্দোলনে, আজাদ হিন্দ বাহিনীর সেনাদের মুক্তির আন্দোলনে ও নৌ বিদ্রোহে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ব্রিটিশরা বিতাড়িত হলেও আপোসহীন সংগ্রামী ধারায় বিশ্বাসী নেতাজি, ভগৎ সিং, আশফাকুল্লা, সূর্য সেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারদের কাঙ্ক্ষিত সর্বাঙ্গীন স্বাধীনতা কিন্তু আসেনি। সাদা জোঁকের পরিবর্তে কালো জোঁক অধিষ্ঠিত হয়েছে মাত্র। ব্রিটিশ শাসনের কায়দাতেই দেশ শাসনে গত ৭৭ বছর ধরে ডান, বাম নির্বিশেষে সব ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার নামে ভয়ের রাজনীতি ও সন্ত্রাস, খুন-ধর্ষণ, ধর্মীয় বিভাজনসহ সমস্তরকম বৈষম্য উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করে চলেছে। প্রত্যেক ভুক্তভোগী জনতা এর প্রতিকার চায়। কিন্তু ভোট দিয়ে এই শোষণ থেকে সর্বাঙ্গীণ মুক্তি সম্ভব নয়। বিচারব্যবস্থার মধ্যেও পক্ষপাতিত্ব, অস্বচ্ছতা এবং শাসকের তাঁবেদারী ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে। ন্যূনতম বিচার পাওয়ার শেষ ভরসাটুকুও নিঃশেষিত হতে চলেছে। এমতাবস্থায় দেশের স্বনামধন্য মেডিকাল কলেজ ও হাসপাতালের মধ্যে কর্তব্যরত মহিলা চিকিৎসকের নৃশংস ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা মানুষের ঘুমন্ত বিবেকের দরজায় আঘাত করেছে।

স্বাধীনতার পর দেশের মানুষ বহু দাঙ্গা ও হত্যাকাণ্ড দেখেছে। মূলত নয়ের দশক থেকে সীমাহীন দুর্নীতি এবং সেই দুর্নীতির সাক্ষ্যপ্রমাণ লোপাট করতে ব্যাপম কেলেঙ্কারির মত একের পর এক হত্যাকাণ্ড এবং সিঙ্গুর, নন্দীগ্রামের মত একাধিক ধর্ষণের ঘটনা দেখেছে। কিন্তু একজন ডাক্তারের কাছে হাসপাতাল তাঁর দ্বিতীয় বাড়ি। সেরকম এক আপাত নিরাপদ জায়গায় ৩৬ ঘন্টা ডিউটির পর ক্লান্ত একজন ডাক্তারকে একদল দুষ্কৃতী ডিউটি রুমের মধ্যে ঢুকে প্রবল আক্রোশে পৈশাচিক শারীরিক ও যৌন নির্যাতন চালিয়ে খুন করতে পারে – এ বুঝি এই দেশের মানুষের কল্পনাতীত ছিল। ৯ অগাস্ট ভোররাতের পাশবিক হত্যাকাণ্ডের পর যদি আর জি কর মেডিকাল কলেজের জুনিয়র ডাক্তার, মেডিকাল-নার্সিং ছাত্রছাত্রী ও হাসপাতালের নার্সিং কর্মচারীদের একাংশ এবং ছাত্রদরদী কিছু শিক্ষক মনুষ্যত্বের আহ্বানে এগিয়ে না আসতেন, তাহলে হয়ত অভয়াকেও একজন আত্মহত্যাকারী হিসাবেই আমাদের চেনানো হত। প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষের নেতৃত্বে কলেজ কর্তৃপক্ষ, পুলিস ও রাজ্য প্রশাসনের পৈশাচিক ষড়যন্ত্রকে বানচাল করে দিয়ে তাঁরা অভয়ার মৃতদেহ আটকে ম্যাজিস্ট্রেট ইনকোয়েস্ট ও ভিডিওগ্রাফির দাবি করেন। অসহায় সদ্য কন্যাহারা বাবা-মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে তারা পুলিস প্রশাসনকে ময়না তদন্তে বাধ্য করেন। এরপর সেদিন সন্ধ্যা থেকে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ‘ব্রেকিং নিউজ’ হয়ে যায় আর জি করের ঘটনা। পরদিন খবরের কাগজে অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষ সহ পুলিস প্রশাসনের কার্যকলাপ এবং প্রমাণ লোপাটের প্রচেষ্টার খবর প্রকাশিত হয়। তৎক্ষণাৎ যেন বছরের পর বছর ধরে মার খাওয়া জনতার বুকের ভিতর জ্বলতে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে।

ফলে অভয়ার বিচারের দাবিতে জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলন একটি সামাজিক আন্দোলনের রূপ নিয়েছে। আন্দোলন যত এগিয়েছে ততই পুলিস প্রশাসন সহ রাজ্যের ক্ষমতাসীন দলের হুমকি সংস্কৃতি এবং সন্ত্রাসের বহিরাবরণ খসে পড়েছে। তারা খোলাখুলিভাবেই অভয়া হত্যাকাণ্ডে যুক্ত দুর্নীতি চক্রের হোতাদের পক্ষ নিয়েছে। ফলে আন্দোলনের মূল দাবির সঙ্গে বেশ কিছু দাবি যুক্ত হয়েছে। যার উদ্দেশ্য, আর কোনো মেয়েকে যেন অভয়া হতে না হয়। অর্থাৎ বিভিন্ন মেডিকাল কলেজ ও হাসপাতালে যেসব হুমকি চক্র গড়ে তুলে শাসক দলের ঘনিষ্ঠ ডাক্তার প্রশাসক, কিছু ডাক্তারি ছাত্র এবং কিছু সিনিয়র ডাক্তার দুর্নীতি ও নানা অপকর্ম চালাত সেগুলির অবসানের মধ্যে দিয়ে কলেজ হোস্টেলগুলোতে সুস্থ, গণতান্ত্রিক, পড়াশোনার উপযুক্ত পরিবেশ এবং হাসপাতালগুলোতে উপযুক্ত চিকিৎসা পরিকাঠামো ও কাজের উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য ডব্লিউবিজেডিএফ রাজ্য সরকারের কাছে দশ দফা দাবি পেশ করে।

দ্বিতীয় অভয়া যাতে না হয় তার প্রাথমিক শর্ত হল ধর্ষণ ও খুনের সঙ্গে জড়িতদের কঠোর শাস্তি। কিন্তু সিবিআই এতদিন তদন্ত করার পর যে চার্জশিট দিয়েছে তাতে গোটা দেশ হতবাক ও ক্ষুব্ধ। সিবিআইয়ের অস্বচ্ছ তদন্তের বিরুদ্ধে প্রথমে ডাক্তারদের, নার্সদের, পরে নাগরিকদের সিজিও কমপ্লেক্স অভিযান বুঝিয়ে দিয়েছে যে অভয়ার ন্যায়বিচারের সঙ্গে কোনোরকম আপোস সংগ্রামী জনতা মেনে নেবে না। ১৭ অক্টোবর ‘জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা’-র উদ্যোগে হাজার হাজার মহিলার মিছিল একথা আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে।

আরো পড়ুন আর জি কর: ভুয়ো খবর ছড়ানোয় সংবাদমাধ্যম, প্রশাসনও দায়ী

অন্যদিকে গত মঙ্গলবার কলকাতা হাইকোর্ট আর জি করে হুমকি সংস্কৃতি চালানোর অপরাধে কলেজ কাউন্সিল কর্তৃক বহিষ্কৃত নেতাদের শাস্তির উপর স্থগিতাদেশ দিয়েছে। তাই ব্যাপক গণআন্দোলন না চালালে যে অভয়ার জন্য ন্যায়বিচার আদায় করা যাবে না, তা আজ দিনের আলোর মত পরিষ্কার। এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই জুনিয়র ডাক্তারদের উত্থাপিত দাবিগুলো সাধারণ মানুষের সমর্থন লাভ করেছে। তাই এই আন্দোলনকে বিভ্রান্ত করতে এবং আন্দোলনকারী জুনিয়র ডাক্তার ও ডব্লিউবিজেডিএফ নেতৃত্বকে কালিমালিপ্ত করতে শাসক দল সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী উঠেপড়ে লেগেছে। কিন্তু এই আন্দোলন কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে গড়ে ওঠেনি। সে অর্থে এই আন্দোলনের নেতৃত্ব অরাজনৈতিক। আবার নেতৃত্বকারী জুনিয়র ডাক্তারদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বিশ্বাস ও মতাদর্শ থাকলেও, তাঁরা এবং আন্দোলনকারী প্রায় সমস্ত জুনিয়র ডাক্তার ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাপিপাসু সমস্ত রাজনৈতিক দলের থেকে এই আন্দোলনকে সঙ্গত কারণেই দূরে রাখতে চেয়েছেন। তাই আন্দোলনকে সংগঠিত ও বিস্তৃত করার লক্ষ্যে তাঁরা ডব্লিউবিজেডিএফ গড়েছিলেন। দীর্ঘ আড়াই মাস নানা জয় পরাজয়, ত্রুটি বিচ্যুতি অতিক্রম করে আজ এই তরুণ ব্রিগেড এক বিকল্প শক্তির জন্ম দিয়েছে। প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যাপক দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়ন যখন নেতাদের গ্রাস করেছে, তখন এই ঘন অন্ধকারের মাঝে সৎ, আদর্শবাদী ও সত্যান্বেষী জুনিয়র ডাক্তারদের উপস্থিতি যেন আলোকবর্তিকা।

নিবন্ধকার পেশায় ডাক্তার। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.