বস্তুত এই সপ্তাহে মধ্যবিত্ত বাঙালি কী করে ডানা মেলে উড়ে আবার বসে পড়ল, এ বিষয়ে আন্দাজ করা কঠিন। আমরা সানন্দে বোধ করছিলাম যে আমরা আবার মহাত্মা গান্ধীর সন্তান বা সুভাষচন্দ্র বসুর দৌহিত্র, কেননা এরকম বলা অনেকেই শুরু করেছিলেন যে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে যেমন জনস্বীকৃত জনউপস্থিতি ছিল, তেমনভাবেই আর জি কর আন্দোলনে আমাদের আবেগ ফেটে পড়েছে। আমার মত সন্দিগ্ধ মানুষের মনে সন্দেহ একটু ছিলই। আমরা যারা এই আন্দোলনকে সমর্থন করেছি, এর সমর্থনে লিখেছি, তাদেরও বারবারই মনে হচ্ছিল যে এই আন্দোলন যতটা এসপ্ল্যানেডকেন্দ্রিক অথবা শ্যামবাজারকেন্দ্রিক ততটা বুঝি গ্রামবাংলায় নেই। কেউ খেয়াল করছে না, মফস্বলে ইটভাটার শ্রমিকও তাতে যোগদান করছে কিনা। অর্থাৎ সোজা কথায়, হাসিম শেখ আর রামা কৈবর্তদের নিয়ে কেউ মাথা ঘামায়নি। আমাদের অনেকেরই আসলে ক্ষোভের কারণ ছিল এই, যে জয়েন্ট এন্ট্রান্স পাস করা ছেলেমেয়েদের এভাবে অপমান করা হবে! এই কালপর্বেই যখন কুলতলির মেয়েটি ধর্ষিত হয়ে খুন হল, তা নিয়ে কিন্তু বাঙালি গায়ক বা দরদি কেরানিরা ততটা প্রতিবাদী হয়ে ওঠেননি, ওঠার প্রয়োজনও বোধ করেননি। একটা আন্দোলন হচ্ছিল এবং সেই উপলক্ষে গানবাজনা, চিত্রনাট্য, নৃত্যনাট্য ইত্যাদি হচ্ছিল।

বলা যেতেই পারে যে আমি বড্ড কঠোর অবস্থান নিচ্ছি। কারণ এটা কি সত্যি নয় যে বহুদিন বাদে বাঙালির বিবেকে একটা চিড় ধরেছিল? তার অপরাধ স্খালন করার অভিপ্রায় জেগেছিল? হয়ত তা ঠিক। কিন্তু একথাও তো ঠিক যে এই জনজাগরণ অভূতপূর্ব – একথা বলা যায় না। কারণ আগেকার সমস্ত জনআন্দোলনে মানুষকে ত্যাগস্বীকার করতে হয়েছে। তাতে আমরা অনেককে শহিদ হতে দেখেছি, অনেকের আর চাকরি হয়নি আন্দোলনে যোগ দেওয়ার অপরাধে। কারণ তখন ‘পুলিস ভেরিফিকেশন রিপোর্ট’ নামে একটা বস্তু ছিল। তার ফলে অনেককে অনেকরকম যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। রাত দখল আন্দোলন দেখার কিছুদিনের মধ্যেই দেখছি, সাইক্লোন ডানা এসে পড়ায় ভোরবেলা বাংলার টেলিভিশন অ্যাংকররা প্রায় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের মহিষাসুরমর্দিনী পরিবেশনের ভঙ্গিমায় ঝড়ের খবর দিচ্ছেন। ফলে বুঝতে পারছি যে আজ সংবাদ মূলত কাব্য তো বটেই, তা আবার বাচিক শিল্পেরও অন্তর্গত। কারণ টিভি চ্যানেলগুলোর তাকে রীতিমত দৃশ্য করে না তুললে চলে না। এ অবস্থায় মনে হয়, আমরা ওই নৈশ বাহুবন্ধন দিয়ে যে প্রতীকী উপস্থাপনা করলাম কদিন, তা কি আমাদের বিশ্বকাপ বা অলিম্পিকের জন্যে নৈশ জাগরণের সঙ্গে তুলনীয় নয়? আমাদের কি এই আন্দোলন করতে গিয়ে বিন্দুমাত্র ব্যক্তিগত ক্ষতি হয়েছে? এমনকি অফিস কাছারি থেকে কোনো সাময়িক ছুটিও নিতে হয়েছে? স্কুল কলেজ সর্বত্রই আমরা তপ্ত ছিলাম এবং ভাবছিলাম যে আমাদের সময় আমাদের কাছ থেকে মূল্য আদায় করে নিল। এখন আমরা নিষ্কলুষ। আমাদের হাতে আর রক্ত লেগে নেই।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

বাঙালি মধ্যবিত্তের এই পতন অনেকদিন ধরেই হচ্ছিল। এখন সে একেবারে খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে। সে যেন ভাবছে যে গয়ায় গিয়ে একবার পিণ্ডদান করে এলেই সমস্ত পাপ দূর হবে। কিন্তু পরিস্থিতি তত সহজ নেই। বরং দেখা গেল, মধ্যবিত্তের এই আন্দোলনে শ্রেণি বিভাজন আরও বেশি। কোনোদিন প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্রছাত্রী, প্রাক্তনীরা পথে বেরোচ্ছেন; কোনোদিন যাদবপুরের। কোনোদিন ডাক্তারদের মিছিল, তো কোনোদিন ইঞ্জিনিয়ারদের মিছিল। কিন্তু এ তো জাতপাত প্রথার মতন পেশাভিত্তিক উর্দি পরা সমর্থন। দেখে ট্যাবলো মনে হয়। বাস্তিল দুর্গের সামনে বা ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময়ে কিম্বা স্বাধীনতার পরে শিক্ষক আন্দোলনের সময়ে, অথবা ছয়ের দশকে আমেরিকার ভিয়েতনাম আক্রমণের বিরুদ্ধে আন্দোলনে এরকম ভাগাভাগি ছিল না। যে লোক ‘ম্যাকনামারা ফিরে যাও’ বলেছিল সে চারুচন্দ্র কলেজ না প্রেসিডেন্সি নাকি যাদবপুরের ছাত্র তা কেউ খোঁজ করেনি। সে প্লাম্বার না ফিটার – কেউ জানতে চায়নি। সে মাস্টার হতে পারে, সে বেকার হতে পারে। কিন্তু তার উত্তোলিত মুষ্টিতে একটা কথাই লেখা ছিল – ম্যাকনামারাকে শহরে ঢুকতে দেব না।

আরো পড়ুন তিলোত্তমার জন্য গণআন্দোলনই সাবির হত্যার বিচার চাইতে পারে

এই যে স্বর, যাকে আমরা জনতার স্বর বলি, তা আমরা অনেকদিন হল পরিত্যাগ করেছি। আসলে নয়ের দশক থেকে আমরা এমন এক সমাজ তৈরি করেছি, যেখানে শ্রেণি আখ্যানগুলো খুব স্পষ্ট। যেমন আমাদের স্কুলগুলো। তার আগের যুগে আমরা যেসব পাড়ার স্কুলে পড়েছি সেগুলো থেকে যেমন ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের ফুটবলার উঠে আসত, তেমন দেশবিখ্যাত সুরকার পাওয়া যেত, আবার জাতীয় বৃত্তি পাওয়া ছেলে, আবার কম্পার্টমেন্টালেও পাস করতে না পারা ছেলে থাকত। মেয়েদের স্কুলগুলোও একইরকম ছিল। কারোর বাবা হয়ত আয়কর বিভাগের বড় অফিসার, কারোর মা হয়ত বাজারে তেলেভাজা বিক্রি করেন। কিন্তু পাড়ার স্কুলে ভর্তি হওয়া নিয়ে ভেদাভেদ ছিল না। অন্তত বেলা দশটা থেকে বিকেল চারটের মধ্যে আমাদের কাউকে বাবা-মা কী করেন সে পরিচয় দিতে হয়নি। আজ রাজ্যে সবমিলিয়ে চার-পাঁচটা প্রতিষ্ঠান আছে যেখানকার ছাত্রছাত্রী না হলে হিসাবের মধ্যেই ধরা হয় না। এমনকি রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে গুরুত্ব পেতেও এখন যাদবপুর বা প্রেসিডেন্সির তকমা লাগে। ওই গোটা পাঁচেক কুলীন প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া যায় স্কুল ছাড়ার পরীক্ষার মেধা তালিকায় খুব উপরদিকে থাকলে বা জয়েন্ট এন্ট্রান্স পাস করলে। প্রায় চার দশক হল, জয়েন্ট এন্ট্রান্স হয়ে দাঁড়িয়েছে এমন এক মানদণ্ড যা দিয়ে আমাদের সমাজের সবকিছু মাপা হয়। নইলে কুলতলির সঙ্গে আর জি করের এত তফাত হয় কী করে? দুটি ঘটনার শিকারই তো বালিকা, তরুণী, মানুষ। কিন্তু মৌখিক বিবৃতি বাদ দিলে আমাদের নম্বর দক্ষিণ ২৪ পরগণার ঘটনায় শূন্য, কলকাতায় লেটার মার্কস। কারণ আমরা জানি যে আমাদের মুখে আলোর ঝলকানি কলকাতায় পড়বে, গ্রামে পৌঁছবে না।

মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, বন্যার জলও শুকায়। মানুষের চোখের জল তো নয়। দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশনের বাঁধ থেকে জল ছাড়া হল, তা শুকিয়েও গেল। হয়ত আর জি করের তাপেই শুকোল। কিন্তু তারপরেই ডানা হাজির হল। আবার হয়ত মিনাখাঁর কোনো প্রত্যন্ত এলাকায় নোনা জল ঢুকে পড়েছে চাষের জমিতে। কিন্তু তা নিয়ে কার মাথাব্যথা? আমাদের তো কেবলই দৃশ্যের কুচকাওয়াজ। আমরা ক্রমশ ছোট থেকে ছোট হচ্ছি। আমাদের স্কুল চার-পাঁচটি, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় দু-তিনটি, আমাদের ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা শেষ করে নিশ্চিতভাবে হয় বাংলার বাইরে যাবে নয়ত দেশের বাইরে যাবে। আমাদের কোনো দায় নেই। আমাদের আন্দোলন মানে অনেকটাই অবসর যাপন। যে বাঙালিকে আমরা উনিশ শতকের ভূপতি বা অমল হিসাবে চিহ্নিত করেছিলাম, সেই বাঙালি এখন শুধু স্বপ্নেই পাওয়া যায়। তারা এখন ইংরিজিতে লিখে পরিত্রাণ পেতে চায়, এমনকি হোয়াটস্যাপেও। তারা মিম তৈরি করে, মন তৈরি করে না। এই বাঙালি মধ্যবিত্তকে জিজ্ঞেস করতে সাধ হয় ‘মিম! মিম! তোমার মন নাই বাঙালি?’

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

3 মন্তব্য

  1. সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় ছাড়া এইরকম নির্মল ও নির্মম সত্য আর কে বলতে পারবেন।

    অমর্ত্যলোক বন্দ্যোপাধ্যায়।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.