তন্ময় ইব্রাহিম
কথায় আছে, গাধায় পানি ঘোলা করে খায়। কেন্দ্রের সংশোধিত ওয়াকফ আইন নিয়ে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের সরকারের অবস্থাও সেইরকম বলে মনে হচ্ছে। মাসের পর মাস রাজ্যের মুসলমান সম্প্রদায়কে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি আশ্বাস দিয়েছিলেন যে পশ্চিমবঙ্গে তিনি ওয়াকফ আইনের সংশোধনী, যা নিয়ে এপ্রিল মাস জুড়ে রাজ্যে মুসলমানরা আন্দোলন করেছিলেন, সাম্প্রদায়িক অশান্তিও হয়েছিল, প্রয়োগ করতে দেবেন না।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
সেইসময় কেন্দ্রীয় সরকার নতুন সংশোধনীর নিয়মাবলী অনুসারে ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সমস্ত চিহ্নিত ওয়াকফ সম্পত্তির রাজ্যভিত্তিক নথিভুক্তির নির্দেশ দেয় কেন্দ্রীয় পোর্টাল উম্মীদ-এ। কিন্তু যেহেতু মমতা আশ্বাস দিয়েছিলেন যে ওয়াকফ আইনের সংশোধনী তিনি পশ্চিমবঙ্গে প্রয়োগ হতে দেবেন না (যা আদতে ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় অসম্ভব), সেহেতু রাজ্যের প্রশাসন হাত গুটিয়ে বসেছিল এবং এই রাজ্যের যাবতীয় ওয়াকফ সম্পত্তি, যেমন মসজিদ, মাদ্রাসা, কবরস্থান, ইয়াতিমখানা প্রভৃতির দায়িত্বে থাকা মুতওয়াল্লিদের এই কাজ সম্পর্কে অবগত করা হয়নি।
হঠাৎ গত সপ্তাহে, ২৭ নভেম্বর, রাজ্য সরকারের টনক নড়ে। তখন রাজ্যের সমস্ত জেলাশাসকের কাছে এই মর্মে নির্দেশ পাঠানো হয়। বলা হয়, অবিলম্বে ওই পোর্টালে সমস্ত সম্পত্তি নথিভুক্তকরণের প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।

পশ্চিমবঙ্গ ওয়াকফ বোর্ডের তথ্য অনুসারে, রাজ্যে ৮,০৬৩টি ওয়াকফ এস্টেট আছে; ৮২,৬১৬টি ওয়াকফ সম্পত্তি রয়েছে। এর মধ্যে ৮৮টি ওয়াকফ এস্টেট যেহেতু বোর্ড সরাসরি পরিচালনা করে, তাই ওগুলি বাদ দিয়ে বাকি সবার তথ্যই সরকারি পোর্টালে নথিভুক্ত করতে হবে।
নতুন সংশোধিত আইন অনুসারে, যে মুতওয়াল্লিরা (সম্পত্তির দেখাশোনা করা লোক) এই তথ্য আপলোড করবে, তাদের সম্পত্তির সমস্ত কাগজপত্র তো বটেই, আইনি বিবাদ সংক্রান্ত তথ্যও আপলোড করতে হবে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মুতওয়াল্লি হন মসজিদের ইমাম বা মাদ্রাসার মৌলানা। তাঁদের তথ্যপ্রযুক্তি সংক্রান্ত জ্ঞান সীমিত বলেই সম্প্রদায়ের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। সুতরাং ছমাস সময় থাকতে যদি মমতা সরকার এই কাজ করে ফেলার কথা বলত, তাহলে এতদিনে রাজ্যের সমস্ত ওয়াকফ সম্পত্তি নথিভুক্ত হয়ে যেত। তার জায়গায় এক সপ্তাহ সময় দেওয়ায় এই পর্বতপ্রমাণ কাজ শেষ করা যে এক মাসে এসআইআর করার চেয়েও কঠিন, তা বলে দিতে আলাদা করে গবেষণা করার দরকার পড়ে না। এই এক সপ্তাহের মধ্যে আবার জেলাশাসকদের সমস্ত মুতওয়াল্লিদের সঙ্গে বৈঠক করে তাদের এই বিষয়ে ওয়াকিবহাল করারও কথা।
প্রশাসনিক কর্তারা নির্দেশ পাওয়ার পর থেকে নানা জেলায় দায়সারাভাবেই কাজটি সারছেন, সমস্যায় পড়েছেন মুতওয়াল্লিরা। অর্ধেকের বেশি মুতওয়াল্লি তাঁদের কর্তব্য কী – সে বিষয়ে ওয়াকিবহাল নন। এমন অনেক ওয়াকফ সম্পত্তিও আছে, যার দলিল এবং অন্যান্য নথিপত্র জোগাড় করা অসম্ভব। ফলে ২৬ নভেম্বর পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের মাত্র ২.৯৮% ওয়াকফ সম্পত্তি (এস্টেট ও সম্পত্তি মিলিয়ে মোট ২,৪৬৫টি) নথিভুক্ত হয়েছে।

মনে রাখা দরকার, নথিভুক্তিকরণ মানে হল এই সম্পত্তির প্রাথমিক তথ্য সংরক্ষণ। কোনো সম্পত্তি আদৌ ওয়াকফ কিনা, তা নিয়ে পরবর্তীকালে সিদ্ধান্ত হওয়ার এবং সম্পত্তির চরিত্র বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকছে। কিন্তু যে কাজ মে মাস থেকেই রাজ্যজুড়ে শুরু করা দরকার ছিল, কারণ কেন্দ্রের আইনকে রাজ্য অমান্য করতে পারে না, তা কোনো এক অজ্ঞাত কারণে মুখ্যমন্ত্রী আটকে রাখলেন ছমাস। কাজ শুরুর নির্দেশ দেওয়া হল যখন হাতে আর এক সপ্তাহ সময়ও নেই। এই এক সপ্তাহে কি ৯৭% সম্পত্তি নথিভুক্ত করা সম্ভব, যখন গত ছমাসে ৩% নথিভুক্তিও হয়নি?
ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্ট এই নথিভুক্তির সময়সীমা বৃদ্ধি করার আর্জি নাকচ করেছে। কারণ আইন অনুযায়ী সেই আর্জি করা যেতে পারে একমাত্র এর জন্যে গঠিত ট্রাইব্যুনালের কাছে, আর মুতওয়াল্লিদের তা করতে হবে কারণ দর্শিয়ে, অর্থাৎ কেন সময়সীমার মধ্যে তাঁরা তাঁদের সম্পত্তি নথিভুক্ত করেননি। এক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের মুতওয়াল্লিরা কী বলবেন? মুখ্যমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছিলেন বলে কাজটা করিনি? তা বলারও উপায় নেই, কারণ মুখ্যমন্ত্রী কোনো সরকারি নির্দেশিকা জারি করে আশ্বাস দেননি। এই আইন এ রাজ্যে প্রয়োগ হবে না বলে কোনো বিজ্ঞপ্তিও রাজ্য সরকার দেয়নি। শাসক দলের নেত্রী হিসাবে মমতা কী মন্তব্য করেছেন, তা তো আর সরকারি কাজে গণ্য হয় না।
ঠিক যেমন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন, বাংলাদেশ থেকে আগত সমস্ত অমুসলমানকে নাগরিকত্ব দেবে নরেন্দ্র মোদীর সরকার। কিন্তু আসলে নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন, ২০১৯ অনুসারে নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্য মাত্র ৩১,৩১৩ জন। সুতরাং অসংখ্য মতুয়া-নমঃশূদ্র উদ্বাস্তু আইনত দাবি করতে পারেন না যে শাহ বলেছিলেন বা শুভেন্দু অধিকারী বলেছিলেন বলেই তাঁদের ভারতের নাগরিকত্ব পাওয়া উচিত।
ঠিক তেমন এখন বিশ বাঁও পানিতে পড়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানরা। যদি ৯০ হাজারের বেশি সম্পত্তির নথিভুক্তি না হয়, তাহলে প্রত্যেক মুতওয়াল্লিকে ট্রাইব্যুনালের কাছে আবেদন করতে হবে। সেখানেও সমস্যা। প্রথমত, কীভাবে আবেদন করতে হবে সে ব্যাপারে তাঁরা অবগত নন এবং রাজ্য প্রশাসন এ ব্যাপারে দারুণ উদ্যোগী বলেও জানা যাচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, আবেদন গৃহীত হবে কি হবে না তা নির্ভর করে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের উপর। এর ফলে অনিশ্চিত থেকে যাচ্ছে অসংখ্য চিহ্নিত ওয়াকফ সম্পত্তির ভবিষ্যৎ। সেগুলো নথিভুক্ত না হলে, বা কোনো কাগজে গন্ডগোল থাকলে, একদিন সেই সম্পত্তি সরকার অনায়াসে অধিগ্রহণ করে ফেলতে পারে। সুপ্রিম কোর্টে এ বিষয়ে আইনজীবী কপিল সিবাল বলেছেন যে, লক্ষ লক্ষ মুতওয়াল্লি আবেদন করলে সেই আবেদন খতিয়ে দেখে সময়সীমা বৃদ্ধি করার কাজ করতেই অনির্দিষ্টকাল লেগে যাবে।
কিন্তু বিপদের এখানেই শেষ নয়।
পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিপদ হল, অনেকের কাছে ওয়াকফ সম্পত্তি আছে, কিন্তু তার দলিল নেই। অনেকে আবার অবগত নন যে তাঁরা ওয়াকফ সম্পত্তি ব্যবহার করছেন বা তাতে বাস করছেন। অনেক মুতওয়াল্লি জানেন না যে সম্পত্তিটি কীভাবে ওয়াকফ হয়েছিল বা দেড়শো-দুশো বছর আগের দলিল কোথায় আছে। যেসব জেলায় বছর বছর বন্যা হয়, সেখানে বহু আগেই অনেকের সম্পত্তির কাগজ হারিয়ে গেছে।
আরো পড়ুন ওয়াকফ সংশোধনী মুসলমান পরিচয় নিশ্চিহ্ন করার ছকের অংশ
১৯৬২ সালের দাঙ্গার পরে এ রাজ্যের সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়ের অনেকে দেশ ছেড়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পাড়ি দেন। সেইসময় তাঁদের অনেকেই নিজের সম্পত্তি নিকটাত্মীয়কে দিয়ে যান। যদিও তাঁরা সজ্ঞানে সেই সম্পত্তিকে ওয়াকফ ঘোষণা করেননি, কিন্তু বহু জায়গায় এইসব সম্পত্তি পরবর্তীকালে ওয়াকফের রূপ নেয়। এগুলিকে নথিভুক্ত করার কোনো ব্যবস্থা নেই। সম্পত্তি যাঁদের নামে আছে, তাঁদের অনেকেই এর মিউটেশন করাতে পারেননি। ফলে এই সম্পত্তি এখন শত্রু সম্পত্তি চিহ্নিত হয়ে সরকারের দখলে চলে যেতে পারে। তার ফলে অনেক জায়গায়, বিশেষ করে মালদা, মুর্শিদাবাদ, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার প্রভৃতি জেলায় এই সম্পত্তি দখল নিয়ে অশান্তি সৃষ্টি হতে পারে।
এখানে উল্লেখ্য, গ্রামাঞ্চলে এমন অনেক সম্পত্তি কিন্তু বর্তমানে সংখ্যাগুরু হিন্দুদের হাতে চলে গেছে। যেহেতু কেন্দ্রীয় সরকার কয়েক বছর আগে শত্রু সম্পত্তি আইন সংশোধন করে ‘রেট্রোস্পেক্টিভ’ করে দিয়েছে, সেহেতু পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটতে কেন্দ্র বা রাজ্য – কেউই পিছপা হবে না। হিন্দু হোক বা মুসলমান, সম্পত্তি হারাবে। মসজিদ-মাদ্রাসা নয়, ওয়াকফ সম্পত্তিতে জনবসতি গড়ে ওঠায় নানা জায়গায়, বিশেষ করে উত্তরবঙ্গে, অসংখ্য মানুষের উচ্ছেদ হওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল। এই সম্পত্তি নিমেষে বড় রিয়েল এস্টেট সংস্থার করায়ত্ত হতে পারে, এমন আশঙ্কাও অনেকে করছেন।
ওয়াকফ সম্পত্তির অনেকটাই যে শত্রু সম্পত্তি হিসাবে চিহ্নিত হতে পারে, সে বিষয়ে এই রাজ্যের মুসলমান চিন্তাবিদরা অনেকেই সাবধান করে এসেছেন। কিন্তু রাজ্যের মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিপত্তি এবং মুখ্যমন্ত্রীর চমকের রাজনীতির ফলে অধিকাংশ মুসলমানই বুঝতে অপারগ যে কীভাবে এই ওয়াকফ আইনে সম্পত্তি নথিভুক্তি প্রক্রিয়া বানচাল করে রাজ্য সরকার তাঁদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করার পথ প্রশস্ত করেছে।
ফলে ওয়াকফ আইনের প্রয়োগ ঘিরে রাজ্যে নতুন অশান্তির আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। পরবর্তীকালে এই নিয়ে ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতিও তীব্র হয়ে উঠতে পারে।
নিবন্ধকার ইস্ট পোস্ট (ইংরিজি) ওয়েবসাইটের সম্পাদক। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








