আর জি কর কাণ্ডে প্রথম থেকেই সোশাল মিডিয়ায় ভুয়ো এবং অর্ধসত্য খবরের বন্যা বয়ে গেছে। ‘১৫০ গ্রাম বীর্য’ থেকে ‘পুলিসের চাপে ধর্না চত্বরের প্যান্ডেল খোলা’ পর্যন্ত রাশি রাশি ভুয়ো খবর ছড়িয়েছে এই আন্দোলন পর্বে। ভুয়ো খবর ছড়ানোর অভিযোগে তলব, গ্রেফতারিও হয়েছে। আইন অনুযায়ী সেটাই পুলিসের কর্তব্য। আর জনগণ হিসাবে সচেতন হয়ে খবর পড়া, বোঝা এবং তা অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়াও নাগরিক কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। কিন্তু ভুয়ো খবরের মতই এই ‘কর্তব্য’ ব্যাপারটিও সাদায় কালোয় দেখা উচিত নয়।
প্রথমত বলে নেওয়া ভাল যে ‘ভুয়ো খবর’ (fake news) শব্দবন্ধটি অনেকটা সোনার পাথরবাটির মত। সাংবাদিকতার প্রথম পাঠই হল – যাচাই করা সত্যনিষ্ঠ তথ্যই খবর। কাজেই তথ্যই যদি ভুয়ো হয়, তাহলে তা খবরই নয়। আর শুধু খবর বা খবরের কাগজ, চ্যানেল বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমেই ভুয়ো তথ্য ছড়িয়ে পড়ে তা নয়। সুবিশাল সোশাল মিডিয়া তথ্য পরিবেশনে যেমন গণতান্ত্রিকতা এনেছে, তেমনই বিপদও ডেকে এনেছে। যাঁর যা ইচ্ছে সোশাল মিডিয়ায় লিখে দিতে পারেন। তা যাঁর মনে ধরবে, তিনি তা অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারেন। এই প্রক্রিয়ায় আপাতভাবে সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা প্রায় নেই। কাজেই ভুয়ো তথ্য মানেই ভুয়ো খবর নাও হতে পারে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
তার মানে অবশ্য এই নয়, যে সংবাদমাধ্যম ভুয়ো তথ্যের পরিবেশ তৈরি করতে কোনো ভূমিকাই নেয় না। সাংবাদিকরাই বরং সোশাল মিডিয়ার রটনাকে খবরের আকারে জনগণের সামনে নিয়ে আসেন। সোশাল মিডিয়ার তথ্যে জল থাকলে, সেই জল নতুন মাত্রা পায় সংবাদমাধ্যমের গুণে। যেমন কোনো ভাইরাল ভিডিও নিয়ে খবর করেও একটি ডিসক্লেমার লিখে দেওয়া – এই খবরের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি। যদি সত্যতা যাচাই করা না হয়ে থাকে, তাহলে সেই ভিডিও দেখানো কেন বা তা নিয়ে খবর প্রকাশ করা কেন?
অন্যদিকে একথা অস্বীকার করার উপায় নেই, সংবাদমাধ্যমে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য ও মতামতের মধ্যে লক্ষ্মণরেখাটি অস্পষ্ট হয়ে যাওয়ায় সংবাদমাধ্যমও তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কারণে বস্তুনিষ্ঠ খবর এখন কোনো বিশেষ পক্ষের দিকে হেলে গিয়ে মতামত যুক্ত খবরে পরিণত হচ্ছে। তাই কোনটা সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যমের মতামত আর কোনটি আসল তথ্য তা সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা দুষ্কর হয়ে যায়।
এত তথ্যের ভিড়ে কোনটি সত্যি তথ্য, কোনটি মিথ্যা আর কোনটি অর্ধসত্য – তা মালুম করা পেশাদার সাংবাদিকদের পক্ষেই কঠিন কাজ। কাজেই সাধারণ মানুষ কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই কোনটি ভুয়ো তথ্য তা বুঝে ফেলবেন, এ আশা করা উচিত নয়। তাছাড়া নিজের মতের সঙ্গে মিললেই সেই তথ্যকে বিশ্বাস করে নেওয়ার সহজাত প্রবণতা আমাদের সকলেরই আছে। অনেকে আবার সরল মনে যা দেখেন সবই বিশ্বাস করে নেন এবং সরল মনেই তা সবার মধ্যে ছড়িয়েও দেন। কোনো কোনো সরলমতি ব্যক্তির ধারণা – এমনটাই কর্তব্য।
কাজেই আর জি কর কাণ্ডে ‘গণধর্ষণ’ হয়ে থাকতে পারে আর হয়েছে – এর মধ্যে তফাত করতে করতেই এই তথ্য ছড়িয়ে পড়ে যে ময়না তদন্তের রিপোর্টে ‘১৫০ গ্রাম বীর্যের’ সন্ধান পাওয়া গেছে। ব্যাস, দুয়ে দুয়ে চার। একজন মানুষের শরীর থেকে ১৫০ গ্রাম বীর্য নিঃসৃত হতে পারে না। সুতরাং রটে গেল, নিশ্চয়ই এটি গণধর্ষণের ঘটনা। যাঁরা ওই তত্ত্বে বিশ্বাস করেন, তাঁরা টুপ করে এই তথ্যেও বিশ্বাস করতে শুরু করলেন। কে এই তথ্য দিল, কোথা থেকে এই তথ্য এল – অত খোঁজার দায়িত্ব ও সময় সাধারণ মানুষের কোথায়? যতক্ষণে এই তথ্য সামনে এল, যে ওই ওজন ময়না তদন্তের রিপোর্টে যোনির ওজন হিসাবে উঠে হয়েছে, ততক্ষণে ১৫০ গ্রাম বীর্য সোশাল মিডিয়ায় ছেয়ে গেছে।
এমনটা বরাবরই হয়, যে যাচাই করা তথ্য সোশাল মিডিয়ায় অনেক পরে আসে (কারণ যাচাই করতে সময় লাগে) এবং তা যতখানি প্রচারিত হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি লোকের কাছে ভুয়ো খবরটি পৌঁছে যায়। এটি শুধু ভুল বোঝা বা জানার ব্যাপার নয়। কেউ কেউ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেও ভুল তথ্য বাজারে ছাড়েন, যাতে বিপক্ষকে বিপাকে ফেলা যায়। যেমন পশ্চিমবঙ্গের প্রধান বিরোধী দল বিজেপির নেতা অমিত মালব্য বাংলাদেশের সরকারবিরোধী আন্দোলনের জমায়েতের ছবি দিয়ে দাবি করেছিলেন এটি পশ্চিমবঙ্গের। ওরকম একটি মিছিল কলকাতাতেও হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ছবিটি কলকাতার নয়। এটি ইচ্ছাকৃত ভুল, নাকি উদ্দেশ্য প্রণোদিত, তা অমিতই বলতে পারবেন। কিন্তু এভাবেই ভুয়ো তথ্য ছড়াতে থাকে সোশাল মিডিয়ায়।
আবার সিবিআইয়ের কলকাতা শাখা থেকে একজন ডিআইজি পদমর্যাদার অফিসার আর জি কর কাণ্ডে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে সিবিআইয়ের প্যাডেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকে চিঠি পাঠিয়েছেন বলে সোশাল মিডিয়ায় একটি ছবি ছড়িয়ে পড়েছিল। পরে জানা গেল, ওরকম কোনো অফিসারই নেই সিবিআই কলকাতায়।
যে কোনো বড় ঘটনার পরেই এই ধরনের ভুয়ো খবর ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা থাকে। এ নিয়ে সাধারণ নাগরিকদের যেমন সচেতন থাকতে হয়, তেমন পুলিস ও প্রশাসনও তাদের দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারে না।
আর জি কর কাণ্ডে মৃতার পরিবারকে কলকাতা পুলিস প্রথমে আত্মহত্যার কথা জানিয়ে ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। নানা আলোচনায় বিশিষ্টজনেরাও এই তথ্য উল্লেখ করতে থাকেন। কিন্তু কলকাতা পুলিস একথা মৃতার পরিবারকে জানায়নি, জানিয়েছিলেন আর জি কর মেডিকাল কলেজের কোনো এক কর্মী। কলকাতা পুলিস এই তথ্য ছড়ানোর দায়ে অনেককে নোটিস পাঠায় এবং সোশাল মিডিয়ায় জানায় যে তারা আত্মহত্যার তত্ত্ব মোটেই দেয়নি। কিন্তু কে দিয়েছিলেন, সে তথ্য তারা নিজের মুখে বলেনি।
আরো পড়ুন তীব্র মেরুকরণ হওয়া সমাজে ফ্যাক্ট চেকিং যথেষ্ট নয়: প্রতীক সিনহা
অন্যদিকে প্রথম থেকেই কলকাতা পুলিসের বিরুদ্ধে তদন্তে অস্বচ্ছতার অভিযোগ ছিল। কাজেই সাধারণ মানুষও একটা সময়ের পর তাদের কথা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। যেমন সেদিন ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর আর জি কর হাসপাতালের সেমিনার রুমে কারা কারা উপস্থিত ছিলেন, তা দেখাতে একটি ছবি নিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করেন কলকাতা পুলিসের ডিসি (সেন্ট্রাল)। তিনি ছবিতে চিহ্নিত করে বলেন কারা কারা ছিলেন। কিন্তু পরে দেখা গেল, একটি উলটো তথ্যও সংবাদমাধ্যমের হাতে এসেছে। হিসাব মত কলকাতা পুলিসের মত একটি বড় প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যকেই সত্যি বলে মানার কথা। কিন্তু তা সম্ভব হল না। বিভ্রান্তি তৈরি হল।
কাজেই পুরো তথ্য সামনে আনা এবং সত্য তথ্য বেশি করে প্রচার করা পুলিস ও প্রশাসনের কাজ। কিন্তু তারা যদি পুরো তথ্য সামনে না আনে, তাহলে ভুয়ো, অর্ধসত্য খবর ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা বাড়ে। যেমন এখন পর্যন্ত এতগুলো সাংবাদিক সম্মেলন, কলকাতা হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের শুনানি সত্ত্বেও কলকাতা পুলিসের তদন্তের টাইমলাইন স্পষ্ট হল না। কখন আর জি কর চত্বরে কলকাতা পুলিসের আউটপোস্টে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ খবর দিলেন, কখন টালা থানা খবর পেল, কখন জেনারেল ডায়েরি হল, কতগুলো জেনারেল ডায়েরি হল, কখন এফআইআর হল – এসব নিয়ে অস্পষ্টতা আজও কাটেনি।
স্বাস্থ্য ভবন চত্বর থেকে জুনিয়র ডাক্তারদের অবস্থান তুলে দিতে পুলিস হুমকি দিয়ে প্যান্ডেল খুলিয়ে দিচ্ছে – এই ভুয়ো খবরকে অবশ্য জুনিয়র ডাক্তার ও পুলিস – দুপক্ষই নস্যাৎ করেছে সঙ্গে সঙ্গেই। কিন্তু তথ্যের আদানপ্রদানে যদি স্বচ্ছতা না থাকে, কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা যদি কমে যায় – সে মূলধারার সংবাদমাধ্যমই হোক বা সরকারি প্রতিষ্ঠান – তাহলে ভুয়ো খবর আরও বেশি করে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।
এই ডিজিটাল যুগে তথ্যের ব্যাপকতা সাধারণ মানুষকে বিচলিত করেই। তাঁরা নিজেরাই বুঝতে পারেন না, কোনটি বিশ্বাস করবেন আর কোনটি করবেন না। আবেগের উপর ভরসা করে প্রতিক্রিয়া জানান। সেই প্রতিক্রিয়ার বশেই ভুল বা অর্ধসত্য খবর ছড়িয়ে ফেলেন চারিদিকে। সেখানে প্রতিষ্ঠানের উপর বিশ্বাস তৈরি করা এক মস্ত বড় কাজ। এমন প্রতিষ্ঠান যার কথা বিশ্বাস করতে পারে মানুষ। তথ্য আদানপ্রদানে স্বচ্ছতা সেখানে আবশ্যিক শর্ত।
সাধারণ নাগরিকদের সঙ্গে সঙ্গে সংবাদমাধ্যম ও প্রশাসনকেও সেই দায়িত্ব নিতে হবে।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








