রুবেল সেখ

একসময় মুর্শিদাবাদকে গোটা পশ্চিমবঙ্গে চিনত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাতিঘর হিসাবে। এই জেলার গ্রাম-শহরে মানুষ ধর্মীয় বিভেদ ভুলে একত্রে চলত, উৎসবগুলি ছিল মিলনমেলা। একদিকে নবাবি রাজধানীর ঐতিহ্য, অন্যদিকে স্বাধীনতা সংগ্রামের লড়াই – দুয়ে মিলে মুর্শিদাবাদের ইতিহাস দাঁড়িয়ে আছে অনন্য ঐক্যের ভিতের উপর। মাস্টারদা সূর্য সেন, কমলচাঁদ পাণ্ডে, ত্রিদিব চৌধুরী, রেজাউল করিমদের মত প্রগতিশীল নেতৃত্ব ও সমাজসংস্কারকের হাত ধরে এই জেলা বহুদিন ধরে দাঁড়িয়েছিল সাম্প্রদায়িক ঐক্যের প্রতীক হয়ে। হিন্দু-মুসলমান মিলিত সংগ্রামের ভিতরেই মুর্শিদাবাদের সামাজিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময়ে গোটা বাংলায় যখন দাঙ্গার আগুন জ্বলছিল, তখনো মুর্শিদাবাদের বহু গ্রামে মানুষ একে অপরকে আশ্রয় দিয়েছিল। হিন্দু পরিবার মুসলমান প্রতিবেশীর ঘরে রাত্রি কাটিয়েছে, মুসলমান পরিবার হিন্দু বাড়িতে লুকিয়ে থেকেছে দাঙ্গার হাত থেকে বাঁচতে। এই মানবিকতার ইতিহাসই ছিল মুর্শিদাবাদের প্রকৃত গৌরব।

কিন্তু সময়ের স্রোতে রাজনৈতিক চরিত্র পাল্টেছে। আজকের রাজনীতি আর সম্প্রীতির রাজনীতি নয়, এটি বিভাজনের রাজনীতি। ক্ষমতার লোভে, রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য বারবার ছড়ানো হয়েছে বিভেদের বিষবীজ। জাতপাত, ধর্মের নামে মানুষের মনে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে সন্দেহ ও অবিশ্বাস। এর ফলে যে মাটিতে একদিন উৎসব মানেই ছিল মিলনমেলা, সেই মাটিতেই এখন রাজনীতির কৃত্রিম আগুনে ছড়িয়ে পড়ছে হানাহানি ও বৈরিতা। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির গর্বিত ঐতিহ্য যেন ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে আমাদের চোখের সামনে। গত কয়েক বছরে একাধিকবার সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা ঘটেছে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ক্রমবর্ধমান সাম্প্রদায়িক বিভাজনের সবচেয়ে সাম্প্রতিক এবং ভয়ঙ্কর নিদর্শন গীতারাম হাসপাতালের ঘটনা। জেলার অন্যতম বড় বেসরকারি হাসপাতাল, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ রোগী মুসলমান সমাজ থেকে আসেন। এমন একটি হাসপাতালে আড়াই বছর নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার পর শুধুমাত্র ধর্মীয় পোশাক পরিধানের কারণে নার্স সারমিন বানুকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার খবর পেলাম আমরা। একটি গণতান্ত্রিক দেশে, যেখানে ধর্মীয় স্বাধীনতা সংবিধানপ্রদত্ত মৌলিক অধিকার, সেখানে শুধুমাত্র পোশাকের কারণে কারোর চাকরি যাওয়ার ঘটনা কেবল লজ্জাজনক নয়, ভয়ঙ্কর এবং বিপজ্জনকও বটে।

প্রশ্ন উঠছে, এটি কি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা? নাকি এটি আমাদের পচন ধরে যাওয়া সমাজের নগ্ন রূপ? হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জনমতের চাপে ক্ষমা চেয়েছে এবং সারমিন বানুকে ফিরিয়েছে। কিন্তু ক্ষমা চাওয়া সমস্যার সমাধান নয়। কারণ যে মানসিকতা থেকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তা তো আর রাতারাতি বদলে যায়নি। আসল বিপদ সেইখানে। সেটিই নিঃশব্দে ধ্বংস করছে মুর্শিদাবাদ জেলার সম্প্রীতির ঐতিহ্য। এই ঘটনা মুর্শিদাবাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার গভীর সংকটকেও প্রকট করল। সরকারি হাসপাতালের অব্যবস্থা, ডাক্তার-নার্স-যন্ত্রপাতির অভাব, অবহেলা – সব মিলিয়ে মানুষ বাধ্য হয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে যায়। অথচ সেখানেই যদি ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে চাকরি খোয়াতে হয়, তবে এ কেবল একজন নার্সের অপমান নয়, বরং গোটা সমাজকে সাম্প্রদায়িক আগুনের দিকে ঠেলে দেওয়ার নোংরা চক্রান্ত।

এই অবস্থার জন্য দায়ী কারা? কেবল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নয়। দায় এড়াতে পারে না সরকারও – না কেন্দ্র, না রাজ্য।

কেন্দ্রীয় সরকারের ‘সব কা সাথ, সব কা বিকাশ’ স্লোগান যে কথার কথা, তা তো এতদিনে আমরা জেনেই গেছি। সংবিধানের মৌলিক অধিকারকে পদদলিত করে যে ধর্মীয় বিদ্বেষ গোটা দেশে ছড়ানো হচ্ছে, তা কেন্দ্র শুধু নীরবে দেখছে না, বরং রাজনৈতিকভাবে উস্কেও দিচ্ছে। গীতারাম হাসপাতালের ঘটনা সেই বৃহত্তর রাজনীতিরই প্রতিফলন। কেন্দ্রীয় সরকার বারবার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও সমানাধিকারের প্রশ্নে গাফিলতি করে চলেছে। গীতারাম হাসপাতালে এক নার্স অপমানিত হলেও, আচরণটি গোটা দেশের ধর্মনিরপেক্ষতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের উপরেই আঘাত।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারও দায় এড়াতে পারে না। রাজ্যের শাসক দল মুখে ধর্মনিরপেক্ষতার বুলি আওড়ালেও বাস্তবে তারা নীরব দর্শকের ভূমিকা নিয়েছে। স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিপর্যয়, বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের লাগামহীন দৌরাত্ম্য – এসব নিয়ন্ত্রণ করার ন্যূনতম রাজনৈতিক সদিচ্ছাও দেখা যাচ্ছে না। গীতারাম হাসপাতালের ঘটনা রাজ্যের চোখে ধুলো দেওয়ার মত অঘটন নয়, এটি স্পষ্ট করে দেয় যে সরকার আসলে সমস্যা এড়িয়ে যেতে চাইছে। প্রশাসন কঠোর অবস্থান নেবে, এই ভয় যদি থাকত, তাহলে কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এভাবে সংবিধানবিরোধী কাজ করতে সাহস করত না।

আরো পড়ুন ভারতীয় সংবাদমাধ্যম সাম্প্রদায়িক বিভাজন সৃষ্টি করতে চাইছে

মাস্টারদা, কমলচাঁদ পাণ্ডে, ত্রিদিব চৌধুরী, রেজাউল করিমরা যে সম্প্রীতির মুর্শিদাবাদ গড়ে দিয়েছিলেন, সে জেলা আর নেই। আজ তাঁদের উত্তরসূরিরা দেখতে পাচ্ছে উল্টো ছবি, যেখানে একজন নার্সকে শুধুমাত্র তাঁর ধর্মীয় পোশাকের কারণে অপমানিত হতে হয়। এই চিত্র আসলে রাজনৈতিক শূন্যতারই প্রতিফলন। প্রশ্ন উঠছে, মুর্শিদাবাদ কি তবে সাম্প্রদায়িক ঐক্যের বাতিঘর থেকে ধীরে ধীরে সাম্প্রদায়িকতার আঁতুড়ে পরিণত হচ্ছে?

আমাদের মনে রাখতে হবে, মুর্শিদাবাদ জেলার ইতিহাস বিভেদের নয়, ঐক্যের। এই জেলার প্রাণশক্তি একসময় হিন্দু-মুসলমানের মিলিত সংগ্রামে নিহিত ছিল। তাই এই ঘটনার প্রতিবাদ করা কেবল মানবিক কর্তব্য নয়, জেলার ঐতিহ্যরক্ষার সংগ্রামও বটে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ক্ষমা চাওয়ায় সমস্যার কোনো দীর্ঘমেয়াদি সুরাহা হল মনে করলে ভুল হবে। প্রয়োজন কঠোর সামাজিক প্রতিরোধ, প্রয়োজন প্রশাসনিক পদক্ষেপ, প্রয়োজন কেন্দ্র ও রাজ্য – উভয় সরকারের জবাবদিহি। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন জনগণের ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠস্বর। কারণ আজ যদি আমরা নীরব থাকি, আগামীদিনে আর কোনো সারমিন বানু নয়, গোটা সমাজকেই ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে অপমানিত হতে হবে।

নিবন্ধকার রাজনৈতিক কর্মী। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.