লড়াইটা রাহুল গান্ধীর একার নয়। লড়াইটা শুধু বিহারকে ঘিরেও নয়। লড়াইটা শুধু মাত্র অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা খেদানো নিয়ে নয়। এই লড়াই শুধু ভিনরাজ্যে বাঙালিদের হেনস্থা বন্ধ করার জন্যও নয়। ভোট চুরির যে অভিযোগ উঠেছে, তা নিয়ে লড়াইটা অনেক বৃহত্তর। ভোটার তালিকায় গরমিলের যেসব তথ্য গত মাসখানেকের বেশি সময় ধরে উঠে আসছে, তাতে ভোট চুরির অভিযোগ ঘিরে লড়াই ভারতের প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলেরই হওয়া উচিত, আর সেই লড়াই তৃণমূল স্তর থেকেই হওয়া উচিত। তার অনেকগুলি কারণ রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক হিসাবে আমরা প্রত্যেকেই কমবেশি ভুয়ো ভোটার, ছাপ্পা ভোট ইত্যাদি বিষয়ে অবগত। সেসব ক্ষেত্রে সাধারণত অভিযোগ ওঠে রাজ্যের শাসক দলের বিরুদ্ধে। কিন্তু এ পর্যায়ে যে অভিযোগ কংগ্রেস দলের নেতা এবং লোকসভার বিরোধী দলনেতা তুলছেন তার তির মূলত নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
একদিকে রাহুল অভিযোগ করেছেন কর্ণাটকের মহাদেবপুরা বিধানসভা এলাকায় লাখ খানেকের বেশি ভুয়ো ভোটারের নাম ভোটার তালিকায় তোলা হয়েছিল। এটি বেঙ্গালুরু সেন্ট্রাল লোকসভার কেন্দ্রের মধ্যে পড়ে। ঘটনাচক্রে এই বিধানসভা আসনে ভোটের ব্যবধান বেশি থাকায় এই লোকসভা কেন্দ্রটিতে বিজেপির প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। এরপর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমও রাহুলের অভিযোগ যাচাই করতে নেমে দেখিয়েছে যে ভোটার তালিকায় গোলমাল রয়েছে। তালিকায় দেওয়া ঠিকানা দেখে সেই জায়গায় গিয়ে তালিকাভুক্ত ভোটারের খোঁজ মেলেনি।
অন্যদিকে বিহারের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের কাজে নেমে প্রায় ৬৫ লাখ ভোটারকে অবৈধ ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন খানিক বিপদেও পড়েছে। সেখানেও দেখা গেছে, জীবিত ভোটারকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছে। মূলত পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর নাগরিকদেরই ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই ধরনের অভিযোগ মহারাষ্ট্র নিয়েও তুলেছিলেন রাহুল। সেখানেও ভোটার তালিকায় ভুয়ো ভোটার রয়েছে বলে অভিযোগ।
কোনো ক্ষেত্রেই অভিযোগ নস্যাৎ করতে গিয়ে নির্বাচন কমিশন খুব শক্তপোক্ত প্রমাণ খাড়া করেনি। বরং সম্প্রতি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সাংবাদিক সম্মেলনের বক্তব্য শুনে মনে হচ্ছিল কোনো সাংবিধানিক সংস্থার প্রধানের বক্তব্য শুনছি না, বরং তাঁর কথার ঝাঁজ একজন রাজনৈতিক নেতার মত। দুটি ক্ষেত্রেই অভিযোগ প্রমাণের দায় অভিযোগকারীর দিকেই ঠেলে দিয়েছে কমিশন।
বিহারের ক্ষেত্রে অবশ্য সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে খানিকটা পিছু হঠতে বাধ্য হয়েছে। যেমন ভোটার তালিকায় নাম তোলার ক্ষেত্রে বা নাম বাদ পড়লে তার আবেদন পত্রের সঙ্গে ১১টি নথির উপর আধার কার্ডও নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে শীর্ষ আদালত। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশিকায় আধার কার্ডের উল্লেখ ছিল না।
অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশেই নির্বাচন কমিশন বিহারের খসড়া ভোটার তালিকা, যে ভোটারদের থেকে আবেদনপত্র জমা পড়েনি তার তালিকা, ১২টি স্বীকৃত রাজনৈতিক দলের জেলা সভাপতিদের হাতে তুলে দিয়েছে। এতদিন পর্যন্ত সেই তালিকা কারোর হাতে দিচ্ছিল না তারা। ওয়েবসাইটেও তারা ভোটার তালিকা তুলছিল না। এখন অবশ্য সেই তালিকা ওয়েবসাইটেও পাওয়া যাচ্ছে।
এইসব গরমিল নিয়ে লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী, রাষ্ট্রীয় জনতা দলের নেতা তেজস্বী যাদব এবং সিপিআই(এমএল) লিবারেশন সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টচার্যরা বিহারের রাস্তায় নেমে ভোট অধিকার যাত্রা করছেন। এমনকি তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী, ডিএমকে নেতা এম কে স্ট্যালিনও এসে পা মিলিয়েছেন। কিন্তু আরও তৃণমূল স্তরের কর্মীদের এই ‘অধিকার’ সম্পর্কে প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। তালিকায় যে কোনো গরমিল দেখলেই সেই প্রশিক্ষিত রাজনৈতিক কর্মীদের দিয়েই শুরু করা প্রয়োজন।
আরো পড়ুন দিনদুপুরে ভোট ডাকাতি?
সুপ্রিম কোর্ট গত ২২ অগাস্টের অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশে একটি বিশেষ কথা উল্লেখ করেছে। বিহারে ১,৬০,০০০ বুথ লেভেল এজেন্ট বা বিএলএ-র কাজের কথা বলা হয়েছে। এই বিএলএ হল রাজনৈতিক দলগুলির এজেন্ট, যাঁরা বুথ স্তরে দলগুলির হয়ে কাজ করেন। সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, যদি এই এজেন্টরা দিনে দশজন করে বাদ যাওয়া ভোটারের নাম মিলিয়ে দেখেন তাহলে প্রতিদিন ১৬ লাখ ভোটারের নাম যাচাই হয়ে যাবে। তাঁরাই তখন অনলাইনে বা ব্লক লেভেল অফিসারদের কাছে ফর্ম জমা দিয়ে আপত্তির কথা জানাতে পারবেন।
এই বুথ স্তরের রাজনৈতিক এজেন্ট বা কর্মীরা ভারতের নির্বাচন প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু না নির্বাচন কমিশন, না রাজনৈতিক দল, এঁদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেয়। যদিও রাজনৈতিক দলগুলি বুথ স্তরের কমিটি গড়ার কথা প্রায়শই বলে, কিন্তু সব দলের পক্ষে প্রতিটি বুথ ধরে ধরে সংগঠন গড়া সম্ভব হয় না। যদিও বা সম্ভব হয়, যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাবে এই কর্মীবাহিনি আসল কাজটি করে উঠতে পারে না।
তবে এখানে একটি কথা বলে নেওয়া দরকার। নির্বাচন কমিশন যদি গোড়াতেই ঠিক করে নেয় যে নির্বাচন প্রক্রিয়া অস্বচ্ছ হবে, তাহলে এই বুথ স্তরের এজেন্টরা কোনোদিনই তাঁদের কাজ ঠিকমত করতে পারবেন না। যদি নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকাই এই এজেন্টদের হাতে না দেয়, তাহলে সঠিক ভোটার, ভুয়ো ভোটার, মৃত ভোটার ইত্যাদি চিহ্নিত করার কাজ তাঁরা করবেন কীভাবে? এই সেদিন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকার ডিজিটাল কপি দিতেই টালবাহানা করছিল।
এই এজেন্টরা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাঁরা স্থানীয় বাসিন্দা। তাঁরা নিজেদের এলাকায় প্রত্যেকটি বাড়ির ভোটারদের চিনবেন – এমনটাই প্রত্যাশিত। সুতরাং কে মৃত আর কে রাজ্যের বাইরে কাজ করতে গেছে বলে বাড়িতে নেই, তা তাঁরা ভালই বলতে পারবেন।
এই বিশেষ নিবিড় সংশোধনের কাজের মূল নির্দেশ ছিল – বুথ লেভেল অফিসার (বিএলএ) বা তাঁর বাহিনি প্রত্যেক ভোটারের বাড়ি গিয়ে ভোটার তালিকা মিলিয়ে দেখবেন। কিন্তু এই কাজটি এত কম সময়ের মধ্যে করা কমিশনের পক্ষেও কঠিন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, কমিশনের তৃণমূল স্তরের কর্মীরা এই কাজ করতে হিমশিম খাচ্ছেন। অথচ উপরতলার নির্দেশকে অমান্যও করতে পারছেন না। ফলে সময়সীমার মধ্যে এই কাজ করতে তাঁদের নাভিশ্বাস উঠেছে। স্বাভাবিকভাবেই এই ভোটার তালিকা পরিমার্জনের কাজ করতে গিয়ে অনেক ভুলত্রুটি থেকে যাচ্ছে।
তার উপরে অনেক অফিসার আবার বুথের রাজনৈতিক এজেন্ট তো দূর, ভোটারদের আপত্তিও গ্রাহ্য করছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। ইতিমধ্যেই আমরা দেখেছি, জীবিত ভোটাররা কেমন করে মৃত হয়ে গেছেন নির্বাচন কমিশনের তালিকায়। কত ভুয়ো ভোটারের নাম উঠে গেছে সেই তালিকায়। আবার আসল ভোটারের নাম বাদ চলে গেছে তালিকা থেকে। হয়রান হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
প্রতিবছরই শেষদিকে ভোটার তালিকা পরিমার্জনের কাজ করে থাকে নির্বাচন কমিশন। তারপর প্রত্যেক জানুয়ারিতে খসড়া তালিকা প্রকাশ হয়। সেই তালিকা দেখে কেউ তাঁর আপত্তির কথা জানাতে পারেন। সেখানে এই রাজনৈতিক দলগুলির এজেন্টরাও পরিমার্জনের কাজে হাত লাগান। এলাকার মৃত ব্যক্তিদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া, নতুন ভোটারের নাম তালিকায় যুক্ত করা, যিনি এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন, তাঁর নাম বাদ দেওয়া – এইসব কাজগুলি প্রতিবছরই হয়। শেষে খসড়া তালিকা থেকে কারোর নাম অকারণে বাদ চলে গেলে তিনি আবেদন জানাতে পারেন।
কিন্তু বিশেষ নিবিড় তালিকা সংশোধনের কাজ মাঝে মাঝে হয়। বোঝাই যাচ্ছে, বিহারে এই সংশোধনের কাজে এবার রাজনৈতিক দলের এজেন্টদের সেভাবে যুক্ত করা হয়নি। ফলে তালিকা তৈরির কাজটি অস্বচ্ছ রয়ে গেছে। কারোর কাছে কোনো সঠিক তথ্য এসে পৌঁছয়নি। তার আগেই প্রায় ৬৫ লাখ ভোটারের নাম বাদ চলে গেছে। নতুন ভোটারদের নামও অনেক জায়গায় বাদ পড়ে গেছে এই খসড়া তালিকা তৈরির সময়ে।
এই ৬৫ লাখের মধ্যে সবাই তো আর বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা নন। এঁদের অনেকে মৃত হতে পারেন বা নিজের বাসস্থান বদল করে থাকতে পারেন। কিন্তু যেরকম অভিযোগ ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন আসছে, তাতে পরিষ্কার যে অনেকের নামই উপযুক্ত কারণ ছাড়াই বাদ দেওয়া হয়েছে।
এই সংশোধনের পর্বে যেসব নথি ভোটারদের কাছে চাওয়া হয়েছে, তা অনেক গরিব, অন্য রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া নাগরিকের কাছে না-ও থাকতে পারে। জুলাই মাস থেকে যে বিশেষ নিবিড় সংশোধনের কথা বলা হয়েছিল, সেই নির্দেশিকায় উল্লেখ রয়েছে যে বুথ স্তরের অফিসাররা প্রত্যেকটি বাড়িতে গিয়ে তালিকায় থাকা ভোটারদের Annexure C ফর্মটি দেবেন। এটি অনলাইনেও ডাউনলোড করা যাবে। তার একটি অংশ ভোটারকে দিয়ে দিতে হবে সই করে, অন্য অংশটি অফিসার নিজের কাছে রাখবেন। সেই ফর্মের উপর ভিত্তি করেই খসড়া তালিকা তৈরি হবে। নতুন নাম যুক্ত করতে হলে বা কেউ অন্যত্র চলে গিয়ে থাকলে ফর্ম ৬ বা ৮-এর সঙ্গে আলাদা করে Annexure D-র মাধ্যমে হলফনামা জমা দিতে হবে।
শেষবার বিহারে ২০০৩ সালে এই বিশেষ নিবিড় সংশোধনের কাজ হয়েছিল। এবারে বলা হয়েছে, ২০০৩ সালের ১ জানুয়ারি যাঁদের নাম ভোটার তালিকায় ছিল, তাঁদের কোনো অতিরিক্ত নথি জমা দিতে হবে না, তবে ফর্ম পূরণ করতে হবে। কিন্তু তারপর যাঁদের নাম যুক্ত হয়েছে, তাঁদের নিচের ১১টির মধ্যে কোনো একটি নথি জমা দিতে বলা হয়েছিল।
১। কেন্দ্রীয় সরকার/রাজ্য সরকার/রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার কর্মচারী/অবসর ভাতাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে দেওয়া পরিচয়পত্র/পেনশন দেওয়ার আদেশপত্র
২। সরকার/স্থানীয় কর্তৃপক্ষ/ব্যাংক/ডাকঘর/জীবন বিমা/রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার দেওয়া ১.৭.১৯৮৭ তারিখের আগের যে কোনো পরিচয়পত্র/শংসাপত্র/নথি
৩। উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের ইস্যু করা জন্মের শংসাপত্র
৪। পাসপোর্ট
৫। স্বীকৃত বোর্ড/বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাট্রিকুলেশন/শিক্ষাগত যোগ্যতার শংসাপত্র
৬। উপযুক্ত রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের ইস্যু করা স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার শংসাপত্র
৭। জঙ্গলের অধিকারের শংসাপত্র
৮। উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের ইস্যু করা ওবিসি/তফসিলি জাতি/তফসিলি উপজাতি বা অন্য কোনো বর্ণের শংসাপত্র
৯। জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (যেখানে প্রযোজ্য, বিহারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়)
১০। রাষ্ট্রীয়/স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তৈরি পারিবারিক রেজিস্টার
১১। সরকারের জমি/বাড়ি বরাদ্দ করার শংসাপত্র
কিন্তু আধার কার্ডের উল্লেখ ছিল না।
দেখুন SIR নিয়ে আমাদের পডকাস্ট
এমন অনেকেই আছেন যাঁদের কাছে এই নথিগুলির একটিও থাকা সম্ভব নয়। যাঁরা বিহারের সাম্প্রতিক বন্যার কারণে ঘরছাড়া, ত্রাণশিবিরে রয়েছেন, অন্য রাজ্যে কাজ করতে গেছেন বা দিনমজুর – তাঁরা অনেকেই এসব জমা দিতে পারবেন না। অথচ যে আধারের সঙ্গে পৃথিবীর সমস্ত নথি যোগ করার কথা বলা হয়ে থাকে, সেই আধারকে স্বীকৃতি দিতেই রাজি ছিল না নির্বাচন কমিশন। এমনকি তাদেরই দেওয়া ভোটার পরিচয়পত্রও তারা মানতে রাজি নয়। কমিশনের উদ্দেশ্য কখনো ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হতে পারে না। বৈধ ভারতীয় নাগরিক যেন ভোটার তালিকায় যুক্ত হতে পারে, তার ব্যবস্থা করাই কমিশনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। কিন্তু এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন ভোটারদের উপরেই নিজের বৈধতা প্রমাণের দায় চাপিয়ে দিয়েছে। এমনিতে পশ্চিমবঙ্গের মত রাজ্যে শাসক দলের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকায় ভুয়ো ভোটারের নাম তুলে রাখার অভিযোগ ওঠে। এবার সেই অভিযোগ উঠছে নির্বাচন কমিশনের উপর। টি এন শেষনের সময় থেকে যে নির্বাচন কমিশনের উপর সাধারণ মানুষের আস্থা বেড়েছে, তা হঠাৎ এই জমানায় এসে কমতে থাকলে ভারতীয় গণতন্ত্রের পক্ষে মোটেই সুখকর নয়।
কিন্তু আবার সেই প্রসঙ্গে আসব, যে ভোটার তালিকায় জল মেশানো থাকলে তা ধরার দায়িত্ব কিন্তু বুথ স্তরের রাজনৈতিক কর্মী বা এজেন্টদেরই। তাঁরাই এলাকার প্রতিটি ভোটারকে চিনবেন। এই যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, তাদের এজেন্টকে ভোটের দিন বুথ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তা এই ভুয়ো ভোটার ধরতে না দেওয়ার জন্যই করা হয়।
কারণ বুথের ভিতরে বসা এজেন্টদের কাজ হল, প্রত্যেক ভোটারকে তালিকা দেখে মিলিয়ে নেওয়া। তারপরে তাঁরা ভোট দিতে পারেন। ভুয়ো ভোটার হলে এই এজেন্টরাই আপত্তি করবেন। প্রিসাইডিং অফিসার তখন সেই আপত্তির যথার্থতা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। নির্বাচন কমিশনের থেকে আগেই ভোটার তালিকা পেলে (আইন অনুযায়ী প্রত্যেক প্রার্থীকে ভোটার তালিকা দিতে নির্বাচন কমিশন বাধ্য) ভুয়ো ভোটার নিয়ে আগে থেকেই আপত্তি তুলতে পারেন রাজনৈতিক দলের এজেন্টরা। কমিশন সেই পরিসর কমিয়ে দিয়েছে বলে অভিযোগ।
শুধু তাই নয়। এই পোলিং এজেন্টদের ভোটের শুরুতে ইভিএম ঠিকমত কাজ করছে কিনা তাও যাচাই করে দেখার কথা। তাঁরা সই করার পরেই সেই ইভিএম দিয়ে ভোটগ্রহণ শুরু হবে। প্রতি ঘন্টায় প্রিসাইডিং অফিসার জানিয়ে দেবেন কত শতাংশ ভোট পড়ল। তার উপর নজর রাখতে পারবেন পোলিং এজেন্টরা। তাঁরা মিলিয়ে দেখবেন নিজেদের হিসাবে সঙ্গে প্রিসাইডিং অফিসারের হিসাব মিলছে কিনা। ভোটগ্রহণ শেষে সমস্ত হিসাব মিলিয়ে সব পোলিং এজেন্টদের সামনেই প্রিসাইডিং অফিসারকে ইভিএম সিল করতে হয়। সেখানে সব পোলিং এজেন্টের সই লাগে।
দুর্ভাগ্যের বিষয়, এই পোলিং এজেন্টরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বুঝতে পারেন না রাজনৈতিক রেষারেষি ছাড়া তাঁদের আর ঠিক কী করা উচিত। সকালের দিকে থাকলেও, একটু বেলা বাড়তেই এই এজেন্টরা উৎসাহ হারিয়ে বা শক্তিশালী দলের কর্মীদের তাড়া খেয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়ান। ফলে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির সুযোগ বাড়ে।
অন্যদিকে ইভিএমে গণ্ডগোলের যে অভিযোগ নির্বাচন কমিশনের দিকে বারবার উঠে থাকে, তার মোকাবিলাতেও কাউন্টিং এজেন্টদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা পোলিং এজেন্টদের সই করা সংখ্যার সঙ্গে প্রত্যেকটি ইভিএমে ধরে রাখা ভোটের সংখ্যা মিলিয়ে নেবেন। গরমিল থাকলেই আপত্তি জানাবেন। এক্ষেত্রেও নিজেদের প্রার্থী ভোটগণনার সময়ে পিছিয়ে পড়ছে দেখলেই কাউন্টিং এজেন্টরা কাউন্টার ছেড়ে চলে যান। ফলে সেখানেও দুর্নীতির সুযোগ ছেড়ে যান তাঁরা। অথচ এই বুথ স্তরের এজেন্টরাই ভোট প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হতে পারেন। তাঁরাই ধরতে পারেন যে প্রক্রিয়ার মধ্যে কোনো গোলমাল আছে কিনা। তাঁদের কাজই হল স্থানীয় নেতৃত্বকে জানান দেওয়া যে ইভিএমে গড়বড় আছে। তা সম্ভব ভোটগণনার সময়েই। যদিও অনেক সময়েই অভিযোগ ওঠে যে এজেন্ট তো দূরস্থান, স্থানীয় গণনা আধিকারিকরা সেই আসনের প্রার্থীর আপত্তিকে পাত্তাই দেন না।
কিন্তু নির্বাচন কমিশন যদি এই এজেন্টদের বা রাজনৈতিক দলগুলিকেই এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত না করেন, রাজনৈতিক নেতাদের তোলা অভিযোগের যথাযথ প্রমাণ ছাড়াই জবাব দেন বা ইভিএমের ভিতরেই কোনো একটি দলের পক্ষে ভোট চলে যাওয়ার অভিযোগকে যথাযথভাবে খণ্ডন করতে না পারেন; সর্বোপরি দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে বেছে নেওয়ার কমিটিতে সরকারি সদস্য সংখ্যা বাড়ানো হয় এবং দেশের প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয় – তাহলে তো নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে সন্দেহ দানা বাঁধবেই।
এইভাবে নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা ও স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তার মোকাবিলা কমিশনকেই করতে হবে। প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলকেই দেখতে হবে যে এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বৈধ ভোটাররা যেন বাদ পড়ে না যান, বা বৈধ ভোটারদের হেনস্থা না হতে হয়। এটি শুধুমাত্র বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা ভোটার বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া নয়। এটি বৈধ ভারতীয় নাগরিকদের জন্য সংকট।
তাই রাহুল বা বাংলাদেশি-রোহিঙ্গায় আটকে না থেকে প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের বুথ স্তরের কর্মী ও এজেন্টদের সচেতন করার কাজ করে যাওয়া উচিত। যদি কোনো নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কোনো দুর্নীতি হয়ে থাকে, তাহলে তৃণমূল স্তর থেকেই তার প্রতিবাদ ও সেই সংক্রান্ত আন্দোলন গড়ে ওঠা উচিত। বাকি দায় আমাদের গর্বের ভারতীয় গণতন্ত্রের ধারক নির্বাচন কমিশনের।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







