পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে তৃণমূল বনাম বিজেপির দ্বিদলীয় বৃত্তকে আচমকাই যেন কিছুটা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে পেরেছে বামপন্থী ছাত্র-যুব সংগঠনগুলির নবান্ন অভিযান। দলবদল আর ব্যক্তিগত কাদা ছোড়াছুড়ির  আবহে হঠাৎ করেই সামনে এসেছে প্রতিদিনের বাঁচামরার বেশ কিছু জ্বলন্ত সমস্যা। নবান্ন অভিযান আদৌ নির্বাচনী পাটিগণিতে কোনও প্রভাব ফেলতে পারবে কিনা তার উত্তর দেবে সময়। কিন্তু *নাগরিক ডট নেট * মনে করে, অনেকদিন পর রাজ্যের রাজনৈতিক পরিসরে কর্মসংস্থানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে কিছুটা হলেও তুলে আনতে পেরেছেন বামপন্থী ছাত্র-যুবরা। তাই নবান্ন অভিযানে অংশ নেওয়া কয়েকজনের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা।

সৌনক সেনগুপ্ত

আমি সৌনক। বর্তমানে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলনামূলক ভারতীয় সাহিত্য নিয়ে এমএ পড়ছি।তৃতীয় সেমেস্টারের ছাত্র।শেষ ৫ বছর ধরে SFI করছি।

আজকের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মাঝে ছোট্ট ভালো লাগার একটা ঘটনা বলি।
ধর্মতলার নিজামের উল্টো দিকে স্যামসং-এর শো-রুমের পাশে একটা ছোট্ট চা, পাঁউরুটি টোস্টের দোকান রয়েছে।জলকামানে ভিজে আমরা তখন পুরসভার সামনের ব্যরিকেড ভেঙে দিয়েছি।শুরু হল টিয়ার গ্যাস আর নির্মম লাঠিচার্জ।চারিদিকে সব রাস্তা আটকে রায়েট গিয়ারের পুলিশ, আর সামনে পিছন দু’ দিক থেকে পুলিশ এলোপাথারি লাঠি চালাচ্ছে। বাঁশের লাঠি নয়, স্টিলের লাঠি। আমরা জনা দশেক পালিয়ে একটা সরু রাস্তায় ঢুকে পড়ি।  ঢুকেই দেখি ডেড এন্ড।  আর তখনই গলিতেনঢোকে ৪ জন পুলিশ। আমাদের জাস্ট আটকে রেখে পেটাতে শুরু করে। আমার পাশে একজন অচেনা সমবয়সী মেয়ে। বীরপুঙ্গব কলকাতা পুলিশ মেরে মাথা ফাটিয়ে দেয় ওর।আমরা যাই বাঁচাতে। কোনও মতে ঠেলে ওকে নিয়ে বেরোই লাঠির বাড়ির বৃষ্টির মধ্যেই।  আবার দৌড়। তখনই দেখি
পুলিশ একটা ব্যরিকেড খুলে দিয়েছে, যাতে সবাই ওই দিকেই দৌঁড়ায় আর তাদের পেটাতে পারে। মার খেতে খেতে আমরা নিজামের সামনে এসে পড়ি। কোন দিকে যাব খুঁজছি, আর ঠিক তখনই ওই ছোট্ট দোকানটা চোখে পড়ে।  ডান হাতের কনুইয়ের চামড়া ফেটে গিয়েছে। একটা জলের বোতল কিনে আনে কমরেড সৌনক দত্ত। জামা খুলে পিঠে লাঠির কালশিটে দাগে জল ঢালছে, ঠিক তখনই দোকানদার বেরিয়ে আসেন। সাথে একজন ভদ্রলোক আর এক ভদ্রমহিলা।
ওঁরা নিজেদের সন্তানের মত পরিচর্যা করে দেন আমাদের। দোকানের কাকু চা এগিয়ে দেন, পাশের কুলফিওয়ালা বরফ।  নিজের টাকা দিয়ে ভদ্রলোক ওষুধ কিনে আনেন, জামা খুলিয়ে মহিলা বরফ ঘষে দেন ক্ষতস্থানে। রাস্তায় ভিড় জমে, চুকচুক সমবেদনার সাথে ক্যামেরার ফ্ল্যাশ। ওঁরাই জমায়েত সরিয়ে দেয় পাছে পুলিশ এসে ডিটেইন করে আমাদের। চা কাকু তখন পাউরুটি টোস্ট করে জোর করে খাইয়ে দেয়। এখনও কানে ভাসছে- “খাও বাবু, নয়তো এত কড়া ওষুধে শরীর আরও খারাপ লাগবে…”
কিছুক্ষণ পর লোকালের কিছু কমরেড চলে আসেন। তাঁরা আমাদের সাথে থাকা হাতের কব্জি ভেঙে যাওয়া ছেলেটাকে রিক্সা করে ইরান সোসাইটিতে নিয়ে যায়। যেখানে ডঃ ফুয়াদ হালিমের মেডিক্যাল টিম আহত কমরেডদের ট্রিটমেন্ট করছে।আমরা আবার রিক্সা খুঁজতে থাকি।
রাস্তার সাধারণ লোকেরাই আবারও এগিয়ে আসেন৷ অচেনা একজন বাইকে বসিয়ে নিয়ে যান ইরান সোসাইটিতে। তারপর পেইনকিলারের ৩টে ইঞ্জেকশান, ফুয়াদ হালিমের প্রেসক্রিপশান লিখে দেওয়া আর কমরেড সৌনক দত্তের গাড়িতে আইরিস হাসপাতাল। এক্সরে হয়, ফার্স্ট এড দেয় ওরা। হাত, পিঠ ফুলে গেছে, ডান কাঁধে হেয়ার লাইন ফ্র্যাকচার।
দিনের শেষে ওই অজ্ঞাত পরিচয়ের ব্যাক্তিরা না থাকলে কী হত ভাবলে শিউরে উঠি।  ওই গরীব চা কাকু হাজার জোরাজুরি সত্ত্বেও একটা কিছুর দাম নেননি। ওই বাইক কাকুর নামটুকুও জানা হয়নি। আর হ্যাঁ, ওই ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলা বহু বছর আগে DYFI কর্মী ছিলেন।  রক্তের চেয়েও কমরেডশিপের টান হয়তো অনেক বেশি৷ নতুন করে বুঝলাম। মনে রাখব।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আরো পড়ুন :