অর্কদ্যুতি সরকার
আধুনিক মানবসভ্যতার প্রধান চালিকাশক্তি ও অপরিহার্য উপাদান হল বিদ্যুৎ। এই শক্তি ব্যবহারের অবাধ সুযোগকে জনজীবনের উন্নয়নের মানদণ্ড রূপে গণ্য করা হয়। তাই দেশের সার্বিক উন্নতিবিধানের জন্য নাগরিকদের স্বল্পমূল্যে বা বিনামূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা আবশ্যক। কিন্তু বেশ কয়েক দশক ধরে ভারতের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বিক্রয়জাত লাভজনক পণ্যে পরিণত হচ্ছে এবং রাষ্ট্রীয় ঔদাসীন্যের সম্মুখীন হয়ে চলেছে। স্বাধীনতার পর ১৯৪৮ সালে প্রথম বিদ্যুৎ আইনে বিদ্যুৎকে একটি পরিষেবা বলে গণ্য করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে নয়া অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, উদারনীতিকরণ, বেসরকারিকরণের হাওয়ায় ২০০৩ সালে এল নতুন বিদ্যুৎ আইন। এখানে আগেকার মত বিদ্যুৎ আর পরিষেবা থাকল না, হয়ে গেল পণ্য। একে একে বহু বেসরকারি কোম্পানি বিদ্যুৎ বন্টনের সঙ্গে যুক্ত হতে লাগল। এর ফলে দেশের প্রায় ৪৯% বিদ্যুৎব্যবস্থা তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেল।
কিন্তু মালিকদের খিদে কি অত সহজে মেটে? তাদের চাই পুরো ব্যবস্থাটাই। ওই বিদ্যুৎ আইন বেসরকারি মালিকের স্বার্থের দিকে লক্ষ্য রেখে রচিত হয়ে থাকলেও তার এমন অনেকগুলি দিক ছিল, যার সাহায্যে বেসরকারি কোম্পানিগুলির যথেচ্ছ লুণ্ঠন রাজ্য সরকার রুখে দিতে পারে, বা বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীরা আইনি সাহায্যে বিদ্যুৎ মালিকদের নানা জনবিরোধী কার্যকলাপকে প্রতিহত করতে পারে। কিন্তু সরকার, আইনসভা – সবাই বেসরকারিকরণের পক্ষে। তাই প্রয়োজন পড়ল নতুন আইনের। ফলে কেন্দ্রের বর্তমান সরকার ২০২২ সালে নিয়ে এল নতুন বিদ্যুৎ সংশোধনী আইন। সংসদে তা পেশ করেও অবশ্য পাশ করাতে পারল না। কিন্তু তার জন্য তো হাত গুটিয়ে বসে থাকা যায় না, জারি করল ইলেকট্রিসিটি বিল, ২০২২ এবং ইলেকট্রিসিটি বিল, ২০২৩। এগুলির প্রাথমিক উদ্দেশ্য হল, লাভজনক এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহের সম্পূর্ণ অধিকার বেসরকারি কোম্পানিগুলির হাতে তুলে দেওয়া।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
তার আগেই ২০২১ সালের জুলাই মাসে কেন্দ্রীয় সরকার এক মারাত্মক জনবিরোধী প্রকল্প নিয়ে এসেছে, যার নাম রিভ্যাম্পড ডিস্ট্রিবিউশন সেক্টর স্কিম (আরডিএসএস)। বিশ্বব্যাংকের নির্দেশে আনা এই স্মার্ট মিটারিং স্কিম অন্যায্যভাবে লাগু করার উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয় সরকার বন্ধ করে দিয়েছে সমস্ত আর্থিক সহায়তা প্রকল্পগুলি। তিন লক্ষ কোটি টাকার এই স্মার্ট মিটারিং প্রকল্পের দুই লক্ষ কোটি টাকারও বেশি বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে রাজ্য সরকার আর বিদ্যুৎ গ্রাহকদের উপরে। এই প্রকল্পে প্রথমেই ‘ক্রস সাবসিডি’ তুলে দেওয়া হবে। এখন বৃহৎ শিল্পপতিদের হাই টেনশন বিদ্যুতের দামের থেকে সাধারণ গ্রাহকের বাড়ির বিদ্যুতের দাম কম, কারণ শিল্পপতিদের থেকে বেশি দাম নিয়ে সাধারণ মানুষের বোঝা কমানো হয়। বলা যেতে পারে, এ এক ধরনের ভর্তুকি ব্যবস্থা। তাই দামের এই তফাতকে ‘ক্রস সাবসিডি’ বলা হয়। এ জিনিস তুলে দিলে আপনার-আমার আর বিরাট কারখানার মালিকের জন্যে বিদ্যুতের একই দাম হবে। এই ধরনের পদক্ষেপের বিষময় ফল আমরা গত কয়েক বছরে রান্নার গ্যাসের দামের ক্ষেত্রে দেখতে পাচ্ছি। বিদ্যুতের ক্ষেত্রে স্থায়ী মাশুল, ন্যূনতম মাশুল ব্যাপক হারে বাড়ানো হবে। নিয়ামক সংস্থাকে দিয়ে জোর করে ট্যারিফ বৃদ্ধি করানো হবে, বকেয়া ঋণ সাধারণ গ্রাহকদের উপর চাপানো হবে, লাভজনক এলাকাগুলি পুরোপুরি বেসরকারি মালিকদের হাতে তুলে দেওয়া হবে, জনগণের টাকায় সরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা গোটা বিদ্যুৎ ব্যবস্থার পরিকাঠামো চলে যাবে মুনাফাভোগী বেসরকারি কোম্পানিগুলির হাতে। এই প্রকল্পের অঙ্গ হিসাবে শুরু হয়েছে বাড়ি বাড়ি স্মার্ট মিটার বসানোর কাজ।
বসানোর খরচ গ্রাহককেই বহন করতে হবে, বসাবে টেন্ডার প্রাপ্ত বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা। একেকটি স্মার্ট মিটারের দাম প্রায় ১২,০০০ টাকা, যা সম্পূর্ণ গ্রাহকের পকেট থেকে যাবে। মিটারটির গড় আয়ু মোটামুটি ছয় বছর, তার পর মিটারটি ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে যাবে। গ্রাহকদের মিটারের পিছনে বার্ষিক খরচ হবে ২,০০০ টাকা; অর্থাৎ প্রত্যেক মাসে বিদ্যুৎ খরচের সঙ্গে ১৭০-১৮০ টাকা দিতে হবে। যা ভবিষ্যতে আরও বৃদ্ধি পাবে।
মিটার মাশুল পরিচালিত হবে এক নতুন ব্যবস্থায়, যার নাম টাইম অফ ডে সিস্টেম (টিওডি সিস্টেম)। এই ব্যবস্থা অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ সময়ের জন্য বিল বেশি হবে। এই মিটার লাগানোর সঙ্গে সঙ্গেই এই নয়া মাশুল ব্যবস্থা চালু হয়ে যাবে। চব্বিশ ঘন্টার বিদ্যুৎ খরচকে তিন ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। সকাল পাঁচটা থেকে সন্ধ্যা পাঁচটা, সন্ধ্যা পাঁচটা থেকে রাত এগারোটা এবং রাত এগারোটা থেকে সকাল পাঁচটা পর্যন্ত। স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ গ্রাহকদের বাড়িতে আলো, পাখা, টিভির জন্য সকালবেলার চেয়ে বিকেলবেলা ও সন্ধেবেলায় বেশি পরিমাণ বিদ্যুৎ লাগবে। অর্থাৎ তখন বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে। ঠিক তখনই বিদ্যুতের দাম বাড়বে সবথেকে বেশি। সরকারি প্রকল্পে বলা হচ্ছে যখন বিদ্যুতের দাম বেশি, তখন গ্রাহককে ব্যবহার কমাতে হবে। ফলে এক পর্যায়ে মানুষকে আলো, পাখা বন্ধ করে সন্ধেবেলা কাটাতে হবে।
এই মিটারে পুরো ব্যবস্থাই পরিচালিত হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে অটোমেটিক কানেকশন, ডিসকানেকশন, মিটার রিডিং এবং বিলিং করা যাবে। ফলে টিওডি সিস্টেম (একই দিনের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দাম), ডাইনামিক প্রাইসিং সিস্টেম (চাহিদা অনুযায়ী দাম বৃদ্ধি), রিয়েল টাইম মনিটরিং সিস্টেম (কনট্র্যাক্ট লোডের থেকে কোনো কারণে লোড বেড়ে গেলে অটোমেটিক ফিক্সড চার্জ সহ অন্যান্য সমস্ত চার্জ বেড়ে যাবে) চালু হবে। বন্টন কোম্পানির ইচ্ছা অনুযায়ী বাড়তি মুনাফা করতে এই মিটার অত্যন্ত সহায়ক হবে। ফলে প্রতিনিয়ত দাম বাড়তেই থাকবে।
গ্রাহক বাড়িতে বসে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে মিটার রিডিং, প্রিপেড ব্যালেন্স দেখতে পাবেন। স্মার্ট মোবাইলের সাহায্যেই মিটার ব্যালেন্স রিচার্জ করা যাবে। কিন্তু স্মার্টফোনের মত মাসের নির্দিষ্ট দিনে রিচার্জের সুযোগ এখানে নেই। মাসের যে কোনো সময়, দিনের যে কোনো মুহূর্তেই ব্যালেন্স ফুরিয়ে যেতে পারে। তখনই গ্রাহককে স্মার্টফোনের অ্যাপ থেকে রিচার্জ করাতে হবে। কারণ ব্যালেন্স শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। এখন কথা হল, শহরাঞ্চল বা গ্রামের সব বাড়িতে তো স্মার্টফোন নেই, বা থাকলেও সকলে তা ব্যবহার করতে খুব স্বচ্ছন্দ নন। গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কি সবসময় মোবাইল নেটওয়ার্ক থাকে? স্মার্ট মিটার থাকলে সবাই স্মার্টফোন রাখতে বাধ্য হবেন এবং তাঁর এলাকায় দ্রুতগতির নেটওয়ার্ক পরিষেবাও থাকতে হবে।
এতদিন জানা ছিল, কত তারিখে মোটামুটি কত টাকা বিল দিতে হবে। সেই হিসাবে আপনি টাকার জোগাড় করে রাখতে পারতেন। কিন্তু স্মার্ট মিটারে সে সুবিধা একেবারেই নেই। গভীর সংকটে পড়বেন গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী ৮০% গরিব মানুষ, বিশেষ করে কৃষকরা। কারণ অগ্রিম টাকা দিয়ে বিদ্যুৎ কিনে ফসল ফলিয়ে সেই ফসলের দাম পেতে তাঁদের দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হবে। শহরের মানুষেরও ভোগান্তির শেষ থাকবে না। গ্রাহককে সর্বক্ষণ মেসেজের অপেক্ষায়, কখন রিচার্জ করতে হয় – সেই আতঙ্কে দিন কাটাতে হবে। পাশাপাশি মাসের শেষ পর্যায়ে ব্যালেন্স শেষ হয়ে গেলে টাকা জোগাড় করা কঠিন হবে অনেক গ্রাহকের পক্ষেই। বিদ্যুৎ আইন, ২০০৩, ৫৬ নং ধারায় বলেছে, গ্রাহকের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হলে কোম্পানিকে কমপক্ষে ১৫ দিন আগে নোটিস দিতে হবে। অর্থাৎ বিল মেটানোর শেষ দিনের পর আরও ১৫ দিন হাতে থাকে। কিন্তু স্মার্ট মিটারের টাকা শেষ হওয়া মাত্রই বিদ্যুৎ সংযোগ নিজে নিজে বিচ্ছিন্ন হবে।
মিটার খারাপ হলে সে ব্যাপারে অভিযোগ কীভাবে, কোথায় করা যাবে বা খারাপ মিটারের বিল গ্রাহকরা সহজে সংশোধন করাতে পারবেন কিনা – সেসবও স্পষ্ট নয়। ইতিমধ্যেই ডিজিটাল মিটার বন্ধ করা বা চালু করা, স্থান পরিবর্তন করা, খারাপ হলে তা ঠিক করা, ভুতুড়ে বিল এলে তা সংশোধন এক কষ্টসাধ্য ও প্রায় অসম্ভব কাজ হয়ে দাঁড়িছে। সেখানে স্মার্ট মিটারের জনমানবহীন ব্যবস্থা এত বিপুল গ্রাহকের নানাবিধ সমস্যা মেটাবে কী করে? এতে গ্রাহকদের হাতে কোনো নথিও থাকছে না, যা নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করা যাবে। কারণ গ্রাহকরা বিলের হার্ড কপি পাবেন না। ফলে কত ইউনিট খরচ হচ্ছে, তার দাম কত, মিটার ভাড়া কত, স্থায়ী মাশুল কত, বা অন্য কোনো মাশুল নেওয়া হচ্ছে কিনা – গ্রাহক কিছুই জানতে পারবেন না। ফলে এতে গ্রাহকদের টাকা যথেচ্ছ লুঠ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমানের চেয়ে বিল যে বহুগুণ বেড়ে যাবে তা তো বলাই বাহুল্য। সরকার যা-ই বলুক, বাস্তবে বহু জায়গায় স্মার্ট মিটার বসার পরে আগের দ্বিগুণ বা তার থেকেও বেশি বিল আসছে। বিশেষ করে কৃষিক্ষেত্রের গ্রাহক আর দরিদ্র গ্রাহকদের উপর বেড়েছে বিপুল বোঝা। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বিহারে মিটারে ত্রুটি থাকায় একসাথে কয়েক হাজার গ্রাহকের বিদ্যুৎ সংযোগ কাটা পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মিটারের ব্যালেন্স শেষ হয়ে গেলে রিচার্জ করার পরেও দু-তিন দিনের আগে বিদ্যুৎ সংযোগ ফেরত আসছে না। দায়িত্বপ্রাপ্ত বেসরকারি কোম্পানিকে ফোন করলে একই রেকর্ড বেজে যাচ্ছে। সরকারি বিদ্যুৎ সংস্থা হাত তুলে নিচ্ছে। এক্ষেত্রে দায় কার? বণ্টন কোম্পানি না মিটার সরবরাহকারী সংস্থার?
গত এক দশক ধরে ইলেকট্রিসিটি রেগুলেটরি কমিশনকে পাশ কাটিয়ে সরকার বিদ্যুতের গ্রাহকদের বাজারের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এই উদ্দেশ্যেই তৈরি হয়েছে বিদ্যুতের ভার্চুয়াল বাজার। কমিশন সর্বোচ্চ ইউনিট প্রতি বিদ্যুতের দাম ১২ টাকা থেকে ক্রমাগত বাড়িয়ে প্রায় ৫০ টাকা করেছে। নতুন মিটার ব্যবস্থায় তা বেড়ে ১০০ টাকায় পৌঁছতে পারে।
সাধারণ গ্রাহকরা এতদিন নানা ন্যায্য ভর্তুকি পেতেন। সেসব বন্ধ করে দেওয়া হবে। বিদ্যুৎ আইনে ক্রস সাবসিডির নামে সাধারণ গ্রাহক ও বৃহৎ শিল্পপতিদের হাই টেনশন বিদ্যুতের মাশুল আলাদা করা ছিল। সাধারণ গ্রাহকরা দামের ক্ষেত্রে বেশ কিছু ভর্তুকি পান। নতুন মিটারে সব ক্ষেত্রে দাম অভিন্ন করার উদ্দেশ্যে এই ভর্তুকি তুলে দেওয়া হবে। সাধারণের ঘরে বিদ্যুতের দাম হবে আকাশছোঁয়া। বিশেষ করে কৃষিক্ষেত্রের গ্রাহকরা পড়বেন ভয়ঙ্কর সমস্যায়। আমাদের রাজ্যে প্রায় সাড়ে তিন লক্ষের বেশি পাম্পের কানেকশন আছে। একটি ৭.৫ হর্স পাওয়ারের পাম্প একবেলা করে চালালে মাসে ১৫,০০০-২০,০০০ টাকা বিল দিতে হবে। এর ফলে খাদ্য উৎপাদনে যে বিপুল খরচ হবে তার নিত্যদিনের বোঝা বইতে হবে আমাদের।
আরো পড়ুন আদানি থেকে মাস্ক: গণতন্ত্র নয়, চলছে কর্পোরেটতন্ত্র
সাইবার আক্রমণের মুখে যে কোনো সময়ে পড়তে পারে এই নয়া মিটার ব্যবস্থা। ফোন নম্বর সহ গ্রাহকদের সমস্ত তথ্য বেসরকারি বিদ্যুৎ বন্টন কোম্পানিগুলির হাতে রয়েছে। সেইসঙ্গে পুরো ব্যবস্থাই পরিচালিত হচ্ছে নেটওয়ার্ক সিগনালিং দ্বারা। গবেষকরা বলেছেন, যে কোনো সময়ে সাইবার আক্রমণের মুখে পড়তে পারে এই ডিজিটাল স্মার্ট মিটার সহ গোটা গ্রিড ব্যবস্থা। হ্যাকাররা উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে পুরো বিদ্যুৎব্যবস্থা বন্ধ করে দিতে পারে, হয়ে যেতে পারে সামগ্রিক ব্ল্যাক আউট। সেক্ষেত্রে জাতীয় নিরাপত্তা এবং ব্যক্তির নিরাপত্তা বিপন্ন হবে। আবার কেন্দ্রীয় সরকারও চাইলে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কোনো রাজ্যের বিরূদ্ধে এই নেটওয়ার্ক কন্ট্রোল ব্যবহার করতে পারে। কোনো রাজ্য সরকারও রাজনৈতিক মতলবে থেকে কোনো এলাকাকে মুহূর্তে বিদ্যুৎশূন্য করে দিতে পারে। গ্রাহকদের তথ্য ব্যবহার করে কোনো বিপজ্জনক সংস্থা তাঁদের ঘরের নেটওয়ার্কেও হানা দিতে পারে। গবেষকরা বলছেন, একে নজরদারির যন্ত্র হিসাবেও ব্যবহার করা সম্ভব।
গবেষকরা আরও বলছেন, স্মার্ট মিটার থেকে যে বিকিরণ হয় তা মানুষের পক্ষে, বিশেষত অন্তঃসত্ত্বা মহিলা বা হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের পক্ষে বিপজ্জনক।
ব্যবসায়িক কারণেই বোঝা যায়, বেসকারি বিদ্যুৎ সংস্থাগুলি গ্রাহকদের চাহিদার তথ্য বিশ্লেষণ করে সবথেকে লাভজনক এলাকাগুলির বিদ্যুৎ বন্টনের দায়িত্ব নেওয়ার আবেদন জানাবে। সরকারি পরিকাঠামো ব্যবহার করে তারা মুনাফা লুটবে। সরকারি সংস্থার কাছে পড়ে থাকবে অলাভজনক প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকাগুলো। তখন বিধ্বস্ত রাজ্য বিদ্যুৎ পর্ষদ হয় পুরোপুরি কর্পোরেটের কাছে বিক্রি হয়ে যাবে, নইলে কম ভোল্টেজ, লোডশেডিং করতে করতে মানুষকে প্রায় বিদ্যুৎহীন করে দেওয়া হবে।
স্মার্ট মিটার ব্যবস্থার আরও একটি দিক মনে রাখা প্রয়োজন। পশ্চিমবঙ্গে মিটার রিডিংয়ে নিযুক্ত কর্মীর সংখ্যা প্রায় ৬,৫০০। আরও বেশ কয়েক হাজার কর্মী বিল দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত। নয়া ব্যবস্থায় এঁদের অনেকেরই প্রয়োজন ফুরোবে। ক্যাশ কালেকশন সেন্টারে কর্মী লাগবে না, পুরো ব্যবস্থাই পরিচালিত হবে কন্ট্রোল রুমে সামান্য কয়েকজন কম্পিউটারে দক্ষ কর্মীর দ্বারা। এক ধাক্কায় এতগুলো মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়বেন। এঁদের বড় অংশই চুক্তিভিত্তিক কর্মী। ফলে কোনো সরকারি সাহায্যও পাবেন না।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলিতে কিন্তু বিদ্যুৎ হল পরিষেবা। আমাদের দেশেও বিদ্যুৎব্যবস্থা পরিষেবা বলেই গণ্য হত। কিন্তু আজ তা পণ্যে পরিণত হয়েছে। অর্থ না থাকলে তা ব্যবহার করার অধিকার আমরা হারাচ্ছি। ইতিমধ্যেই আসাম, ত্রিপুরার মত দেশের অনেক জায়গায় স্মার্ট মিটারের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়েছে জনসাধারণ। বিহারে সরকারবিরোধী রাষ্ট্রীয় জনতা দল স্মার্ট মিটার উপড়ে ফেলার কর্মসূচি নিয়েছিল গতবছর। কাশ্মীরে আন্দোলন দমন করতে সশস্ত্র সেনা নামাতে হয়েছিল। এরাজ্যে ২০২১ সালেই ৩৭ লক্ষ মিটার লাগানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল রাজ্য সরকার। রাজ্যের ২,০৭,০০০,০০ গ্রাহককে স্মার্ট মিটারের আওতায় আনা হচ্ছে। বহু জায়গায় আইনবিরুদ্ধভাবে সরকার মানুষকে চাপ দিচ্ছে স্মার্ট মিটার বসাতে। কিন্তু এ হল একটি প্রকল্প, কোনো আইন নয়। সুতরাং এর ব্যবহার ঐচ্ছিক।
এই প্রকল্প বাবদ রাজ্যের মানুষের ঘাড়ে চাপানো হবে ১২,৬২৩.১২ কোটি টাকার বোঝা। গোটা দেশের বিদ্যুৎব্যবস্থাই গড়ে উঠেছে জনসাধারণের করের টাকায়। অথচ সেই ব্যবস্থা আজ সরকার ন্যূনতম মূল্যে তুলে দিচ্ছে আম্বানি, আদানি, টাটা, গোয়েঙ্কা, এসার, টোরেন্ট গোষ্ঠীর মত একচেটিয়া কর্পোরেটের হাতে। আজ বিদ্যুৎ এই মুনাফাভোগীর মৃগয়াক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। আগামী দিনে আমাদের উপর চাপবে বিদ্যুতের ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধির বোঝা। সাধারণ গ্রাহকদের কাটাতে হবে বিদ্যুৎহীন অন্ধকার জীবন। তাই একথা আজ নিঃসংশয়ে বলা যায়, স্মার্ট মিটার আদতে জনজীবনকে ধ্বংস করা স্মার্টলি টাকা লুঠের ব্যবস্থা।
নিবন্ধকার বিদ্যুৎ আন্দোলনের কর্মী। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








