মানতাশা আহমেদ
গতমাসে যখন ভারত সরবে পাকিস্তানের মাটিতে বিমান হানা চালাচ্ছিল, তখনই নীরবে চল্লিশের বেশি রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুর বিতাড়নের ব্যবস্থাও করে। তাঁদের মধ্যে অনেকের কিন্তু ইউনাইটেড নেশনস হাই কমিশনার ফর রিফিউজিস (ইউএনএইচসিআর)-এর খাতায় নাম নথিভুক্ত ছিল। তা সত্ত্বেও এ কাজ করা হয়। ওই মানুষগুলো ‘রাষ্ট্রহীন’ এবং তাঁদের সসম্মানে কোথাও পাঠানো হয়নি, কোনো আইনি পথে কারোর হাতে তুলেও দেওয়া হয়নি। বরং তাঁদের চোখ বেঁধে, হাতে হাতকড়া পরিয়ে, মারধোর করে মায়ানমারের সঙ্গে ভারতের যে জলসীমা আছে তার কাছাকাছি সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়। তাঁরা আদৌ বাঁচবেন কিনা সে ভাবনাও ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয় স্রেফ লাইফ জ্যাকেট পরিয়ে এবং প্রতিশ্রুতি দিয়ে যে ওঁদের বাঁচাতে কেউ না কেউ ঠিক এসে পড়বে।
দিল্লির এই বাসিন্দারা মূলত উত্তম নগর আর বিকাশপুরীতে থাকছিলেন। তাঁদের অভিযোগ – বায়োমেট্রিক যাচাই করা হবে বলে স্থানীয় পুলিস তাঁদের থানায় নিয়ে যায়। তারপর জিজ্ঞাসাবাদ ও হয়রানি করা হয়, কয়েদি নম্বর লাগিয়ে দেওয়া হয় এবং ডোসিয়ার সেলে নিয়ে গিয়ে শারীরিক পরীক্ষাও করা হয়। এমনকি মেয়েদের ক্ষেত্রে অন্তঃসত্ত্বা কিনা, তাও পরীক্ষা করা হয়। এখন পর্যন্ত ওঁদের মধ্যে যাঁরা বিভিন্ন সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাঁদের কথাবার্তা থেকে বোঝা যায় যে প্রত্যেকের সঙ্গে বিভিন্ন অপরাধে অভিযুক্তদের মত আচরণ করা হয়েছে। গণহত্যা থেকে বাঁচতে অন্য দেশে পালিয়ে আসা উদ্বাস্তু হিসাবে গণ্য করা হয়নি।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুরা পৃথিবীর সবচেয়ে অত্যাচারিত জনগোষ্ঠীগুলোর অন্যতম। ২০১৭ সালের অগাস্ট মাস থেকে মায়ানমার সেনাবাহিনীর গণহত্যার উদ্দেশ্য নিয়ে চালানো আক্রমণের ফলে ৭,৭০,০০০-এর বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে চলে যান। আজ প্রায় দশ লাখ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু বাংলাদেশের কক্সবাজারে এক উদ্বাস্তু শিবিরে বাস করছেন। ওই শিবির পৃথিবীর সবচেয়ে বড় উদ্বাস্তু শিবিরে পরিণত হয়েছে। সেখানে ঠাসাঠাসি ভিড়, বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব হয়েছে, মানুষের বেঁচে থাকার সংস্থান ক্রমশ কমে আসছে। অন্তত ৬,০০,০০০ রোহিঙ্গা এখনো মায়ানমারেই রয়েছেন প্রতিনিয়ত বিপদ মাথায় করে। আর মায়ানমারের বাইরে রয়েছেন কয়েক লক্ষ, যাঁদের বারবার উচ্ছেদ হতে হচ্ছে। হিসাব বলছে তার মধ্যে ৪০,০০০ রোহিঙ্গা ভারতে রয়েছেন। এঁদের অর্ধেক সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের খাতায় উদ্বাস্তু হিসাবে নথিভুক্ত। কিন্তু সেই স্বীকৃতিও তাঁদের কোনো প্রকৃতি আইনি সুরক্ষা দিতে পারছে না।
ভারতের কোনো জাতীয় উদ্বাস্তু আইন নেই। ১৯৫১ সালের সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের উদ্বাস্তু কনভেনশন অথবা ১৯৬৭ সালে তার যে প্রোটোকল তৈরি হয়, তাতেও ভারত সই করেনি। ওগুলো অন্য দেশে আশ্রয়প্রার্থী মানুষের অধিকার সুরক্ষিত করে এবং ওতে উদ্বাস্তুদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করে যে কোনো উপায়ে ফেরত পাঠানোর চেষ্টার নিষেধ আছে। তাহলেও, ভারত কিন্তু সেই দেশ যে দেশ বলে, প্রাচীনকাল থেকে তার দর্শন হল ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’। অর্থাৎ পৃথিবীর সব মানুষই একে অপরের আত্মীয়। তেমন দেশের সরকারের থেকে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের প্রতি এমন ব্যবহার স্ববিরোধী। প্রাচীন ভারতের কথা যদি বাদও দিই, অনতি অতীতেই এ দেশ তিব্বতি, শ্রীলঙ্কার তামিল, আফগান উদ্বাস্তুদের জন্যে দরজা খুলে দিয়েছিল। অথচ দেখা যাচ্ছে, অন্য দেশের মুসলমান সংখ্যালঘু উদ্বাস্তুদের বেলায় একেবারে অন্য নীতি প্রয়োগ করা হচ্ছে।
এই মনোভাবকে আইনি চেহারা দেওয়া হয় ২০১৯ সালে, যখন ভারত সরকার নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) পাশ করে। এই আইনে প্রতিবেশী দেশগুলোর নথিবিহীন অভিবাসীদের দ্রুত নাগরিকত্ব দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়, তবে শর্ত হল, তাঁদের মুসলমান হওয়া চলবে না। বার্তা পরিষ্কার – কাকে আশ্রয় দেওয়া হবে তা নির্ভর করবে তার ধর্মীয় পরিচয়ের উপর। রোহিঙ্গারা (মুসলমান ও খ্রিস্টান) পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অত্যাচারিত জনগোষ্ঠীর অন্যতম হওয়া সত্ত্বেও তাদের এই আইনের আওতার বাইরে রাখা হয়।
আরো পড়ুন বহু মানুষের প্রার্থনা লিপিবদ্ধ করেছেন লেখক
আজ ভারত এমন এক দেশে পরিণত হয়েছে, যে দেশ উদ্বাস্তুদের অমানবিক নির্বাসনের অজুহাত হিসাবে খাড়া করে নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিপদ এবং আঞ্চলিক উত্তেজনাকে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সংঘর্ষের সময়ে এভাবেই রোহিঙ্গাদের সমুদ্রে ফেলে দেওয়ার ঘটনাটা ঘটানো হল। এ কেবল আইনি নীতির পরিবর্তন নয়, এ থেকে বোঝা যায় যে প্রশাসন চালানোর দৃষ্টিভঙ্গি এ দেশে ক্রমশ সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠছে। উদ্বাস্তুদের আর দুর্গত বা অত্যাচারিত মানুষ বলে ভাবা হচ্ছে না। তাঁদের গায়ে রাজনৈতিক তকমা আঁটা কিছু মানুষ হিসাবে বা স্রেফ সংখ্যা হিসাবে ভাবা হচ্ছে, যাঁদের একটা যেমন তেমন ব্যবস্থা করে দিতে পারলেই ঝামেলা চুকে যায়। ‘রোহিঙ্গা’, ‘বাংলাদেশি’ শব্দগুলো হয়ে দাঁড়িয়েছে মুসলমানদের অপরাধী বলে প্রমাণ করতে ব্যবহৃত গালাগাল। সমুদ্রে নিক্ষিপ্ত এই মানুষগুলোর একজন তো বলেছেন তাঁকে নাকি থানায় নিয়ে গিয়ে পুলিস পহলগামের ঘটনায় যুক্ত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত করছিল। মনে রাখা ভাল, কিছুদিন আগেই যখন ভারত থেকে বেআইনিভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাওয়া ভারতীয়দের ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকার হাত-পা বেঁধে ফেরত পাঠাচ্ছিল, তখন ভারত নিন্দা করেছিল। সেই দেশই তার এলাকায় বসবাসকারী রাষ্ট্রহীন মানুষের প্রতি নীরবে তার চেয়েও অমানবিক আচরণ করেছে।
১৬ মে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এই নির্বাসনের উপর স্থগিতাদেশ জারি করতে অস্বীকার করে। যেসব তথ্যপ্রমাণ আদালতে দাখিল করা হয়েছে, বিচারপতিরা সেগুলো বিশ্বাসই করতে চাননি। অন্যদিকে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ এই ঘটনার তদন্ত করছে এবং ভারত সরকারকে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের প্রতি এই অমানবিক এবং জীবন বিপন্ন করার মত ব্যবহার বন্ধ করতে বলেছে।
এ জিনিস মেনে নেওয়া মানে একে স্বাভাবিকত্ব দেওয়া। এ সম্পর্কে নীরব থাকা মানে এই ব্যবহার সমর্থন করা। রোহিঙ্গা সংকট কেবল মায়ানমারের লজ্জা নয়, এখন এটা ভারতেরও লজ্জা। যদি আমরা রাষ্ট্রের এই ব্যবহারের প্রতিবাদ না করি, তাহলে ভেবে দেখতে হবে ভারতীয় মূল্যবোধ বলতে আর কী বাকি আছে।
নিবন্ধকার স্বাধীন সাংবাদিক। প্রধানত শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে লেখালিখি করেন। অতীতে ডেকান হেরাল্ড ও দ্য হিন্দু কাগজে কাজ করেছেন। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







