কুশল দেবনাথ

পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের প্রেক্ষিতে আমরা একটি রাজনৈতিক কর্মসূচী নিয়েছি, সেটা হল ‘নো ভোট টু বিজেপি’, অর্থাৎ বিজেপিকে একটিও ভোট নয়। আমরা মানে এ রাজ্যের শ্রমিক আন্দোলন, নারী আন্দোলন, মানবাধিকার আন্দোলনসহ বিভিন্ন গণ আন্দোলনের কর্মীরা গত ৪ঠা জানুয়ারি ভারতসভা হলে একটি কনভেনশনের মাধ্যমে ‘ফ্যাসিস্ট আরএসএস – বিজেপি-র বিরুদ্ধে বাংলা’ নামে একটি মঞ্চ গঠন করি। ওই মঞ্চ থেকে একটি বক্তব্য উঠে আসে — বিজেপিকে হারাও পথে, বিজেপিকে হারাও ভোটে।

আমরা মনে করি, শ্রেণীবিভক্ত ভারতে শাসকশ্রেণীর বহু দল আছে। বিভিন্ন শাসকদল তাদের রাজত্বকালে সাধারণ মানুষের উপর নানাবিধ আক্রমণ নামিয়ে এনেছে। কিন্তু এদের কারোরই ফ্যাসিবাদী কর্মসূচী নেই। আর এস এস – বিজেপির ফ্যাসিবাদী কর্মসূচী আছে। সেই কর্মসূচী বাস্তবায়িত করার জন্য তারা গোটা দেশে ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন চালাচ্ছে। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক —সব ক্ষেত্রেই এই আগ্রাসন চলছে।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এছাড়াও ফ্যাসিবাদের একটি নির্দিষ্ট প্রতিক্রিয়াশীল দর্শন থাকে। বহু বৈচিত্র‍্যের দেশ ভারতে এরা একটি একনায়কতন্ত্রী হিন্দুরাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে সমস্ত কর্মসূচী গ্রহণ করছে। একদিকে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন, অন্যদিকে বিদ্বেষ বিভাজনের রাজনীতিকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া,  উগ্র জাতীয়তাবাদকে ভিত্তি করে জনগণকে বিভক্ত করাই এদের উদ্দেশ্য। আমাদের দেশে মুসলমানসহ বিভিন্ন ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষের উপর ভয়ানক আক্রমণ নামিয়ে এনেছে। আদিবাসী, দলিত, ছাত্র এবং নারীরাও এদের আক্রমণের লক্ষ্য। আমাদের দেশে বিভিন্ন রাজ্যে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। কিন্তু ধর্ষকদের নিয়ে মিছিল একমাত্র এই দলটিই করে। ২০১৯ এ দ্বিতীয়বার লোকসভা নির্বাচনে জেতার পর নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ২০১৯ পাশ করে, যার মধ্য দিয়ে ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব দেওয়াকে আইনী করা হয়। এনপিআর, এন আর সি-র মাধ্যমে বহু মানুষকে না-মানুষ করার চক্রান্ত করেছে। ৪৪টি শ্রম আইনকে চারটি শ্রম কোডে রূপান্তরিত করে শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার তারা কেড়ে নিয়েছে।  তিনটি কৃষি আইন এনে কৃষিক্ষেত্রে কর্পোরেট পুঁজির একাধিপত্যকে নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছে। কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বিলোপ করে গোটা কাশ্মীরকে কার্যত কারাগারে পরিণত করেছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে কুক্ষিগত করেছে।  এক কথায় ফ্যাসিবাদী কর্মসূচী রূপায়ণ করার জন্য গোটা দেশের জনগণের উপর ভয়ঙ্কর আক্রমণ নামিয়ে এনেছে। রেলসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প বেচে দিচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক খাতে ব্যয়বরাদ্দ কমাচ্ছে। মানুষ প্রতিবাদ করলেই তার উপর নানা ধরনের রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন নামিয়ে আনছে। কার্যত দেশে অঘোষিত জরুরী অবস্থা চলছে। এই প্রেক্ষাপটেই আমাদের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনকে দেখতে হবে।

গত বিধানসভা নির্বাচনে এ রাজ্যে বিজেপি তিনটি আসন পেয়েছিল। ভোট পেয়েছিল মাত্র ১০%। কিন্তু গত পাঁচ বছরে তাদের সমর্থন বহু গুণ বেড়েছে। গত লোকসভা নির্বাচনে তারা ১৮টি আসন দখল করে। আমাদের রাজ্যে গত দশ বছরের তৃণমূল শাসনে দলবাজি, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি না দেওয়া ইত্যাদি জনবিরোধী কাজের জন্য বহু মানুষের ন্যায্য ক্ষোভ রয়েছে। গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিরোধীদের উপর পরিকল্পিত হামলা বর্তমান শাসকদলের দম্ভ ও অগণতান্ত্রিক মানসিকতার চরম নিদর্শন। ৩৫% মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। এর সুযোগ নিয়ে বিজেপি তার সমর্থন বাড়িয়ে তুলেছে। বামেদের ৩৪ বছরের শাসনকালেও নানা স্বৈরাচারী পদক্ষেপ আমরা দেখেছি।  এইসব কাজে লাগিয়ে বিজেপি – আর এস এস ক্ষমতা দখলের জন্য মরীয়া হয়ে উঠেছে। কিন্তু আমরা স্পষ্টই বলতে চাই তৃণমূল কিংবা বাম-কংগ্রেস জোটের চেয়ে সব অর্থেই এরা অনেক ভয়ঙ্কর শক্তি। গোটা দেশে ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন চালালেও আর এস এস- বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের শাসনক্ষমতা এখন পর্যন্ত পায়নি। তাই এরা ক্ষমতা দখলের জন্য মরিয়া।  অপরদিকে ফ্যাসিবিরোধী যে সমস্ত মানুষ আজ বিভিন্ন রাজ্যে লড়াই চালাচ্ছেন, তাঁরাও চাইছেন এরা যেন পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় না আসতে পারে।

আজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এই ফ্যাসিস্ট শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই চলছে। গত বছর গুজরাটে পেপসি কোম্পানির বিরুদ্ধে কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ জমি লুঠ বন্ধ করার লড়াই সফল হয়েছে।  পশ্চিমবঙ্গে এন আর সি- এন পি আর-সি এ এ বিরোধী লড়াইয়ের ফলে ওরা জল মাপছে,  বেশি এগোতে সাহস পাচ্ছে না। কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে পাঞ্জাব-হরিয়ানা-উত্তরপ্রদেশের কৃষকদের নেতৃত্বে তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলছে কৃষক বিদ্রোহ। দিল্লিকে ঘিরে ফেলে জাতীয় সড়ক অবরোধ করেছেন কৃষকরা।  কৃষকদের আম্বানি-আদানি-জিও বয়কটের ডাকে সাড়া দিচ্ছে দেশের কোটি কোটি মানুষ। কোম্পানিগুলোর গায়ে জোর ধাক্কা লেগেছে। পাঞ্জাবে বিজেপিকে সামাজিক বয়কট করা হচ্ছে, বিজেপি নেতাদের ঘেরাও করা হচ্ছে। এতে প্রমাণ হচ্ছে যে ফ্যাসিস্ট শক্তিকে জনগণের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন দিয়েই প্রতিরোধ করা সম্ভব। আমাদের রাজ্যকেও সেই পথেই এগোতে হবে আজ।

এই লড়াইয়ের অংশ হিসাবে, নির্বাচনেও যাতে ওরা জিততে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের রাজ্যের বিধানসভা ভোটে তাই আমরা বিজেপির বিরুদ্ধে স্পষ্ট ডাক দিচ্ছি।  আমরা একদিকে যেমন রাস্তায় নেমে লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে এই ফ্যাসিস্ট শক্তিকে আটকাব, অন্য দিকে তেমনই ভোটেও হারানোর জন্য সাধ্যমত চেষ্টা চালাব। বাংলার সাধারণ মানুষের মঞ্চ গড়ে আমরা তাই আওয়াজ তুলেছি ‘নো ভোট টু বিজেপি। বিজেপি-কে একটি ভোটও নয়’।

আমরা মনে করি পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বিজেপি জিতলে এই রাজ্য সহ সারা দেশে ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন বাড়বে। এই আগ্রাসন শুধু অর্থনৈতিক রাজনৈতিক পরিসরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, গোটা বাংলার সংস্কৃতি, কৃষ্টি, ভাষা ও সম্প্রীতির নানা ঐতিহ্যকেও ধ্বংস করবে। পরাস্ত হলে সেই আগ্রাসন অন্ত কিছু সময়ের জন্য ধাক্কা খাবে।

সবশেষে বলি, অনেকে বলছেন ‘নো ভোট টু বিজেপি’ একটি নেতিবাচক শ্লোগান। প্রসঙ্গত আমরা বলতে চাই, স্পেনে ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ে জেনারেল ফ্রাঙ্কোর বিরুদ্ধে বামপন্থী নেত্রী ডোলোরেস ইবারুরির বিখ্যাত স্লোগান ছিল ‘নো প্যাসারন’ অর্থাৎ পিছোব না, যা আজও প্রতিবাদী মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে আছে। তাই না মানে নেতিবাচক নয়, ইতিবাচকও বটে।

~লেখক ‘নো ভোট টু বিজেপি’ উদ্যোগের সাথে যুক্ত (মতামত ব্যক্তিগত )

ছবি ঋণ: Wikimedia এবং নো ভোট টু বিজেপি-র Facebook Group

পড়ুন বিপক্ষের মতামত : “নো ভোট টু বিজেপি” – রাজনৈতিক স্লোগান অথবা দায়িত্বজ্ঞানহীন রাজনৈতিক হারাকিরি