৩১ অগস্ট, ১৯৫৯। তিরিশ হাজার নরনারী দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ কমিটির ব্যানারে জমায়েত হলেন কলকাতায়। ধর্মতলায় পুলিশ মিছিল আটকাল। মানুষ রাস্তায় বসে পড়লেন। বিকেল যখন সন্ধেয় মিশছে, তখনই শুরু হল বেপরোয়া লাঠিচার্জ আর টিয়ার গ্যাস৷ সন্ধে রাতের দিকে গড়িয়ে গেল। মার থামল না। ভারতের ইতিহাসে এমন নৃশংস পুলিশি হামলা খুব কমই ঘটেছে। সরকারি মতে মারা গেলেন আশি জন, বেসরকারি মতে আরও অনেক বেশি। এর পরের চার-পাঁচ দিন কলকাতার দখল নিলেন সাধারণ মানুষ। অসংখ্যবার গুলি চলল, লোক মরল, কিন্তু রাজপথ ছাড়ল না ক্ষিপ্ত জনতা৷  কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইট মেরে পুলিশকে তাড়িয়ে দিল ছাত্রছাত্রীরা। একদিনে তিরিশ জায়গায় গুলি চলল৷ ভাতের থালা সামনে নিয়ে বসে মানুষ মরল। ৭৫ বছরের চুনীলাল দত্ত, ১৪ বছরের সরোজ দাঁ মরল গুলিতে। শিবপুরের ১৮ বছরের ছেলে হারাধন পাল তেল মেখে পুকুরে নামার সময় গুলি খেয়ে মরল। তার মা ছুটে এসে জাপটে ধরলেন লাশ। পুলিশ লাশশুদ্ধু মাকে টেনে নিয়ে গেল থানায়। রাতে শ্মশানে একসঙ্গে পুড়ল আরও সতেরোটা লাশ। কংগ্রেস সরকার কেঁপে উঠল খাদ্য আন্দোলনের অভিঘাতে।

তিন বছরের মাথায় বিধানসভা নির্বাচনে কিন্তু আবারও ক্ষমতায় ফিরল কংগ্রেস। তার কয়েক মাস পরেই চীন ভারত যুদ্ধ। মোড় ঘুরে গেল রাজনীতির৷ কমিউনিস্ট পার্টির দফতরে লাগানো হল আগুন। দক্ষিণ কলকাতায় খুলল কুশপুতুল বিক্রির দোকান। সেখান থেকে জ্যোতি বসু আর চৌ এন লাইয়ের কুশপুতুল কিনে নিয়ে গেল কংগ্রেসিরা। ‘দেশদ্রোহী’ কমিউনিস্টদের উপর বর্ষিত হল গণঘৃণা। কলেজস্ট্রিটে ডাঁই করে পোড়ানো হল বামপন্থী বইপত্র। পাড়ায় পাড়ায় টহল দিল দক্ষিণপন্থী ঝটিকা বাহিনী৷ একঘরে হয়ে গেলেন কমিউনিস্টরা। পাড়াছাড়া হলেন অনেকে। সকালবেলার খবরের কাগজ হয়ে উঠল কংগ্রেসি দেশপ্রেমের মাউথপিস। খোলাখুলি ঘৃণা ছড়াতে শুরু করল লাল ঝান্ডার প্রতি।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

পার্টির অভ্যন্তরে আগে থেকেই মতভেদ ছিল। ক্রমশ তা আরও তীব্র হল। চওড়া হল ফাটল। এক অংশের কমিউনিস্টরা অভিযোগ করলেন, অন্য অংশের কমরেডরা তাঁদের পুলিশের হাতে তুলে দিচ্ছেন। পাল্টা অভিযোগ, পার্টি ভাঙার চক্রান্ত করছে অতিবামরা। অবশেষে ভেঙেই গেল পার্টি। ১৯৬৪ সাল। দু’টুকরো হয়ে গেল কমিউনিস্ট পার্টি।

১৯৬৬। একটানা প্রায় ৭ বছরের খরার পর ফের গোটা বাংলা ফেটে পড়ল ঐতিহাসিক গণআন্দোলনে। গত ৭ বছরে কমিউনিস্টরা দু’টুকরো হয়ে গেছে, একবার চীন, আরেকবার পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ হয়েছে। দেশপ্রেমের জোয়ার উঠেছে ভালভাবে। কংগ্রেসও ‘৫৯ সালের ধাক্কা সামলে জাঁকিয়ে বসেছে। কিন্তু ছেষট্টির খাদ্য আন্দোলন সব এলোমেলো করে দিল।

‘৬৫ সাল থেকেই বাংলায় খাদ্যের হাল শোচনীয়। চাষী ফসলের দাম পায় না, বাজারদর আকাশছোঁয়া, খাদ্যদ্রব্য অগ্নিমূল্য। মজুতদার আর কালোবাজারির দাপটে লোক না খেয়ে মরতে শুরু করেছে। এই অবস্থায় ১৯৬৬ সালের ৩০ জানুয়ারি মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি ডাক দিল -কলকাতা চলো। আশংকা ছিল, জমায়েত ভাল হবে না, কারণ ১৯৫৯ সালের নৃশংসতার স্মৃতি তখনও টাটকা। কিন্তু ময়দান উপচে পড়ল। কৃষক সভা ঘোষণা করল, ‘আর নিঃশব্দে মৃত্যু নয়, বাঁচার পথ সংগ্রামের।’ ১১ ফেব্রুয়ারি বামপন্থী নেতৃত্ব খাদ্য ও বন্দিমুক্তির দাবিতে সর্বাত্মক আন্দোলনের ডাক দিলেন।

সর্বত্র স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলন শুরু হয়ে গেল। প্রস্তুতিহীন, বিশৃঙ্খল, তেজোদীপ্ত। ১৬ তারিখ বসিরহাটে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী কোর্ট ঘেরাও করল। দাবি তুলল কেরোসিন আর রেশন সুষ্ঠুভাবে বন্টন করতে হবে। পুলিশ  বেধরক লাঠি চালাল, গুলি চলল৷ প্রাণ বাঁচাতে কয়েকজন লাফিয়ে পড়ল নদীতে। তাদেরও গুলি করল পুলিশ। ইছামতীর জল লাল হয়ে গেল রক্তে। এরপর কার্যত মুক্তাঞ্চল হয়ে গেল চব্বিশ পরগনার বিস্তীর্ণ অঞ্চল। পরেরদিন গুলি চলল স্বরূপনগরে। শহীদ হল নুরুল ইসলাম। স্কুলের ছাত্র নুরুলের লাশ নিয়ে মিছিল গ্রামের পর গ্রাম পেরল। শ্মশানে তোলা হল লাল পতাকা। ১৮ তারিখ বাদুরিয়ার গ্রামের পর গ্রাম পুলিশশূন্য করে দিল কৃষক সভা। জনতার তাড়া খেয়ে পালাতে পালাতে এলোমলো গুলি করল পুলিশ, শহীদ হল এক ছাত্র৷ ২০ তারিখ বাংলা জুড়ে শহীদ দিবস পালন করল দুই ছাত্র ফেডারেশন, পিএসইউ, ডিএসও, ছাত্র ব্লক। গণআন্দোলনের জোয়ারে রাজপথে মিশে গেলেন যুযুধান দুই কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীরা।

২০ তারিখ বারাসতে একের পর এক বাসে আগুন দিল ক্ষুদ্ধ জনতা। পোড়া বাসকে ব্যারিকেড বানিয়ে লড়াই হল পুলিশের সঙ্গে। রাজ্যজুড়ে কয়েক হাজার বাম কর্মী গ্রেফতার হলেন। দোসরা মার্চ আনুষ্ঠানিক ভাবে স্কুল-কলেজ খুলল, কোনও ক্লাস হল না৷ চৌঠা মার্চ রাজ্য জুড়ে ছাত্র ধর্মঘট ডাকল বামপন্থী ছাত্ররা। শিয়ালদহ স্টেশনের সামনে পুলিশ মিছিল থেকে গ্রেফতার করল বাম ছাত্র ফেডারেশন, ডিএসও এবং পিএসইউ কর্মীদের। গাড়ি ঘিরে ফেলল ছাত্রছাত্রীরা, ধৃতদের ছাড়িয়ে আনল। রাত পর্যন্ত সংঘর্ষ চলল গোটা মধ্য কলকাতা জুড়ে।

কলকাতার চেয়েও বড় বিক্ষোভ হল কৃষ্ণনগরে৷ পুলিশের গুলিতে একজন ছাত্র মারা গেল। এই খবর পেয়ে রানাঘাট, চাকদা, শান্তিপুর, পায়রাডাঙ্গা, মদনপুরে পুলিশের ফাঁড়িতে হামলা করল জনতা। থানা আক্রান্ত হল। সরকার বাধ্য হয়ে আর্মি নামাল রাজপথে। একদিনে দু’জন পুলিশ আর একজন আন্দোলনকারী মারা গেলেন। আটই মার্চ পর্যন্ত গোটা জেলা স্তব্ধ হয়ে রইল।

আন্দোলনের জোয়ারে কেঁপে গেল দিল্লির সরকার। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি বিবৃতি দিয়ে জনগণের হিংসাত্মক কার্যকলাপের নিন্দা করলেন। পাল্টা ১০ মার্চ হরতাল ঘোষণা করল বামপন্থী জোট। ৮ তারিখে কলকাতায় ৫৪০ জন, ২৪ পরগনায় ৬০০ জন, নদীয়া আর হাওড়ায় ৫০০ জন গ্রেফতার হলেন। বামপন্থীরা বললেন, সরকার যদি দমননীতি চালিয়ে যায়, তাহলে লাগাতার হরতাল চলবে। মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেন আর কংগ্রেস নেতৃত্ব জানালেন, বামপন্থীরা নৈরাজ্য চালিয়ে সরকারকে ব্ল্যাকমেল করছে। তাদের সঙ্গে কোনও আলোচনা করা হবে না। কড়া হাতে হরতাল ব্যর্থ করা হবে

১০ মার্চ সর্বাত্মক সফল হল হরতাল। রক্ত ঝরল অনেক। উত্তর কলকাতার বারো জায়গায় গুলি চলল, পুলিশের ভ্যান পুড়ল, বোমা পড়ল, মারা গেলেন দু’জন৷ রিষড়া-কোন্নগর-হিন্দ মোটরের এলাকায় এলাকায় হল সবচেয়ে রক্তাক্ত লড়াই। রেলের লাইন উপড়ে ফেলল জনতা। পুলিশ পাল্টা মার খেয়ে পিছিয়ে গেল। ১০ তারিখ রাতে কার্ফু জারি হল। বামপন্থী নেতৃত্ব বিবৃতি দিলেন, পরদিনও ধর্মঘট চলবে। ১১ তারিখও গুলি চলল, জবাবে উড়ে এল বোমা। ব্যাঙ্ক জ্বলল কলকাতায়, বাগবাজার, বেহালা, শ্রীরামপুরে থানার ভিতরে ঢুকে দখল নিল জনতা। মারা গেলেন ১২ জন। ১২ তারিখ মৃতের সংখ্যা বেড়ে হল ৩৪! লোকসভায় তোলপাড় শুরু হল। ইন্দিরা বললেন, কমিউনিস্টরা পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ করে তুলেছে।

১৩ মার্চ শহরে সংগঠিত হল সুবিশাল মৌন মিছিল। শিল্পী, বুদ্ধিজীবী, কবিরাও সামিল হলেন তাতে। স্টেটসম্যান লিখল- অভূতপূর্ব দৃশ্য! দু’মাইল লম্বা মিছিলে কোনও স্লোগান নেই, সবাই নীরবে হাঁটছেন। হাঁটছেন বৃদ্ধ এবং পঙ্গুরাও। মানুষের নীরব ঢেউ ভাসিয়ে দিচ্ছে কলকাতা।

আন্দোলনের চাপে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গুলজারিলাল নন্দ কলকাতায় এলেন। জেলবন্দি ৪৮ জন বাম নেতা মুক্তি পেলেন। কিন্তু তখনও ৭৫০০ মানুষ কারাগারে। কংগ্রেস দলের অন্দরেও দমননীতি নিয়ে তুমুল মতভেদ তৈরি হল। অর্ন্তকলহের জেরে মুখ্যমন্ত্রী একবার পদত্যাগপত্র দিয়েও তা প্রত্যাহার করলেন। দলের একাংশ কংগ্রেস ছেড়ে তৈরি করলেন নতুন দল- বাংলা কংগ্রেস। নেতৃত্বে মেদিনীপুরের অজয় মুখোপাধ্যায়। তিনি অগস্ট আন্দোলনের নেতা। সিপিআইয়ের বিশ্বনাথ মুখার্জির দাদা।

৬ এপ্রিল আবার ধর্মঘট ডাকল বামেরা। আবারও সর্বাত্মক সফল। ময়দানের উপচে পড়া সভায় নেতৃবৃন্দ বললেন, এই সরকার কেবল হরতালের ভাষা বোঝে। তাই দাবী না মানা পর্যন্ত হরতাল হবে। প্রয়োজনে তিন, চার দিন ধরে টানা হরতাল হবে।

নির্বাচন এসে গেল। প্রবল কংগ্রেস বিরোধী হাওয়া সত্ত্বেও বিরোধীরা একজোট হতে পারলেন না। একদিকে থাকল সিপিআইএম, আরএসপি, আরসিপিআই, এসইউসি, মার্কসবাদী ফরওয়ার্ড ব্লক, বলশেভিক পার্টির মতো দল, অন্যদিকে সিপিআই, বাংলা কংগ্রেস, ফরওয়ার্ড ব্লক। কংগ্রেস পেল ১২৭ আসন। সিপিআইএম ৪৩, বাংলা কংগ্রেস ৩৪, সিপিআই ১৬, ফরওয়ার্ড ব্লক ১৪, আরএসপি ৬, এসইউসি ৪ আসন৷ কংগ্রেস এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল না। দুই ফ্রন্টেরও ম্যাজিক ফিগার নেই। কিন্তু রাস্তায় রাস্তায় জনতা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে উৎসব শুরু করে দিল৷ আবির উড়িয়ে, বাজনা বাজিয়ে মিছিল করল সাধারণ মানুষ। পরিস্থিতির চাপে দুই ফ্রন্ট ঐক্যবদ্ধ হল। দোসরা মার্চ নতুন মন্ত্রিসভা শপথ নিল। ময়দানের বিরাট জনসভা লালে লাল৷ বাংলার প্রথম অকংগ্রেসী সরকারের যাত্রা শুরু হল।

১৯৫৯ থেকে ১৯৬৭। এই ৮ বছরের ইতিহাস প্রমাণ করেছে, অসম্ভব বলে কিছু নেই। কংগ্রেসি স্বৈরাচারের সামনে বুকটান করে দাঁড়িয়েছিলেন বামপন্থীরা। পার্টির ভাঙন, একের পর এক নির্বাচনে পরাজয়, চিন যুদ্ধের সময় কার্যত একঘরে হয়ে যাওয়া – এই সবকিছুকে পেরিয়ে তাঁরা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন যুক্তফ্রন্ট সরকার৷ যা কার্যত অসম্ভব বলে মনে হচ্ছিল, তাকে সম্ভব করে তুলেছিলেন৷ জনগণের ক্রোধকে দিতে পেরেছিলেন বাম দিশা। কোনও শর্টকাট পথে নয়, নির্বাচনী পাটিগণিত কষে নয়, এই সাফল্য এসেছিল রক্তের বিনিময়ে। রাজপথের মরিয়া লড়াই জিতিয়ে দিয়েছিল বামপন্থীদের৷ প্রমাণ হয়েছিল, মানুষই ইতিহাস তৈরি করেন।

আমাদের কি এর থেকে কিছুই শেখার নেই আর?

খাদ্য আন্দোলন ও জ্যোতি বসু ছবি ঋণ : CPIMWB Twitter

2 মন্তব্য

Leave a Reply