খেলা কি ঘুরছে?

কিসের খেলা? আমরা বামপন্থীরা রাজনীতিকে খেলা বলে মনে করি না। তবে হ্যাঁ, আমাদের শক্তি প্রতিদিন বাড়ছে। যাঁরা চলে গিয়েছিলেন আমাদের ছেড়ে, মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিলেন, তাঁদের একটা বড় অংশ ফিরে আসছেন। আমরা লড়ব। এবার শেষ পর্যন্ত লড়াই হবে।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

জঙ্গলমহলে হঠাৎ করেই সক্রিয় সিপিএম, গ্রামে গ্রামে লাল পতাকা, বিরাট মিছিল কারণটা কী? আপনার ক্যারিশমা?

আমি কেউ নই। পার্টিই সব। আমাদের পার্টি ছিল, আছে, থাকবে। কমিউনিস্ট পার্টিকে শেষ করা যায় না। গত এক দশক আমরা কোনমতে টিকে থেকেছি, দাঁতে দাঁত কামড়ে পড়ে থেকেছি। এবার আমাদের ফিরে আসার পালা।

টিভিতে, সংবাদপত্রে তো শুধু তৃণমূল আর বিজেপি। আপনারা কোথায়? আদৌ আছেন?

আপনি দুটো দল দেখছেন, আমি দেখছি একটা দল। শুভেন্দু অধিকারীকে জঙ্গলমহলের লোক চেনে না? এতদিন সে কী করেছে মানুষ ভুলে গেছে? ভারতী ঘোষকে মানুষ চেনে না? এরা সব বিজেপিতে গিয়ে শুদ্ধ হয়ে গেল? শুনুন, গরীব মানুষ যদি একজোট হয়, তাহলে একদিকে লাল ঝান্ডা, অন্যদিকে বাকি সব। আমি তো গ্রামে গ্রামে গিয়ে বলছি, তৃণমূল চোর, বিজেপি ডাকাত বাঁচতে চাইলে এই লাল পতাকার তলায় আসতে হবে। মানুষ সাড়াও দিচ্ছেন।

আপনার নামে তো অনেক অভিযোগ। কঙ্কাল কাণ্ড…

হ্যাঁ, অনেক অভিযোগ। মাটির নীচে বছরের পর বছর চাপা পড়ে থাকা কঙ্কালের গায়ে অবিকৃত গেঞ্জি-জাঙিয়া পরানো ছিল… আপাতত উঠি, ১০-১২টা গ্রামে যেতে হবে। মানুষ অপেক্ষা করে আছেন।

ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে সত্যিই যেন অনেকখানি বদলে গিয়েছে জঙ্গলমহল। বামপন্থীদের সভায় উপচে পড়ছে ভিড়। যুব সংগঠনের বাইক মিছিলের শেষ দেখা যাচ্ছে না। বসে যাওয়া, গ্রাম ছাড়া কর্মীরা ফিরছেন। একের পর এক এলাকায় প্রায় এক দশক বন্ধ থাকা পার্টি অফিস খুলে বসছেন সিপিএম কর্মীরা। বেদখল হয়ে যাওয়া পার্টি অফিস দখল করছেন বামেরা। গ্রামে গ্রামে লাল ঝান্ডা উড়ছে। বামেদের ডাকা ধর্মঘটে কার্যত স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে বিস্তীর্ণ এলাকা।

শুধু এটুকুই নয়। নতুন করে আবার শোনা যাচ্ছে রাজ্য রাজনীতির এক সময়ের বিখ্যাত (বা কুখ্যাত) শব্দ — হার্মাদ। তৃণমূল-বিজেপির অন্দরে চাপা ফিসফাস — ২০১১ পূর্ববর্তী লাল সন্ত্রাস ফেরানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সিপিএম। বিরোধীদের অভিযোগ, এক সময়ের “কুখ্যাত হার্মাদরা” নতুন করে সক্রিয় হচ্ছে। মাটিতে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে যে, গড়বেতা, শালবনী, চন্দ্রকোনা, কেশপুরের মতো বেশ কিছু এলাকার ছবিটা নাকি অনেকটাই বদলে গেছে । লড়াই এখানে এখন আর দ্বিপাক্ষিক নয়, পুরোপুরি ত্রিপাক্ষিক। তৃণমূল-বিজেপির প্রবল প্রতিপক্ষ হিসাবে গত তিন মাসে উঠে এসেছে সিপিএম।

নেপথ্যে রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী সুশান্ত ঘোষের ফিরে আসা।

————————

সুশান্ত ঘোষ ফ্যাক্টর আমাদের চিন্তায় ফেলে দিল। গ্রামের পর গ্রামে আমাদের সঙ্গে আসা মানুষজন সিপিএমে ফিরে যাচ্ছেন। বিশেষ করে তৃণমূলকে রুখতে যে মুসলমানরা বিজেপিতে এসেছিলেন, তাঁদের পুরো অংশটাই প্রায় ফিরে যাচ্ছেন।

————————

আদালতের নির্দেশে টানা এক দশক নিজের এলাকায় ফিরতে পারেননি সুশান্ত। দক্ষিণ কলকাতার যে ফ্ল্যাটে তিনি থাকতেন, সেখান থেকে ঢিল ছুঁড়লে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শান্তিনিকেতন রেসিডেন্সিতে গিয়ে পড়বে। মাঝখানে কয়েকটি বাড়ির ব্যবধান। কয়লা পাচার কাণ্ডে সিবিআই হানার পর এখন অভিষেকের বাড়ির সামনে সংবাদমাধ্যম আর পুলিশের ভিড় লেগেই আছে। কিন্তু ডায়মন্ড হারবারের সাংসদের এক দশকের বিতর্কিত পড়শির আর হরিশ মুখার্জি রোডের ফ্ল্যাটে ফেরার সময় নেই। দিনরাত এক করে সুশান্ত চষে ফেলছেন পশ্চিম মেদিনীপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা। হাঁটছেন গ্রামের পর গ্রাম। করছেন ছোট ছোট বৈঠক, হাটসভা, কখনো কখনো জনসভা। একটাই বার্তা : আমি ফিরে এসেছি, আর ভয় নেই।

“বিশ্বাস করুন, ম্যাজিকের মতো কাজ হচ্ছে। সিপিএমের যে মাস বেসটা কার্যত উবে গিয়েছিল, আমাদের দাপটে যাদের দেখাই যেত না, সেটাই ফিরে আসছে। আমাদের তো বটেই, বিজেপির চোখে চোখ রেখে কথা বলছে।” বলছিলেন তৃণমূলের এক ব্লক সভাপতি। সুশান্তের কট্টর বিরোধী ওই নেতার কথায়, “উনি সুবিধার লোক নন। বাম আমলে বহু সন্ত্রাসের হোতা। ওঁর আমলে এই অঞ্চলে গণতন্ত্র ছিল না, লোকে কথা বলতে পারত না। কিন্তু ভদ্রলোকের সাংগঠনিক দক্ষতার কোনও জবাব নেই।”

তৃণমূলের এক জেলা স্তরের নেতা আবার নির্বাচনী পাটিগণিতে আশার আলো দেখছেন। তাঁর কথায়, “আপনি যদি এলাকা ধরে ধরে হিসাব করেন, তাহলে দেখবেন, সুশান্তবাবু ফিরে আসায় আমরা লাভবান হব। বামপন্থীদের যে বিপুল সংখ্যক কর্মী বিজেপিতে গিয়েছিলেন, তাঁদের বড় অংশ আবার সিপিএমে ফিরছেন। শুধু আমাদের দখল করা অফিসই তো সিপিএম পুর্নদখল করছে না, বিজেপির অফিসও করছে। এর ফলে বিরোধী ভোট যেভাবে বিজেপির দিকে জমাট বেঁধেছিল, তাতে ফাটল ধরবে। বিরোধী ভোট ভাগ হবে, আমরা জিতব।”

গড়বেতা এলাকায় বিজেপির প্রভাব সেই বাম আমল থেকেই। তবে সেই সময়ে যাঁকে কেন্দ্র করে বিজেপির সংগঠন চলত, তিনি এখন তৃণমূলে। পশ্চিম মেদিনীপুরের অন্য কোন কেন্দ্র থেকে প্রার্থী হতে পারেন। ফলে ঐ এলাকায় বিজেপি কিছুটা আত্মনির্ভর। কিন্তু শালবনী বা চন্দ্রকোনার মতো এলাকায় বিজেপির ভরসা মূলত বামপন্থীদের হারিয়ে যাওয়া জনভিত্তি। সঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর অনুগামীরা। জেলা বিজেপির এক নেতার মন্তব্য, “সুশান্ত ঘোষ ফ্যাক্টর আমাদের চিন্তায় ফেলে দিল। গ্রামের পর গ্রামে আমাদের সঙ্গে আসা মানুষজন সিপিএমে ফিরে যাচ্ছেন। বিশেষ করে তৃণমূলকে রুখতে যে মুসলমানরা বিজেপিতে এসেছিলেন, তাঁদের পুরো অংশটাই প্রায় ফিরে যাচ্ছেন।”

শুভেন্দু-ঘনিষ্ঠ এক নেতার অবশ্য দাবি, “সুশান্ত ঘোষ কোন ফ্যাক্টর নন। উনি রাজনৈতিকভাবে শেষ হয়ে গিয়েছেন। তৃণমূলকে হারাতে পারে একমাত্র বিজেপি। এটাই সহজ সত্য।”

————————

কোথায় পাও বলো তো এসব? গল্প লিখতে পারো তো! আরে এটা কমিউনিস্ট পার্টি, একটা পরিবারের মত। তুমি বরং আমার সঙ্গে গ্রামে গ্রামে চলো৷ মানুষের সাড়া দেখে অবাক হয়ে যাবে।

————————

কেবল তৃণমূল আর বিজেপিই তো নয়, সিপিএমের অন্দরেও শুরু হয়েছে টালমাটাল। সূত্রের খবর, জেলা নেতৃত্বে সুশান্তের প্রত্যাবর্তন ঠিক কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। “বিতর্কিত” নেতাকে ফেরানো নিয়ে আপত্তি ছিল অনেকেরই। একটি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ধারাবাহিক লেখায় সুশান্ত সরাসরি পার্টিবিরোধী মন্তব্য করেছেন — এই ফিসফাস এখনো কান পাতলেই শোনা যায়। এ কথাও ঠিক যে সুশান্ত ফেরার পরেই বিভিন্ন এলাকায় তাঁর অনুগামীরা সক্রিয় হতে শুরু করেছেন। ফলে সিপিএমের অন্দরের সমীকরণও বদলে গিয়েছে অনেকটাই। গড়বেতার নেতা সুকুর আলির কথাই ধরা যাক। তপন ঘোষ এবং সুকুর আলির নাম এক সময়ে রাজ্যের মানুষের মুখে মুখে ফিরত। তপনবাবু গত এক দশকে সক্রিয় থাকলেও “অসুস্থ” সুকুর কিছুটা নিষ্ক্রিয় ছিলেন বলে শোনা যায়। ইদানীং তিনি আবার রাজনীতির ময়দানে।

এসব অবশ্য ফুৎকারে উড়িয়ে দিচ্ছেন সুশান্ত। তাঁর কথায়, “কোথায় পাও বলো তো এসব? গল্প লিখতে পারো তো! আরে এটা কমিউনিস্ট পার্টি, একটা পরিবারের মত।” এরপরই হাসতে হাসতে তাঁর কটাক্ষ, “তুমি বরং আমার সঙ্গে গ্রামে গ্রামে চলো৷ মানুষের সাড়া দেখে অবাক হয়ে যাবে।”

অবাক না হওয়ার অবশ্য কারণও নেই। যে বেনাচাপাড়া গ্রামের কঙ্কাল কাণ্ড নিয়ে এত আলোচনা, সুশান্ত সেই গ্রামে যেতেই উড়ে এসেছে ফুল। তাঁকে ঘিরে স্লোগান দিয়েছেন বাসিন্দারা। গড়বেতার মুসলমান প্রধান এলাকায় কার্যত একা চলে গিয়েছেন সুশান্ত। সঙ্গে কেবল জনা তিনেক পার্টিকর্মী। গোটা গ্রাম ভিড় করে এসেছে তাঁর কথা শুনতে৷ চন্দ্রকোনায় তাঁর সভায় ঝেঁটিয়ে এসেছেন বিজেপিতে চলে যাওয়া বাম সমর্থকেরা। শালবনীতে তাঁকে দেখতে বিরোধী দলের সমর্থকরা পার্টি অফিস খালি করে ভিড় জমিয়েছেন।

জঙ্গলমহলের এক বামকর্মীর কথায়, “১৮০ ডিগ্রি না হোক, খেলা কিন্তু ১০০ ডিগ্রি ঘুরেছে। বাকিটা তো সময় বলবে…”

~ছবি ফেসবুক থেকে

আরো পড়ুন : ফিরে দেখা – খাদ্য আন্দোলন থেকে যুক্তফ্রন্টের দিকে >>

Leave a Reply