বিকশিত ভারতের নাম নিয়ে এ মাসে যে অন্তর্বর্তী বাজেট পেশ হল, তাতে কার জন্য কোথায় অমৃত আর কোথায় গরল বরাদ্দ হল তা বুঝে নেওয়া জরুরি। শিক্ষা নিয়ে এমনিতেই এই সরকারের নির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্য আছে। ২০২০ সালের নতুন শিক্ষানীতি সেইসব লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য খুব ভাল করেই আমাদের সামনে স্পষ্ট করে দিয়েছে। সর্বজনীন শিক্ষার ধারণার থেকে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে কীভাবে বের করে নিয়ে যাওয়া যায়, এই নীতি তারই নীল নকশা। গত চারবছর ধরে বিজেপি সরকার সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী নিরন্তর কাজও করে চলেছে এবং বলার অপেক্ষা রাখে না, যে তার বিরুদ্ধে খুব বেশি প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। নির্মলা সীতারামণের এবারের বাজেটকে এই প্রেক্ষিতে দেখা ভাল।

ইউপিএ সরকারের আমলে ২০০৪-২০১৪ সাল অবধি শিক্ষা খাতে গড় ব্যয় বরাদ্দ ছিল জিডিপির ০.৬১%। এনডিএ সরকারের দশ বছরে সেই গড় নেমে এসে দাঁড়িয়েছে ০.৪৪%। অর্থাৎ এমনিতেই ভারতে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কম ছিল। নরেন্দ্র মোদীর আমলে তা আরও সংকুচিত হয়েছে। ‘মোদী হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়’। জাতীয় শিক্ষানীতি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল “In order to attain the goal of education with excellence and the corresponding multitude of benefits to this Nation and its economy, this Policy unequivocally endorses and envisions a substantial increase in public investment in education by both the Central government and all State Governments. The Centre and the States will work together to increase the public investment in Education sector to reach 6% of GDP at the earliest.” (NEP, 61)

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

অর্থাৎ কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্য সরকারগুলো শিক্ষায় অর্থ বরাদ্দ বাড়াবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। যদিও ২০২০ সালের পর থেকে এবার নিয়ে চারবার বাজেট পেশ করা হলেও উল্টোটাই দেখা যাচ্ছে। আগেরবারের তুলনায় এবছর শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির সাপেক্ষে আরও কমেছে। দেশের বিভিন্ন মন্ত্রকের জন্য বরাদ্দ হিসাব করলে দেখা যাচ্ছে শিক্ষার কপালে জুটেছে মাত্র ২.৯%।

বাজেট পেশের পর অর্থমন্ত্রী তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে এক পোস্টে দাবি করেন, অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হয়েছে। বলা হয় সাতটা আইআইটি, ১৬টা আইআইআইটি, সাতটা আইআইএম, ১৫টি এইমস এবং ৩৯০টা বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করা হয়েছে।

এই দাবিগুলোকেও একটু খতিয়ে দেখলে আসল ছবিটা বোঝা যাবে। ২০২৪ সালে ১৫টা নতুন এইমস তৈরির সিদ্ধান্ত নেয় বিজেপি সরকার। তার মধ্যে এখনও অবধি সাতটার কাজ শেষ হয়েছে। যেগুলো শেষ হয়েছে, তার প্রায় সবকটাতেই চিকিৎসা চলছে নির্দিষ্ট কয়েকটা বিভাগে, মেডিকাল শিক্ষাদানের ব্যবস্থাও পুরোপুরি শুরু হয়নি। এইমস গৌহাটি, মাদুরাই, বিজয়পুর – এমন বেশকিছু প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার কাজটা চলছে অন্য অস্থায়ী ক্যাম্পাস থেকে। রেওয়ারি, অবন্তীপুর, দ্বারভাঙ্গা – এই জায়গাগুলোতে তো এখনো পড়াশোনা শুরুই হয়নি।

এইমস মাদুরাই ২০২৭ সালে উদ্বোধন হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে গত ডিসেম্বরেই। অথচ ১৫ খানা এইমস দেখিয়ে দেশের শিক্ষার প্রগতির ফলাও বিজ্ঞাপন করছেন অর্থমন্ত্রী। গতবছরের মাঝামাঝি প্রকাশ্যে আসা ২০২১ সালের সিএজি রিপোর্টে নতুন তৈরি হওয়া সাতটা আইআইটির নির্মাণকাজে বিলম্ব, সামগ্রিক পরিকাঠামোর খারাপ গুণমান, পরীক্ষাগারের সামগ্রীর অপ্রতুলতা – এমন আরও কিছু কিছু বিষয় সামনে আসে। অর্থাৎ নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরির কথা ঘোষণা হয়েছে, হয়ত তার ভবনও তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেগুলোর গুণমান যথাযথ নয়। অথচ এবারের বাজেট আইআইটির বরাদ্দ ৫৯.৭ কোটি টাকা কমিয়ে দিয়েছে। যে ৩৯০টা বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির কথা বলা হচ্ছে, তার মধ্যে বেশিরভাগই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। বিজেপি সরকারের জমানায় কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হয়েছে সাতটা। এর মধ্যে ভারতীয় রেলের কর্মীদের প্রশিক্ষণের জন্য তৈরি একটা প্রতিষ্ঠানকে বিশ্ববিদ্যালয়ের তকমা দেওয়া হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে সিন্ধু কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, যে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগের সংখ্যা মাত্র তিন। সাধারণ ডিগ্রি কলেজও এর থেকে বেশি বিভাগ নিয়ে তৈরি হয়। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, অর্থমন্ত্রীর এই ৩৯০ বিশ্ববিদ্যালয় আসলে কোথায়? বিভিন্ন রাজ্য সরকারের তৈরি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকেগুলোকেও কি কেন্দ্রীয় সরকারের কৃতিত্ব হিসাবে তুলে ধরা হচ্ছে?

এবারের বাজেটে অবশ্য স্কুলশিক্ষায় বরাদ্দ অনেকটা বাড়ানো হয়েছে। তবে এই খবরে খুব বেশি উল্লসিত হওয়ার কারণ নেই। আপনার বাড়ির পাশের সরকারি স্কুলে সেই বরাদ্দের চুঁইয়ে পড়া সুবিধা এসে পৌঁছবে না। কারণ নয়া শিক্ষানীতি মোতাবেক মূলত পিএম-শ্রী প্রকল্পের আওতায় তৈরি হওয়া স্কুলগুলোতেই এই বরাদ্দ এসে পৌঁছবে। বাকি সরকারি স্কুলগুলো আরও শক্তিশালী হবে, এমন আশা না করাই ভাল। এখন অবধি যে কোনো লেখাপড়ার জিনিসপত্রের উপর ১২% জিএসটি নেওয়া হয়। প্রায়শই স্কুলশিক্ষার খরচের সঙ্গে সঙ্গে এই খরচও গরিব মানুষের মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়ায়। দীর্ঘদিন বিভিন্ন মহল থেকে এই কর ছাড়ের দাবি জানানো হলেও, এখনো সামান্য পেন্সিল থেকে পাঠ্যবই – সবেতেই ওই হারে জিএসটি বর্তমান।

এবছর অন্তর্বর্তী বাজেটে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের বরাদ্দ ৬১% আগের বছরের থেকে কমানো হয়েছে। উচ্চশিক্ষাকে ভাতে মারার চেষ্টা ছাড়া একে কি আর কোনোভাবে দেখা সম্ভব? ৬,৪০৯ কোটি থেকে এই বরাদ্দ কমিয়ে আনা হয়েছে ২,৫০০ কোটি টাকায়। এর প্রভাব সরাসরি ভারতের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়বে। এমনিতেই গত কয়েক বছরে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফি বৃদ্ধির ঝোঁক চোখে পড়েছে। সরকারের ব্যয় সংকোচনের ফলে আরও ফি বাড়ানো, সেলফ ফাইন্যান্সড কোর্সের সংখ্যা বৃদ্ধির মত বিষয় বাড়াবে। সামগ্রিকভাবে অভিজাত শ্রেণির জন্য শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার পথে এই পদক্ষেপ কার্যকরী ভূমিকা নেবে।

রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বাবদ ১ লক্ষ কোটি টাকার একটা তহবিল তৈরি করার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, এ থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য ঋণ দেওয়া হবে। অর্থমন্ত্রী এই ঘোষণার সঙ্গে একটা তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলেছেন – এ থেকে চাইলে বেসরকারি শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত সংস্থাও ঋণ নিতে পারবে। ঋণের সুদের ব্যবস্থাটাও গোলমেলে। বলা হয়েছে, এই ঋণ বিনা সুদে বা নামমাত্র সুদে নেওয়া যাবে। অর্থাৎ চাইলে কোনো সংস্থা বিনা সুদে ঋণ পেতে পারে, আবার কোনো গরিব ছাত্রকে এই ঋণ নিলে সুদ দিতেও হতে পারে। অর্থাৎ বৈষম্যের ব্যবস্থা রাখা হল। এভাবে কী করে দেশের গবেষণার মান বাড়বে তা যথেষ্ট ধোঁয়াশার।

সরকার বিভিন্ন রকম কর্মকুশলতামূলক কোর্স এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সেগুলোর গুরুত্বের কথা বলছে। অথচ আইআইএমের বরাদ্দ গতবছরের ৩০০ কোটি থেকে কমিয়ে ২১২ কোটি টাকায় নিয়ে আসা হয়েছে। ম্যানেজমেন্ট কোর্সে এমনিতেই অনেক বেশি কোর্স ফি দিতে হয়। সেখানে সরকারের এই বরাদ্দ কমানোর মানে সরকারি ম্যানেজমেন্ট কোর্সের অপ্রতুলতা বাড়ানো।

এমনিতেই এই বাজেটে শিক্ষাজগতের পাওনা খুব বেশি নয়। যে কয়েকটা জায়গায় বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে বা নতুন বরাদ্দ হয়েছে সেগুলো খুব বেশি সাধারণ ছাত্রছাত্রীকে সাহায্য করবে না। বরং উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে গবেষক ও ছাত্রদের কপালে আরও ভাঁজ পড়বে। মিড-ডে মিলে (এখন পিএম পোষণ) বরাদ্দ সামান্য বাড়ানো হলেও তা যথাযথ নয়। সব মিলিয়ে জিডিপির ৬% বরাদ্দের থেকেও এই বাজেট বহুদূর দিয়ে হেঁটেছে। সব মিলিয়ে বলতে হয়, গত এক দশকে যেভাবে ফেব্রুয়ারি মাসগুলো শিক্ষাক্ষেত্রের জন্য আর্থিক দুঃসংবাদ নিয়ে আসে, লোকসভা ভোটের বছরেও তার ব্যতিক্রম হল না।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.