লোরেটো কলেজের তুঘলকি নির্দেশ নিয়ে ঘোলা জল থিতোতে শুরু করেছে। বাংলা মাধ্যম, ঔপনিবেশিকতা, ট্যাঁশ কালচার, এমনকি জাতীয়তাবাদ এবং দলিত রাজনীতিও নিশ্চিন্তে আসন পাতল কুনাট্যের রঙ্গমঞ্চে। সাহেবপাড়ায় মেমের কলেজের প্রতি একটা মাৎসর্য তো ছিলই। কাঞ্চনজঙ্ঘা ছবির নায়িকার প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় প্রেসিডেন্সি কলেজ জানার পর নায়ক যখন নিজের সাকিন জানায় বঙ্গবাসী; তখনই এলিট আর মুটে মজুরে ফারাক হয়ে যায়। আর অধুনা বিতর্কে ঘি পড়েছে কলেজ প্রশাসনের অবিমৃশ্যকারিতায়। ফলাফল বাজার গরম এবং বুদ্ধিজীবিতার নরক গুলজার।

কাঞ্চনজঙ্ঘা মুক্তি পেয়েছিল ১৯৬২ সালে। অর্থাৎ উন্নাসিক আর নাকখত্তার আড়াআড়ি বিভাজনের গ্লানি নিয়ে বাংলা ও বাঙালি এতকাল কাটিয়ে দিয়েছে। লোরেটো কি তাকে একটা নোটিসবদ্ধ করতে গিয়েই ডুবল? ইতিহাসের ক্ষতের উপর থেকে ইচ্ছে করে ভুলে থাকার ব্যান্ড-এড উপড়ে ফেলাই কি জাতির এই আপাত-ছটফটানির কারণ? জাতি হিসাবে আর কতবার নিজেকে ছোট দেখতে হবে ভেবে নাজেহাল বাঙালি কি এবার ইতিহাস পাল্টাতে নামছে? এই প্রশ্নগুলো সঙ্গতভাবেই উঠছে। চর্চাও চলছে। প্রতি আলোচনাতেই উঠে আসছে ইতিহাস। সে ইতিহাস যতটা জাতির, ততটাই ব্যক্তির। আধা-ঔপনিবেশিক মিনারের মত দাঁড়িয়ে থাকা লোরেটো বা ওই ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলির বাংলার প্রতি ঐতিহাসিক উপেক্ষার মেটান্যারেটিভ থাকছে; আবার সেই উপেক্ষাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজের লড়াই জিতে যাওয়ার ক্ষুদ্র ইতিহাসও এখন গৌরবগাথা হয়ে আছড়ে পড়ছে সোশাল মিডিয়ায়। কিন্তু এহ বাহ্য! আপনার, আমার যে এই নোটিস পড়ে মাথায় খুন চেপে যাবে, এটা লোরেটো বুঝতে পারল না? এ কি সম্ভব? তাহলে সম্যক উপলব্ধির পরেও এই পদক্ষেপ কি তাদের দুর্মর নাক-উঁচানির জ্ঞাপক, নাকি তাদের কোনো অসহায়তা চালনা করল এই উদভ্রান্ততার দিকে?

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

রাত গভীর হয়, উত্তর মেলে না…

জাতীয় শিক্ষানীতি ও ডিগ্রি কলেজের সংকট

লোরেটো যে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ (যার আপাত গুঁতোয় লোরেটোর এই পশ্চাদপসরণ), সেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বহু পা ঘষাঘষির পর জাতীয় শিক্ষানীতির আদলে চার বছরের আন্ডারগ্র‍্যাজুয়েট শিক্ষাক্রম চালু করতে চলেছে ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে। এই লেখার মুসাবিদা অবধি বিশ্ববিদ্যালয় কেবলমাত্র কোন কোন বছর কী কী পড়া হবে, তা নির্ণয় করতে পেরেছে মাত্র। বিষয়ভিত্তিক কোনো সিলেবাস হাতে আসেনি কোনো বিভাগের। স্মর্তব্য, আগামী ১ অগাস্ট থেকে নতুন প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু। অধ্যাপকরা জানেনই না আর দিন কুড়ি বাদে সদ্য স্কুল পেরনো ছেলেমেয়েগুলোর জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নেবেন তাঁরা।

আর সেমেস্টারভিত্তিক যে বিষয় বিভাজন হয়েছে, তাতে সাবেক অনার্সের জায়গা নিচ্ছে মেজর। অনার্স থাকছে; তবে তা চার বছরে ৭৫% নম্বর প্রাপ্তির পর একটি গবেষণা-সন্দর্ভ সমাপনান্তে! আর সেই অনার্স বিষয়ের গুরুত্ব কমছে মাইনর, ইন্টারডিসিপ্লিনারি বিষয়, ইন্ডিয়ান নলেজ সিস্টেম, এবং লক্ষণীয়ভাবে বাধ্যতামূলক ইংরেজি ও অন্য একটি ভারতীয় ভাষার কোর্সকে জায়গা দিতে গিয়ে। যে বিষয়ে অনার্স তাতে চার বছরে প্রায় ২৪টি পেপার পড়তে হবে, টিউটোরিয়াল ও সেমেস্টার শেষের পরীক্ষা দিতে হবে! অধ্যাপক মহলে সরস মস্করা চলছে – সিলেবাসের জটিল বিন্যাসের উপরেই একটা আস্ত ছোট প্রশ্নের পরীক্ষা নেওয়া যায়। চতুর্থ বর্ষের গবেষণার পদ্ধতি, বিষয়, সুপারভাইজারের যোগ্যতা ইত্যাদি নিয়েও কোনো স্বচ্ছ পরিকল্পনা মেলেনি অদ্যাবধি।

এই জটিলতার সলতে পাকানো শুরু হয়েছিল বার্ষিক ব্যবস্থার পর সেমেস্টার আসার সময় থেকেই। তিন বছরে আটটি পেপার পড়ে অনার্সের বৈতরণী পেরনোর দিন ফুরিয়ে নামল ছয় সেমেস্টারে ১৮টি কোর্স পড়ার ঢল। শুধু গ্রামগঞ্জ নয়, শহরের বহু কলেজের ছেলেমেয়েদের অসহায়তার কথাও একটু কান পাতলেই শোনা যেত। অনলাইন পরীক্ষার প্রহসন না থাকলে এই ব্যবস্থা বেআব্রু হত অনেক আগেই। সারার্থ দাঁড় করানো হয়েছিল অনেকটা এরকম, যে বিষয়ের গভীরে ঢোকা বিলাসিতা। যার সাংস্কৃতিক ও অন্য নানাবিধ পুঁজি আছে, তার কথা স্বতন্ত্র। কিন্তু সাধারণ ছেলেমেয়েদের ভবিতব্য ওই উপর উপর পড়ে কোনো প্রথিতযশা বা অর্বাচীন টিউটরের নোট উগরানো। বিগত কিছুদিনের অভিজ্ঞতা যা বলছে তাতে ‘লড়ে জিতে নেওয়া’ বাংলা মিডিয়ামের বহু উজ্জ্বল মুখ কিন্তু তিন বছরের বার্ষিক ব্যবস্থার ফলাফল; যেখানে দুবছরে চারবার ম্যাকবেথ পড়ে, অন্তত দুবার ডিকেন্সের নভেলটা পড়ে লড়ে নেওয়ার সুযোগ ব্যবস্থা তাকে দিয়েছিল। অধুনা শিক্ষানীতির বিসমিল্লায় এলিটিজম। তাই “বাড়িতে পরিবেশ কোথায়? কোনোদিন নভেল কী, তাই চোখে দেখেনি! জানো, শেক্সপিয়ার বানান লিখতে গিয়ে যা সব লিখছে!” – এই জাতীয় হেয়োক্তিকে হারিয়ে দেওয়ার মত শক্ত চোয়ালের জন্ম আর বোধহয় কলকাতা বা শহরতলির কলেজগুলোতে হবে না। লোরেটো এটা সম্যক বুঝেছে। আর আমরা মুন্ডু লুকোবার জন্য পেয়েছি জাতীয়তা আর নস্ট্যালজিয়ার বালুকাস্তুপ।

লড়ে নেওয়ারা যাবে কোথায়?

গ্রাম-মফস্বলি সেই ছেলেমেয়েগুলো তাহলে উবে যাবে নাকি? রোগাসোগা যে মেয়েটা পেটে খিদে আর চোখে আগুন নিয়ে ক্লাসে রোজ আসত, কোনো একটা প্রাইভেট স্কুলে ক্রীতদাসত্ব করতে করতে যে ফোন করে এখনো বলে “স্যার, বিসিএস দেব। এসএসসি তো আর হবে না…” সেই মেয়েটা? তার এই জাতীয় শিক্ষানীতিতে ডিগ্রি কলেজে স্থানাঙ্কটা কী? বিশ্ববিদ্যালয় ‘মাল্টিপল এক্সিট’ মেনে নিচ্ছে। এক বছর পড়ে সার্টিফিকেট, দুবছরে ডিপ্লোমা, তিন বছরে ডিগ্রি আর চার বছরে অনার্স ডিগ্রির থাকবন্দি ব্যবস্থায় আর ড্রপ-আউট নেই। মাথাই নেই, তার মাথাব্যথা! কিন্তু বীভৎস মজাটা এর পর। সার্টিফিকেট থেকে অনার্স ডিগ্রি – যা-ই হোক, তা পেতে গেলে শুধু পরীক্ষা পাস নয়, ১৪ হপ্তার সামার ইন্টার্নশিপ করতেই হবে। পুঁজির কেটে দেওয়া গণ্ডিতে জ্ঞানবিকাশের অব্যর্থ আনন্দযজ্ঞে সবার নিমন্ত্রণ থাকছে না, থাকতে পারে না। কোথায় হবে এই ইন্টার্নশিপ? কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে হওয়াই শিক্ষানীতির কাম্য। ছেলেমেয়েরা কাঙ্ক্ষিত ‘এমপ্লয়েবিলিটি’ অর্জনের যোগ্য হবে – এ তো ভালো কথা। তবে সামান্য বিচারেই এই উদ্যোগ যে শস্তার শ্রমিক তৈরির আখড়া হিসাবেই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়কে দেখছে, তা স্পষ্ট হয়ে যায়।

অতঃপর, যে লড়ে নেওয়ার, পালটে দেওয়ার সংকল্প নিয়ে ইংরেজিতে বই পড়া, গান শোনা, উত্তর লেখা, রাজনীতি আর প্রেম – সব করে ফেলা গেছিল; সেই জেদটাকে পুঁজি নিজের কাজে লাগাবে। লোরেটো কেন, কোনো কলেজের কোনো অধ্যাপকের পক্ষেই আর বলা সম্ভব নয় যে ইংরেজিটা শিখে নেওয়া যাবে। যেমন যে কোনো জিনিস শিখে নেওয়া যায়। কারণ সময়ই নেই, কারণ ডিগ্রি কলেজ থেকে দরকচা মারা শস্তা শ্রমের বাইরে সেভাবে রাষ্ট্রের আর কিছু চাওয়ারই নেই।

এলিটিজম বিনা গীত নাই…

লোরেটোর বাপান্ত করতে গিয়ে শহুরে এলিটিজমের চামড়া গোটানোয় আপামর বাঙালি নেট-নাগরিকদের উৎসাহ চোখে পড়ার মত। স্বীকার করতেই হয়, এর বেশ খানিকটা সত্যের উপরেই দাঁড়িয়ে। কিন্তু এখানেও ইতিহাস-বিলাসের আলখাল্লায় ঢেকে যাচ্ছে ঘটমান বর্তমানের বাঘনখ।

ভারতজুড়ে কলেজের মানের ক্রম তালিকা, র‍্যাঙ্কিং ইত্যাদি একটি কলেজের অস্তিত্বরক্ষার সঙ্গে ধীরে ধীরে জড়িয়ে যাচ্ছে। NAAC, NIRF – এসবের বেঁধে দেওয়া মানদণ্ডে মাপজোক হচ্ছে প্রান্তিকতম কলেজটারও। তার ভিত্তিতে সুনাম, অনুদান, গবেষণাপ্রকল্প প্রাপ্তির সুযোগ। উচ্চশিক্ষায় জাতীয় শিক্ষানীতি পুরোপুরি লাগু হলে এই মানদণ্ড রাতারাতি রাজদণ্ডে পরিণত হবে বলে আশংকা আকাঞ্চনজঙ্ঘাকাকদ্বীপ সব প্রতিষ্ঠানের। কম ছাত্রছাত্রীর একাধিক কলেজ নাকি মিশে যাবে, অনুদানে আসবে কোপ, কলেজ চালানোর একটা শতাংশ নিজেদেরই রোজগার করে নিতে হবে কলেজগুলোকে – এইসব কানাঘুষোয় আতঙ্ক বাড়ছে সব মহলে। জাতীয় শিক্ষানীতি বলছে আগামী ১৫ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ কলেজ উঠে গিয়ে থাকবে শুধু স্বয়ংশাসিত কলেজ। সেই মানে উঠতে না পারলে কোন অতলে তলিয়ে যেতে হবে, কেউ জানে না। সেখানে ইন্টার্নশিপ আর প্লেসমেন্টে খারাপ ফল মানে যে শিয়রে শমন – তা প্রান্তিক কলেজ বুঝছে, লোরেটোও সম্যক বুঝেছে। প্রান্তিক কলেজের বুঝেও নিশ্চিন্তে কাঁঠালপাতা খাওয়া ছাড়া গতি নেই। লোরেটো সেখানে লড়ে নেওয়ার চেষ্টা করবে নিজের পুঁজির জোরে – এটাই বাজারের নিয়ম। খাস কলকাতায় NAAC-এর নতুন কাঠামোয় র‍্যাঙ্কের অবনতি হয়েছে বেশ কিছু কলেজের। লোরেটো বা ওই জাতীয় প্রতিষ্ঠান যদি একে পাত্তা না দেয়, আমি-আপনিই দশ বছর বাদে হাটে বাজারে এদের নিন্দেমন্দ করে বেড়াব (সাবেক প্রেসিডেন্সিয়ানদের এটা অন্যতম বিলাস)। ফলত, ৩৬৫ দিনে নানা অছিলায় ২০০ দিন স্কুল বন্ধ রাখার সাপ্লাই লাইনকে লোরেটো অস্বীকার করেছে। সাত-আট বছর শিক্ষক নিয়োগ না হওয়া দিশাহীন ব্যবস্থার শিকার শিক্ষার্থীদের প্রবেশাধিকার দিতেও সে অস্বীকার করেছে। কান পাতুন, বাজার বলছে “বেশ করেছে!” মধ্যবিত্ত বাঙালি নিজের নার্সারিতে পড়া বাচ্চার ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া টিউটরের জন্য হন্যে। ইন্ডাস্ট্রি ইন্টার্নশিপ বা প্লেসমেন্টে বাংলা মাধ্যম যে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হবে, তা তো জানা কথাই।

তবু লোরেটো, তোমার মন নাই?

এই ওয়েবসাইটেই জাতীয় শিক্ষানীতি বিষয়ক সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক আব্দুল কাফি বলেছেন, শেষ বিচারে একজন শিক্ষক যেন বেদনাবিদ্ধ হতে ভুলে না যান। কিছু করার নেই – এই বোধটা যে যন্ত্রণার জন্ম দেয়, তা বিস্মৃত না হন। লোরেটোর সেই কুখ্যাত নোটিসটি (এবং পরবর্তীকালে তাঁদের ক্ষমা চাওয়ার বিজ্ঞপ্তিটিও) কী নির্মমভাবে নৈর্ব্যক্তিক! একটিবারের জন্যও প্রতিষ্ঠানটি নিজের সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করছে না। বলছে না, “দ্যাখ বাবারা, মায়েরা… যা চাপ, যা সময় আর সিস্টেমের দাবি, তাতে এক্সট্রা ক্লাস করিয়ে, আলাদা ট্রেনিং দিয়ে তোদের ইংরেজিটা দাঁড় করিয়ে দেব, এমন উপায় নেই। তাই আগে তোদের দিদিদের এই কলেজে পড়াতে পারলেও এখন তোদের আর পড়াতে পারব না” (ভাষাটা না হয় ইংরেজিবেত্তা লোরেটো কর্তৃপক্ষ গুছিয়ে নিতেন)। এখানে দোষ হচ্ছে শিক্ষার্থীর। কেন সে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করেনি? ক্ষমাপ্রার্থনার বয়ান তো আরো সরেস। তাঁরা মাফ-টাফ চেয়ে বাংলার গৌরববৃদ্ধিতে নিজেদের পুনর্নিয়োজিত করলেন, যেমনটা ঐতিহাসিকভাবে করে এসেছেন! ইতিহাসের আড়ালে বাদী-বিবাদী দুপক্ষই আশ্রয় খুঁজে পাচ্ছেন দেখে বহতা বর্তমান নিজের জিত সম্বন্ধে আরও নিশ্চিত হবে, বলাই বাহুল্য।

ইতিহাসের মেদুর আবডাল যেটাকে কিছুতেই ঢাকতে পারছে না তা হল এই বিজ্ঞপ্তিগুলি তো কোনো শিক্ষকেরই কলমপ্রসূত। সেই শিক্ষকরা, আমরা, এত হৃদয়হীন হয়ে গেলাম? কী ঘটে গেল? নিজেদের এলিট বলে প্রমাণ করার নেশা এত পেয়ে বসল? এরও উত্তর আছে। জাতীয় শিক্ষানীতি নির্ধারিত বিস্তীর্ণ সিলেবাস পড়ানো কোনো কলেজের পক্ষেই আগামীদিনে পুরোপুরি সম্ভব হবে কিনা – সে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। তাহলে উপায়? শিক্ষককে রূপান্তরিত হতে হবে। শিক্ষক থেকে ‘ফেলিসিটেটর’ হয়ে ধীরে ধীরে ‘কন্টেন্ট ক্রিয়েটর’ হয়ে উঠতে হবে। ম্যাসিভ ওপেন অনলাইন কোর্স (MOOCs)-এ চলে আসবে তাঁর তৈরি লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম। অনতিদূর ভবিষ্যতে রক্তমাংসের শিক্ষকের প্রয়োজন কমে আসতে বাধ্য। আর কোনোদিন ক্লাসে না গিয়ে, শিক্ষককে ব্যক্তিগতভাবে না চিনে, বন্ধুত্ব-টন্ধুত্বের তোয়াক্কা না করে কর্পোরেটের সেবাদাসত্ব করে রাতে মোবাইল খুলে ওই লড়াকু ছেলেমেয়েটা পড়ে নেবে সেই পাঠ, যার ঠিক দুটো লক্ষ্য থাকবে। এক, কর্পোরেট কাঠামোয় যাতে সে আরও নিঃশেষে প্রাণ বিলিয়ে দিতে পারে তা নিশ্চিত করা। কারণ পাঠক্রম সেই অনুযায়ী নির্মিত। সমগ্র বছর জুড়ে ‘স্কিল এনহ্যান্সমেন্ট’ আর ‘এবিলিটি এনহ্যান্সমেন্ট’ কোর্সের বহর তা বুঝিয়েও দিচ্ছে। আর দুই, এক বায়বীয় ভারতীয় জাতিসত্তার প্রতি অন্ধ শ্লাঘাবোধের নির্মাণ। ইন্ডিয়ান নলেজ সিস্টেমের নামে দিকে দিকে এটা শুরু হল বলে।

এখানে আমাদের ধ্রুপদী শিক্ষকতা অচল আধুলি হয়ে উঠবে অচিরেই। বাংলার অধ্যাপক ভাববেন কোন প্রকাশনা বা মিডিয়া হাউসে যোগাযোগ করবেন যাতে ছেলেমেয়েগুলোর একটা ভাঙাচোরা ইন্টার্নশিপ জুটে যায়, ইংরেজির অধ্যাপক কল সেন্টারে ছাত্র জোগান দিতে উদগ্রীব হবেন। তাতে সমস্যা নেই। সমস্যা হল, সমগ্র ব্যবস্থাটা অস্থির, ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেছে। চল্লিশ শতাংশ কোর্স অনলাইনে চলে আসার প্রস্তাব শুনতে পাই। কোনো একটা কলেজের ওয়েবসাইটে বা কোনো সরকারি পোর্টালে একটা ৪-৫ ঘন্টার কোর্সের গুরুত্ব নাকি সারা সেমেস্টার ক্লাস করার সমান। যে সমস্ত সহকর্মীরা এই ধরনের কোর্স তৈরি করে ফেলছেন, তাঁরা নন্দিতও হচ্ছেন অধ্যাপক মহলে। অফিশিয়াল মিটিংয়ে ডাকসাইটে অধ্যক্ষ বলছেন, “ছেড়ে দিন। এইসব পাস কোর্সের স্টুডেন্টরা কাম-কাজ করে খাক। আর কিছু নোটপত্তর আর এইসব লেকচারগুলো অনলাইনে শুনে পাস করে বেরিয়ে যাক!” স্তম্ভিত হয়ে ভাবি, এটাই কি ডিসটোপিয়া?

শিক্ষকরা শিক্ষানীতির দশচক্রে নিজেদের বেদনাবোধ হারাচ্ছেন। একেবারে কাঠামোগতভাবে হারাচ্ছেন। লোরেটো এইটা স্পষ্ট করে দিয়েছে। এইবার এটার বিরুদ্ধে লড়ে, জিতে দেখানোই বাঙালির বড় কাজ।

~ মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.