পঞ্চায়েত নির্বাচনে উত্তরবঙ্গের একাধিক জেলা নিয়ে মাথাব্যথা রয়েছে তৃণমূলের। কিন্তু দক্ষিণবঙ্গের লড়াই শাসক দলের জন্য তুলনামূলকভাবে সহজ। বস্তুত, বিরোধী দলনেতা তথা নন্দীগ্রামের বিজেপি বিধায়ক শুভেন্দু অধিকারীর নিজের জেলা পূর্ব মেদিনীপুর ছাড়া দক্ষিণবঙ্গের অন্য কোথাও জেলা পরিষদ দখল করা নিয়ে তৃণমূল নেতৃত্ব চিন্তিত নয়। পূর্ব মেদিনীপুরে লড়াই হলেও তৃণমূলকেই সামান্য এগিয়ে রেখেছে জনপ্রিয় টিভি চ্যানেলের প্রাক-নির্বাচনী সমীক্ষার ফলাফল। কিন্তু আপাত নিরঙ্কুশ দক্ষিণবঙ্গেও শাসক দলের সামনে রয়েছে একাধিক কাঁটা। সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল কুড়মি ভোট।
জঙ্গলমহলে উনিশের লোকসভা নির্বাচনে প্রবল ধাক্কা খেয়েছিল তৃণমূল। একুশের বিধানসভা নির্বাচনে সেই ধাক্কা সামলে ওঠে রাজ্যের তারা। তারপর থেকেই জঙ্গলমহলে ক্রমশ দুর্বল হয়েছে বিজেপি। পুরুলিয়ার মত জেলায় গেরুয়া শিবিরের চিন্তা বাড়িয়ে সক্রিয় হয়েছে কংগ্রেস এবং বাম শিবিরও। পৌরসভা নির্বাচনে নেপাল মাহাতোর নেতৃত্বে ঝালদায় জয়ী হয়েছে কংগ্রেস। কিন্তু গত কয়েক মাসে অনেকটাই বদলে গিয়েছে জঙ্গলমহলের পরিস্থিতি। নেপথ্যে কুড়মি আন্দোলন।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
কুড়মি জনজাতিকে তফসিলি উপজাতি তালিকাভুক্ত করার দাবিতে আন্দোলনে করছেন কুড়মি জনজাতির মানুষ। এই আন্দোলনের বিরাট প্রভাব পড়েছে গোটা জঙ্গলমহলে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কনভয়ে হামলার অভিযোগ উঠেছে। গ্রেফতার হয়েছেন বহু কুড়মি নেতা। কুড়মিদের সঙ্গে বোঝাপড়া করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে শাসক দল। তৃণমূল নেতারাও পাল্টা আক্রমণের পথে হেঁটেছেন। কুড়মিদের খালিস্তানিদের সঙ্গে পর্যন্ত তুলনা করেছেন স্থানীয় তৃণমূল নেতারা। পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে কুড়মি সমাজের ক্ষোভের পারদ বেশ চড়া। কিন্তু তৃণমূলকে হারাতে কোনো প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলকে সমর্থনের পথে হাঁটেননি তাঁরা।
পঞ্চায়েত নির্বাচনে পশ্চিম মেদিনীপুরসহ জঙ্গলমহলের চার জেলায় নিজেদের প্রার্থী দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন কুড়মিরা। পাশাপাশি স্লোগান দেওয়া হয়েছে- ‘নো ভোট টু টিএমসি’। গত বিধানসভা নির্বাচনের সময়ে যেমন বিজেপির বিরুদ্ধে ‘নো ভোট টু বিজেপি’ স্লোগান উঠেছিল, ঠিক তেমন করেই তৃণমূলকে প্রধান শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করে কুড়মিদের ঘাঘর ঘেরা কেন্দ্রীয় কমিটি ডাক দিয়েছে – তৃণমূলকে একটি ভোটও নয়। তবে কোনো বিরোধী রাজনৈতিক দলকেও তাঁরা সমর্থন করবেন না। কুড়মি প্রতিনিধিরা নির্দল হিসাবে লড়বেন।
কুড়মিদের সমর্থন পেতে চেষ্টা করেছিল সব বিরোধী দলই। কিন্তু সফল হয়নি। মনোনয়ন পর্ব শুরু হওয়ার আগে বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার বলেছিলেন, “কুড়মিরা দীর্ঘদিন ধরে বিজেপিকে সমর্থন করেন। আমরা ওঁদের বলব, আলাদা প্রার্থী না দিয়ে আপনারা বিজেপিকে ভোট দিন।” কিন্তু তাঁর প্রস্তাবে সাড়া দেননি কুড়মি নেতারা। দিলীপ ঘোষকেও কুড়মিদের ক্ষোভের মুখে পড়তে হয়েছিল। অন্যদিকে পুরুলিয়া জেলা পরিষদের ৪৮টি আসনের মধ্যে ১৮টিতে কুড়মি সমাজের মানুষজনকে প্রার্থী করেছে বামফ্রন্ট। কিন্তু ঘাঘর ঘেরা কমিটির সমর্থন ছাড়া তাঁরা কুড়মি ভোট কতটুকু পাবেন তা নিয়ে সংশয় থাকছেই।
মুখে অবশ্য রীতিমত প্রত্যয়ী তৃণমূল নেতারা। নাগরিক ডট নেটকে জঙ্গলমহলের দাপুটে তৃণমূল নেতা অজিত মাইতি বলেছেন, “কুড়মিদের জন্য মুখ্যমন্ত্রী একগুচ্ছ প্রকল্প নিয়েছেন। জঙ্গলমহলে তৃণমূলের পাশে সবথেকে বেশি দাঁড়াবে কুড়মি সমাজের মানুষই।” কিন্তু বাস্তবের ছবিটা একদম আলাদা। কুড়মি সমাজের দাপটে বহু এলাকাতেই প্রবল অস্বস্তিতে তৃণমূল। ইতিমধ্যেই বেশ কিছু আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে গিয়েছেন কুড়মি প্রার্থীরা। যেমন পুরুলিয়া ২ নম্বর ব্লকের আগয়া নড়রা গ্রাম পঞ্চায়েতের ডুমুরডি সংসদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছেন কুড়মি সমাজ সমর্থিত নির্দল প্রার্থী রঘুনাথ মাহাতো। ওই সংসদে আরও দুজন নির্দল প্রার্থী মনোনয়ন পত্র জমা করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁরা তা প্রত্যাহার করেন। একইভাবে বান্দোয়ান গ্রাম পঞ্চায়েতের গঙ্গামান্না গ্রামের ২ নম্বর সংসদে কুড়মি সমাজ সমর্থিত নির্দল প্রার্থী শিবানী রাজোয়াড় জয়ী হয়েছেন। বহু জায়গায় কুড়মিদের দাপটে প্রচার করতে পারছে না তৃণমূল। ঝাড়গ্রামের দুথকুন্ডি গ্রাম পঞ্চায়েতের বড়গহিরা গ্রামে তৃণমূল কংগ্রেসের ঝান্ডা টাঙাতে গিয়েছিলেন শাসক দলের কর্মীরা। ওই গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ কুড়মি সম্প্রদায়ের। কুড়মি সমাজের মহিলারা তৃণমূলের পতাকা টাঙাতেই দেননি। শাসক দলের নেতাদের সামনেই স্লোগান ওঠে, “আমার দেওয়াল আমারই থাক।”
অবশ্য কুড়মিদের তীব্র তৃণমূলবিরোধিতা তৃণমূলকে সত্যিই কতখানি সমস্যায় ফেলবে, তা নিয়ে সংশয় আছে। কারণ কুড়মি আন্দোলনের বিরোধিতা করছেন অন্য আদিবাসী সম্প্রদায়ের বড় অংশ। তাছাড়া কুড়মিদের শক্তি বেশ কিছু পকেটে সীমাবদ্ধ। সেই ব্লকগুলো থেকে তৃণমূল হয়ত মুছে যেতে পারে, কিন্তু সার্বিকভাবে জেলা পরিষদ দখলের যুদ্ধে কতখানি সমস্যায় পড়বে তা নিয়ে সন্দেহ আছে।
কুড়মিদের পৃথক প্রার্থী দেওয়া চিন্তায় রেখেছে বিরেধীদেরও। নাগরিক ডট নেটের কাছে কংগ্রেস নেতা নেপালবাবুর আক্ষেপ, কুড়মিদের মধ্যে বড় সংখ্যায় কংগ্রেসের সমর্থক আছেন। কিন্তু পঞ্চায়েতে তাঁরা লড়ছেন কুড়মি সমাজের টিকিটেই। ফলে কংগ্রেস যত আসন পেতে পারত, তত হয়ত হবে না।
পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রাম – এই চার জেলায় মোট বিধানসভা আসনের সংখ্যা ৪০। এর মধ্যে পুরুলিয়ায় ৯, বাঁকুড়ায় ১২, পশ্চিম মেদিনীপুরে ১৫ এবং ঝাড়গ্রাম জেলায় ৪ বিধানসভা আসন রয়েছে। একদা মাওবাদীদের দুর্গ এই জঙ্গলমহল এলাকা ২০১১ সাল থেকে তৃণমূলের গড় বলেই পরিচিত ছিল। কিন্তু ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে এই অঞ্চলে পাঁচটার মধ্যে চারটে লোকসভা আসনেই জিতেছিল বিজেপি। উনিশের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে এই অঞ্চলের ৪০ বিধানসভা আসনের মধ্যে ৩১টায় এগিয়ে ছিল বিজেপি। কিন্তু একুশের বিধানসভা নির্বাচনে ঘুরে দাঁড়িয়ে করে ৪০টার মধ্যে ২৫ বিধানসভা আসন জিতে নেয় তৃণমূল।
বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিম মেদিনীপুরে মাত্র দুটো আসনে জয় পায় বিজেপি – ঘাটাল এবং খড়্গপুর সদর। এছাড়া বাকি সবই যায় তৃণমূলের দখলে। তার মধ্যে ছিল গড়বেতা, গোয়ালতোড়, মেদিনীপুর সদর, শালবনী, কেশিয়াড়ির মত জঙ্গলমহল এলাকার অন্তর্গত আসন। ঝাড়গ্রাম জেলারও সবকটা আসন দখল করে তৃণমূল। বাঁকুড়া জেলায় অবশ্য ১২টা আসনের মধ্যে আটটা বিজেপি দখল করে। কিন্তু তালড্যাংড়া, রানিবাঁধ, রাইপুরের মত জঙ্গলমহল এলাকার অন্তর্গত আসন যায় তৃণমূলের ঝুলিতে। পুরুলিয়ায় নটা আসনের মধ্যে ছটা পায় বিজেপি। কিন্তু বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকেই ভাঙতে শুরু করে বিজেপির সংগঠন।
আপাতদৃষ্টিতে জঙ্গলমহলের জেলা পরিষদগুলো নিয়ে তৃণমূলের খুব দুশ্চিন্তার কারণ নেই। কারণ একদিকে বিজেপির নড়বড়ে অবস্থা, অন্যদিকে বাম-কংগ্রেসের সক্রিয়তায় বিরোধী ভোট ভাগ হওয়া। একমাত্র পুরুলিয়ায় খানিকটা লড়াই দিতে পারে বিরোধীরা, কিন্তু সেক্ষেত্রেও ভোট ভাগের অঙ্কে অ্যাডভান্টেজ তৃণমূল। তবে পঞ্চায়েত সমিতি এবং গ্রাম পঞ্চায়েত স্তর নিয়ে উদ্বেগ থাকছেই শাসক দলের। তার উপর যোগ হয়েছে কুড়মি কাঁটা।
~মতামত ব্যক্তিগত
আরো পড়ুন :
- জনপ্রিয় জনমত সমীক্ষা নিয়ে কিছু খটকা
- বিজেপির উত্থানে তৃণমূলের কপালে ভাঁজ ফেলেছে উত্তরবঙ্গ
- রাজনৈতিক হিংসার উৎস সন্ধানে একটি সমীক্ষা
- তৃণমূলের অন্তর্দ্বন্দ্বের সুযোগে মুর্শিদাবাদ পুনরুদ্ধার করবেন অধীর?
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








