২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে খোদ অধীর চৌধুরীর খাসতালুক বহরমপুর বিধানসভায় কংগ্রেসের প্রার্থী মনোজ চক্রবর্তী তৃতীয় হবেন – এমনটা খুব বেশি মানুষ ভাবেননি। ঠিক তেমনই সাগরদীঘির উপনির্বাচনে কংগ্রেস জিতে যাবে, এমনটাও খুব একটা জনপ্রিয় মতামত ছিল না সাংবাদিক ও রাজনৈতিক মহলে। কিন্তু দুটোই হয়েছে। একদা অধীরের গড় মুর্শিদাবাদ জেলায় এবারের পঞ্চায়েত নির্বাচনেও কেন্দ্রীয় চরিত্র সেই তিনিই। বহরমপুরের কংগ্রেস সাংসদ তথা প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি কি তাঁর দুর্গের খানিকটা পুনরুদ্ধার করতে পারবেন? নাকি তাঁরই প্রাক্তন সহকর্মীদের মাধ্যমে মুর্শিদাবাদে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা কায়েম রাখবে তৃণমূল কংগ্রেস?
২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে ভোট দিতে পারেননি জেলার মানুষ। অধিকাংশ আসনে মনোনয়নই জমা দিতে পারেননি বিরোধীরা। এবার কিন্তু ছবিটা তেমন নয়। জেলার বহু জায়গায় রীতিমত সেয়ানে সেয়ানে টক্কর দিচ্ছেন বিরোধীরা। আক্রান্ত হতে হচ্ছে শাসক দলকেও। বহু তৃণমূল নেতা, এমনকি জেলা পরিষদ সদস্যও, দলবদল করে ভিড়ে যাচ্ছেন হাত শিবিরে। নির্দিষ্ট কিছু পকেটে প্রবল প্রতিরোধ গড়ছে সিপিএমও।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
রাজ্যে পালাবদলের পর প্রথম পঞ্চায়েত নির্বাচনে ২০১৩ সালে মুর্শিদাবাদ জেলা পরিষদ দখল করে কংগ্রেস। সাগরদীঘির মত দু-একটা পকেট বাদে তখন জেলায় কার্যত চিহ্নই ছিল না তৃণমূলের। এক দশক আগের সেই নির্বাচনে মুর্শিদাবাদে একটাও পঞ্চায়েত সমিতি পায়নি তৃণমূল। অধিকাংশ পঞ্চায়েত সমিতি পেয়েছিল কংগ্রেস। কিছু ছিল বামফ্রন্টের দখল। এরপর থেকেই সিরাজের জেলায় অধীরের নবাবি ভাঙতে তৎপর হয় তৃণমূল।
২০১৬ সালে মুর্শিদাবাদের রাজনীতিতে তৃণমূলের দায়িত্ব নেন শুভেন্দু অধিকারী। অধুনা রাজ্য বিজেপির মুখ তথা নন্দীগ্রামের বিধায়কের হাত ধরেই মুর্শিদাবাদে শুরু কংগ্রেস, বামেদের ভাঙন। শুভেন্দু দল পালটে চলে গিয়েছেন পদ্ম শিবিরে। তবে কংগ্রেসের ভাঙন যেন ভাগীরথীর মতই, থামার নাম নেই। একের পর এক দুর্গ হাতছাড়া হয়েছে অধীরের। তাঁর অতি বিশ্বস্ত সঙ্গীরা দল বদল করে চলে গিয়েছেন তৃণমূলে। কার্যত নিঃসঙ্গ সম্রাট অধীর গত লোকসভা নির্বাচনে তুমুল চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন তাঁর এক সময়ের ডান হাত কান্দির বিধায়ক অপূর্ব সরকার ওরফে ডেভিডের সামনে। কোনোমতে জিতলেও প্রবল চাপের মধ্যে রয়েছেন লোকসভায় কংগ্রেসের দলনেতা।
সাগরদীঘি নির্বাচনের ফল বাম, কংগ্রেস শিবিরকে কিছুটা অক্সিজেন জুগিয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস যে অপরাজেয় নয়, সেটা সাগরদীঘির মানুষ দেখিয়ে দিয়েছেন। বায়রন বিশ্বাসের দলবদল কংগ্রেসকে অস্বস্তিতে ফেলছে ঠিকই, তবে উপনির্বাচনের গণরায় যে তাতে বদলে যায়নি, তা জানেন তৃণমূল নেতারাও। মুর্শিদাবাদে এবারের পঞ্চায়েত যেমন কংগ্রেসের, বামফ্রন্টের শক্তি বাড়ানোর ভোট। তেমনই ভোট তৃণমূলের সম্মানরক্ষারও। কারণ শুভেন্দুর শিবির বদলের পর এই জেলা নিজে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখেন স্বয়ং অভিষেক ব্যানার্জি। বায়রনও তাঁর হাত ধরেই শিবির বদল করেছেন।
জেলার গ্রামাঞ্চলে বিজেপি প্রান্তিক শক্তি। কংগ্রেস, সিপিএম এবং তৃণমূলের দুই পক্ষের বিবাদে মনোনয়ন পর্ব থেকেই উত্তপ্ত মুর্শিদাবাদ। জেলায় খুন হয়েছেন দুজন। একজন মনোনয়ন জমার প্রথম দিনেই, অন্যজন শেষ দিনে। একজন কংগ্রেসের কর্মী, অন্যজন তৃণমূল কংগ্রেসের অঞ্চল সভাপতি। ঘটেছে একাধিক বোমাবাজির ঘটনা। তবে একতরফা নয়। ডোমকল, রানিনগরে সিপিএম ও কংগ্রেস কর্মীরা হাতে লাঠি, ইট নিয়ে তাড়া করেছেন তৃণমূলের কর্মীদের। সরিয়ে দিয়েছেন শাসক দলের অবরোধ। প্রায় সব আসনেই প্রার্থীও দিয়েছে দুই দল। জেলার বড় অংশের পঞ্চায়েতে হয়ে গিয়েছে নিচুতলার জোটও। এটাই ভাবাচ্ছে তৃণমূলকে। এর মধ্যেই প্রকট হয়েছে মুর্শিদাবাদে তৃণমূলের গোষ্ঠীকোন্দলও। বিদ্রোহের সুর শোনা গিয়েছে চার তৃণমূল বিধায়কের গলায়। দলের বিরুদ্ধে গিয়ে নির্দল প্রার্থী দাঁড় করিয়েছেন তৃণমূলের বিধায়ক হুমায়ুন কবীর।
অধীরের কাছে এই নির্বাচন সত্যিই বড় চ্যালেঞ্জ। শুধু কংগ্রেস নয়, অধীরের নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও লুকিয়ে আছে পঞ্চায়েতের ভোট প্রক্রিয়ায়। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে এ যেন তাঁর শক্তি পরীক্ষার শেষ সুযোগ। মরিয়া অধীর কখনো ছুটে যাচ্ছেন আক্রান্ত কংগ্রেস কর্মীদের বাড়ি। কখনো এই বয়সেও বিডিও অফিসের সামনে অবস্থান বিক্ষোভে বসছেন। বার্তা দিচ্ছেন, কর্মীদের পাশে আছেন তিনি। জেলায় দলের ভিত্তি ফেরাতে কংগ্রেসে টেনেছেন বিক্ষুব্ধ তৃণমূল নেতাদেরও। তবে কংগ্রেসকে ভাবাচ্ছে বুথ স্তরে সাংগঠনিক দুর্বলতা। একই চিন্তা মুর্শিদাবাদ জেলার বামফ্রন্টেরও।
এক সময় অধীরের সঙ্গে সেয়ানে সেয়ানে লড়াই করেছেন বামফ্রন্ট নেতারা। সেই কংগ্রেসের সঙ্গে বোঝাপড়ার কথাই এখন সিপিএম নেতাদের গলায়। দলের জেলা সম্পাদক জামির মোল্লা কার্যত জানিয়েই দিয়েছেন, কংগ্রেসের সঙ্গে ভোটের আগের দিন পর্যন্ত সমঝোতার সব রাস্তা খোলা আছে। তবে গ্রাম পর্যায়ে জোটের সিদ্ধান্ত দলের পঞ্চায়েত স্তরের নেতাদের উপরই ছেড়ে দিয়েছেন দুই দলের নেতারা। একদা এই জেলা ছিল আরএসপির শক্ত ঘাঁটি। লালবাগের মতো এলাকা ছিল ফরোয়ার্ড ব্লকের দুর্গ। তবে এখন বাম শরিকরা বেশ দুর্বল, শক্তি কমেছে সিপিএমেরও। তাই কয়েকটা পকেট বাদে বামেদের ভরসা কংগ্রেসের সাংগঠনিক শক্তি এবং অধীর ম্যাজিক।
একদিকে অধীরের নেতৃত্বে পুনরুজ্জীবিত কংগ্রেস, অন্যদিকে কিছু পকেটে বামেদের প্রতিরোধ চাপ বাড়াচ্ছে শাসক দলের। তার উপরে তাদের মাথাব্যথার কারণ ভয়াবহ গোষ্ঠীকোন্দল। তৃণমূল কংগ্রেস মুর্শিদাবাদ জেলাকে মূলত দুটি সাংগঠনিক জেলায় ভাগ করে কাজ করে। প্রথমটি বহরমপুর মুর্শিদাবাদ সাংগঠনিক জেলা। এর মধ্যে পড়ে বহরমপুর এবং মুর্শিদাবাদ লোকসভার প্রায় সবটুকু অঞ্চল। গোষ্ঠী বিরোধ সবচেয়ে বেশি এই এলাকাতেই। এই সাংগঠনিক জেলায় তৃণমূলের সভাপতি শাওনী সিংহরায়, যিনি কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে এসেছেন। বিগত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির কাছে হেরেছেন। তৃণমূলের গোষ্ঠী রাজনীতিতে শাওনীর বিপক্ষ শিবিরে ছিলেন মুর্শিদাবাদের সাংসদ আবু তাহের খান। তিনি ছিলেন এই সাংগঠনিক জেলার চেয়ারম্যান। কিন্তু গত কয়েকমাস ধরে গুরুতর অসুস্থ আবু তাহের খান রাজনীতিতে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়। তাঁর জায়গায় দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হয়েছেন অপূর্ব সরকার। অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ অপূর্ব সাংগঠনিক স্বার্থে শাওনীর সঙ্গে সংঘাতে যাননি ঠিকই, কিন্তু নিচের তলায় গোষ্ঠীবিরোধ চরমে।
আবু তাহের অনুগামীদের একাংশ শাওনীর শিবিরে যোগ দিয়েছেন। অন্য অংশ প্রাপ্য গুরুত্ব না পেয়ে ক্ষুব্ধ। সর্বত্র দুই শিবিরের গোলমাল রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে নওদার কথাই বলা যায়। এলাকার নেতা সাফিউজ্জামান ওরফে হবিব মাস্টারকে শাওনীর শিবির গুরুত্ব দিতে শুরু করতেই বেঁকে বসেছেন স্থানীয় বিধায়ক সাহিনা মমতাজ। এমন ছবিই সর্বত্র। চারজন বিধায়ক সরাসরি বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। রীতিমত সাংবাদিক বৈঠক করে দলীয় নেতৃত্বকে হুমকি দিয়েছেন রেজিনগরের রবিউল আলম চৌধুরী, ভরতপুরের হুমায়ুন, নওদার সাহিনা মমতাজ এবং জলঙ্গির আবুর রাজ্জাক। যদিও শেষ পর্যন্ত হুমায়ুন বাদে বাকিরা সরাসরি মাঠে নামেননি। কিন্তু ক্ষোভের পারদ চড়ছেই। তাকেই কাজে লাগাতে চাইছে কংগ্রেস।
বড়ঞার বিধায়ক জীবনকৃষ্ণ সাহা জেলে আছেন। জেলার বাকি বিধায়কদের একটা বড় অংশের অভিযোগ হল, তাঁদের অনুগামীরা টিকিট পাননি। তৃণমূলের অন্দরের খবর, অন্তত ৬-৭ জন বিধায়ক প্রবল ক্ষুব্ধ। তাঁরা হয় নিষ্ক্রিয়, নয়ত কংগ্রেস শিবিরকে সাহায্য করছেন, অথবা নির্দল প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করছেন।
বিধানসভা নির্বাচনে শূন্য হয়ে গেলেও মুর্শিদাবাদে প্রধান বিরোধী কংগ্রেস এবং সিপিএম। বিজেপির জেলায় দুজন বিধায়ক আছেন ঠিকই, তবে সেই দুটি বিধানসভার বিরাট এলাকা শহরে। বহরমপুর আর মুর্শিদাবাদ মিলিয়ে খান পাঁচেক পঞ্চায়েত বাদে অন্যত্র পদ্ম ফোটার সম্ভাবনা জেলা বিজেপির নেতারাও দেখছেন না।
আরো পড়ুন এবং শুনুন বিজেপির জন্য পরিস্থিতি সহজ করে দিলেন বায়রন
সিপিএমের সঙ্গে কংগ্রেসের বহু জায়গাতেই মজবুত জোট হয়েছে। আবার কিছু এলাকায় সচেতনভাবেই পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে জোট হয়নি। লালগোলার একাংশ, রানিনগরের একাংশ, ডোমকল, ইসলামপুর এবং জলঙ্গির মত সিপিএমের শক্তিশালী পকেটে মসৃণ জোট হয়নি। নির্বাচনের আগে অধীর বহু তৃণমূল নেতাকে কংগ্রেসে এনেছেন। তার মধ্যে জেলা পরিষদ সদস্য যেমন আছেন, প্রাক্তন ব্লক তৃণমূল সভাপতিও আছেন। এই নেতারা তৃণমূলের রাজনীতিরই অংশ। তৃণমূলে প্রাপ্ত গুরুত্ব না পেয়ে তাঁরা কংগ্রেস শিবিরে এসেছেন। শাসক দলকে বহু এলাকায় চোখে চোখ রেখে টক্কর দিচ্ছেন তাঁরা। সঙ্গে রয়েছে অধীরের জনপ্রিয়তা।
তৃণমূলের আরেক সাংগঠনিক জেলা হল জঙ্গিপুর। এই এলাকা নিয়ে শাসক দলের চিন্তা কম। সাংসদ খলিলুর রহমান এবং সাংগঠনিক জেলার চেয়ারম্যান তথা নবগ্রামের বিধায়ক কানাই মণ্ডলের নেতৃত্বে তৃণমূল অনেকটাই নিশ্চিন্ত। সুতির বিধায়ক ইমানি বিশ্বাস জেলা তৃণমূলের অন্দরে বিরোধী গোষ্ঠী হিসাবে পরিচিত হলেও তাঁর অনুগামীরাও পর্যাপ্ত টিকিট পেয়েছেন। এই এলাকায় বিরোধীরা তুলনামূলকভাবে কম শক্তিশালী। তার মধ্যেও সুতি এবং সাগরদীঘিতে কংগ্রেসের শক্তিশালী সংগঠন। রঘুনাথগঞ্জ ব্লক এবং নবগ্রামে বামেদের শক্তিও যথেষ্ট।
সবমিলিয়ে বেশ চাপে রয়েছে তৃণমূল। যদিও জেলা পরিষদ জেতা নিয়ে নিশ্চিত শাসকদলের নেতারা। অন্যদিকে কংগ্রেস নেতা মনোজ বলছেন “চব্বিশে অধীর সমেত জেলায় কংগ্রেসের তিনজন প্রার্থীই জিতবেন। পঞ্চায়েত নির্বাচন সেই বিজয়ের জমি তৈরির মঞ্চ।”
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







