সাধারণ নির্বাচনের আর এক বছরও বাকি নেই। এরকম সময়ে দেশের শাসক দল বিজেপির শতকরা একশো ভাগ নির্বাচনমুখী হয়ে পড়ার কথা (যদিও কোনো সময়েই তারা নির্বাচন ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে ভাবে না)। এরকম সময়ে বিরোধী দলগুলোরও বিজেপিকে আক্রমণ করার বদলে একে অপরকে আক্রমণ করে যাওয়ার কথা। সকলেরই দাবি করার কথা যে তারা সমমনস্ক দলগুলোর মধ্যে প্রধান এবং শাসকদের প্রধান বিরোধী শক্তি। কিন্তু এবারে একটা অন্যরকম ঘটনা ঘটেছে।
ভারতের উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা ১৭টা রাজনৈতিক দল বিহারের রাজধানী পাটনায় এক মঞ্চে একত্রিত হয়ে সমস্ত কেন্দ্রে বিজেপির বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রার্থী দেওয়ার ব্যাপারে আলোচনা আরম্ভ করেছে। এই বৈঠকে আম আদমি পার্টির উপস্থিতি কিছুটা অবাক করার মত, কারণ কংগ্রেস সম্পর্কে তাদের বিতৃষ্ণা মোটামুটি সর্বজনবিদিত। তবে আপ বৈঠকে এসেছিল একটা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে, যা বাকি দলগুলো বুঝতে পেরেছে। যে দলগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে অনুপস্থিত ছিল তাদের অনুপস্থিতি প্রত্যাশিতই ছিল। দলগুলো হল কর্ণাটকের জনতা দল সেকুলার, ওড়িশায় ক্ষমতাসীন বিজু জনতা দল, তেলেঙ্গানায় ক্ষমতাসীন ভারত রাষ্ট্র সমিতি, অন্ধ্রপ্রদেশে ক্ষমতাসীন ওয়াইএসআর কংগ্রেস পার্টি এবং অবশ্যই মায়াবতীর দল বহুজন সমাজ পার্টি।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
পাটনার এই বৈঠক থেকে কয়েকটা জিনিস পরিষ্কার হল।
প্রথমত, সদর্থক বিরোধী জোটের কেন্দ্রীয় শক্তি হিসাবে কংগ্রেসের স্থান মেনে নিতে উপস্থিত দলগুলোর বেশিরভাগেরই কোনো আপত্তি নেই। এবার কংগ্রেসের কাজ হল আসন্ন মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, ছত্তিশগড় এবং রাজস্থানের বিধানসভা নির্বাচনে জয় নিশ্চিত করে এই স্থান নিশ্চিত করা।
দ্বিতীয়ত, রাহুল গান্ধী বেশিরভাগ দলের কাছেই গ্রহণযোগ্য মুখ। একান্ত তাঁকে পছন্দ না হলে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়গে গ্রহণযোগ্য বিকল্প। কিছুটা ঝুঁকি নিয়েই বলি, তাঁর মধ্যে বিরোধী জোটের নেতা হয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত গুণই রয়েছে। তিনি বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, কড়া লোক, আদর্শবোধ প্রখর এবং তিনি দলিত। প্রধানমন্ত্রিত্বের দাবিদার হিসাবে তাঁকে হাজির করলে আপত্তি করবে কে?
তৃতীয়ত, কিছু কিছু দল পাটনার বৈঠকে এসেছিল হাওয়া বুঝতে। তারা যেমনটা চেয়েছিল বৈঠক ঠিক তেমনভাবে এগোয়নি। শুধু কংগ্রেসই নয়, ওমর আবদুল্লা আর মমতা ব্যানার্জিও এই বৈঠকে দিল্লি নিয়ে কেন্দ্রের অর্ডিন্যান্সের ইস্যুর বিষয়টা উত্থাপন করায় আপত্তি জানিয়েছেন। আপ নিজের তাস খেলে ফেলেছে, আর আমি অবাক হব যদি তৃণমূল কংগ্রেস বেঙ্গালুরুতে অনুষ্ঠিতব্য পরবর্তী বৈঠকেও যোগ দেয়। তবে ওমর যথার্থই বলেছেন, কে এসেছে তা নিয়েই ভাবা উচিত, কে আসেনি তা নিয়ে নয়।
চতুর্থত, বৈঠক শেষ হওয়ার পর সাংবাদিক সম্মেলনে প্রবীণ রাজনীতিবিদ লালুপ্রসাদ রাহুলের বিয়ে নিয়ে রসিকতা করে যা বলেছেন তা নেহাতই রসিকতা ছিল ভাবলে ভুল হবে। আসলে তিনি যে বার্তা দিয়েছেন তা হল ঝুঁকি নিন, সামনে এসে দাঁড়ান। এটা আপনি ২০০৯-১৪ পর্যন্ত করেননি, কিন্তু এখনো সময় আছে। এবার করে ফেলুন, আমরা আপনার সঙ্গে থাকব।
VIDEO | "Rahul Gandhi didn't follow my suggestion earlier. He should have married before. But still it's not too late," RJD supremo Lalu Prasad Yadav quips at Rahul Gandhi after opposition meeting held in Patna.#OppositionMeeting pic.twitter.com/o22ICLTujM
— Press Trust of India (@PTI_News) June 23, 2023
এই জোটের কাঠামো সম্পর্কে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এমকে স্ট্যালিন কিছু পরামর্শ দিয়েছেন, যা ভাববার মত – ১) প্রত্যেক রাজ্যের প্রধান দলের সেই রাজ্যে এই জোটের নেতৃত্বে থাকা উচিত, ২) যেসব আসন ছাড়া নিয়ে ঐকমত্য হবে না, সেখানে জোটের সম্মিলিত প্রার্থী দেওয়া উচিত।
আরো পড়ুন কতটা পথ পেরোলে পরে ভারত পাওয়া যায়?
এই মুহূর্তে বিজেপির সাপেক্ষে অন্য দলগুলোর অবস্থা কী তা এবার আলোচনা করা যাক।
বেশিরভাগ রাজ্যেই লড়াইটা খুব পরিষ্কার। রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, গুজরাট, এমনকি কর্ণাটকের বেশিরভাগ জায়গাতেও লড়াইটা সরাসরি কংগ্রেস আর বিজেপির মধ্যে। বিহার, ঝাড়খণ্ড, মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ুর মত রাজ্যগুলোতে আবার লড়াইটা দুটো জোটের মধ্যে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ব্যাপারটা জটিল কেরালা, পশ্চিমবঙ্গ আর উত্তরপ্রদেশে। কিন্তু কেরালাকে এই তালিকায় রাখা একেবারেই ভুল। কেরালায় লড়াইটা এলডিএফ বনাম ইউডিএফ এবং তেমন থাকলেই ভাল। দুপক্ষের মধ্যে কোনোরকম সমঝোতার বিন্দুমাত্র ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও মানুষের কাছে ভুল বার্তা যাবে এবং যে বিজেপি ওই রাজ্যে আজও পায়ের তলায় জমি পায়নি, তারা বিরোধী পরিসরটা দখল করার সুযোগ পেয়ে যাবে।
পশ্চিমবঙ্গের ব্যাপারটা আবার একেবারেই আলাদা। হিসাবে সামান্য ভুল করলেই বিজেপি ফায়দা তুলবে। আপাতত এই রাজ্যে তৃণমূল এখনো বিরোধীদের থেকে অনেকখানি এগিয়ে। তারপরেই আছে বিজেপি, আর কংগ্রেস অনেকটা পিছিয়ে থাকা তৃতীয় স্থানাধিকারী। যদিও বামেরা সারা রাজ্যে নিজেদের অবস্থার অনেকটা উন্নতি করেছে, তবু এখনো লোকসভা আসন জেতার মত জায়গায় পৌঁছতে পারেনি। আসন্ন পঞ্চায়েত নির্বাচনের ফল থেকে রাজ্যের রাজনীতি কোনদিকে এগোবে সে ব্যাপারে আরও পরিষ্কার ইঙ্গিত পাওয়া যাবে।
উত্তরপ্রদেশে হয়ত সমাজবাদী পার্টি আর কংগ্রেস আসন সমঝোতা করে ফেলতে সফল হবে, কিন্তু ভোট হস্তান্তর কতটা মসৃণ হবে তা নিয়ে সন্দেহ রয়েই যাচ্ছে।
পাটনায় যে পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হল সেটা যে ঐতিহাসিক প্রথম প্রয়াস তা নয়। মমতা নিজেই ২০১৯ নির্বাচনের আগে বিজেপির বিরুদ্ধে এক ধরনের জোট তৈরি করার চেষ্টা করেছিলেন। কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে ২৩টা বিরোধী দলের নেতাকে নিয়ে এসে জনসভাও করেছিলেন নরেন্দ্র মোদী সরকারের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে লড়বেন ঘোষণা করে। সেই পরীক্ষা মুখ থুবড়ে পড়ে এবং বিজেপি ২০১৪ সালের থেকেও বড় জয় পেয়ে ক্ষমতায় ফেরে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি বেশ খানিকটা আলাদা। মমতার সেই প্রচেষ্টা শুরু হয়েছিল ভোটের মাত্র সাড়ে চার মাস আগে। এবার সমস্ত অবিজেপি দলকে একজোট করার চেষ্টা শুরু হয়েছে অনেক আগে থেকে। বিভিন্ন দলের নেতাদের মধ্যে একগুচ্ছ ইস্যুতে মতপার্থক্য রয়েছে। তবুও তাঁদের অনেক বেশি সংগঠিত এবং বদ্ধপরিকর দেখাচ্ছে। তবে সফল বৈঠক সত্ত্বেও মানতেই হবে, এই জোট এখনো একেবারে কাঁচা অবস্থায় আছে। পাকাপোক্ত করে তোলার জন্যে অনেক কাজ বাকি। একাধিক কারণে এই ঐক্য ভেঙে যেতে পারে। অরবিন্দ কেজরিওয়াল ১৯৯১ সালের দিল্লি আইন সংক্রান্ত কেন্দ্রের অর্ডিন্যান্স নিয়ে আলোচনা করতেই হবে বলে জোর করলে সেটা হতে পারে, আবার মমতার বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাম দলগুলোর সঙ্গে হাত মেলাতে আপত্তির কারণেও হতে পারে।
বেঙ্গালুরু বৈঠক কৌতূহলোদ্দীপক হতে যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত নির্বাচন, যেখানে তৃণমূল আর কংগ্রেস-বাম একে অপরের বিরুদ্ধে লড়ছে, তার প্রভাব কি পড়বে ওই বৈঠকে? আরও বেশি সংখ্যক দল কি যোগ দেবে, বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অসম জাতীয় পরিষদ, অখিল গোগোইয়ের রাইজোর দল এবং ত্রিপুরার প্রদ্যোৎ দেববর্মণের মোথার মত দলগুলো? উত্তর-পূর্বাঞ্চলে কিন্তু ২৬টা লোকসভা আসন রয়েছে এবং মণিপুর এই মুহূর্তে জ্বলছে। প্রধানমন্ত্রী এখনো সেখানে যাওয়ার সময় পাননি, পৌঁছে গেছেন রাহুল। প্রশাসন তাঁকে দুর্গত মানুষের সঙ্গে দেখা করতে বাধা দেওয়ার চেষ্টাও করেছে।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








