জনগণের চোখে উৎকর্ষ কেন্দ্রের তকমা পাওয়া উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি সম্বন্ধে মানুষের মনে বিশেষ সম্ভ্রম কাজ করে। এই ধারণা তৈরি করার ব্যাপারে পথিকৃৎ আইআইটি বা ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজিগুলি। আইআইটিতে দেশের সেরা ছাত্র এবং শিক্ষকের সমাহার ঘটে, সেখানে রাজনীতি বিবর্জিত বিশুদ্ধ জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা হয়, প্রকৃত গুণী মর্যাদা পায় এবং মেধার সঠিক মূল্য নির্ধারিত হয় – এমনটাই চালু ভাবনা। বিশেষত যখন রাজ্য সরকারের অনুদানে চলা প্রতিষ্ঠানগুলির সঙ্গে তুলনা করা হয়, তখন সাধারণ মানুষের কাছে এই ধারণা জোরালো স্বীকৃতি পায়। আইআইটির পরেই প্রথম সারির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উৎকর্ষ কেন্দ্রগুলির মধ্যে পড়ে বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ সায়েন্স (আইআইএসসি), ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ সায়েন্স এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ (আইআইএসইআর) এবং ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজিগুলি (এনআইটি)।

প্রথম দুটিতে প্রাকৃতিক বিজ্ঞান শিক্ষা এবং গবেষণায় যথেষ্ট জোর দেওয়া হলেও এনআইটিগুলি আইআইটির মতই মূলত প্রযুক্তিবিদ্যা শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান। এই শতকের শুরুতে দেশের আঞ্চলিক প্রযুক্তিবিদ্যার প্রতিষ্ঠানগুলি, যা রাজ্য সরকারের আওতায় ছিল, তাদের নিয়ে আসা হয় কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন দপ্তরের অধীনে এবং উন্নীত করা হয় এনআইটিতে। এর পিছনে মূল কারণ ছিল বিগত শতকের শেষের দিক থেকে তৈরি হওয়া প্রযুক্তিবিদ্যা শিক্ষার বর্ধিত চাহিদা। মাত্র সাতটি আইআইটির পক্ষে সেই চাহিদার সঙ্গে তাল মেলানো ছিল অসম্ভব। ফলে সরকারের দিক থেকে নতুন করে পরিকাঠামো তৈরি করার পরিবর্তে স্বাভাবিক ছিল রাজ্যে রাজ্যে চালু থাকা প্রতিষ্ঠানগুলির পরিকাঠামোকে সামান্য পরিবর্ধিত করে তাদের মাধ্যমেই চাহিদা মেটানো। জাতীয় মর্যাদা পাওয়া এই নতুন প্রতিষ্ঠানগুলিতে স্বাভাবিকভাবেই পঠনপাঠন এবং গবেষণার পরিকাঠামো রাজ্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ে অনেক উন্নত হয়। সেইসঙ্গে শিক্ষকদের বেতন কেন্দ্রীয় সরকারের বেতন কাঠামো মেনে হওয়ায় শিক্ষকতা এবং গবেষণার প্রতি দায়বদ্ধ যোগ্য প্রার্থীরা এখানে যোগ দিতে আগ্রহী হন। ক্রমে ক্রমে এনআইটিতেও নিয়োগ থেকে পদোন্নতি – সমস্তকিছুই নিয়মমাফিক স্বচ্ছ উপায়ে হয় – এমন ধারণা হবু শিক্ষক, গবেষক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যে দানা বাঁধে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

গত মাসে হামিরপুর এনআইটির সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগের বিজ্ঞাপন সেই ধারণায় জোরালো ধাক্কা দিয়েছে। তার অভিঘাত সবচেয়ে বেশি পড়েছে চাকরিপ্রার্থীদের উপর। সোশাল মিডিয়ায় নানা আলোচনায় ধরা পড়ছে তাঁদের তীব্র হতাশা। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা গবেষণাগারগুলিতে সাম্প্রতিককালে উপযুক্ত প্রার্থী এবং খালি পদের অনুপাত ক্রমবর্ধমান। ফলে পিএইচডি করেও অনেক উপযুক্ত প্রার্থীই অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কায় জর্জরিত। এই পরিস্থিতিতে হামিরপুরের বিজ্ঞাপন যেন অগ্নিতে ঘৃতাহুতি দিল। কেন তা আলোচনা করার আগে দেখা যাক এনআইটির মত প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ কী পদ্ধতিতে হয়।

নিয়োগের
সেই বিজ্ঞপ্তি। ছবি: টুইটার

প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয়ের মত এনআইটিগুলিতে (এবং আইআইটি, আইআইএসইআরে) শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞাপনে পদের সংখ্যা বেঁধে দেওয়া থাকে না। কারণ শিক্ষা দপ্তর থেকে বড় সংখ্যক পদের জন্য অনুমোদন আগেই নেওয়া থাকে। দ্বিতীয়ত, কোন বিভাগ কতজন শিক্ষক নিতে চায় তা আগে থেকে নির্দিষ্ট করা থাকে না। বিভাগগুলি আভ্যন্তরীণভাবে মোটামুটি একটি সংখ্যা স্থির করে। নিয়োগের ক্ষেত্রে যদি দেখা যায় সেই সংখ্যার চেয়ে কিছু বেশি সংখ্যক উপযুক্ত গুণমানের প্রার্থী পাওয়া যাচ্ছে, তাহলে কখনো কখনো সে অনুমোদনও দেওয়া হয়। অর্থাৎ নিয়োগের ক্ষেত্রে পদ্ধতি যথেষ্ট নমনীয়। যেহেতু চূড়ান্ত নিয়োগের দায়িত্বে থাকে বহিরাগত বিশেষজ্ঞদের কমিটি, সেহেতু ইন্টারভিউ দেওয়ার জন্য বহু আবেদনপত্রের মধ্যে থেকে অল্প কয়েকজনকেই বেছে নেওয়া হয়। এই বেছে নেওয়া বা শর্টলিস্ট তৈরি করা সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্ব। শর্টলিস্টিং হয় দুটি স্তরে। প্রথম স্তরে দেখা হয় প্রার্থী বিজ্ঞাপনে বেঁধে দেওয়া ন্যূনতম যোগ্যতার শর্তগুলি পূরণ করেছেন কিনা। এই শর্তগুলির মধ্যে থাকে স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সমস্ত পরীক্ষায় নির্দিষ্ট শতাংশ নম্বর আছে কিনা, পিএইচডি ডিগ্রি আছে কিনা, পিএইচডি-পরবর্তী সময়ে কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা আছে কিনা। যে প্রার্থীরা এই স্তর পার করেন তাঁদের তালিকাও যদি যথেষ্ট লম্বা হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট বিভাগ তাদের মত করে কিছু যোগ্যতামান তৈরি করে। এই দ্বিতীয় স্তরের শর্টলিস্টিং মূলত প্রার্থীদের গবেষণা সংক্রান্ত ব্যুৎপত্তির উপর ভিত্তি করে হয়। এই অংশটি অনেকাংশেই পরিমাণগত নয়, গুণগত।

বোঝা শক্ত নয় যে এই যোগ্যতামানের কোনো একক মাপকাঠি থাকা সম্ভব নয়। কারণ বিভাগ থেকে বিভাগে, এমনকি একটি বিভাগের বিভিন্ন শাখাতেও, মাপকাঠির কয়েক যোজন তফাত রীতিমত বাস্তব। উদাহরণ হিসাবে গণিত এবং রসায়নের মধ্যে তুলনা করলে দেখা যাবে, গড়ে গণিতে গবেষণাপত্রের সংখ্যা রসায়নের অর্ধেক বা আরও কম। এমনকি পদার্থবিদ্যায় গবেষণার খতিয়ান দেখলে দেখা যাবে পরীক্ষামূলক গবেষণায় গবেষণাপত্রের সংখ্যা তাত্ত্বিক শাখায় প্রকাশিত গবেষণাপত্রের চেয়ে চোখে পড়ার মত বেশি।

আরো পড়ুন গৌ-সম্মেলন: আইআইটি ও অপবিজ্ঞানের গলাগলি

হামিরপুর এনআইটি কর্তৃপক্ষ প্রার্থী ঝাড়াই বাছাই প্রক্রিয়ার এই দ্বিতীয় স্তরে বিভাগীয় ভিন্নতাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সবার জন্য একই মাপকাঠি লাগু করেছেন। আপাতত এই দার্শনিক উল্লম্ফন অগ্রাহ্য করলেও বাছাইয়ের যে সব মাপকাঠি রাখা হয়েছে তা চোখ কপালে তোলার মত। কারণ এটি নিছকই স্বচ্ছ উপায়ে শর্টলিস্টিংয়ের আরেকটি পদ্ধতি নয়, বরং উচ্চশিক্ষার অভিমুখ কোনদিকে যেতে চলেছে তার ইঙ্গিতবাহী। আগামীদিনে গবেষণার গুণগত বিচারের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়াবে প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ডিং – এমন আমূল পরিবর্তন আর কষ্টকল্পিত বলা যায় না। আগামী পর্বে আমরা দেখব, কেন এমন মনে হচ্ছে।

চলবে

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.