একুশে জুলাইয়ের সমাবেশে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির বক্তৃতায় রক্তস্নাত পঞ্চায়েত নির্বাচন নিয়ে কথা বলার জন্য সব মিলিয়ে সময় বরাদ্দ ছিল মিনিট পাঁচেক। তার মধ্যে একবার, মাত্র একবার, বললেন “দুঃখিত”। ব্যাস, ওইটুকুই। বাকি পুরোটাই সিপিএম আমলেও যে পঞ্চায়েতে বিপুল হিংসা এবং প্রাণহানি হত তার খতিয়ান। গোটা বক্তৃতায় বারবার উঠে এল জাতীয় রাজনীতির কথা। জাতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রচারের সুবিধার জন্য অনেকখানি সময় হিন্দিতে বললেন, হিন্দিতে স্লোগানও দিলেন। বারবার নিজেকে তুলে ধরার চেষ্টা করলেন বিরোধী জোট ইন্ডিয়ার মুখ হিসাবে। কিন্তু পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৃণমূলের লাগামছাড়া সন্ত্রাস নিয়ে কার্যত চুপ থাকলেন মমতা। প্রশ্ন হল, এই নীরবতা, যা প্রকৃত প্রস্তাবে পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৃণমূলের ভোট লুঠকে অনুমোদন দেওয়া, তা কি ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে ২০১৯ সালের স্মৃতি ফিরিয়ে আনবে? তা যদি হয়, তাহলে মমতার সর্বভারতীয় স্বপ্ন যে আবারও ধাক্কা খাবেই সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই।

পঞ্চায়েত নির্বাচনের ক্ষত এখনও দগদগে, প্রাণহানি অব্যাহত। গোটা রাজ্যের মানুষ দেখেছেন কীভাবে নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করেছে শাসক দল। ভোটের দিন তো বটেই, গণনাকেন্দ্রেও ভোট লুঠ হয়েছে। রাস্তায়, পুকুরধারে, ঝোপজঙ্গলে ফেলে দেওয়া হয়েছে ব্যালট। জনা পঞ্চাশের প্রাণ গিয়েছে। ঠিক যেন ২০১৮ সালের নির্বাচনের দ্বিতীয় পর্বের অভিনয়। তৃণমূল নেতৃত্ব জানে, পাঁচ বছর আগের পঞ্চায়েত নির্বাচনে ভোট লুঠের প্রভাব পড়েছিল গত লোকসভায়। অভূতপূর্ব উত্থান হয়েছিল বিজেপির।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

একথা ঠিক যে, পঞ্চায়েতের ফল প্রকাশের পরের দিন দশেকে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেকখানি বদলে গিয়েছে। মূলত বিরোধী দলগুলোর নিষ্ক্রিয়তার জন্যই ভোট লুঠ এবং হিংসার দগদগে স্মৃতির গায়ে ধুলো জমছে। বিরোধী দলগুলো পঞ্চায়েত নির্বাচনে হিংসার বিরুদ্ধে সেভাবে পথে নামেনি, অচল হয়নি কলকাতা। এক অর্থে বলতে গেলে তৃণমূল এত বড় প্রহসনের নির্বাচন করেও পার পেয়ে গিয়েছে। কিন্তু ২০১৮-১৯ সালের অভিজ্ঞতা বলে, সবকিছু এত দ্রুত ‘ম্যানেজ’ করে ফেলা সব সময় সম্ভব হয় না। লোকসভা নির্বাচন কেন্দ্রীয় বাহিনীর বন্দুকের ডগায় করাবে কেন্দ্রীয় সরকার। এই নির্বাচনে যাঁরা ভোট দিতে পারলেন না, যাঁদের ভোট লুঠ হল, তাঁরা আরও একবার পাশা উলটে দিতে পারেন, ঠিক ২০১৯ সালের মতোই। মমতা খুব ভাল করেই জানেন, তাঁর জাতীয় স্তরের উচ্চাশার গোড়ায় জল দিতে খান চল্লিশ আসন প্রয়োজন। ২০১৯ সালের পুনরাবৃত্তি হলে মুশকিল।

গত কয়েক দিনে জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিতেও বড়সড় বাঁক বদল হয়েছে। গড়ে উঠেছে বিরোধী জোট ইন্ডিয়া। এক মঞ্চে এসেছেন রাহুল গান্ধী, মমতা, সীতারাম ইয়েচুরিরা। বাংলাতেও এর প্রভাব পড়েছে। বিজেপি সুর চড়িয়ে দাবি করছে, তৃণমূল-বাম-কংগ্রেস কার্যত ভাই ভাই। বাম এবং প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্ব স্পষ্টত অস্বস্তিতে। পঞ্চায়েতে অপ্রত্যাশিত লড়াই করার পরে তাঁদের আবার নতুন করে নিজেদের তৃণমূলবিরোধী অবস্থান স্পষ্ট করতে হচ্ছে।

এই অবস্থায় কী করতে পারতেন মমতা? সরাসরি ভুল স্বীকার করে নিতে পারতেন গ্রামবাংলার ভোটারদের কাছে। তাতে পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৃণমূলের সন্ত্রাসের দায় থেকে কিছুটা মুক্ত হতেন তিনি। ২০২৪ সালে ২০১৯ সালের পুনরভিনয়ের সম্ভাবনা কিছুটা হলেও কমত। কারণ এখনো তিনি রাজ্যের জনপ্রিয়তম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। পুরনো ম্যাজিক না থাকলেও দিদির কথার দাম এখনো গ্রামীণ ভোটারের বড় অংশের কাছে অনেকখানি। কিন্তু মমতা সে পথে হাঁটলেন না। পঞ্চায়েত “বিপুল” জয়ের জন্য জনতাকে ধন্যবাদ দিয়ে শুরু করলেন ভাষণ। দাবি করলেন ৭১,০০০ বুথের মধ্যে কেবল তিনটে জায়গায় গোলমাল হয়েছে। সেই সঙ্গে পেশ করলেন নিহতদের মধ্যে তৃণমূলের লোকজনের সংখ্যাই যে বেশি, সেই হিসাব। জুড়ে দিলেন বাম আমলের সঙ্গে তুলনা।

আরো পড়ুন তৃণমূলী নৈরাজ্যের নেই রাজ্যে পোয়া বারো আরএসএসের

২০০৯ সালে যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রে তৃণমূলের টিকিটে জয়ী হয়েছিলেন কবীর সুমন। বছরখানেকের মধ্যেই দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়েন তিনি। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে মমতা যাদবপুরে এসে নির্বাচকমণ্ডলীর কাছে সুমনকে টিকিট দেওয়ার জন্য ক্ষমা চেয়ে নেন। যে তৃণমূল কর্মীরা সুমনের প্রতি বিরক্ত ছিলেন, নেত্রী ওই বক্তব্য তাঁদের উৎসাহিত করেছিল। রক্তস্নাত পঞ্চায়েত নির্বাচনের পরেও মমতা একই কাজ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা না করায় ভোট দিতে না পারা গ্রামীণ জনতার ক্ষোভে কোনো প্রলেপ পড়ল না।

গোটা বক্তৃতায় একটিবারও কংগ্রেসের নাম নেননি মমতা। বামেদের নাম নিয়েছেন মাত্র একবার। টানা আক্রমণ করেছেন বিজেপিকে। জাতীয় বিরোধী জোট ইন্ডিয়ার নেত্রী হিসাবে নিজেকে তুলে ধরতেই এই প্রয়াস। কিন্তু লোকসভা নির্বাচনের পর যাবতীয় সমীকরণ স্থির হবে আসনসংখ্যার বিচারে। পঞ্চায়েত নির্বাচনের ঘটনাবলী সেই সময় তৃণমূলের হাতে পর্যাপ্ত আসন থাকতে দেবে তো? ২০১৯ সালের অভিজ্ঞতা কিন্তু সংশয়মুক্ত হতে দিচ্ছে না।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.