অ্যাম্বুলেন্সের অস্বাভাবিক ভাড়া না দিতে পেরে ব্যাগে করে শিশুসন্তানের দেহ নিয়ে ফিরলেন বাবা। অ্যাম্বুলেন্স চালকের আক্রমণে মারা গেলেন রোগী। দুদিনের ব্যবধানে দুই জেলার এই দুই মর্মন্তুদ ঘটনা বেআব্রু করল ‘এগিয়ে বাংলা’-র আসল রূপ। তোলাবাজি, সিন্ডিকেটরাজ, বেহাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা – এককথায় এ রাজ্যের নৈরাজ্যের আসল চেহারা সামনে চলে এল। তারই পাশাপাশি এগরায় বিস্ফোরণে মৃত্যুমিছিল। অরাজকতার চূড়ান্ত পর্যায়ে অবনমিত বাংলা।

মুখ্যমন্ত্রী তথা রাজ্য সরকার নির্বিকার। অপরকে দোষ দিতেই ব্যস্ত। চলছে বাংলার যুবরাজের আড়ম্বরপূর্ণ যাত্রা। বিলাসবহুল বাসে চড়ে কিছুদিন আগেই উত্তরবঙ্গ সফর সেরে তিনি এখন দক্ষিণবঙ্গ ঘুরছেন। সেই উত্তরবঙ্গে গাড়িভাড়া না দিতে পেরে পিতা সন্তানের দেহ ব্যাগে ভরে বাসে করে ফিরতে বাধ্য হন। শিলিগুড়ির উত্তরবঙ্গ মেডিকাল কলেজ থেকে অসীম দেবশর্মা এভাবেই পাঁচ মাসের সন্তানের মৃতদেহ নিয়ে এলেন। অভিযোগ, অ্যাম্বুলেন্স চালক নাকি শিলিগুড়ি থেকে উত্তর দিনাজপুরের কালিয়াগঞ্জে আসার জন্য ৮,০০০ টাকা ভাড়া চেয়েছিলেন। যমজ সন্তানের একজন সদ্য মৃত, আরেকজন আশঙ্কাজনক অবস্থায়। তারই মধ্যে এভাবে মরদেহ নিয়ে আসা কতটা মর্মান্তিক, সংবেদনশীল ব্যক্তিমাত্রই উপলব্ধি করতে পারবেন।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

রাজ্য সরকার তথা শাসক দলের থেকে সংবেদনশীলতা আশা করা চূড়ান্ত মূর্খামি। রাজ্যে এখন মৃত্যু, ধর্ষণ সবকিছুই ক্ষতিপূরণ দিয়ে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়। করেকম্মে খেতে হলে দিতে হয় উচ্চ মূল্যের নজরানা। টোটো স্ট্যান্ড থেকে হাসপাতালের সামনে অ্যাম্বুলেন্স – সবেতেই তোলাবাজি। চালক তার তোলাবাজি দেওয়ার অর্থ উশুল করবে যাত্রীদের থেকে। অ্যাম্বুলেন্স, বেসরকারি রোগনির্ণয় কেন্দ্র বা হাসপাতালের আঁতাত সকলের জানা। এসব নতুন নয়, কিন্তু এখন প্রশাসনের ন্যূনতম নিয়ন্ত্রণও নেই। মৃতদেহ, সদ্য সন্তানহারা পিতার আকুতি – কোনোকিছুই সিন্ডিকেট ও তোলাবাজির রাজত্বে একটা দলকে স্পর্শ করে না। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে কালিয়াগঞ্জ থেকে সুদূর শিলিগুড়িতে শিশুকে নিয়ে যেতে হল কেন? সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, রায়গঞ্জ মেডিকাল কলেজ থেকে তাকে অন্যত্র রেফার করা হয়েছিল। বাবা ভরসা না করে সন্তানকে উত্তরবঙ্গ মেডিকাল কলেজে নিয়ে যান। স্বাস্থ্যের উন্নতি নিয়ে এত ঢাকঢোল পেটানোর পরেও রেফারের রোগ থেকে মেডিকাল কলেজগুলোও মুক্ত নয়। আর নতুন মেডিকাল কলেজগুলোর প্রতি মানুষ বিপদের মূহূর্তে আস্থা রাখতেও পারছেন না। মাসখানেক আগেই জলপাইগুড়ি হাসপাতাল থেকে মহিলার মৃতদেহ হেঁটে বাড়িতে আনতে বাধ্য হয়েছিলেন তাঁর স্বামী ও পুত্র। আমাদের সকলকে লজ্জায় ফেলে দেওয়ার মত চরম দারিদ্র্যের দৃষ্টান্ত।

মুর্শিদাবাদের ঘটনায় অ্যাম্বুলেন্সকে কেন্দ্র করে সিন্ডিকেটরাজ আরও প্রকট হয়। সালার গ্রামীণ হাসপাতাল থেকে ৪২ বছরের চাঁদতারা বিবিকে বর্ধমান মেডিকাল কলেজে রেফার করা হয়। পরিবারের লোকেরা চেনা পরিচিত অ্যাম্বুলেন্স চালককে ডাকলে হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স চালকরা রোগীকে নিয়ে যেতে বাধা দেন, অ্যাম্বুলেন্স যাওয়ার রাস্তা আটকে দেন। বাড়ির লোকের অভিযোগ, একজন চালক রোগীর অক্সিজেন মাস্ক খুলে নিলে তাঁর মৃত্যু হয়। গ্রামীণ হাসপাতালে বচসার সময়ে পুলিসের কাছে অভিযোগ জানিয়েও নাকি কাজ হয়নি।

দুর্নীতি, তোলাবাজি, দুর্বৃত্তায়নের শিকড় কতটা গভীরে গেলে এমন পৈশাচিক ঘটনা ঘটতে পারে তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। একজন অর্থলোলুপ অমানুষ অ্যাম্বুলেন্স চালক কেবল হত্যাকারী নয়, এই হত্যায় হাসপাতাল তথা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গড়ে ওঠা চক্রের সঙ্গে জড়িত সকলেই হত্যাকারী। শাসক দল, পুলিস, হাসপাতাল প্রশাসনের একাংশকে নিয়ে রাজ্যজুড়ে গড়ে উঠেছে এই চক্র। চলে বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেন। ভাগ তৃণমূল স্তর থেকে উপরতলায় কতদূর পর্যন্ত যায় তা সরকারের অজানা নয়। দলদাস পুলিস রাজ্যজুড়ে অমানবিক হওয়ার প্রতিযোগিতায় মত্ত।

এসবের মধ্যেই পূর্ব মেদিনীপুর জেলার এগরায় বিস্ফোরণে বহু মানুষের মৃত্যু ঘটল। বোমা বিস্ফোরণের অভিযোগ উঠলেও, সরকার বাজি বিস্ফোরণ বলে ঘটনাটাকে লঘু করতে চায়। বাজি তৈরির কারখানাও যদি হয়, তাহলেও এমন দুর্ঘটনার দায় প্রশাসন এড়াতে পারে না। তৃণমূলের রাজত্বে বোমা বানানো যেখানে কুটির শিল্প, সেখানে বাজি বানানোর নামে বোমা বানানো অসম্ভব নয়। ঘটনার পরেই অভিযুক্ত ব্যক্তির নানা কুকীর্তির অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছে। উঠে আসছে গ্রামবাসীদের তীব্র ক্ষোভের কথা। শাসক দলের বড় নেতারা ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রবল বিক্ষোভের মুখে পড়েছেন। এই মর্মান্তিক ঘটনায় সত্যি সত্যি কতজন মারা গেলেন তার হিসাব সম্ভবত কোনোদিনই পাওয়া যাবে না। চারিদিকে ছড়িয়ে থাকা ছিন্নভিন্ন মৃতদেহের চিত্র দেখে রাজ্যবাসীকে শিউরে উঠতে হচ্ছে।

আরেক ভয়ঙ্কর পরিণাম কিছুদিন আগেই কালিয়াগঞ্জে দেখা গিয়েছিল। সেই ঘটনায় পুলিশের উপর মানুষ কতটা ক্ষুব্ধ তারও প্রমাণ পাওয়া গেছে। সরকার এরপরেও পুলিস প্রশাসনকে ঠিক করতে বিন্দুমাত্র চেষ্টা করেনি। বরং সবকিছুকে লঘু করতে গিয়ে অপরাধীদেরই উৎসাহিত করে চলেছে। রাজ্যে ঘটে চলেছে একের পর এক নারকীয় হত্যাকাণ্ড। সরকারের দায়িত্ব কেবল ক্ষতিপূরণ দেওয়া, অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া নয়।
শাসক দলের অনুপ্রেরণাতেই আজ রাজ্যের এই শোচনীয় অবস্থা। নিয়োগ দুর্নীতিতে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন এখন প্রকাশ্যে চলে এসেছে। শিক্ষা দপ্তরের মন্ত্রী থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ হোমরা চোমরা – অনেকেই দুর্নীতির অভিযোগে জেলে। কেউ বা জেল থেকে ছাড়া পেয়ে গলা ফাটাচ্ছেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা থাকার থেকে নানা অছিলায় বন্ধ রাখতেই সরকার উৎসাহী। দুর্নীতি, দুর্বৃত্তসুলভ কাজে দক্ষতাই শাসক দলের নেতাদের যোগ্যতার মাপকাঠি।

মুখ্যমন্ত্রী নিজে বাঁচতে রাজ্যবাসীকে একে অপরের বিরুদ্ধে খেপাতে চাইছেন। ডিএ নিয়ে আন্দোলন ভাঙতে এতদিন সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছিলেন। সদ্য চাকরিহারা স্কুলশিক্ষকদের কর্মরত শিক্ষক, সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে খেপাচ্ছেন। বলছেন ডিএ আন্দোলনকারীদের জন্যই নাকি তাঁদের চাকরি গেছে। এভাবেই নিয়োগ দুর্নীতি তিনি ধামাচাপা দিতে চান। একবারও বঞ্চিত যোগ্য প্রার্থীদের আন্দোলনের কথা বলছেন না। সহানুভূতি দেখাচ্ছেন নিয়ম বহির্ভূত উপায়ে চাকরি পাওয়া ব্যক্তিদের প্রতি। না হলে অবশ্য তাঁর ঘোর বিপদ। তোলা দিয়েও চাকরি খোয়ানো ব্যক্তিরা মুখ খুললে তৃণমূলের সর্বনাশ। এভাবেই চিট ফান্ডে সর্বস্ব খোয়ানো মানুষের রোষ থেকে তিনি বেঁচেছিলেন। রাজ্যে এখন দুর্নীতি করা অপরাধ নয়, তার বিরুদ্ধে বিচার চাওয়াই অপরাধ।

মুখ্যমন্ত্রীই যখন এমন গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চান, তখন প্রশাসন ও শাসক দল বেলাগাম, বেপরোয়া হয়ে যায়। তিনি যখন চোর বললেও বুক চিতিয়ে ঘোরার নিদান দেন, তখন প্রকারান্তরে দুর্নীতিবাজ, দুষ্কৃতিদেরই স্বীকৃতি দেন। কেউ কাউকে মানবে কেন? নৈরাজ্যই তাই রাজ্যের ভবিতব্য। সেই সুযোগে কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলো সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। সিবিআই, ইডির কাজ বাড়ছে। নরেন্দ্র মোদীর শাসনে কার্যত কেন্দ্রের বশংবদ এই সংস্থাগুলোর এত সক্রিয়তা ভবিষ্যতের পক্ষে ভাল নয়। তাদের ভূমিকাও সন্দেহের উর্দ্ধে নয়। নানা তদন্তের শ্লথ গতি নিয়ে খোদ বিচারকরা ইডি ও সিবিআইয়ের বিরুদ্ধে একাধিকবার ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। চিট ফান্ড কেলেঙ্কারির অপরাধীদেরই এখনো শাস্তি হয়নি। এনআইএর ভূমিকা নিয়ে তো প্রায় সব বিজেপিবিরোধী রাজ্য সরকারেরই ক্ষোভ আছে। অথচ এগরা কাণ্ডে এনআইএ তদন্তকে রাজ্য সরকার স্বাগত জানাতে বাধ্য হয়েছে।

আরো পড়ুন দুই শাসক চাইছে, তাই দাঙ্গা হচ্ছে আমার পাড়ায়

কোন শক্তির হাত শক্ত করছে তৃণমূল? তৃণমূলের অপশাসনের সুযোগ নিয়ে কারা রাজ্যে ভিত শক্ত করার সুযোগ পাচ্ছে? একদিকে মুখ্যমন্ত্রী কেন্দ্রের অতিকেন্দ্রীকরণের ঝোঁকের বিরুদ্ধে বক্তৃতা দিয়ে বাজার গরম করবেন, অন্যদিকে ঘুরপথে তাদের রাজ্যে নাক গলানোর সুযোগ করে দেবেন। কেন্দ্রের নয়া শিক্ষানীতি বাস্তবায়িত করতে এগোবেন, চুপিসাড়ে এনআরসির প্রথম ধাপের কাজ করে দেবেন। ধর্ম, জনজাতিভিত্তিক পরিচয় সত্তার রাজনীতিকে লালন করে বিজেপি তথা আরএসএসের পোয়া বারো করে দেবেন।

মূলধারার সংবাদমাধ্যম তৃণমূল-বিজেপির তরজা দেখিয়ে এসব আড়াল করতে চাইছে। বাম, প্রগতিশীল আন্দোলনের দীর্ঘকালের শক্ত জমিতে তৃণমূলের হাত ধরে ফসল তুলতে চাইছে মৌলবাদী শক্তি। ভোটের রাজনীতিতে ওই দুটো দলের মধ্যেই লড়াইটাকে আটকে রাখতে হবে আর তলে তলে মৌলবাদী শক্তিকে সুযোগ দিতে হবে। সংবিধানের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ধ্বংস করার আরএসএস প্রকল্পকে রাজ্যে বাস্তবায়িত করার সুযোগ দিতে হবে। এটাই তৃণমূলের লুকনো এজেন্ডা। খাদের কিনারে রাজ্য। খাদ থেকে বাঁচতে রাজ্যবাসীকেই ঘুরে দাঁড়াতে হবে।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.