বনফুলের হাটে বাজারে উপন্যাসের সদাশিব ডাক্তারের কথা মনে আছে? যিনি চিকিৎসক হিসাবে রোগীদের অত্যন্ত ভরসার ও শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন? সাধারণ মানুষ অসুখে পড়লে এমন ডাক্তার আশা করেন যিনি ক্লিনিকাল সেন্স প্রয়োগ করে রোগ ধরতে পারেন এবং কম খরচে চিকিৎসা করতে পারেন। দুঃখের বিষয়, আজ আমাদের দেশের ডাক্তারি শিক্ষার (এমবিবিএস) নিয়মকানুন যাঁরা তৈরি করছেন, তাঁরা এই আশাকে দুরাশায় পরিণত করতে উদ্যত।

নরেন্দ্র মোদীর জমানায় আগেকার মেডিকাল কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া (এমসিআই) তুলে দিয়ে তাঁরা চালু করেছেন সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক একটি প্রতিষ্ঠান – ন্যাশনাল মেডিকাল কমিশন (এনএমসি)। এই এনএমসির প্রতিনিধিরা সবাই কেন্দ্রীয় সরকার মনোনীত। কোনো নির্বাচন হয়নি, সব রাজ্যের প্রতিনিধিও নেই।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এই এনএমসি তৈরি হওয়ার পর থেকেই বলে চলেছে, আমাদের দেশের মেডিকাল গ্র্যাজুয়েটদের আগেকার এমবিবিএসদের মত অত কিছু না জানলেও চলবে। তাদের হতে হবে ‘বেসিক ডক্টর’। তাই তারা এমবিবিএস সিলেবাস পরিবর্তন করেছে, যার ফলে কমপিটেন্সি বেসড মেডিকাল এডুকেশন (সিবিএমই)-র নামে আসলে ছাত্রদের ক্লিনিকাল স্কিল গড়ে তোলার প্রক্রিয়ার সাংঘাতিক ক্ষতি করা হয়েছে। এই একই সময়ে, মেডিকাল কলেজ চালু করার মানদণ্ডগুলো লঘু করে দিয়ে এনএমসি একদিকে পরিকাঠামোহীন জেলা হাসপাতালগুলোকে মেডিকাল কলেজের তকমা দিয়েছে, অন্যদিকে বেসরকারি সংস্থাগুলোর সামনে অপর্যাপ্ত পরিকাঠামোতেই কলেজ খুলে কোটি কোটি টাকা লাভ করার পথ খুলে দিয়েছে। আশ্চর্যের বিষয়, এই বিরাট পরিবর্তনগুলোর কোনোটাই দেশের নামকরা ডাক্তার বা চিকিৎসক-শিক্ষকদের মতামত নিয়ে করা হয়নি। একতরফা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে মাত্র।

গত এক বছর ধরে এনএমসির এই সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে বাম ছাত্র সংগঠন অল ইন্ডিয়া ডেমোক্র্যাটিক স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশন (এআইডিএসও) টানা প্রচার চালালেও বেশিরভাগ মেডিকাল ছাত্রছাত্রী বা সিনিয়র ডাক্তার বিষয়টা গোড়ায় বুঝে উঠতে পারেননি। পাঠকদের জেনে রাখা ভাল, এমবিবিএস শিক্ষায় ছাত্রছাত্রীদের সাড়ে চার বছরে নটা আভ্যন্তরীণ পরীক্ষা, চারটে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা এবং অসংখ্য ক্লাস টেস্ট দিতে হয়। অন্তিম বর্ষের এমবিবিএস শিক্ষার্থীদের মেডিসিন, সার্জারি, গায়নোকোলজি এবং পেডিয়াট্রিক মেডিসিন পড়তে হয়। সারাবছর এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর থিওরি এবং প্র্যাকটিকাল ক্লাস হয়। শুধু দিনের বেলা ক্লাস নিয়ে সবটা সম্ভব নয় বলে সন্ধেবেলা ওয়ার্ডে গিয়ে পেশেন্ট দেখে শেখারও দরকার হয়। এরপর তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় পাস করলে এক বছর ইন্টার্নশিপ করতে হয়। তবে একজন ডাক্তার হিসাবে রেজিস্ট্রেশন পাওয়া যায়। এরপর পোস্ট গ্র্যাজুয়েট করতে চাইলে নিট-পিজি (NEET- PG) বলে একটা র‍্যাঙ্কিং পরীক্ষা দিলে তবে সে সুযোগ পাওয়া যায়। অন্যদিকে যারা বিদেশ থেকে ডাক্তারি পড়ে আসে তাদের জন্য ছিল ফরেন মেডিকাল গ্র্যাজুয়েট একজামিনেশন (এফএমজিই) বলে একটা পরীক্ষা। এতে পাস করলে ইন্টার্নশিপের সুযোগ পাওয়া যেত। এত কিছু সত্ত্বেও কি ক্লিনিকাল স্কিলের বা রোগীর প্রতি দরদের উঁচু মান রক্ষিত হচ্ছিল? তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। এবার সেসব একেবারেই খতম করতে এনএমসি কর্তারা উঠেপড়ে লেগেছেন।

কীরকম? সম্প্রতি (২৭ জুন) তাঁরা নিদান দিলেন, ফাইনাল এমবিবিএস পরীক্ষা, নিট পিজি এবং এফএমজিই পরীক্ষা – এই তিনটে পরীক্ষার জায়গায় একটা পরীক্ষা নেওয়া হবে। যার গালভরা নাম হল ন্যাশনাল এক্সিট টেস্ট বা নেক্সট। এখন এই একটা পরীক্ষা দিয়েই তাঁরা তিনটে কাজ সারবেন। ফলে এমবিবিএস কোর্সের অন্তিম বর্ষের ছাত্রদের এবার ফাইনাল এমবিবিএস পরীক্ষার বদলে বসতে হবে ন্যাশনাল এক্সিট টেস্ট (নেক্সট)-১ এ। এই পরীক্ষা পাস করলে এক বছর ইন্টার্নশিপ এবং ইন্টার্নশিপ শেষ করার পর আবার নেক্সট ২ পরীক্ষায় পাস করলে তবেই একজন মেডিকাল শিক্ষার্থী ডাক্তার হিসাবে স্বীকৃতি পাবে।

এখন যারা দেশের বিভিন্ন মেডিকাল কলেজ হাসপাতালে ফাইনাল ইয়ারে পড়ছে, তাদের আগামী ছয় থেকে আট মাসের মধ্যে এই নেক্সট পরীক্ষায় বসতে হবে। এনএমসির এই নতুন পরীক্ষায় ছাত্রদের পড়তে হবে চারটে বিষয়ের বদলে ১৯টা বিষয় এবং পরীক্ষা হবে মাল্টিপল চয়েস কোয়েশ্চেন (এমসিকিউ) পদ্ধতিতে। কেবলমাত্র কিছু ছাত্রছাত্রীকে একটা কঠিন পরীক্ষায় বসতে হবে বলেই এই লেখা নয়, বরং জনস্বাস্থ্য এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বলেই এই লেখার অবতারণা।

এবছর এই ঘোষণা হওয়া মাত্রই একদিকে যেমন ছাত্রছাত্রীরা ক্ষোভে ফেটে পড়েছে, অন্যদিকে প্রাইভেট কোচিং সেন্টারগুলোও ঝাঁপিয়ে পড়েছে। তারা যেন তৈরিই ছিল এই ঘোষণার জন্য। এই মুহূর্তে কোনো মেডিকাল কলেজের শিক্ষক জানেন না নেক্সট পরীক্ষার প্রশ্নের ধরন কেমন হবে। ফলে হাওয়া উঠেছে, পাস করতে হলে আর কলেজে এসে লাভ নেই। প্রাইভেট কোচিং সেন্টারগুলো কিন্তু বুক ফুলিয়ে বলছে, আমাদের কাছে নেক্সট পরীক্ষা পাস করার চাবিকাঠি আছে। ফলে হাজার হাজার টাকা দিয়ে দলে দলে মেডিকাল ছাত্রছাত্রী অনলাইন কোচিংয়ের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হচ্ছে। কলেজের ক্লাসরুম এবং ক্লিনিকাল ক্লাসগুলো খাঁ খাঁ করছে।

এখন প্রশ্ন হল, তাহলে কি কোচিং সেন্টারগুলোর সঙ্গে যোগসাজসেই এই পরীক্ষা চাপিয়ে দেওয়া হল? একই পরীক্ষা কেমন করে পাস করার এবং র‍্যাঙ্কিং স্থির করার জন্য হতে পারে? দুটোর তো প্রশ্নের ধরন তো আলাদা হওয়ার কথা। আরও প্রশ্ন, এমনিতেই ডাক্তারির ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে মানসিক অবসাদ এবং তার পরিণতিতে আত্মহত্যা ক্রমবর্ধমান। তার মধ্যে এমন চাপ তৈরি করে তাদের মানসিক চাপ আরও বাড়ানো হল না কি? কোচিং ক্লাসে এমসিকিউ মুখস্থ করে ডাক্তারি ছাত্ররা হয়ত পরীক্ষা বৈতরণী পার হয়ে যাবে, কিন্তু তাদের ক্লিনিকাল স্কিল কী করে তৈরি হবে? আর রোগীর থেকে দূরে বসে শুধু থিওরি মুখস্থ করার ফলে রোগীকে একজন মানুষ হিসাবে বোঝার ক্ষমতাই বা গড়ে উঠবে কী করে?

নেক্সট পরীক্ষায় কেউ অকৃতকার্য হলে তাকে ছমাস অপেক্ষা করতে হবে পরের পরীক্ষার জন্য। এমবিবিএস ব্যবস্থায় কিন্তু দেড়মাসের মধ্যে সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা দিয়ে ইন্টার্নশিপ শুরু করার সুযোগ ছিল। নিম্নবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের একজন ছাত্র বা ছাত্রী যখন ফাইনাল ইয়ারে পৌঁছয়, তার দিকে তাকিয়ে থাকে তার পরিবার – কবে সে ইন্টার্নশিপ শুরু করে উপার্জন আরম্ভ করবে। এই অবস্থায় ছমাস অপেক্ষা করা অত্যন্ত অমানবিক। এছাড়া পরীক্ষার ধরনধারণ নিয়েও অসংখ্য সঙ্গত প্রশ্ন রয়েছে। কিন্তু কোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়া তো এনএমসি কর্তারা তাঁদের কাজ বলে মনে করেন না।

এমনিতেই আজকাল নানা কারণে ডাক্তারদের সঙ্গে মানুষের দূরত্ব বাড়ছে। তার মধ্যে এই পরীক্ষা চালু করার সুদূরপ্রসারী কুফল হিসাবে এই সম্পর্ক আরও নষ্ট হবে এবং ভবিষ্যৎ ডাক্তারদের হতে কলমে কাজ করার ক্ষমতা আরও কমবে – এমন আশঙ্কা অমূলক নয়। ফলে ভুগবেন দেশের সাধারণ মানুষ।

ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বুঝতে কি পারছেন না যে এতে জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি হবে? তাঁরা কি এতই বোকা? তা তো নয়। আসলে আজকের ভারত চালাচ্ছে যে কর্পোরেট সংস্থাগুলো, তাদের স্বার্থে মেডিকাল শিক্ষা ব্যবসার দরজা হাট করে খুলে দেওয়ার জন্যই এই ধরনের সিদ্ধান্ত। দেশের মানুষ মরুক বাঁচুক, সরকারের কিস্যু এসে যায় না। এই সব সুযোগ দেওয়ার পরিবর্তেই তো পার্টি ফান্ডে ঢোকে হিসাববিহীন ইলেকটোরাল বন্ডে লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি টাকা। সেই টাকা ব্যবহৃত হয় সন্ত্রাস তৈরি করতে, ভোটারদের ঘুষ দিতে বা বিপক্ষ দলের বিধায়ক, সাংসদদের কিনে নিতে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ডাক্তারি শিক্ষাক্রম নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা নতুন নয়। কিছুদিন আগেই আমাদের রাজ্যের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন তিন বছরের ডিপ্লোমা ডাক্তার এবং পনেরো দিনের নার্স তৈরি করবেন। তাও ভাল তৎক্ষণাৎ তীব্র আন্দোলন শুরু হওয়ায় এবং তার প্রতিক্রিয়া পঞ্চায়েত ভোটে পড়তে পারে ভেবে তিনি বা তার দল ও নিয়ে আর এগোননি।

আরো পড়ুন ডিপ্লোমা ডাক্তার হেসে উড়িয়ে দেওয়ার মত প্রস্তাব নয়

আমাদের রাজ্যে মেডিকাল শিক্ষায় ন্যক্কারজনকভাবে রাজ্যের শাসক দলের ছাত্র সংগঠনের নেতা, কর্মীদের পাস করানোর জন্য পরীক্ষার সময়ে বই বা মোবাইল দেখে লেখানো, টুকলি সরবরাহ করা, পরীক্ষকদের হুমকি প্রদর্শন ইত্যাদির মাধ্যমে পরীক্ষাকে প্রহসনে পরিণত করার অপচেষ্টা বিদ্যমান। এই দেখে অনেকে বিভ্রান্ত হচ্ছেন যে নেক্সটের মত সর্বভারতীয় পরীক্ষা হলে বুঝি দুর্নীতি দূর হবে। তাঁদের ভেবে দেখতে বলব, এমবিবিএস পাঠক্রমে নটা আভ্যন্তরীণ আর চারটে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার বদলে মাত্র একটা নেক্সট হওয়ার কথা। ফলে নেক্সট দিয়ে দুর্নীতি পুরোপুরি দূর হওয়া সম্ভব না। দ্বিতীয়ত, আগে রাজ্যে রাজ্যে জয়েন্ট এন্ট্রান্সগুলো তুলে দিয়ে যখন নিট চালু হয়, তখনো একই কথা আমরা শুনেছিলাম। কিন্তু বহুবার নিট ইউজি এবং পিজি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস এবং কর্পোরেট কোচিং ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে এদের যোগসাজসের বহু অভিযোগ এই দুর্নীতিমুক্ত কেন্দ্রীয় পরীক্ষার ফানুস ফাটিয়ে দিয়েছে। বরং যা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি তা হল, কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় দুর্নীতি দূর হওয়ার বদলে তার কেন্দ্রীকরণ হবে। ফায়দা তুলবে তৃণমূলের বদলে বিজেপির স্নেহধন্যরা আর কোচিং সেন্টারগুলো।

তার চেয়েও বড় কথা, যে সিদ্ধান্তের সঙ্গে দেশের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য পরিষেবা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে, সে ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত কি একতরফাভাবে কোনো সরকার নিতে পারে? এই প্রবল সংকটের দিনে আদার ব্যাপারী না হয়ে জাহাজের দিকেও একটু নজর দেওয়া সময়ের দাবি।

আশার কথা, এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের ডাকে মেডিকাল ছাত্রসমাজ দেশজুড়ে আন্দোলনে সামিল হয়েছে। দেশের ৩০টা রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল থেকে স্বাক্ষর দিয়ে ছাত্রছাত্রীরা প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং সফল করেছে একের পর এক কর্মসূচি। যারা বলে আন্দোলনে কিছু হয় না, তাদের জেনে রাখা ভাল, ছাত্র আন্দোলনের চাপে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী ইতিমধ্যেই বলেছেন ২০১৯ সালের ব্যাচকে নেক্সট পরীক্ষা দিতে হবে না। এখন এই পরীক্ষা পুরোপুরি বাতিলের দাবিতে আন্দোলন চলছে। এই উদ্যোগের পাশে থাকা আমাদের সকলেরই প্রয়োজন।

~ মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.