শীত কলকাতার দরজায় কড়া নাড়ছে। পৌষের রং বাজারের আনাচে কানাচে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। কচি ফুলকপি, বাঁধাকপি, চুকাই, মেথির শাক আরো কত কী! মাছের বাজারে টাটকা ছোট, বড়, মাঝারি কই; মাগুর, সিঙ্গি, শোল আর জ্যান্ত দিশি ট্যাংরা। বাঙালির কাছে পুরো শীতকাল জুড়ে এইসব মাছের কদর বেশি। পৌষ মাসে গরম ভাতে শোলমাছ পোড়া বা ফুলকপি দিয়ে দিশি কই মৎস্যপ্রিয় বাঙালদের খাবারের তালিকায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
কলকাতায় শীত ক্ষণিকের অতিথি। এখন বিশ্ব উষ্ণায়নের দয়ায় শীতের মেয়াদ আরও কমে আসছে। তবে পৌষ আর মাঘ আমাদের উৎসবের মাস। খাওয়াদাওয়া, মেলা, গানবাজনার আসর, চড়ুইভাতি, পিঠের সম্ভার নিয়ে আমরা মেতে থাকি। আমার মামার লেখা একটা ছড়া মনে পড়ছে
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
চড়ুইভাতি করব মোরা
চড়ক ডাঙায় গিয়ে
ফুলুরি আর ফুলকো লুচি
ভাজব গাওয়া ঘিয়ে।
বাঙালির খাদ্যপ্রেম নিয়ে লিখতে গেলে শীতকালে চড়ুইভাতি বা বনভোজন কিম্বা পিকনিকের কথা লিখতে হবে বৈকি। কালক্রমে সেই পিকনিকের ধারার পরিবর্তন হয়েছে। অফিস, স্কুল, কলেজও শীতকালে পিকনিকের আনন্দ ভাগ করে নিয়েছে। বনভোজনের আড়ম্বরের এখন অনেক বাহারি রূপ দেখা যায়।
এখনকার বনভোজনের ছবির সঙ্গে আমার মা, মাসি, মামা, বাবাদের ছোটবেলার বনভোজনের কোনো মিল নেই। তখন ছোট্ট কলোনিগুলোতে সবার বাড়িতেই এক চিলতে বাগান ছিল। পুববাংলার মানুষের গাছপালার সঙ্গে কী যে আত্মিক টান ছিল! তাই নাকতলা অঞ্চলের সেকেন্ড স্কিম, থার্ড স্কিমের সব বাড়িতেই বাগান করার অল্প জায়গা ছিল। তখন পাড়ার সব বাড়ির মানুষ যেন একই পরিবারের। বাড়িতে অতিথি এসেছে তাই পাশের বাড়ি থেকে কাঁচের কাপ, প্লেট, থালা, বাটি নিয়ে আসতে বাড়ির কেউ ছুটল। কিম্বা রান্না করতে গিয়ে হয়ত দেখা গেল তেল নেই, বাড়ির বাইরে বেরিয়ে উল্টোদিকের বাড়িতে হাঁক দিয়ে তেল জোগাড় করা হত। এমন সম্পর্কগুলোর মধ্যেই কলোনিগুলোর ইতিহাস লেখা আছে। বিজয়গড়, যাদবপুর, বাঘাযতীন, নেতাজিনগর, নাকতলা, গড়িয়া – সব অঞ্চলেরই একই গল্প।
মায়েদের ছোটবেলায় পিকনিকের মধ্যেও সেই স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল। একদিন শীতের সন্ধ্যায় হঠাৎ করেই ঠিক হত আজ চড়ুইভাতি হবে। কারোর বাড়ির উঠোনে বা বাগানে উনুন জ্বালানো হত। বন্ধুরা সব একে একে জড়ো হয়ে এর ওর বাড়ি থেকে চাল, ডাল, তেল, নুন সংগ্রহ করত। বুয়া, অর্থাৎ আমার সেজোমাসির কাছে শুনেছি, ওরা একে ‘মুনলাইট পিকনিক’ বলত।
আমার মামাবাড়ির পিছন দিয়ে আদিগঙ্গা বয়ে গেছে। আদিগঙ্গার পাড়ের ঝোপঝাড় পেরোলেই যে কলোনি, তার নাম বিধানপল্লী। তখন বিধানপল্লীর জমি অনেক নিচু ছিল, তাই জমির দামও ছিল অনেক কম। ওপার বাংলা থেকে উদ্বাস্তু হয়ে অনেকেই ওখানে বসত গড়েছে। মায়েদের বন্ধু মানা মাসিদের বাড়িতেই এই মুনলাইট পিকনিকগুলোর আয়োজন করা হত। মেনুতে থাকত খিচুড়ি, ঘি আর ডিমভাজা।
আমার মামাবাড়ির লাগোয়া যে বাগান, সেখানেও অনেক পিকনিক হয়েছে। মামাবাড়িতে অনেকদিন পর্যন্ত উনুনে রান্না হত। তাই কাঠ, ঘুঁটে ইত্যাদির জোগাড় বাড়িতেই থাকত। সকালের জলখাবারে চা, পাঁউরুটি আর জিলিপি খেয়ে সবাই পিকনিকের আয়োজনে মশগুল হয়ে যেত। বন্ধুদের বাড়িতে এইসব ছোট ছোট পিকনিকের রান্না করতে যে যার বাড়ি থেকে চাল, ডাল, মশলা নিয়ে আসত। মাছ কিম্বা মাংস স্থানীয় বাজার থেকে কেনা হত। তখনো পাঁঠার মাংস মহার্ঘ ছিল। স্থানীয় বাজারগুলোতে প্রচুর কচ্ছপের মাংসও বিক্রি হত। তার দাম যেমন কম তেমনই সুস্বাদু। তাই যে কোনো পিকনিকের মেনুর কেন্দ্রে থাকত কচ্ছপের কষা মাংস। কচ্ছপের ডিমও আলাদা করে বিক্রি হত। ছোটবেলা থেকেই মা, মাসিদের কাছে কচ্ছপের মাংস রান্না আর তার স্বাদের গল্প শুনে আসছি।
নাকতলা সেকেন্ড স্কিমে তখন একটা সরকারি প্রাইমারি স্কুল ছিল। সেই স্কুলের সামনে অনেকখানি জায়গা ছিল। সেখানে বাবা আর বাবার বন্ধুরা একবার পিকনিকে গরুর মাংস রান্না করেছিল। প্রচণ্ড ঝাল হওয়ায় পিকনিকের আনন্দ মাটি হয়।
তখন গড়িয়া পেরিয়ে বারুইপুরের দিকের চিত্র একেবারে আলাদা ছিল। কামালগাঁজী, নরেন্দ্রপুর, সোনারপুর, রাজপুর ওই সব জায়গা গুলো তখন গ্রাম হিসেবেই পরিগণিত হত। আমার মামাবাড়ির পাড়া থেকে একবার রাজপুরে সকলে মিলে চড়ুইভাতি করেছিল। চাঁদা তুলে বাজার করেছিল। আমার মেজো মাসি, বড় মাসি আর পাড়ার আরো অন্যান্য মহিলারা রান্না করেছিল। সেই পিকনিকে পাঁঠার মাংস হয়েছিল। সারাদিন হইহুল্লোড় করে সকলে গান গাইতে গাইতে রাজপুর থেকে নাকতলা হেঁটে ফিরেছিল। সেই দিনের সেসব গল্প মায়ের কাছে আজও শুনি।
পাড়ার পিকনিকগুলো আবার খানিকটা অন্যরকম ছিল। চড়ুইভাতির আগে পাড়ার ক্লাবে মিটিং বসত। সঙ্গে থাকত চা আর গরম গরম ফুলকপির সিঙাড়া। ম্যাটাডোর ভাড়া করা হত। বড় বড় হাঁড়ি, কড়াই সব তুলে পাড়ার লোকে সদলবলে হইহই করতে করতে পিকনিক করতে যেত। যাত্রাপথের খাবার হিসাবে ডিম সেদ্ধ, পাঁউরুটি আর কলা থাকত। গন্তব্যে পৌঁছে পাড়ার মা, কাকিমারা উনুন ধরানোর তোড়জোড় শুরু করত। কারোর দায়িত্ব পড়ত মাছে নুন হলুদ মাখানোর, কারোর দায়িত্ব থাকত তরকারি কাটার। এভাবেই মিলেমিশে দুপুরের রান্না হত।
আরো পড়ুন মগজের কারফিউ ভেঙে ঢিল ছুড়ল জুইগাটো
অফিসের পিকনিকে বাস ভাড়া করা হত। অফিসের জেঠু গোছের লোকজন গিয়ে বাজার করত। ২৫ ডিসেম্বর বা পয়লা জানুয়ারি সকাল সকাল বাস ছেড়ে দিত। রান্নার ঠাকুর সঙ্গে যেত। একে একে কর্মচারী এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের তুলতে তুলতে বাস গিয়ে পৌঁছত চড়ুইভাতির জায়গায়।
একালের পিকনিক হয় জাঁকজমকপূর্ণ, খাওয়াদাওয়ায় থাকে অভিনবত্ব আর রান্নায় থাকে আধুনিকতার স্পর্শ। আজকের দিনে বনভোজনে সবাই মিলে কুটনো কোটা, চাল ডাল ধোয়া, একসঙ্গে রান্না করা – এসবের আর অবকাশ কোথায়? জলখাবার থেকে বিকেলের চা আর টা-এর ব্যবস্থা এখন ক্যাটারারই করে থাকে। সকালের জলখাবারে কড়াইশুঁটির কচুরি আর নতুন আলুর দম। মাঝে চিকেন বা ভেজ পকোড়া আর দুপুরে ভাত, ডাল, তরকারি, মাছ, মাংস কব্জি ডুবিয়ে খাওয়া।
মায়েদের সময়কার পিকনিকের স্মৃতি ক্রমশ আবছা হয়ে গেছে। কলোনির মানুষের জীবন আর পারস্পরিক সম্পর্কের সমীকরণগুলোও এখন অনেক বদলে গেছে। তবু তো প্রতিবছর শীতকালে স্কুল, কলেজ, অফিস, বন্ধুবান্ধব, পারিবারিক বনভোজনের আয়োজন করা হয়। গান, গল্প, খেলাধুলায় ভরে থাকুক পিকনিকের দিনগুলো।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








