বিশ্বেন্দু নন্দ

আজকের রাজনীতিতেও জীবন্ত চরিত্র জিন্দাপীর ঔরঙ্গজেবের নামে নাগপুর সংঘর্ষের দিন সাতেক পরে এই লেখা লিখছি।

ভারতের তলিয়ে যাওয়া অর্থনীতিতে, ব্যাংক ফেল করার বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ২০২৫ সালে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো কোন সম্রাট আলমগীর ঔরঙ্গজেবের সমাধি সরানোর দাবি জানাচ্ছে? যে আলমগির জিন্দাপীর ১৭০৭ সালে নব্বইতে পা দিয়ে প্রয়াত হচ্ছেন মোগল সাম্রাজ্যকে বিশ্বমানবতার গন্তব্যভূমিতে পরিণত করে। তাঁর আমলের দক্ষিণ এশিয়া ভৌগোলিক ব্যপ্তিতে, সম্পদে, খ্যাতিতে বিশ্বের প্রত্যেকটি সাম্রাজ্যের সামনে জ্বলন্ত উদাহরণ। এই প্রবন্ধে হিন্দুত্ববাদীদের ঔরঙ্গজেব দর্শন চেষ্টা নিয়ে আলোচনা করব না, বরং প্রথম পর্বে বোঝার চেষ্টা করব মোগল আমলে বিশ্বজুড়ে তাঁর প্রভাব কতখানি ব্যাপ্ত ছিল। তা আমরা তিনটি উদাহরণ থেকে দেখব – দুটি সম্রাটের জীবদ্দশার আর তৃতীয়টি মৃত্যুর পরের। প্রবন্ধ শেষ করব তাঁর সমাধি সম্পর্কিত অভিলাষ নির্দেশ করে মৃত্যুকালের উইল উল্লেখ করে। ঔরঙ্গজেব কেমন মানুষ ছিলেন? সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায় ছেড়ে দিলাম পাঠকের উপর।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

১৬৭৫ সালে কবি জন ড্রাইডেন মোগল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের নামে লিখেছিলেন বিয়োগান্ত কাব্যনাট্যAureng-zebe পাঠকদের জন্য ড্রাইডেনের লেখার প্রোলগ তুলে দেওয়া গেল

Our author, by experience, finds it true,
’Tis much more hard to please himself than you;
And out of no feign’d modesty, this day
Damns his laborious trifle of a play;
Not that it’s worse than what before he writ,
But he has now another taste of wit;
And, to confess a truth, though out of time,
Grows weary of his long-loved mistress, Rhyme.
Passion’s too fierce to be in fetters bound,
And nature flies him like enchanted ground:
What verse can do, he has perform’d in this,
Which he presumes the most correct of his;
But spite of all his pride, a secret shame
Invades his breast at Shakspeare’s sacred name:
Awed when he hears his godlike Romans rage,
He, in a just despair, would quit the stage;
And to an age less polish’d, more unskill’d,
Does, with disdain, the foremost honours yield.
As with the greater dead he dares not strive,
He would not match his verse with those who live:
Let him retire, betwixt two ages cast,
The first of this, and hindmost of the last.
A losing gamester, let him sneak away;
He bears no ready money from the play.
The fate which governs poets, thought it fit
He should not raise his fortunes by his wit.
The clergy thrive, and the litigious bar;
Dull heroes fatten with the spoils of war:
All southern vices, Heaven be praised, are here;
But wit’s a luxury you think too dear.
When you to cultivate the plant are loth,
‘Tis a shrewd sign, ‘twas never of your growth;
And wit in northern climates will not blow,
Except, like orange trees, ‘tis housed with snow.
There needs no care to put a playhouse down,
‘Tis the most desert place of all the town:
We, and our neighbours, to speak proudly, are,
Like monarchs, ruin’d with expensive war;
While, likewise English, unconcern’d you sit,
And see us play the tragedy of Wit.

এই কাব্যনাট্য লেখার সাড়ে তিনশো বছর পরে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে নর্দান ব্রডসাইডস কোম্পানি দ্য ক্যাপটিভ কুইন নামে সেটি মঞ্চস্থ করে স্যাম ওয়ানামেকার প্লে হাউস রঙ্গমঞ্চে। নির্দেশনা এবং ঔরঙ্গজেবের ভূমিকায় অভিনয়ে ছিলেন ব্যারি রুটার। দ্য গার্ডিয়ান কাগজে ওই নাটকের সমালোচনা ইন্টারনেটে সহজলভ্য। আজও সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে ঔরঙ্গজেব সমান ভাস্বর।

দ্বিতীয় উদাহরণ আরও অদ্ভুত। ঔরঙ্গজেব যে দশকে আশির ঘর থেকে নব্বইতে পা দিচ্ছেন, সেই দশকে ইউরোপের সবচেয়ে বিখ্যাত স্বর্ণকার-মণিকার জোহান মেলচিওর ডিংলিংগার ৫২২৩টি হীরে, ১৮৯টি রুবি, ১৭৫টি পান্না, ৫৩টি মুক্তো, দুটি ক্যামিও এবং একটি নীলকান্তমণি দিয়ে তাঁর সম্মানে ৬,০০০ কিমি দূরে বসে তৈরি করছেন ‘The Royal Household at Delhi on the occasion of the Birthday of the Great Moghul Aurangzeb’, অর্থাৎ ঔরঙ্গজেবের জন্মদিনের দিল্লির রাজসভা। অসামান্য স্বর্ণ-মণি খোদাই কীর্তি ডিংলিংগার জুড়লেন ১৩৭টি এনামেল করা সোনা-রূপোর মানুষ ও পশুর মূর্তি। এখনও সেই অসামান্য কীর্তিটি ড্রেসডেনে গ্রিন ভল্ট জাদুঘর আলো করে আছে। মাথায় থাক, আকবরের রাজত্ব থেকেই মোগল মহিমার কিংবদন্তি ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ছিল। আকবর রোমের জেসুইট লাইব্রেরির জন্য নিজের লাইব্রেরি থেকে রেজিও মন্টেনাসের বই উপহার দেন। বইটি রোমে ছিল না। রেমব্রাঁ নেদারল্যান্ডসে একদা মোগল মিনিয়েচার নকল করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। সে সময় স্যাক্সনির শাসক অগাস্টাস দ্য স্ট্রং ডিংলিংগারের এই কীর্তি কেনার জন্য নিজের কেল্লা তৈরির থেকেও বেশি অর্থ, প্রায় ৬০,০০০ থ্যালার, ব্যয় করেছেন অক্লেশে।

তৃতীয় উদাহরণ ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর ১২০ বছর পর, ভারতকে উপনিবেশে পরিণত করার পরের ঘটনা। উপনিবেশে পা না দেওয়া প্রাচ্যবাদী কবি লেটিশিয়া এলিজাবেথ লন্ডন ১৮৩০ সালে প্রয়াত সম্রাটের বিশাল এক সমাধিস্থল কল্পনা করে বড় স্থাপত্যের ছবিওয়ালা কবিতা লিখলেন ‘THE TOMB OF AURUNGZEBE’

“Oh, fleeting honours of the dead,
Oh, high ambition lowly laid.”
“A mighty tomb, fit for a mighty king,
One last great mockery, a thousand slaves
Dug marble from the quarry, then arose
The slow foundation—men put forth their skill
In rich devices, and in ornament,
Then towered the rounded column, and the walls
Shone with red gold and many-coloured stones.
Then spread the broidered purple for a pall,
And all for what?—to hide some grains of dust.”
So might the cynic say; so say not I.
It is a glorious thing for man to war
With time, by some great work. Wherefore was skill,
And energy, and industry, bestowed,
If that he use them not? How many hearts
In the completion of this building throbbed
With the fine pride of art—that pride which leads
To all that can redeem or civilize
Our human nature. Now, what solemn thoughts
Brood here! an atmosphere from which we draw
Such lessons as the dead alone can give,
And only they when present to the mind,
As they are present in this monument—
Oh, build tombs for the dead, they’re mightier there
Than in their living palaces!

Az tila o nuqreh gar saazand gumbad aghniyaa!/Bar mazaar e maa ghareebaan gumbad e gardun bas ast!

ধনীরা কবরে সোনা-রুপোর গম্বুজ তৈরি করবে!/আমার মতো দরিদ্রের কবরের ছাদ আকাশই!

কিন্তু যে সম্রাটকে নিয়ে সারা বিশ্ব সেদিনও এত উচ্ছ্বসিত ছিল, যাঁর বিশাল সমাধি কল্পনা করেছেন লন্ডনের প্রাচ্যবাদী কবি, সেই সমাধি কল্পনা কি আদৌ সত্য হল? আমাদের প্রশ্ন – লেটিশিয়া তাঁর কবিতার সঙ্গে সম্রাট ঔরঙ্গজেবের যে কল্পিত সমাধির ছবি জুড়েছিলেন, তিনি কি সত্যই সেইভাবে বিশাল সমাধি ভবন তৈরি করে সমাধিস্থ হন? একেবারেই না। আলমগীরের ইচ্ছাকে সম্মান দিয়ে, খুলদাবাদের চিস্তি সুফি দরগা জৈনুদ্দিন শিরাজীর কবরের পাশে তাঁকে অনামা অনাড়ম্বর কবরে সমাধিস্থ করা হয়। বাবা, ঠাকুর্দার মত বিশাল সমাধিস্থল তৈরি করার গৌরব তিনি অস্বীকার করলেন। আজও তাঁর বাবা-মায়ের সমাধিস্থল রওজা-এ-মুনাবরা, উজ্জ্বলতম সমাধিস্থল, তাজমহল, টিকিট বিক্রিতে রেকর্ড করে। এদিকে হিন্দুত্ববাদীরা বুকে তুলসী চারা নিয়ে চাদরে ঢাকা সাদা পাথরে মোড়া কবরে শুয়ে থাকা সম্রাটের সমাধি উপড়ে ফেলার দাবিতে দাঙ্গা লাগাতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না।

আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটির ঐতিহাসিক আলী নাদিম রেজাভি দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-কে বলেছেন ‘ইসলামিয় নীতি অনুসারে, ঔরঙ্গজেবের ইচ্ছা ছিল সাধারণতম সমাধিতে সমাহিত হওয়া। তাঁর সমাধি ১৪শ শতাব্দীর চিস্তি সাধক শেখ জয়নুদ্দিনের দরগা (মাজার) কমপ্লেক্সের ভিতরে রয়েছে। এখানে ঔরঙ্গজেবের পুত্র আজম শাহকেও সমাহিত করা হয়েছে।’ মজার কথা হল, তাঁর অন্যতম প্রতিপক্ষ, দিদি জাহানারার কবরও, তাঁর মতই সাধারণ। তিনি নয়াদিল্লির নিজামুদ্দীন আউলিয়ার দরগায় ভাইয়ের মতই সাধারণতম কবরে সমাহিত।

ঔরঙ্গজেবের সমাধির বিস্তারিত বর্ণনা সাকি মুস্তাদ খানের মাসির-ই-আলমগীরিতে পাচ্ছি ‘…মহামান্য সম্রাটের শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী, তাঁকে শেখ জৈনুদ্দিনের সমাধির আঙ্গিনায় [দৌলতাবাদের রৌজায়] সম্রাটের জীবদ্দশায় নির্মিত সমাধিতে সমাহিত করা হয়েছে… সমাধির ওপরের অংশ খুব বেশি হলে দৈর্ঘ্যে তিন গজ, প্রস্থে আড়াই গজ, উচ্চতা কয়েক আঙ্গুল; লাল পাথরের মঞ্চের (চবুত্র), মাঝখানে গর্ত। গর্তের মাটিতে সুগন্ধি ভেষজ’ (অনুবাদ: যদুনাথ সরকার)। পরে রৌজার নাম পালটে খুলদাবাদ রাখা হয়। ঔরঙ্গজেবকে ‘খুলদাবাদ’ বা ‘অনন্তকালের বাসিন্দা’ উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ইতিহাসবিদ রানা সাফভি দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-কে বলেন, ‘রৌজা কথার অর্থ সমাধি। খুলদাবাদ আগে রৌজা নামে পরিচিত ছিল কারণ এখানে বহু সুফি সাধকের মাজার ছিল।’

ইতিহাসবিদ মাইকেল ব্র্যান্ড তাঁর Orthodoxy, Innovation, and Revival: Considerations of the Past Imperial Mughal Tomb Architecture গবেষণাপত্রে লিখছেন, বাবর আর ঔরঙ্গজেব খুব সাধারণ সমাধিতে সমাধিস্থ হওয়ার ইচ্ছা জানিয়ে যান। হুমায়ুন, আকবর আর জাহাঙ্গীরের সমাধি বানিয়েছেন তাঁদের ছেলেরা বা উত্তরাধিকারীরা। তাঁর প্রশ্ন – মোগল সম্রাটদের সমাধি কি সত্যিই মৃত সম্রাটদের স্মরণিকা, নাকি সিংহাসনের যুদ্ধে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি সম্রাটের বিজয় স্তম্ভ?

ঐতিহাসিক ক্যাথরিন আশের বলছেন, ঔরঙ্গজেব কট্টর সুন্নি মুসলিম হয়েও সুফি সাধকের দরগায় সমাহিত হতে দ্বিধা বোধ করেননি। আশেরের বক্তব্য, ঔরঙ্গজেব জানতেন যে প্রাতিষ্ঠানিক ইসলামে কবর জিয়ারত গ্রহণযোগ্য নয়। তবুও স্বনির্বাচিত সমাধিক্ষেত্রের সিদ্ধান্ত থেকে একটি কথা পরিষ্কার যে তিনি ব্যক্তিগতভাবে যা-ই বিশ্বাস করুন, সুফি সন্তদের শ্রদ্ধা করতেন। এর উদাহরণ আমরা রিচার্ড ঈটনের লেখাতেও পাই। ঈটন বলছেন, ঔরঙ্গজেব যৌবনে দক্ষিণ ভারতে সুবাদার হিসেবে যাওয়ার পর বহুকাল সুফি সন্তদের সঙ্গ করেছেন, তাঁদের সম্বন্ধে নোট নিয়েছেন এবং ঔরঙ্গাবাদ প্রতিষ্ঠার পরে তাঁদের প্রত্যেককে সেখানে সাদর আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

আলমগীরের কবরের ভিতরের খোলা জমিতে দাঁড়ালে আশ্চর্য লাগে। এখনকার ছবিতে যে মার্বেলের গেট, ভিতরে সাদা পাথর, জালি দেখা যায় – এসব কিচ্ছু আগে ছিল না। খোলা জমিতে সাধারণ পাঁচিলে ঘেরা এই কবর। দুপাশে খাদিমদের চালা। ঠিক নিজামুদ্দীনের দরগায় জাহানারার সমাধির মত – খোলা, শুধু ঘাসে ঢাকা।

এই ছবিতে তুলসি চারার অবয়ব স্পষ্ট। ব্রিটিশ শাসক কার্জন খুলদাবাদে এসে এটিকে পাথরে মুড়ে দেন। দুবেলা সাধারণ মানুষ জিন্দাপীরের কবরে নামাজ পড়তে আসেন। ঔরঙ্গজেব জীবনের শেষ দিনগুলিতে টুপি সেলাই করে যে অর্থ উপার্জন করেছেন, সেই অর্থ থেকে নিজের সমাধির জন্য মূল্য পরিশোধ করেন। খরচ হয়েছিল চার টাকা দু আনা। এই তথ্য থেকে আমরা তাঁর উইলে প্রবেশ করব।

‘Too great is the grief of this world, and I have only one heart bud—/how can I pour all the desert’s sand into an hourglass?’

– ঔরঙ্গজেব (অনুবাদ: অড্রে ট্রাশকে)

যদুনাথ সরকারের আহকম-ই-আলমগীরি থেকে ৮ নং অ্যানেকডোট, সম্রাটের শেষ ইচ্ছাপত্র।

সর্বশক্তিমানের যারা অনুগামী, যারা তাঁর পরিতুষ্টি প্রদান করেছেন তাদের উপর তাঁর দোয়া ঝরে পড়ুক। আমার শেষ ইচ্ছের নির্দেশাবলী দিয়ে যেতে চাই:

প্রথম – এই পাপী এবং অন্যায়পরায়ণ মানুষটির হয়ে হাসানের পুণ্য কবরে চাদর দেবে, কারণ যারা পাপের সমুদ্রে ডুবে রয়েছে তাদের করুণা আর কৃপার দরজা দিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। এই মঙ্গলকর কর্মটি [ইচ্ছাপত্র রচনাটি] আমার মহৎ পুত্র শাহজাদা আলিজার [মহম্মদ আজম] উপস্থিতিতে করছি।

দ্বিতীয় – ফেজ টুপি সেলাই করে যে চার টাকা দু আনা রোজগার করেছিলাম, সেটি মহলদার আয়া বেগের জিম্মায় রাখা আছে। সেটা অবহেলিতদের কবরে শবচ্ছেদ দেওয়ার কাজে ব্যবহার করবে, কোরান নকল করার শ্রম রূপে তিনশো পাঁচ টাকা আমার নিজের তহবিলে রয়েছে নিজের ব্যক্তিগত খরচের জন্য। আমার মৃত্যুর দিন সেগুলি ফকিরদের দান করে দিও। শিয়ারা যেহেতু কোরান নকল করা বেআইনি মানে, এই টাকা কটি দিয়ে আমার কবরের আচ্ছাদন কিনে দিও না।

তৃতীয় – শাহজাদা আলিজার থেকে আমার শেষকৃত্যের জন্য বাকি কিছু অর্থ নিও, সে আমার খুব কাছের সন্তান, আমার শেষকৃত্যের আইনি বেআইনি কাজ তাঁর ইচ্ছের উপর নির্ভর করছে। এই নিরুপায় [ঔরঙ্গজেব] ব্যক্তি সেই কাজের জন্য জবাবদিহি করতে থাকবে না, কেননা মৃতদের ভার তার উত্তরপুরুষের হাতে ন্যস্ত হয়।

চতুর্থ –  ঠিক পথে চলতে চলতে [পথ ভুল করে] বিপথের উপত্যকায় গিয়ে পড়া এই ভ্রমণকারীকে মাথা খালি রেখেই কবর দিও কারণ, ছারখার হয়ে যাওয়া প্রত্যেক পাপী, একমাত্র মাথায় আচ্ছাদন না দিয়ে সর্বশক্তিমানের সামনে উপস্থিত হলে তাঁর অনুকম্পা অর্জন করে।

পঞ্চম – আমার কবরে দেওয়া কফিনের মাথাটি গাজি কাপড় দিয়ে ঢেকে দিও। কবরে ঢাকাঢুকি দিও না, আর সে সময় বিধর্মী কোনো গানবাজনা কোর না বা সাদাসিদা নবীর মাওলাদ দেখিও না।

ষষ্ঠ – এই সাম্রাজ্যের শাসকের (আমার উত্তরাধিকারীর) একটু কাজ করা উচিত, যারা এই দুর্বিনীত হতভাগ্যের [ঔরঙ্গজেব] সঙ্গে মরুভূমি, জঙ্গলে [দাক্ষিণাত্যে] ঘুরেছে, তাদের ক্ষমা এবং দোয়া প্রদর্শন করবে। এমনকি তারা যদি কোনো ভুলও করে থাকে, উত্তরে তাদের দয়া উপহার দাও এবং [তাদের ভুলগুলি] মার্জনা করো।

সপ্তম – হিসাব রাখার (মুতাসাদ্দি) কাজে পারসিকদের থেকে উত্তম আর এই বিশ্বে কেউ নেই। এবং যুদ্ধেও, সম্রাট হুমায়ুনের সময় থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত, কোনো দেশ তাদের থেকে উত্তম হতে পারেনি, এবং তাদের জমিতে দাঁড় শক্ত করে থিতু করা দুটি পা নাড়াতে পারেনি। সব থেকে বড় কথা তারা তাদের প্রভুর বিরুদ্ধে কখনো বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। তাদের আশা শুধু সম্মান পাওয়া। কিন্তু তাদের সঙ্গে চলা খুব কঠিন। যে কোনোভাবেই হোক তাদের ঠিক পরামর্শ দেবে, এবং তাদের আলাদা আলাদা করে নিয়োগ করবে।

অষ্টম – তুরানীরা সেনা সমাজ। তারা লড়াই, পিছু নেওয়া, বলপ্রয়োগ করা, রাতের আক্রমণ এবং গ্রেফতারের কাজ ভাল পারে। যুদ্ধের মাঝপথ থেকে কখনো হঠাৎ যদি পিছিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তাহলে তাদের কোনো সন্দেহ, অসম্মান বোধ হয় না। এর অর্থ ‘ছোঁড়া তির তুমি ফিরিয়ে নিতে পারো’ – এবং হিন্দুস্তানিদের মূর্খতার থেকে তারা বহু দূরে বসবাস করে, যারা (হিন্দুস্তানিরা) মনে করে মাথা চলে যাক তবু (যুদ্ধ থেকে) পিছু হঠব না। এই জাতিকে যথাযথ সম্মান দেবে, কেননা অন্যেরা যা পারবে না, তা তারা করে দেখায়।

নবম – বাহারার সৈয়দদের যথোচিত সম্মান দেখাবে, কারণ তারা (নবীর পরিবারের) আশীর্বাদধন্য, কোরানের পুণ্য কবিতায় বলেছে, নবীর নিকট সম্পর্কের মানুষদের তাদের প্রয়োজনীয় সব কিছু দিতে হয়, কখনোই তাদের সম্মান দিতে বিলম্ব করবে না। পবিত্র কবিতায় বলা হয়েছে, আমি বলছি, এর বিনিময়ে (নবীর) আত্মীয়দের ভালবাসা ব্যতীত তুমি কিন্তু কোনো প্রতিদান আশা কোরো না। এই পরিবারের প্রতি ভালবাসা হল নবীত্বের প্রতি দেওয়া তোমার খাজনা, এবং এই বিশ্বে এর থেকে প্রয়োজনীয় ভালবাসা আর কিছুই নেই। কিন্তু বারহার সৈয়দদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে চরম সতর্ক থেকো। তাদের মন দিয়ে ভালবাসবে না, তাদের এমনভাবে পদোন্নতি দেবে না, যাতে তারা সাম্রাজ্যের নানা বিষয় নিয়ন্ত্রণ করতে পারে; তাহলে তারা সাম্রাজ্যটাও চেয়ে বসতে পারে। তাদের যদি একটুও ছাড় দাও তারা তোমার সম্মানহানি ঘটাবেই।

দশম – সম্রাটকে সাম্রাজ্যের প্রতিটি প্রান্তে ঘুরে বেড়াতে হবে; সে যেন এক জায়গায় বসে না যায়, তাতে হয়ত তার বিশ্রাম হবে, কিন্তু [সেই বিশ্রাম] ভবিষ্যতে হাজারো দুর্দশা আর উপসর্গ বহন করে আনবে।

একাদশ – পুত্রদের বিশ্বাস করবে না। তোমার জীবনকালে তাদের সঙ্গে বন্ধুর মত আচরণ করবে না। যদি সম্রাট শাহজাহান দারাশুকোর প্রতি এই আচরণ না করতেন, তাহলে হয়ত বৃদ্ধাবস্থায় তাঁকে এই দুঃখের মধ্যে কাটাতে হত না। চিরাচরিত প্রবাদটি মনে রাখবে ‘রাজার কথা শুকনো [কর্কশ] হয়’।

দ্বাদশ – রাষ্ট্রের মূল স্তম্ভ হল, রাজ্যে ঘটে চলা ঘটনাবলী সম্পর্কে সবসময় ওয়াকিবহাল থাকা। একটি মুহূর্তও যদি তুমি গাফিলতি করো, সেই অসম্মান তোমায় দীর্ঘদিন বয়ে চলতে হবে। শয়তান শিবার [শিবাজী] মুক্তি ঘটেছিল আমার অসতর্কতায়, শেষ জীবন পর্যন্ত তার প্রতিদান চোকাতে হয়েছে [মারাঠাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে করে]।

বারো সংখ্যাটি আশীর্বাদক। আমি এই বারোটি নির্দেশ দিয়ে আমার ইচ্ছাপত্র সমাপ্ত করলাম।

(কবিতা) তুমি যদি পড়াশোনা কর, শেখ, জ্ঞানকে চুম্বন করবে,/ আর যদি জ্ঞানকে অবহেলা করো তাহলে হায়! হায়! হায়।

(অনুবাদ: নিবন্ধকার)

নিবন্ধকার লেখক ও সংগঠক

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.