অবিন চক্রবর্তী

গত কয়েক বছরে ভারতব্যাপী হিন্দুত্ববাদী আস্ফালনের অঙ্গ হিসাবে প্রায়শই বিভিন্ন স্থানীয় হিন্দু রাজা মহারাজাদের শৌর্য, বীর্য, প্রজ্ঞা ও ঔদার্যের প্রতিভূ বলে তুলে ধরার প্রয়াস দেখা গেছে এবং মুসলিম ধর্মাবলম্বী শাসকদের বর্বর, কলহপ্রিয়, সংকীর্ণমনা, ব্যাভিচারী এবং নির্দয় বলে দেখানো হয়েছে। এ নিয়ে কোনো সংশয় নেই যে অনেক মুসলমান শাসক নানাবিধ অত্যাচার চালিয়েছেন। একইভাবে একথাও সত্যি যে বহু হিন্দু শাসকও প্রজাদের উপর নানাভাবে নিপীড়ন চালিয়েছেন। রাজতন্ত্রের যা যা দোষ, তা ধর্মনির্বিশেষে বহু ভারতীয় শাসকের মধ্যেই উপস্থিত ছিল। তাঁদের মধ্যে সেইসব মারাঠা শাসকও ছিলেন, যাঁদের আজকাল পানিপথ (২০১৯) তানহাজি (২০২০), ছাওয়া (২০২৫), ইত্যাদি ছবির মাধ্যমে নিষ্কলঙ্ক মাহাত্ম্যের প্রতীক হিসাবে তুলে ধরা হচ্ছে। জাতিভেদ প্রথা, পিতৃতন্ত্র এবং প্রাদেশিকতায় ভরপুর পেশোয়া শাসন আসলে নানাবিধ অবিচারের আধার ছিল।

পেশোয়া আমলে জাতভিত্তিক অত্যাচারের কথা স্বয়ং বাবাসাহেব আম্বেদকরের লেখা অ্যানাইহিলেশন অফ কাস্ট বইতেও পাওয়া যায়

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মারাঠা রাজ্যে পেশোয়াদের মলে, কোনো অস্পৃশ্য ব্যক্তি যদি তার ছায়ার দ্বারা হিন্দুদের কলুষিত করে, সেই আশঙ্কায় অস্পৃশ্য ব্যক্তিদের জনসাধারণের রাস্তায় চলাচলের অনুমতি ছিল না। অস্পৃশ্য ব্যক্তিকে তার কব্জিতে বা গলায় একটি কালো সুতো বাঁধতে হত, যাতে ভুল করে তার স্পর্শে হিন্দুরা নিজেদের দূষিত না করে, সেজন্য একটি দাগ বা চিহ্ন ব্যবহার করতে হত। পেশোয়ার রাজধানী পুনায়, অস্পৃশ্য ব্যক্তিকে তার কোমরে ঝুলন্ত একটি ঝাড়ু বহন করতে হত, যাতে সে তার পায়ের ধুলোয় ঝাড়ু দিতে পারে, যাতে একই ধুলোর উপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া কোনো হিন্দু দূষিত না হয়। পুনায় অস্পৃশ্য ব্যক্তি যেখানেই যান না কেন তাঁর গলায় একটি মাটির পাত্র ঝুলিয়ে রাখতে হত তাঁর থুতু ধরে রাখার জন্য, পাছে তাঁর থুতু মাটিতে পড়লে কোনো হিন্দু অজান্তেই তার উপর পা রেখে দূষিত না হয়। (অনুবাদ লেখকের)

একই আমলে স্বর্ণকাররা ব্রাহ্মণদের মত করে ভাঁজ করা ধুতি পরা এবং নমস্কার করার অভ্যাস চালু করায় ব্রাহ্মণরা তার বিরোধিতা করে। আম্বেদকর লিখছেন

ধুতি পরার ভাঁজ এবং নমস্কার – দুটোই ব্রাহ্মণদের কাছে মুল্যবান ছিল। ব্রাহ্মণরা এই অনুকরণ এবং সোনারদের ব্রাহ্মণ হিসাবে আত্মপ্রকাশের প্রচেষ্টা পছন্দ করতেন না। পেশোয়াদের সাহায্যে ব্রাহ্মণরা সোনারদের এই প্রচেষ্টা সফলভাবে নস্যাৎ করে দেন। এমনকি তাঁরা বোম্বেতে বসবাসকারী সোনারদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করার জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন পরিষদের সভাপতিকেও বাধ্য করেন। (অনুবাদ লেখকের)

এভাবেই পেশোয়াদের হিন্দু পাদ পাদশাহীতে তীব্র জাতিগত বৈষম্য বিদ্যমান ছিল। এ সম্পর্কে নানা গবেষণা ইতিমধ্যেই হয়েছে। নতুন গবেষণার মধ্যে একটি হল ২০২২ সালে এক্সিটার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের ছাত্র প্রশান্ত প্রণীত মারাঠা সাম্রাজ্যে জাতিভেদ প্রথা ও নারীদের অবস্থান সম্পর্কিত সন্দর্ভ, যা এরকম বিবিধ অবিচারের কথা তুলে ধরেছে।

প্রশান্তের গবেষণায় সপ্তদশ এবং অষ্টাদশ শতাব্দীর বিভিন্ন অপরাধ ও তার বিচারের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের বৈষম্যমূলক আচরণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেমন তালুক বিজয়দুর্গের পাড়ে গ্রামের বাসিন্দা গণেশভাট বারভের স্ত্রী অন্নপূর্ণা বাই (১৭৯৩) পেশোয়াকে জানান যে গঙ্গাধর গোবিন্দ (তালুক বিজয়দুর্গের স্থানীয় কর্মকর্তা), যিনি তাঁর মামলার তদন্ত করছিলেন, তিনি প্রমাণ করতে পারেননি যে তিনি ব্যভিচার করেছেন। তবুও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছেন এবং জরিমানা করেছেন। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় পেশোয়া সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে তাঁর সম্পত্তি এবং অর্থ ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেন। তবে পাশাপাশি তিনি অন্নপূর্ণা বাইকে প্রায়শ্চিত্তের নির্দেশ দেন। কারণ এসবের জন্যে তাঁকে অপবিত্র বলে মনে করা হয়েছিল। ফলে জাত ও ধর্মীয় মর্যাদায় নাকি আঘাত লেগেছিল। পেশোয়া বিজয়দুর্গের তিনটি গ্রামের ব্রাহ্মণ সমাবেশকে অন্নপূর্ণা বাইয়ের শুদ্ধিকরণ এবং পুনর্বাসনের জন্য তাঁকে পঞ্চগব্য (গরুর দুধ, দই, ঘি, গোমূত্র এবং গোময়) দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন, গঙ্গাধরকে তত্ত্বাবধান করতে বলেছিলেন। অন্নপূর্ণার আইনি ও আর্থিক শাস্তি প্রত্যাহার তাঁর প্রায়শ্চিত্ত করার উপর নির্ভরশীল ছিল। এই ব্যবস্থা পেশোয়ার ব্রাহ্মণ্যবাদী কর্তৃত্ব দেখিয়ে দেয় এবং স্থানীয় ব্রাহ্মণ সমাবেশকে আরও শক্তিশালী করে। এটি পেশোয়ার সরকারের প্রচারের কৌশল হতে পারে। তবে আইনের ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, অন্নপূর্ণা অপরাধী না নির্দোষ তার সত্যতা বিচার করার কোনো প্রমাণ নেই এখানে। অর্থাৎ একটি অভিযোগই একজন মহিলার সুনাম নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট ছিল পেশোয়ার শাসনে।

ডাইনি সন্দেহেও মহিলাদের উপরে নানা উৎপীড়ন চলত। মারাঠিভাষী অঞ্চলে ডাইনিবিদ্যাকে অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হিসাবে বিবেচনা করা হত। যদিও মারাঠা বিচারব্যবস্থায় কোনো বর্ণের মহিলাকেই সাধারণত মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হত না, ডাইনিবিদ্যার ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠলেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হত অনেক সময় শাসকের কোনো বিচার ছাড়াই। যেমন গবেষণায় জানোরি গ্রামের প্রধানের হাতে রামজির মায়ের হত্যার কথা উঠে এসেছে। রামজির মা ডাইনি ছিলেন, ভূতপ্রেত পুষতেন, তাড়াতেন এবং মন্দ আত্মাদের মোকাবিলা করতেন জাদুবিদ্যার সাহায্যে – এই ভেবে জানোরি গ্রামের প্রধান (পাটিলা) ওই মহিলাকে হত্যা করেন। পাটিলাকে পুনেতে একটি তদন্তের জন্য ডেকে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে একথা প্রতিষ্ঠিত হয় যে যদিও রামজির মা জাদুবিদ্যার উপাসক ছিলেন, তবু গ্রামের প্রধান সরকারের অনুমতি ছাড়াই তাঁকে হত্যা করেছেন।

ব্রিটিশ শাসনে পশ্চিম ভারতে, বিশেষ করে মেওয়ার এবং খানদেশ অঞ্চলে সাধারণত ডাং, ভিল এবং কোকনি উপজাতির মহিলাদের ডাইনি হওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হত এবং আইনি বিচারের আগেই জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হত। তবে ব্রিটিশরা উনিশ শতকের মাঝামাঝি এই অঞ্চলগুলিতে ডাইনি হত্যা আইনত নিষিদ্ধ করে। একইভাবে, দলিত মহিলারা, বিশেষ করে যারা পরিত্যক্ত, বৃদ্ধা, বা বিধবা, তাঁদের উচ্চবর্ণের লোকেরা ডাইনিবিদ্যা চর্চা করার অভিযোগে অভিযুক্ত করত। সম্পত্তি দখল করে নেওয়া এবং জাতিগত বিভাজন বজায় রাখাই এসবের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল। এইসব মহিলাদের সামাজিকভাবে বর্জন করা থেকে শুরু করে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা পর্যন্ত নানাবিধ শারীরিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক সহিংসতার সম্মুখীন হতে হত।

রামায়ণে দেখানো হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় নাক ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক সম্মানের প্রতীক। ‘নাক কেটে ফেলা’ কথাটি দক্ষিণ এশিয়ার বহু ভাষাতেই অসম্মান করা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। হিন্দুশাস্ত্রের ধ্বজাধারী মারাঠা শাসনে মহিলাদের এবং তাদের পরিবারকে অসম্মান করার জন্য নাক কেটে দেওয়ার এই প্রবণতাকে আরও শক্তিশালী করেছিল। যেমন জুন্নারের জনোজি দাভারার স্ত্রী অহিলির কথা বলা যেতে পারে। অহিলি দেবজীর সাথে অবৈধ যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। দেবজীকে জরিমানা করা হয় এবং অহিলীকে কারাগারে পাঠানো হয়। তাঁর স্বামী পেশোয়ার কাছে মুক্তির আবেদন করেন। পেশোয়া ১৭৮১-৮২ সালে আদেশ দেন, অহিলীর নাক কেটে নিয়ে মুক্তি দেওয়া হোক।

পাশাপাশি, পেশোয়ারা লিঙ্গভিত্তিক ও বর্ণভিত্তিক দাসত্বকে হাতিয়ার হিসাবেও ব্যবহার করেছিলেন। এক পাওয়ার পরিবারের (অব্রাহ্মণ) কন্যা অবৈধ যৌন মিলনে লিপ্ত হওয়ায় তাকে কোরিগড় দুর্গে বন্দি করা হয়। তারপর ১৭৫৫-৫৬ সালে তাকে গঙ্গাধর ভাট কারভের কাছে ৩০ টাকার বিনিময়ে দাসী হিসাবে বিক্রি করা হয়। প্রাপ্ত নথি অনুসারে, কোনো পুরুষ (যে কোনো বর্ণের) বা ব্রাহ্মণ মহিলাকে রাষ্ট্র কখনো দাস হিসাবে ব্যবহার করেনি। একমাত্র দাসীপুত্র বা যুদ্ধে বন্দি হওয়া পুরুষরাই দাস হত। এখানেও পেশোয়াদের শাসনের লিঙ্গবৈষম্য স্পষ্ট।

এরকম আরও অনেক উদাহরণ আছে। বিশ্বনাথ নামে এক ব্রাহ্মণ তাঁর স্ত্রীকে ত্যাগ করে এক দাসীর (কুণবীনা) সঙ্গে বসবাস শুরু করেন। তাঁদের এক সন্তান হয়। বিশ্বনাথের স্ত্রীর অভিযোগে পেশোয়া তাঁকে পুনায় ডেকে পাঠান এবং উপপত্নীকে ত্যাগ করার নির্দেশ দেন। যেহেতু তাঁর জমি সরকার দখল করে নিয়েছিল, তাই বিশ্বনাথ স্ত্রীর সঙ্গে আবার বসবাস করতে রাজি হন। পেশোয়া ১৭৭৭-৭৮ সালে খেদের রাজস্বের দায়িত্বে থাকা আধিকারিককে (কামাভিসাদার) বিশ্বনাথের জমি ফেরত দেওয়ার এবং ওই দাসীকে সিংহগড় দুর্গের কারাগারে রাখার নির্দেশ দেন। দাসীর সন্তানের দায়িত্ব বিশ্বনাথের স্ত্রীকে দেওয়া হয়। অর্থাৎ বিশ্বনাথকে কেবল বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের জন্য শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে দাসীকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

আরো পড়ুন ছাওয়া: যদুনাথ সরকার রচিত ইতিহাসের হদ্দমুদ্দ

পেশোয়া শাসনে বর্ণভিত্তিক বসতি এবং অস্পৃশ্যতা আরও জোরদার হয়েছিল। এমনকি অতি-শূদ্রদের ঘরবাড়িও যদি গ্রামের সীমানার খুব কাছাকাছি বলে মনে করা হত, তাহলে সেগুলো ভেঙে দেওয়া হত। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। ছাব্বিশটি বালুতেদার পরিবার তরফ করায়াত মহলের কাটরাজ গ্রামের সীমানার কাছে বাস করত, কারণ সেখানেই তাদের জমি দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে দুটি চাম্বার (জুতো এবং ব্যাগসহ চামড়ার জিনিসপত্রের কারিগর), ২২টি মাহাড় (যারা আবর্জনা পরিষ্কার করার কাজ, ডাক এবং পাহারার দায়িত্ব পালন করত) এবং দুটি পরিবার মাঙ্গ (দড়ি তৈরির কারিগর)। পরবর্তীকালে গ্রামের কর্মকর্তারা (পাতিল এবং কুলকার্নি) মনে করেন যে তাদের বাড়িগুলি গ্রামের খুব কাছে এবং তারা গ্রাম ও গ্রামবাসীদের দূষিত করতে পারে। অতএব ১৭৮৯-৯০ সালে প্রশাসন তাদের বাড়িঘর ভেঙে দেয়, জমি বাজেয়াপ্ত করে এবং গ্রামের সীমানা থেকে দূরে বসতি স্থাপনের নির্দেশ দেয়।

এই মারাঠা শাসকরাই বাংলায় বর্গী আক্রমণ চালায়, বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষকে ঘোর বিপদে ফেলে। মহামহোপাধ্যায় বাণেশ্বর বিদ্যালঙ্কার রচিত সংস্কৃতে লেখা চিত্রচম্পু, গঙ্গারাম রচিত মহারাষ্ট্র পুরাণ, ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল কাব্য ইত্যাদি বইতে এহেন দুর্দশার বর্ণনা পাওয়া যায়। এ বিষয়ে নিচে উদ্ধৃত অংশটি প্রণিধানযোগ্য।

একদিন দুইদিন করি সাত দিন হইল।
চতুদিগে বরগীতে রসদ বন্ধ কৈল॥
মুদি বানীঞা জত বারাইতে নারে।
লুটে কাটে মারেছমুতে পাএ জারে॥
বরগির তরাসে কেহু বাহির না হএ।
চতুদ্দিগে বরগির ডরে রসদ না মিলএ॥

পিছাড়ি লুটিল বরগি আসি য়ার কত।
পোড়াইল ডেরাডাণ্ডা তাম্বু জত॥
খাজানার গাড়ি জত সাতে ছিল।
চাইর দিগে বরগি যাইসা লুটিতে লাগিল॥
হাতি ঘোড়া কত লুইটা লইয়া জাএ।
বড় বড় সিপাই জত উমনি পলাএ॥

টাকা সের হৈল আনাজ কিন্তে নাই পাএ।
খুদ্র কাঙ্গাল জত মইরা মইরা জাএ॥

কলার আইঠা জত আনিল তুলিয়া।
তাহা আনি সব লোকে খাএ সিজাইয়া॥
ছোট বড় লস্করে জত লোক ছিল।
কলার আইঠা সিদ্ধ সব লোকে খাইল॥
বিসম বিপত্য বড় বিপরিত হইল।
অন্য পরে কা কথা নবাবসাহেব খাইল॥

(মহারাষ্ট্র পুরাণ; গঙ্গারাম, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় পুঁথি সংখ্যা ১৭৮৪, পত্রসংখ্যা – ৩খ)

পরবর্তীকালে অবস্থা আর শোচনীয় হয়

তবে সব বরগি গ্রাম লুটিতে লাগিল।
জত গ্রামের লোক সব পলাইল॥
ব্রাহ্মণ পণ্ডিত পলাএ পুথির ভার লইয়া।
সোনার বাইনা পলাএ কত নিক্তি হড়পি লইয়া॥
গন্ধ বণিক পলাএ দোকান লইয়া জত।
তামা পিতল লইয়া কাসারি পলাএ কত॥
কামার কুমার পলাএ লইয়া চাক নড়ি।
জাউলা মাউছা পলাএ লইয়া জাল দড়ি॥

(মহারাষ্ট্র পুরাণ; গঙ্গারাম, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় পুঁথি সংখ্যা ১৭৮৪, পত্রসংখ্যা – ৩খ)

জাত ধর্ম নির্বিশেষে আপামর বাংলার জনসাধারণের সর্বনাশ হয়। কবি আরও লিখছেন

সঙ্ক বণিক পলাএ করাত লইয়া জত।
চতুর্দিগে লোক পলাএ কি বলিব কত॥
কাএস্ত বৈদ্য জত গ্রামে ছিল।
বরগির নাম সুইনা সব পলাইল॥
ভাল মানুসের স্ত্রিলোক জত হাটে নাই পথে।
বরগীর পলানে পেটারি লইলা মাথে॥

গোশাঞি মোহন্ত জত চোপালাএ চড়িয়া।
বোচকা বুচকি লয় জত বাহুকে করিয়া॥

সেক সৈইয়দ মোগল পাঠান জত গ্রামে ছিল।
বরগির নাম সুইনা সব পলাইল॥

(মহারাষ্ট্র পুরাণ; গঙ্গারাম, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় পুঁথি সংখ্যা ১৭৮৪, পত্রসংখ্যা ৩খ-৪ক)

বাংলার মুসলমান শাসকের হিন্দু প্রজাদের উপর এহেন নির্যাতন ডেকে আনতে হিন্দু সম্রাটের মারাঠা সৈনিকদের কোনো বিবেক দংশন হয়েছিল বলে প্রমাণ নেই।

আসল কথাটা হল, মারাঠা, মোগল, রাজপুত, নিজাম – যার কথাই বলুন না কেন, সকলের শাসনই ভালমন্দ মেশানো। কখনো একতরফা নয়। আজকাল যারা হিন্দু শৌর্যের স্তুতি করে, তারা বেমালুম এদেশের জাতভিত্তিক এবং লিঙ্গভিত্তিক অনাচার অবিচার ভুলে অতীতের মুসলমান শাসকরা কত খারাপ এবং হিন্দু শাসকরা কত ভাল ছিলেন – তা প্রমাণ করতে চান। এ আসলে বর্তমানে ঘটে চলা সাম্প্রদায়িক বীভৎসাকে অতীতের দৃষ্টান্ত দিয়ে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা। এরা এতটাই অমানবিক যে গাজায় ঘটে চলা সীমাহীন নির্মমতাকেও সঠিক প্রমাণ করে ইজরায়েলের পক্ষে গলা ফাটায়। এরা যখন হিন্দুত্ববাদ নামধারী ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের স্বার্থে প্রাচীন ভারতের হিন্দু রাজাদের হয়ে অর্ধসত্য প্রচার করে, তখন সেই মিথ্যা উল্লাসের পিছনে যে অত্যাচার ও অবিচারের ইতিহাস থাকে, তা বারবার উদ্ঘাটন করা দরকার, যাতে ভবিষ্যতে ওইসব অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটানো সহজ না হয়। যে যতই চিৎকার করে মিথ্যা বলুক, তার বিরুদ্ধে সত্যনিষ্ঠ ইতিহাস নির্মোহভাবে তুলে ধরতে হবে। তা করতে না পারলে সম্প্রীতি, সত্য ও সহিষ্ণুতার ভিত্তিতে ভারত গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

নিবন্ধকার পেশায় অধ্যাপক

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.