শুরু করা যাক ইতিহাসেরই একটা কাহিনি দিয়ে। কাহিনির স্থান – চীন, কাল – ২১৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর চীন তখন সবেমাত্র শুধু একটি ভৌগোলিক সংজ্ঞা থেকে একটি কেন্দ্রীভূত সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। স্বর্গপুত্র হিসাবে চীনের মসনদে বসেছেন দোর্দণ্ডপ্রতাপ ছিন বংশের শাসক শি হুয়াংদি। সম্রাট মহাশয়ও তাঁর সমসাময়িক অশোকের মতই শাসন শুরু করেছিলেন চণ্ডাশোক হিসাবে। তফাত এই, তিনি চণ্ডাশোকই থেকে গেছিলেন, প্রিয়দর্শীর মতো আর ধর্মাশোক হতে পারেননি। তিনি একাধারে পণ্ডিত ও বীর, আবার নিষ্ঠুর স্বৈরাচারী। খ্রিস্টপূর্ব ২২১ অব্দের মধ্যেই সম্রাট মোটামুটি সমগ্র চীন নিজের শাসনে এনে ফেলেছিলেন। কিন্তু ভারতে অশোকের মতই, তাঁর চিন্তা ছিল, এই বিরাট ভূখণ্ডকে তো দীর্ঘকাল শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে এক রাখা যাবে না, এর একটি মতাদর্শগত ঐক্য চাই। সেই ঐক্য আসবে কী করে? এ প্রশ্নের উত্তর অশোক দিয়েছিলেন তাঁর ‘ধম্ম’-এর মাধ্যমে। সম্রাট শি কিন্তু ওইরকম কোনো ‘ধম্মবিজয়’-এর ধারকাছ দিয়ে গেলেন না। ২১৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ প্রধানমন্ত্রী লি সি সম্রাটকে পরামর্শ দিলেন, একমাত্র ছিন বংশের লেখা রাজনৈতিক ইতিহাস ছাড়া বাকি সবরকম ইতিহাস এবং ঐতিহ্য ধ্বংস করে ফেলতে। যেমন ভাবা, তেমন কাজ। রাজপেয়াদা ছুটল সাম্রাজ্যের কোণে কোণে। সরকারি ইতিহাসের বাইরে আর যা কিছু আপত্তিজনক মনে করা হল, তা-ই পুড়িয়ে দেওয়া হল। এমনকি কচ্ছপের খোলায় লেখা লোক ইতিহাসও বাদ পড়ল না। ঐতিহাসিকদের দিয়ে শপথ করিয়ে নেওয়া হল, তাঁরা আর ‘ভুল’ ইতিহাস লিখবেন না, পড়াবেন না। যাঁরা রাজি হলেন না, তাঁদের আর ধড়ের উপর মাথা থাকল না। বহ্ন্যুৎসব দেখে তৃপ্ত সম্রাট ভাবলেন এইবার নিজের মত ইতিহাস, আমাদের ইতিহাস লিখতে আর কোনো বাধা রইল না। এই ইতিহাসকেই লোকে আজ থেকে এক ও একমাত্র সত্যি ইতিহাস বলে মানবে।

এই কাহিনি যে আমরা আলোচনা করছি, তা থেকেই বোধহয় প্রমাণ হয়, সম্রাটের সে ইচ্ছা পূর্ণ হয়নি। কিন্তু এই কাহিনির অন্য একটি গুরুত্ব আছে। এই কাহিনি থেকে বোঝা যায়, যে আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে ইতিহাস হল শুধুই ‘যা ঘটে গেছে’, ইতিহাস শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থও তাই। ইতিহাসের স্থান অতীতে – বর্তমানে নয়। কিন্তু আজ থেকে দু হাজার বছর আগে শি হুয়াংদি কিন্তু তা মনে করেননি। কারণ অতীতের সব বিচক্ষণ রাজনৈতিক নেতার মতই তিনি বুঝেছিলেন, ইতিহাস হল আদতে অতীত আর বর্তমানের মধ্যে নিরন্তর কথোপকথন। বর্তমানকে পরিপূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করে নিজের কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিতে কেউ যদি উৎসাহী হয়, তাহলে তাকে আগে অতীতকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। ঠিক এই উদ্দেশ্য নিয়েই যুগে যুগে শাসকগোষ্ঠী চেষ্টা করে ইতিহাসকে নিজের প্রয়োজন মত গড়ে পিটে নিতে।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

একথা অনস্বীকার্য, যে ২০১৪ পরবর্তী ভারত একটি নতুন ভারত। যে নতুন শাসকগোষ্ঠী এই ভারতের ক্ষমতা হাতে পেয়েছে, তারা স্বাধীনোত্তর ৭০ বছরের ভারতের ধারণাকে আরবসাগরে ছুঁড়ে ফেলতে আগ্রহী। ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখলে দেখা যাবে, যে কোনো নব্য প্রতিষ্ঠিত শাসকগোষ্ঠীই সচেষ্ট হয় আগের শাসনব্যবস্থা যে মতাদর্শের উপর দাঁড়িয়েছিল তার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে এবং নিজ শাসনব্যবস্থার ভিত যে মতাদর্শের উপর দাঁড়িয়ে আছে তাকে বৈধতা দিতে। এই দুটি কাজেই তাদের হাতিয়ার হয় ইতিহাস। ঠিক সেই কারণেই মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ যখন নতুন ইতিহাস লেখার আহ্বান জানান, আস্ফালন করেন “এখন আমাদের কে আটকাবে?”, তখন তার মধ্যে আশ্চর্যের কিছু থাকে না। রাজপুতানার ইতিহাস সম্পর্কিত একটি বইপ্রকাশ অনুষ্ঠানে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহাশয় যে বক্তব্য রেখেছেন তা অত্যন্ত স্বাভাবিক। যে রাজনৈতিক ঘরানার তিনি অনুগামী, তাঁরা কখনোই এ কথা গোপন করেননি, যে স্বাধীনোত্তর ভারতের প্রচলিত যে ঐতিহাসিক ভাষ্য মূলত মার্কসবাদী এবং প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকদের দ্বারা নির্মিত হয়েছে, তা তাঁরা সম্পূর্ণ বর্জন করে হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভাবধারায় নতুন ঐতিহাসিক ভাষ্য রচনার পক্ষপাতী।

বলা প্রয়োজন, তাঁদের উদ্দেশ্য যদি শুধু একটি তথ্যনিষ্ঠ বিকল্প ঐতিহাসিক ভাষ্য রচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত, তাহলে আপত্তির কোনো অবকাশ ছিল না।  ইতিহাস তো এক নয়, ইতিহাস বহু। ‘The’ হিস্ট্রি বলে কিছু হয় না, সবই আদতে ‘a’ হিস্ট্রি। ইতিহাস তো আদতে অতীত নয়, অতীতের পুনর্নির্মাণ। পুকুরের জলে পড়া বটগাছের প্রতিবিম্ব যেমন নানা আকার নেয়, তেমনই একই তথ্যের নানারকম ব্যাখ্যায় অনেকরকম ইতিহাস লেখা সম্ভব। মার্কসবাদীরা বা প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদীরা তাঁদের মতো করে ‘a’ হিস্ট্রি লিখেছেন, হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা যদি তাঁদের একটি ‘a’ হিস্ট্রি লিখতে চান – তাঁরা লিখতেই পারেন। সমস্যা আদতে অন্য জায়গায়। প্রথম সমস্যা হল, হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা শুধু ‘a’ হিস্ট্রি লিখতে চাননা, তাঁদের উদ্দেশ্য তাঁদের ব্যাখ্যার ‘a’ হিস্ট্রিটাই ‘the’ হিস্ট্রি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা এবং বাকি সব ইতিহাসকে বিকৃত ও মিথ্যা আখ্যা দিয়ে আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া। অমিত শাহ যখন ‘ভুল ইতিহাস’ মুছে দেওয়ার ডাক দেন, আদতে তাঁর গলায় দু হাজার বছর আগের সম্রাট শিরই প্রতিধ্বনি শোনা যায়।

দ্বিতীয় সমস্যা আরও গুরুতর। বটগাছের প্রতিবিম্বের নিজের মত ব্যাখ্যা করেই শুধু হিন্দুত্ববাদীরা সন্তুষ্ট নন। তাঁরা বুলডোজার চালিয়ে বটগাছটিই যে আদতে অশ্বথ গাছ তা দাবি করতে আগ্রহী। নৈর্ব্যক্তিক তথ্যের নানারকম আপেক্ষিক ব্যাখ্যা হতে পারে। কিন্তু মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দল শুধু নিজেদের মত করে ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন, তাঁরা নৈর্ব্যক্তিক তথ্যটিই পাল্টে দিতে চান। তাই তাঁদের ‘ইতিহাস’-এ তাজমহল হয়ে যায় শিবমন্দির তেজোমহালয়, মৌর্যরা সাড়ে পাঁচশো বছর ধরে আফগানিস্তান থেকে শ্রীলঙ্কা পর্যন্ত আসমুদ্র হিমাচল ভারত শাসন করে, সমুদ্রগুপ্ত অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন দেখেন, সুস্পষ্ট সামন্ততান্ত্রিক ক্ষমতার লড়াইয়ের মধ্যে ধর্মযুদ্ধ দেখতে পাওয়া যায়।

আরো পড়ুন ঐতিহাসিক দ্বিজেন্দ্র নারায়ণ: এক আপোসহীন ইতিহাস লেখক

শুধু এখানেই শেষ নয়, পূর্বতন ইতিহাস চর্চার ধারাগুলির মধ্যে সমালোচনার অনেককিছু ছিল। শাহ তার ধারে কাছে না গিয়ে মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, ভারতের ঐতিহাসিকরা মুঘল শাসকদেরই অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, পাঠ্যবইতে মৌর্য, সাতবাহন, গুপ্তরা বঞ্চিত থেকে গেছেন। দুটি অভিযোগই সম্পূর্ণ অসত্য। যাঁদের ইতিহাস চর্চার সঙ্গে সামান্যতম সম্পর্ক আছে, তাঁরাই এ কথা বলবেন। সমস্যা হল, এই অসুস্থ ঐতিহাসিক ভাষ্য নির্মাণকে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা ঐতিহাসিকদের নেই। ইতিহাস চর্চা দু প্রকার। একটি হল বিদ্যায়তনিক ইতিহাস চর্চার পরিসর, যেখানে শাহের এই বক্তব্য, এমনকি তাঁর রাজনৈতিক দলের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন ঐতিহাসিকদের কাছেও বিশেষ গ্রহণযোগ্য হবে না। আরেকটি হল জনসমাজে প্রচলিত ইতিহাস; বিদ্যায়তনে ইতিহাস চর্চা করেন না এমন নাগরিকদের কাছে ইতিহাস যেভাবে ধরা দেয়। শাহ এই দ্বিতীয় ক্ষেত্রটিকেই প্রভাবিত করতে আগ্রহী। সাধারণ নাগরিকদের কাছে একজন জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ হিসাবে শাহের যে বিশ্বাসযোগ্যতা বা জনপ্রিয়তা আছে, অধিকাংশ প্রশিক্ষিত ইতিহাসবিদেরই তা নেই। তাই জনপ্রিয় ইতিহাসের পরিসরে হাটে-বাজারে, চায়ের দোকানে যখন বিতর্ক হবে, একজন প্রশিক্ষিত ঐতিহাসিকের পক্ষে যতই যুক্তিতর্ক থাক, শাহ তাঁকে শুধু বিশ্বাসযোগ্যতার জোরে দশ গোল দেবেন। সুতরাং এই অসুস্থ ইতিহাস চর্চার ধারা প্রতিহত করা সহজ নয়, যদি না ঐতিহাসিকরা বিদ্যায়তনিক ও গণইতিহাসের মধ্যে সেতুবন্ধন করতে সক্ষম হন। শাহের হুংকার “এখন আমাদের কে আটকাবে?” এই প্রেক্ষিতে নেহাত ফাঁকা আওয়াজ নয়।

তাহলে কি বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাসের পরাজিত হওয়াই ভবিতব্য? তা কেন? একথা ঠিক যে যুগে যুগে শাসকগোষ্ঠী ইতিহাসকে নিজের প্রয়োজন অনুসারে গড়েপিটে নিতে চেষ্টা করেছে, অনেকে সফলও হয়েছে। কিন্তু আসল কথা হল এই সাফল্য সাময়িক। দোর্দন্ডপ্রতাপ সম্রাট শি-ও ইতিহাসকে নিজের পছন্দের ছাঁচে ঢালতে পারেননি। যুগ পাল্টায়, সময় পাল্টায়, রাজনীতিতে পাশার দান পাল্টায়। আজ যা সরকারি ইতিহাস, কাল তাই-ই আস্তাকুঁড়ে যায়। আজ ক্ষমতার মদিরা আকণ্ঠ পান করে শাহ তাঁদের আটকানোর কেউ নেই বলে যতই আস্ফালন করুন, আজকের ভারতের ঐতিহাসিকরা তাঁর অ্যাজেন্ডাকে প্রতিহত করতে যদি অক্ষম হন, তাহলেও তিনি বিফল হবেন। মহা ঐতিহাসিক সীমা চেনের কলমের এক ঘায়ে সম্রাট শি-র সরকারি ইতিহাসের ছাঁচ ভেঙে গিয়েছিল। শাহ এবং তাঁর অনুগামীরা যে ‘নয়া ইতিহাস’ রচনার চেষ্টা করছেন, কালের নিয়মে তার ক্ষেত্রেও এর অন্যথা হবে না।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.