বাংলায় দেরিতে হলেও বর্ষা এসে পড়েছে। এই সময়ে ছাতার চাহিদা বাড়ে। কিন্তু সোশাল মিডিয়া দেখে বোধ হচ্ছে এবার বর্ষায় ছাতা নিয়ে কথা বললে বিপদ হবে। এক সাংবাদিক পূর্বজন্মের পাপের ফল হিসাবেই বোধহয় একটি মেয়েকে ছাতার ইংরেজি প্রতিশব্দ umbrella বানান জিজ্ঞেস করে ফেলেছিলেন। এখন সকলে সাংবাদিকের ‘এলিটিজম’, ‘ক্লাসিজম’, ‘সেক্সিজম’, আরও নানা ইজম নিয়ে দিনরাত শাপ শাপান্ত করছেন। স্বীকার্য যে সাংবাদিকরা কেউ দেবতা, গন্ধর্ব নন। বিভিন্ন চ্যানেলের বুম ধরে কলকাতা শহরে ঘুরে বেড়ান যে সাংবাদিকরা, কাগজগুলো ভরে আছেন যে সাংবাদিকরা তাঁরা অনেকেই আসেন এলিট পরিবার থেকে। ভারতীয় সাংবাদিকতার ধারাটাই এমন। খুব সাধারণ পরিবার থেকে যাঁরা আসেন তাঁরাও তো একই সমাজের উৎপাদন। ‘এলিটিস্ট’, ‘ক্লাসিস্ট’, ‘সেক্সিস্ট’ সমাজ থেকে অন্যরকম সাংবাদিক তো সংখ্যায় কমই বেরোবে। কিন্তু দু-তিনদিন কেটে যাওয়ার পরও বাঙালি ভদ্রলোক, ভদ্রমহিলারা যেভাবে সাংবাদিকটিকে আক্রমণ করে চলেছেন তাতে “সব ব্যাটাকে ছেড়ে বেঁড়ে ব্যাটাকে ধর” মানসিকতাই প্রকট।

সোশাল মিডিয়ার কুপ্রভাব নিয়ে অনেক কথা বলা যায়, অনেকেই আজকাল প্রভাবগুলো সম্পর্কে সচেতন, ফলে সচেতনভাবে সোশাল মিডিয়া থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ কী নিয়ে চিন্তাভাবনা করছে তা বোঝার জন্য সোশাল মিডিয়া গুরুত্ব আজ অস্বীকার করা যায় না। ফলে সোশাল মিডিয়ায় যা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে তাকেও “ওটা ভার্চুয়াল দুনিয়া” বলে অগ্রাহ্য করার উপায় নেই। সোশাল মিডিয়ার সামাজিক, রাজনৈতিক প্রভাব এখন আর গোপন নেই এবং অন্ধ হলে প্রলয় বন্ধ থাকে না।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

হজরত মহম্মদের বিরুদ্ধে নূপুর শর্মা আর নবীন জিন্দালের বক্তব্য এবং তা নিয়ে জায়গায় জায়গায় উত্তেজনা, ভাংচুর থিতিয়ে গেছে। বাঙালি ভদ্রসমাজের বুলডোজারের ব্যাপারে চোখ বুজে থেকে “ওরা এত অসহিষ্ণু কেন” পোস্ট করাও বন্ধ হয়ে গেছে। বর্ষা চলে এল অথচ স্কুলে গরমের ছুটি কেন বাড়িয়ে দেওয়া হল, তা নিয়ে কিছু চুটকি আর কয়েকটা মিম ছাড়া রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঢেউ নেই ফেসবুকের দেয়ালে দেয়ালে। মাসের পর মাস স্কুল বন্ধ রাখাকে রাজনৈতিক ইস্যু করে বিরোধী দলগুলো কেন রাজ্যব্যাপী রাস্তায় নেমে আন্দোলন করছে না, সে প্রশ্নও বড় একটা কেউ তুলছেন না। দিল্লিতে গত কয়েকদিন ধরে দেশের অন্যতম বিরোধী দল কংগ্রেসের প্রধানতম নেতা রাহুল গান্ধীকে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের অফিসে ডেকে পাঠিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা কী যে জেরা করা হচ্ছে কেউ জানে না। কংগ্রেসের অফিসে ঢুকে পড়ছে দিল্লি পুলিস, নেতা কর্মীদের নানা ছুতোয় শারীরিক নিগ্রহ করা হচ্ছে। ভারতীয় গণতন্ত্রে জরুরি অবস্থার সময়টা বাদ দিলে এরকম ঘটনা খুব বেশি পাওয়া যাবে না। ভয়ানক বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি হচ্ছে। তা নিয়েও গণতন্ত্রপ্রিয় বাঙালির ফেসবুকে বিশেষ উচ্চবাচ্য নেই। অথচ ইংরেজিতে ফেল করে প্রতিবাদী হয়ে ওঠা একটি মেয়েকে কেন সাংবাদিক আমব্রেলা বানান জিজ্ঞেস করল, তা নিয়ে পোস্ট আর ফুরোচ্ছেই না।

আমাদের রাজ্যে, বিশেষত কলকাতায়, নানা দাবিতে নিয়মিত মিছিল মিটিং হয়ে থাকে (অনেক ভদ্রজনের তাতে বিষম আপত্তি থাকে চিরকালই)। সেইসব আন্দোলনে সাংবাদিকদের যেতে হয় খবর সংগ্রহে। সেখানে গিয়ে আন্দোলনকারীদের সাথে কথা বলেন, জিজ্ঞেস করেন কী কী দাবি নিয়ে আন্দোলন, সেই দাবির সপক্ষে যুক্তিগুলো কী কী। অনেকসময় তা করেন না, কেবল অকুস্থল থেকে নিজের (অধিকাংশ ক্ষেত্রে আসলে চ্যানেলের বা কাগজের) মতামত দর্শককে/পাঠককে গিলিয়ে দেন। সেটা বরং অন্যায়, আন্দোলনকারীর থেকে তাঁদের দাবির ব্যাখ্যা চাওয়া মোটেই অন্যায় নয়। এক্ষেত্রে সাংবাদিক সেই কাজটাই করছিলেন। যে বলে তাকে অন্যায়ভাবে ইংরেজিতে ফেল করানো হয়েছে, তার যোগ্যতার প্রমাণ চাওয়া আদপেই অন্যায় নয়। নইলে এরপর কৃষক আন্দোলন হলে প্রশ্ন করা যাবে না, কোথা থেকে এসেছেন? আপনার কত বিঘা জমি আছে? সেখানে কী চাষ করেন? নতুন কৃষি আইন নিয়ে আপত্তি করছেন কেন? সরকারকে বিশ্বাস করতে অসুবিধা কোথায়? প্রশ্নগুলো করার উদ্দেশ্য আন্দোলন সম্পর্কে তথ্য বের করে আনা। উত্তরে আন্দোলনকারীরা যা বলেন, তা তাঁদের বিরুদ্ধে গেল কিনা তা দেখা কিন্তু সাংবাদিকের কাজ নয়। সাধারণত যদি যা করছেন সে সম্পর্কে আন্দোলনকারীর সম্যক ধারণা থাকে, যদি ইস্যুগুলো সত্যিকারের ইস্যু হয়, তাহলে এমন কিছু বলে ফেলেন না যাতে আন্দোলন লোকের চোখে হাস্যকর হয়ে যায়। তবে হাস্যকর কারণে আন্দোলন করলে উত্তর তো হাস্যকরই হবে।

দাঁড়ান, দাঁড়ান। ক্ষেপে উঠবেন না। কী বলবেন জানি। এক্ষুনি বলবেন, যেভাবে ওই মেয়েটিকে প্রশ্ন করা হয়েছে সেইভাবে সরকারকে প্রশ্ন করতে পারে না? এই দেখুন, বনলতা সেনগিরি হয়ে গেল। সরকারকে যে সংবাদমাধ্যম কড়া কড়া প্রশ্ন করে না তা নিঃসন্দেহে অন্যায়। কিন্তু সেটা পারে না বলে আর কাউকেই কোনো প্রশ্ন করতে পারবে না? এ-ও তো সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করতে চাওয়াই হল একরকম। তার মানে মমতা ব্যানার্জি বা নরেন্দ্র মোদীর মত আপনিও চান, সংবাদমাধ্যম একমাত্র আপনার পছন্দের প্রশ্নগুলোই করুক। এমন প্রশ্ন যেন না করে যাতে উত্তরদাতা অস্বস্তিতে পড়ে যায়।

পশ্চিমবঙ্গে তথা ভারতবর্ষে আজকাল নানা অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে। একটা ঘটনা প্রায় রোজই ঘটে। সেটা হল কোনো ইস্যুতে যার দায় সবচেয়ে বেশি, তাকে বাদ দিয়ে আর সকলকে আক্রমণ করা। যেমন ধরুন আজকের বেহাল অর্থনীতির জন্য মনমোহন সিংকে আক্রমণ করা, চীন লাদাখে একের পর এক এলাকা দখল করে নিচ্ছে বলে জওহরলাল নেহরুকে আক্রমণ করা, দেশে চাকরি-বাকরি নেই বলে মোগলদের আক্রমণ করা। এগুলো একরকম। আরেকরকম হল এসএসসি নিয়োগে দুর্নীতি নিয়ে সিবিআই তদন্ত হচ্ছে বলে সিপিএমকে আক্রমণ করা, কেকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে বলে রূপঙ্কর বাগচীকে আক্রমণ করা, বগটুই কাণ্ড নিয়ে রাজ্য সরকারের চেয়ে বিখ্যাতদের বেশি আক্রমণ করা। এক্ষেত্রেও দেখছি সেই ব্যাপার ঘটছে। সাংবাদিক নয়, অভিযোগের আঙুল ওঠা উচিত ছিল শিক্ষাব্যবস্থার দিকে। প্রশ্ন ওঠা উচিত ছিল, সামান্য আমব্রেলা বানান না জেনে ওই মেয়েটি যে ক্লাস টুয়েলভ পর্যন্ত চলে এসেছে সে দায় কার? শিক্ষাব্যবস্থার এমন দুর্দশা হল কী করে? যাঁরা ওই মেয়েটিকে এবং তার সহপাঠীদের ইংরেজি পড়িয়েছেন ছোট থেকে, তাঁরা কেমন শিক্ষক? শিক্ষকদের দিক থেকে এ প্রশ্নের একটা সম্ভাব্য উত্তর – ক্লাস এইট পর্যন্ত পাস-ফেল তুলে দেওয়া হয়েছে। যে কিছুই শিখতে পারেনি তাকে যে আরও এক বছর একই ক্লাসে রেখে দিয়ে শেখাব, তার অবকাশ কোথায়? কথাটা ভেবে দেখার মত। ভাবলে এইট অব্দি পাস-ফেল তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত কিনা সেই আলোচনায় যেতে হবে। চুটকি, মিম, গালাগালি দিয়ে সে আলোচনা চলবে না। সাংবাদিককেও সে আলোচনার চাঁদমারি করা যাবে না।

আরও যে প্রশ্ন ওঠা উচিত ছিল, তা প্রাইভেট টিউশন নিয়ে। দেশের আর কোনো রাজ্যের শিক্ষার্থীরা এত বেশি টিউশনের উপর নির্ভরশীল নয়। ২০২১ সালের Annual Status of Education Report (ASER) অনুযায়ী, আমাদের রাজ্যে ৭৬% ছাত্রছাত্রী প্রাইভেট টিউশনের উপর নির্ভর করে, যা গোটা দেশের গড়ের চেয়ে অনেক বেশি। গত শতাব্দীর আশি, নব্বইয়ের দশক থেকে এ রাজ্যে প্রাইভেট টিউশন এক সমান্তরাল শিক্ষাব্যবস্থা হয়ে উঠেছে। সেই ব্যবস্থা কীভাবে মূল শিক্ষাব্যবস্থার কোমর ভেঙে দিল তার কোনো দীর্ঘমেয়াদি বা স্বল্পমেয়াদি মূল্যায়ন আজ অব্দি হয়নি। অথচ সকলেরই জানা আছে, প্রাইভেট টিউশনের রমরমায় কতরকম নৈতিক ও আইনগত দুর্নীতি শিক্ষাজগতে প্রবেশ করেছে। বাড়িতে টোল খুলে প্রবল পরিশ্রম করে মাস্টারমশাই স্কুলে গিয়ে ঝিমোচ্ছেন – এ দৃশ্য আমাদের ছাত্রাবস্থাতেই বিরল ছিল না। স্কুলের পরীক্ষায় কঠিন প্রশ্ন করে ছেলেমেয়েদের কম নম্বর পাইয়ে দিয়ে অভিভাবকদের নিরুপায় করে দেওয়া হয়েছে। তিনি স্কুলে এসে শিক্ষককে জিজ্ঞেস করেছেন কী করলে সন্তান ওই বিষয়ে উন্নতি করতে পারবে। উত্তরে বলা হয়েছে, আমার কাছে পড়তে পাঠিয়ে দেবেন। এমন ঘটনাও দেখেছি। এ তো গেল স্কুল স্তরের দুর্নীতি। বৃহত্তর ক্ষেত্রে কোচিং সেন্টারের মাধ্যমে বোর্ডের পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ইতিহাসও আছে। সত্যদার কোচিংয়ের কথা সকলেই ভুলে যাননি আশা করি। তা স্কুল আর টিউশন – দুটো জায়গায় পড়াশোনা করেও আমাদের ছেলেমেয়েরা আমব্রেলা বানানটুকুও শিখে উঠতে পারছে না?

ভেবে দেখুন, এতগুলো প্রশ্ন করার পরিসর তৈরি হল ওই সাংবাদিক আপনার অপছন্দের প্রশ্নটা করেছিলেন বলে, এবং এই প্রশ্নগুলো করা উচিত শিক্ষাব্যবস্থা যাঁরা চালান তাঁদের। তা না করে আপনি সাংবাদিকটি কত অযোগ্য তা প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লেগেছেন। না হয় মেনে নেওয়া গেল, সাংবাদিক অযোগ্য। তাতে কী? আপনি আত্মপ্রসাদ লাভ করতে পারেন, পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাব্যবস্থার কোনো লাভ হবে কী?

শিক্ষক, অধ্যাপক, শিক্ষা নিয়ে গবেষণারত মানুষজন, ডাক্তার, উকিল নির্বিশেষে মানুষ যেভাবে ফেল করে পাস করিয়ে দেওয়ার আন্দোলনে ব্রতীদের পাশে দাঁড়িয়ে সাংবাদিক খেদাতে নেমেছেন তাতে রাজ্যের ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ে বই কমে না। কোনো সন্দেহ নেই যে এক-আধবার ফেল করা মানেই জীবন শেষ হয়ে যাওয়া নয়। বস্তুত পরীক্ষায় ভাল নম্বর, খারাপ নম্বর সবকিছুর প্রমাণ নয়। ইংরেজিতে কত নম্বর পেলাম তা দিয়ে যে সবকিছু প্রমাণ হয় না তা-ও ঠিক। পৃথিবীতে কত লোক তো আদৌ লেখাপড়াই করে না, পরীক্ষা দেয় না। তারা কি ফেলনা নাকি? কিন্তু মুশকিল হল, ফেল করলে পাস করিয়ে দেওয়ার দাবিতে পথ অবরোধ করব – এই মানসিকতাকে প্রশ্রয় দিলে সমূহ বিপদ। তাহলে স্কুল, কলেজ থেকে পরীক্ষা ব্যবস্থা তুলে দিলেই তো হয়। আহা বাছা, ফেল করেছ তো কী হয়েছে? তোমার দোষ নয়, দুনিয়ার আর সক্কলের দোষ – এই বলে যদি কারোর পাশে দাঁড়ানো হয়, তাহলে আর সে নিজেকে শুধরে নিয়ে পাস করার চেষ্টা করবে কেন? পাস করা যে প্রয়োজন, এটা অন্তত মানেন তো নাকি? না রবীন্দ্রনাথের উদাহরণ টেনে বলবেন, পাস না করলেই বা কী? তা বলতেই পারেন, তবে মনে রাখবেন, অনেকেই দেবেন্দ্রনাথের মত বিত্তশালী, প্রভাবশালী অভিভাবক নয়। ফলে তাদের ছেলেমেয়েদের পরীক্ষায় পাস করে সার্টিফিকেট, ডিগ্রি ইত্যাদি পাওয়ার প্রয়োজন আছে। যাদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন তাদেরও দরকার আছে। নইলে রাস্তা অবরোধ করত না।

আসলে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা তলানিতে এসে ঠেকেছে। এমনিতেই ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক প্রাইভেট টিউশনের কল্যাণে এবং বিশ্বায়নের গুণে ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্কে পরিণত হয়েছিল আগেই, এখন আবার শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকরা দেখে ফেলেছে যে বহু শিক্ষক পরীক্ষা না দিয়ে বা সাদা খাতা জমা দিয়ে, স্রেফ ঘুষ দিয়ে মাস্টার হয়েছে। উপরন্তু বাঙালি ভদ্রসমাজের নীতিবোধে আমূল পরিবর্তন এসেছে। যে ছেলে হল ম্যানেজের কথা বাবা-মা জানতে পারলে কী বলবে তা নিয়ে ভয়ে থাকত, সে এখন বাবা হয়ে ছেলেমেয়ের স্কুলে দাবি জানাচ্ছে অতিমারী কেটে গিয়ে থাকলেও পরীক্ষাটা অনলাইনেই হোক। কেন এই দাবি তা বলে দেওয়ার দরকার নেই। মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা সোশাল মিডিয়ায় এবং তার বাইরে খাতা দেখার যেসব অভিজ্ঞতা বিবৃত করছেন সেগুলো খেয়াল করলেই বোঝা যাবে।

আরো পড়ুন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, কোভিডকাল এবং খুড়োর কল

পশ্চিমবঙ্গে ছাত্র রাজনীতির সুপ্রাচীন ইতিহাস রয়েছে। ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ইস্যু থেকে শুরু করে জাতীয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইস্যু নিয়েও আন্দোলন করে থাকে। কিন্তু কদিন আগে দেখা গেল আরও এক অভূতপূর্ব ঘটনা। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী আন্দোলন করল অফলাইন পরীক্ষা দেবে না বলে। তাদের অন্যতম যুক্তি ছিল, সিলেবাস শেষ করানো হয়নি। সেক্ষেত্রে পরীক্ষাই বাতিল হোক দাবি করলেও না হয় কথা ছিল। কিন্তু তারা পরীক্ষা দিতে রাজি, শুধু বাড়িতে বসে পরীক্ষা দেওয়ার স্বাধীনতা চায়। এই দাবির কারণ কি ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন আছে? এরা তবু কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী। বাবা-মা এদের মতামত নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। কিন্তু সদ্য স্কুল ছাড়তে অকৃতকার্য ছেলেমেয়েরা যে বাবা-মায়েদের সম্মতি ছাড়া রাস্তা অবরোধ করার সাহস পেত না, তা বলাই বাহুল্য। অনেক বাবা-মাকে তো সগর্বে ক্যামেরার সামনে বাইট দিতেও দেখা যাচ্ছে। একজন যেমন বলেছেন, যারা মোবাইলে বাংলায় মেসেজ করে তারা ইংরেজিতে পাস করে গেল আর তাঁর মেয়ে ইংরেজিতে মেসেজ করেও পাস করতে পারল না – এ অসম্ভব।

এই পরিস্থিতি হেসে উড়িয়ে দেওয়ার মত নয়। রিচার্ড ফাইনম্যান ইংরেজিতে খারাপ ছিলেন, অ্যালবার্ট আইনস্টাইন স্কুলজীবনে অঙ্কে দুর্বল ছিলেন – এইসব আবোল তাবোল কথা বলে এদের পাশে দাঁড়ালে সাড়ে সর্বনাশ। এই অকৃতকার্য শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকদের প্রতিক্রিয়া থেকে এক হাড় হিম করা সত্য বেরিয়ে আসছে। তা হল পড়াশোনা এবং পরীক্ষা ব্যবস্থার সংজ্ঞাগুলোই একেবারে উল্টে গেছে এই রাজ্যে। যেনতেনপ্রকারেণ নম্বর পেলেই হয় এবং নম্বর দেওয়া শিক্ষকদের কর্তব্য – এমন ধারণা সমাজের গভীরে প্রোথিত হয়েছে। আমরা সম্ভবত গণটোকাটুকির যুগে ফেরত যেতে চলেছি। এবার আর রাজনৈতিক অশান্তির কারণে নয়, সামাজিক সম্মতিপূর্বক।

২০১৫ সালে বিহারের একটা ছবি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল। আমেরিকার দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, ইংল্যান্ডের দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রভৃতি বিশ্বখ্যাত কাগজ এ নিয়ে দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। ছবিটা এরকম – পরীক্ষা হচ্ছে একটা স্কুলে, আর পরীক্ষার্থীদের বাবা-মায়েরা দেয়াল বেয়ে উঠে জানলা দিয়ে পরীক্ষার্থীদের সাহায্য করছেন। আগামীদিনে পশ্চিমবঙ্গে এরকম কিছু দেখা গেলে অবাক হবেন না। দয়া করে তখন আলোকচিত্রীকে গাল দেবেন না – এইটুকু অনুরোধ। তিনি সাংবাদিক, তাঁর কাজই ওই।

মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.