সরকার, সংবাদমাধ্যমের একটি অংশ এবং এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট ন্যাশনাল হেরাল্ড কাগজের প্রকাশক দি অ্যাসোসিয়েটেড জার্নালস লিমিটেড (এজেএল), হোল্ডিং কোম্পানি ইয়াং ইন্ডিয়ানের বিরুদ্ধে এবং সেই সূত্রে রাহুল গান্ধী ও কংগ্রেস দলের বিরুদ্ধে জনমানসে একগুচ্ছ অভিযোগ ছড়িয়ে চলেছে। টিভি চ্যানেলগুলোতে বিজেপি মুখপাত্রদের দ্বারা এত নির্লজ্জভাবে, এত ঘন ঘন, এত জোর দিয়ে অভিযোগগুলোর পুনরাবৃত্তি করা হয়, যে সন্দেহ হয় এরপর অভিযোগগুলোর যথাযথ তদন্ত হওয়া সম্ভব কিনা।

প্রকৃতপক্ষে ভারত সরকারের কাছে সমস্ত তথ্য, বার্ষিক ভিত্তিতে ফাইল করা হিসাবপত্র, এজেএল আর ইয়াং ইন্ডিয়ান – দুই প্রতিষ্ঠানেরই আর্থিক বিবৃতি রয়েছে। এগুলো পরীক্ষা করে সম্ভাব্য সমস্ত লেনদেন ট্র্যাক করা যেতে পারে। কিন্তু মজার কথা, অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও এখনো কারোর বিরুদ্ধে কোনো এফআইআর করা হয়নি – না এজেএলের বিরুদ্ধে, না ইয়াং ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে। সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী বা অন্য কোনো শেয়ারহোল্ডার বা এজেএল কিম্বা ইয়াং ইন্ডিয়ার ডিরেক্টরের বিরুদ্ধেও কোনো এফআইআর করা হয়নি এই লেখার সময় পর্যন্ত।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

কিছু সংবাদমাধ্যম চলতি সপ্তাহে সরকার এবং কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলো থেকে ফাঁস হওয়া তিনটে ভিত্তিহীন বিষয়কে ব্যবহার করে সোনিয়া এবং রাহুলকে অপমান করার চেষ্টা করেছে। কংগ্রেস সাংসদ রাহুলকে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট জেরার জন্য ডেকে পাঠানোর পর বিজেপির মুখপাত্র এবং বিজেপি-বান্ধব মিডিয়া নিম্নলিখিত অভিযোগগুলো প্রচার করতে প্রচণ্ড পরিশ্রমও করেছে:

১। ইয়ং ইন্ডিয়ান নামের দাতব্য প্রতিষ্ঠানটি বেআইনিভাবে ১৯৩৭ সালে প্রতিষ্ঠিত দি অ্যাসোশিয়েটেড জার্নালস লিমিটেডের সম্পত্তি আত্মসাৎ করেছে।

২। আসলে ইয়াং ইন্ডিয়ানের শেয়ারহোল্ডার সোনিয়া, রাহুল আর প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভাদরাই (আরও অনেকের সঙ্গে) এজেএল-এর ২০০০ কোটি টাকা মূল্যের সম্পত্তির মালিক।

৩। এজেএল থেকে ইয়াং ইন্ডিয়ানে টাকা সরানো হয়েছে এবং এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট এখন সেই তহবিল তছরুপেরই তদন্ত করছে।

২০১৫ সালে বিজেপি সরকার আয়কর আইনের যে সংশোধনগুলো করেছিল, তার ফলে ২০১৬ সালে আয়কর ছাড় পাওয়ার জন্য ইয়াং ইন্ডিয়ানের মূল রেজিস্ট্রেশন সারেন্ডার করা হয়েছিল। তা নিয়েও ইচ্ছাকৃতভাবে বহু ধন্দ তৈরি করা হয়েছে। ইডির রাহুলকে জিজ্ঞাসাবাদ করা উপলক্ষে দিল্লিতে ঢালাও নিরাপত্তার আয়োজন করা হয়েছে, কংগ্রেস কর্মীদের শান্তিপূর্ণ মিছিল বের করার অনুমতি দেওয়া হয়নি, কংগ্রেস নেতাদের গ্রেপ্তার এবং মারধর করা হয়েছে এবং শেষমেশ ১৫ জুন পুলিস কংগ্রেসের সদর দপ্তরে ঢুকে পড়েছে। এখন স্পষ্ট, যে এসব করার আসল উদ্দেশ্য ছিল হিংসায় প্ররোচনা দেওয়া। এই অবস্থায় কিছু কথা সুস্পষ্টভাবে বলা দরকার।

প্রথমত, দি অ্যাসোসিয়েটেড জার্নালস লিমিটেডের সমস্ত সম্পত্তি তার দখলেই রয়েছে। সেইসব সম্পত্তির মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণ মোটেই ইয়াং ইন্ডিয়ানের হাতে নেই।

দ্বিতীয়ত, প্রিয়াঙ্কার সঙ্গে ইয়াং ইন্ডিয়া বা দি অ্যাসোসিয়েটেড জার্নালস লিমিটেডের কোনো সম্পর্কই নেই। যদিও বিজেপি প্রচার করছে তিনি ইয়াং ইন্ডিয়ানের একজন শেয়ারহোল্ডার ও ডিরেক্টর।

তৃতীয়ত, ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত ইয়ং ইন্ডিয়ানের কোনো শেয়ারহোল্ডার বা ডিরেক্টর কোনোদিন বেতন, ভাড়া, খরচ, ভাতা, সিটিং ফি, লভ্যাংশ, স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর বা অন্য কোনো উপায়ে এজেএল বা ইয়াং ইন্ডিয়ানের থেকে একটি পয়সাও নেননি।

চতুর্থত, যেহেতু ইয়াং ইন্ডিয়ান কোম্পানি আইন, ১৯৫৬-র ২৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী গঠিত একটি দাতব্য অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, সেহেতু এই প্রতিষ্ঠান চালু থাকার সময়ে তো বটেই, এমনকি কোনোদিন বন্ধ হয়ে গেলেও কোনো ব্যক্তি বা কোম্পানিকে অস্থাবর সম্পত্তি বা শেয়ার হস্তান্তর করতে পারবে না। একমাত্র আরেকটি ২৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী তৈরি দাতব্য অলাভজনক প্রতিষ্ঠানকেই হস্তান্তর করতে পারে। অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হওয়ার কারণে ইয়াং ইন্ডিয়ান কোনো লভ্যাংশও ঘোষণা করতে পারে না। এজেএল আর ইয়াং ইন্ডিয়ার মধ্যে কোনো আর্থিক লেনদেন হয়নি, ইয়াং ইন্ডিয়ার শেয়ারহোল্ডার এবং ডিরেক্টরদের কোনো লভ্যাংশ বা অন্য কোনোরকম টাকাপয়সাও দেওয়া হয়নি। সুতরাং টাকা সরানোর প্রশ্নই ওঠে না। প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী পি চিদাম্বরম এইজন্য বলেছেন “টাকা সরাতে গেলে আগে টাকা থাকতে হয়।”

সুতরাং সোনিয়া, রাহুল জালিয়াতি করে ২০০০ কোটি টাকার সম্পত্তি আত্মসাৎ করেছেন – এমন বলা ভিত্তিহীন এবং অবমাননাকর। একথা সত্য, যে ২০০১-০২ এবং ২০১০-১১ সালে চেকের মাধ্যমে ১০০ দফায় এজেএল-কে ৯০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছিল। সেই টাকার দুই তৃতীয়াংশ বহু বছর ধরে দি অ্যাসোশিয়েটেড জার্নালস লিমিটেডে কর্মরত সাংবাদিক এবং অসাংবাদিক কর্মীদের বেতন, পিএফ, গ্র্যাচুইটি, ভিআরএস এবং অন্যান্য বিধিবদ্ধ পাওনা মিটিয়ে দিতে কাজে লাগানো হয়েছে। ২০০৮ সাল থেকে লোকসান ক্রমশ বাড়তে থাকায় এজেএল কিছুদিনের জন্য পত্রপত্রিকা প্রকাশ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছিল। সেইসময় বাকি পড়ে যাওয়া কর, বিদ্যুতের বিল এবং অন্যান্য বকেয়া টাকাপয়সাও ওই ঋণের সাহায্য মেটানো হয়েছে।

প্রাক-স্বাধীনতা যুগে এজেএল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন জওহরলাল নেহরু, কৈলাশনাথ কাটজু, রফি আহমেদ কিদোয়াই, আচার্য নরেন্দ্র দেব, পুরুষোত্তম দাস ট্যান্ডনের মত স্বাধীনতা সংগ্রামী তথা কংগ্রেস নেতারা। বস্তুত, ১৯৩৭ সালে এজেএল প্রতিষ্ঠার যে মেমোর‍্যান্ডাম অফ অ্যাসোসিয়েশন তৈরি হয়েছিল, তাতে স্পষ্ট বলা আছে, এজেএলের যে কোনো প্রকাশনা, পত্রিকা বা সাময়িকীকে কংগ্রেসের নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে। নেহরু একবার ন্যাশনাল হেরাল্ড বন্ধ হওয়া ঠেকাতে এলাহাবাদের পৈতৃক বাড়ি ‘আনন্দ ভবন’ বিক্রি করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ১৯৩৭ সালেই প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল হেরাল্ড এবং এজেএল প্রকাশিত অন্য সংবাদপত্রগুলো স্বাধীনতা সংগ্রামে এবং স্বাধীনতার পরেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। কে রামা রাও, চালাপতি রাও এবং খুশবন্ত সিংয়ের মত সম্পাদকরা এই কাগজগুলোর দায়িত্ব সামলেছেন। ন্যাশনাল হেরাল্ড সম্ভবত দেশের প্রথম ইংরেজি সংবাদপত্র, যা সেন্সরশিপের প্রতিবাদে সম্পাদকীয় স্তম্ভ ফাঁকা রেখেছিল। ইংরেজ আমলে একসময় কর্মচারীরা কমিউনিটি কিচেন স্থাপন করে অফিসে থেকে, স্বেচ্ছায় কম পারিশ্রমিক নিয়েও কাগজ বের করেছেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এর গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা এবং নেহরুসহ প্রবাদপ্রতিম কংগ্রেস নেতাদের ন্যাশনাল হেরাল্ডের সঙ্গে যে আত্মিক যোগ, তা মাথায় রেখেই কংগ্রেস বিপদের সময়ে এজেএলকে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

আরো পড়ুন কংগ্রেস কর্মী, সমর্থকদের নতুন উৎসাহ জোগাল চিন্তন শিবির

সেইসময় সংস্থার এমন লোকসান হচ্ছিল যে কর্মচারীদের বেতন দেওয়া যাচ্ছিল না। সাংবাদিক এবং অন্যান্য কর্মচারীরা চরম আর্থিক দুরবস্থার মধ্যে পড়েছিলেন। তখন কংগ্রেস ঋণ না দিলে এই প্রকাশনা সংস্থা চিরতরে বন্ধ হয়ে যেত। ২০০৮ সালে পত্রপত্রিকা প্রকাশ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সময়ে স্পষ্ট বোঝা গিয়েছিল যে এজেএল সকলের সমস্ত বকেয়া মিটিয়ে দেওয়ার পর এই ঋণ শোধ করার অবস্থায় নেই। এরপর এজেএল পুনর্গঠন এবং কোম্পানির পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা শুরু হয়।

এজেএলের শেয়ারহোল্ডাররা ২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে এক বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে ইয়াং ইন্ডিয়ানকে কোম্পানির শেয়ার ইস্যু করা অনুমোদন করেন। ইয়াং ইন্ডিয়ানকে শেয়ার বরাদ্দ করার পর ৯০ কোটি টাকার ঋণ ইকুইটিতে রূপান্তরিত হয় এবং এজেএলের খাতা থেকে ওই ঋণের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়। এই রুটিন কর্পোরেট পুনর্গঠনের ফলে কী ঘটে? প্রথমত, এজেএলের অস্তিত্বের সংকট কেটে যায় এবং সংবাদপত্র ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের পুনরুজ্জীবনের জমি তৈরি হয়। দ্বিতীয়ত, ঋণ ইকুইটিতে রূপান্তরিত হওয়ায় বহু বছর পরে এজেএলের ব্যালান্স শীট স্বাস্থ্য ফিরে পায়। উপরন্তু, দাতব্য অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এজেএল বা ইয়ং ইন্ডিয়ার কোনো শেয়ারহোল্ডার বা ডিরেক্টরের ব্যক্তিগতভাবে ফুলে ফেঁপে ওঠার সম্ভাবনাও নির্মূল করা সম্ভব হয়। অথচ ২০১১ সালের ওই বৈঠকই এখন বিজেপি তথা সঙ্ঘ পরিবারের মিথ্যাচারের মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রকাশনা সংস্থার সফল পুনরুজ্জীবনের ফলে এজেএল এখন নতুন দিল্লি, পঞ্চকুলা আর মুম্বাই থেকে ইংরেজি ও হিন্দিতে দুটি সাপ্তাহিক সংবাদপত্রের সাতটি সংস্করণ প্রকাশ করে। এছাড়াও ইংরেজি, হিন্দি এবং উর্দুতে এজেএলের তিনটি ওয়েবসাইট রয়েছে (https://www.nationalheraldindia.com/, https://navjivanindia.com/, https://qaumiawaz.com/)। এজেএল যেসব সম্পত্তির মালিক, বিজেপি সরকারের আয়কর বিভাগই তার মূল্য হিসাব করেছে ৩৫০ কোটি টাকা। কংগ্রেস তথা গান্ধী পরিবারের নামে কুৎসা ছড়াতে সদাব্যস্ত সুব্রহ্মণ্যম স্বামী এই ২০০০ কোটি টাকার অঙ্কটি কোথায় পেলেন তিনিই জানেন।

তাহলে এই হইচই কিসের জন্য?

আসলে নরেন্দ্র মোদীর সরকার নিজের ব্যর্থতা থেকে মানুষের নজর ঘুরিয়ে দিতে যে কোনো পর্যায়ে নামতে পারে এবং নামবে। আগেও বহুবার তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। গুজরাট ও হিমাচল প্রদেশের নির্বাচন সামনে। প্রতিপক্ষ হিসাবে কংগ্রেস অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়লেও ক্ষমতাসীন বিজেপি খুব একটা স্বস্তিতে নেই। তাই ওই দুই রাজ্যের প্রধান বিরোধী দলের সবচেয়ে বড় সর্বভারতীয় নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বাজিমাত করার এই চেষ্টা। মনে রাখতে হবে, রাহুল এমন একজন বিরোধী নেতা যিনি এই সরকারের কার্যকলাপকে ধারাবাহিকভাবে প্রশ্ন করে চলেছেন, সে রাফালে কেলেঙ্কারিই হোক আর বেকারত্ব বা কোভিড অতিমারীকালীন অব্যবস্থা নিয়েই হোক। এমন নেতাকে ঘন্টার পর ঘন্টা জেরার মুখে ফেলে ব্যস্ত রাখা একাধারে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা এবং তাঁকে কিছু সময়ের জন্য চুপ করিয়ে রাখার চেষ্টা।

~ মতামত ব্যক্তিগত, তথ্য লেখকের

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.