রাহুল মুখার্জি

সম্প্রতি উদয়পুরে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের বহুপ্রতীক্ষিত চিন্তন শিবির শেষ হয়েছে। বহুপ্রতীক্ষিত, কারণ শেষবার এমন চিন্তন শিবিরের আয়োজন করা হয়েছিল ২০১৩ সালে জয়পুরে। উদয়পুর আর জয়পুরের দূরত্ব প্রায় ৪০০ কিলোমিটার। কিন্তু কংগ্রেস রাজনীতির দিক থেকে দেখলে দুই শহরের মধ্যে নয় বছরের ব্যবধান। চিন্তন শিবির জয়পুর থেকে উদয়পুরে এসে পৌঁছতে পৌঁছতে দিল্লি আক্ষরিক অর্থে এবং রাজনৈতিকভাবে কংগ্রেসের পক্ষে বহুত দূর হয়ে গেছে।

উদয়পুরের চিন্তন শিবির থেকে কিছু জটিল বিষয় সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে বলে আশা করা হয়েছিল। বিষয়গুলো হল – ১) দলের নেতৃত্ব, ২) সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত, ৩) আঞ্চলিক দলগুলোর সাথে জোট এবং ৪) জাতীয় স্তরের উপযোগী একটা বয়ানের (narrative) খোঁজ।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

রাহুল গান্ধীকে শীর্ষ নেতৃত্বে ফেরার জন্য চাপ দেওয়া হয়ত চিন্তন শিবিরের এজেন্ডার মধ্যে ছিল না, কিন্তু নেপথ্যে এই ভাবনা নিশ্চয়ই কাজ করেছে। রাহুল যেভাবে দিল্লি থেকে উদয়পুর পর্যন্ত বারো ঘন্টার ট্রেনযাত্রা করেছেন এবং তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে সেখানে জড়ো হওয়া কংগ্রেস সমর্থকদের সঙ্গে দেখা করার জন্য বেশ কয়েকটা স্টেশনে নেমেছেন, তা থেকে এ কথা স্পষ্ট। যদিও শেষপর্যন্ত নেতৃত্বের প্রশ্নটা এ বছরের শেষের দিকে দলীয় নির্বাচনের জন্য ফেলে রাখা হয়েছে, তবু সমর্থকদের জড়ো হওয়া এবং রাহুলের সঙ্গে তাদের সাক্ষাৎ প্রমাণ করে যে তিনি এখনো দলের কর্মীদের এক নম্বর পছন্দ।

কয়েকটা সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত চিন্তন শিবির থেকে ঘোষিত হয়েছে। যেমন

  • এক ব্যক্তি এক পোস্ট
  • সাংগঠনিক কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট মেয়াদ
  • একটি পরিবার একটি টিকিট নীতি। ব্যতিক্রম ঘটাতে হলে পরিবারের দ্বিতীয় সদস্যের অন্তত পাঁচ বছর পার্টির সেবা করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে
  • ৫০% পদ ৫০ বছরের কম বয়সীদের দিয়ে পূরণ করতে হবে

তৃতীয় সিদ্ধান্তটাকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যে ব্যাখ্যা সবচেয়ে বেশি ভেসে বেড়াচ্ছে তা হল, গান্ধী পরিবারকে নিজেদের জায়গা ধরে রাখার সুযোগ দেওয়ার জন্য একটা ফাঁক রাখা হল। কিন্তু সত্যিটা হল, আরও অনেক পরিবারই এই নিয়মের সুবিধা পাবে। একটা কথা স্পষ্ট করে বলা দরকার। রাজনৈতিক ভাষ্যকাররা পরিবারতন্ত্র নিয়ে আলোচনা করার সময়ে কংগ্রেসের প্রতি, বিশেষ করে গান্ধী পরিবারের প্রতি খুব সুবিচার করেননি। যে কোনো রঙের, যে কোনো মতাদর্শের রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে তাকান। জাতীয় দল থেকে শুরু করে আঞ্চলিক দল – প্রত্যেকটা দলের নেতৃত্বে একই পরিবারের দু-তিনটে প্রজন্ম এসেছে। এমনকি বামপন্থী দলগুলোও এই প্রবণতামুক্ত নয়। এটা রাজনীতির এমন এক অপ্রিয় সত্য, যা আমাদের মেনে নিতে হবে। পরিবারতন্ত্র শুধু ভারতে চলে এমনও নয়। বাংলাদেশে মুজিবর রহমানের মেয়ে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, পাকিস্তানের ভুট্টো পরিবারের কথাও আমরা জানি। শ্রীলঙ্কায় একসময় মা সিরিমাভো বন্দরনায়েকে আর মেয়ে চন্দ্রিকা কুমারতুঙ্গে একইসঙ্গে যথাক্রমে প্রধানমন্ত্রী আর রাষ্ট্রপতি ছিলেন। কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর বাবাও প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, আমেরিকার বুশদের দুই প্রজন্ম রাষ্ট্রপতি হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার নেতা সুকর্ণর ছেলেমেয়েরাও নেতৃত্বে এসেছেন।

উদয়পুরের চিন্তন শিবিরে যা নিয়ে অনেক বিতর্ক, এমনকি মতপার্থক্যও হয়েছে, তা হল জোটের প্রশ্ন। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মধ্যে সেই পার্থক্য প্রতিফলিত হয়েছে। একদিকে শিবিরের শেষে প্রকাশিত উদয়পুর ডিক্লেয়ারেশনে বলা হয়েছে, কংগ্রেস সমমনোভাবাপন্ন দলগুলোর সঙ্গে নির্বাচনী জোট গড়ার ব্যাপারে মুক্তমনা। অন্যদিকে সমাপ্তি ভাষণে প্রাক্তন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল আঞ্চলিক দলগুলোকে তীব্র আক্রমণ করেছেন।

চিন্তন শিবিরের শেষে প্রকাশিত উদয়পুর সনদে বলা আছে “যদিও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস সাংগঠনিক ক্ষমতার ভিত্তিতে সর্বত্র তৃণমূল স্তরে নিজের শক্তি প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তবু জাতীয়তাবাদ এবং গণতন্ত্র রক্ষার স্বার্থে আমরা সমস্ত সমমনোভাবাপন্ন দলের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করতে দায়বদ্ধ। পরিস্থিতি অনুযায়ী জোটের পথও খোলা থাকবে।”

পাঁচমারি সনদ (১৯৯৮) আর সিমলা সনদ (২০০৩)-এর মধ্যে উদয়পুর সনদ ভারসাম্য আনল বলে ভাবা যেতে পারে। প্রথমটা কংগ্রেসকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করে তোলার কাজকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল, দ্বিতীয়টায় বলা হয়েছিল বিজেপিকে পরাস্ত করতে কংগ্রেসের অন্য দলগুলোর সঙ্গে নির্বাচনী জোট তৈরি করা উচিত।

এই জোট নিয়ে রাজনৈতিক ইস্যু কমিটিতে গভীর আলোচনা হয়েছে। এক দল নেতা বলেছিলেন, আঞ্চলিক দলগুলোকে জায়গা ছেড়ে দেওয়ার পরিবর্তে দলীয় সংগঠনকে শক্তিশালী করার দিকে মন দেওয়া উচিত। বিধানসভা নির্বাচনগুলোতে জোট করলেও জাতীয় স্তরে এককভাবে লড়ার প্রস্তাবও উঠে এসেছিল। জি-২৩ স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে একজন বললেন “মোটামুটি তিন ধরনের রাজ্য আছে। এক, যেখানে কংগ্রেস বিজেপির বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াইয়ে রয়েছে। দুই, যেখানে তৃতীয় পক্ষ আছে। আর তিন, যেখানে কংগ্রেস প্রান্তিক শক্তি। প্রত্যেকটা রাজ্যের পরিস্থিতির উপর ভিত্তি করে জোট সম্পর্কে আলাদা আলাদা সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।”

তেলেঙ্গানার নেতারা তেলেঙ্গানা রাষ্ট্র সমিতির সাথে কোনোরকম জোটে যাওয়ার স্পষ্ট বিরোধিতা করেছেন। অন্ধ্রপ্রদেশের নেতাদের একাংশ বলেছেন রাজ্যে ওয়াইএসআরসিপির সাথে জোট করার কথা ভেবে দেখা উচিত। বাংলায় তৃণমূল কংগ্রেসের সাথে জোট করা হবে, নাকি বামেদের সঙ্গে? নাকি একেবারে একাই লড়া হবে? তা নিয়ে মতপার্থক্য ঘটেছে।

চতুর্থ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে জিনিসটার প্রত্যাশা উদয়পুরের কাছে ছিল, সেটা হল ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে লড়ার মত একটা জোরালো বয়ান। তা সবচেয়ে বড় এবং সুদূরপ্রসারী যে বয়ানটা উঠে এসেছে, সেটা ভারতীয় জনতা পার্টির হাত থেকে “জাতীয়তাবাদী” ব্যাটনটা ছিনিয়ে নেওয়ার বয়ান। কংগ্রেসের এই জাতীয়তাবাদী ঘোষণার বেশিটাই রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা মল্লিকার্জুন খাড়গের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক ইস্যু কমিটির আলোচনার পরিণাম। প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক ইস্যু কমিটির বৈঠকে কয়েকজন নেতা বলেছিলেন জাতীয়তাবাদকে “পুনরুদ্ধার” করা কথা বললে হবে না, বরং বলতে হবে “ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসই ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রতিনিধিত্ব করে”। আর বিজেপি যে জাতীয়তাবাদের কথা বলে তা জাতীয়তাবাদের “বিকৃতি” বা “ছদ্ম জাতীয়তাবাদ”। রাজনৈতিক ইস্যু কমিটির সদস্য এক নেতা বললেন, খাড়গে আলোচনাটা শুরু করেন কংগ্রেস কেন “প্রকৃত জাতীয়তাবাদী” সে সম্পর্কে ২০ মিনিটেরও বেশি সময় ধরে এক আবেগপ্রবণ ভাষণ দিয়ে। তারপর যে নেতারা বক্তৃতা দেন, অধিকাংশই একমত হন, যে কংগ্রেসের জাতীয়তাবাদী পরিচয় তুলে ধরা দরকার এবং “ছদ্ম জাতীয়তাবাদ”-এর “মুখোশ খুলে দিতে হবে”। খাড়গের সাংবাদিক সম্মেলনে এই আলোচনার প্রভাব স্পষ্ট ছিল।

উদয়পুর চিন্তন শিবিরকে যেভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরা হয়েছে, তার মধ্যেও বিজেপির হাত থেকে জাতীয়তাবাদের মালিকানা ছিনিয়ে নেওয়ার প্রয়াস স্পষ্ট। অনুষ্ঠানস্থলে যাওয়ার রাস্তাটা শহীদ ভগৎ সিং, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল, সরোজিনী নাইডু, ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ, জওহরলাল নেহরু, গোপাল কৃষ্ণ গোখলে এবং লালা লাজপত রায়ের মত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ছবি এবং উদ্ধৃতিওলা ফ্লেক্সে সাজানো ছিল। এছাড়াও ফ্লেক্সে ছিলেন স্বাধীনোত্তর ভারতের কংগ্রেস নেতা ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধী, পিভি নরসিমা রাও, এবং ডঃ মনমোহন সিং। এসব দেখে মনে হয়, কংগ্রেস সিদ্ধান্ত নিয়েছে, দেশের প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্বদের আত্মসাৎ করার বিজেপির চক্রান্তের মোকাবিলা করতে এবং কংগ্রেস অতীতে নেহরু-গান্ধী পরিবারকে অত্যধিক গুরুত্ব দিয়েছে এমন সমালোচনার জবাব দিতে নানারকম ভাবনার আইকনদের গুরুত্ব দেওয়া হবে। শুধুই একটা পরিবারের বাইরে তাকানো নয়, জাতীয়তাবাদী অবস্থানের ভিতরকার যে আদর্শগত বৈচিত্র্য, এটা সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টাও বটে। বামপন্থী শহিদ ভগৎ সিং থেকে শুরু করে ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ, লালা লাজপত রায় এবং পিভি নরসিমা রাওয়ের মত দক্ষিণপন্থীকে একই পংক্তিতে সেই কারণেই রাখা। কংগ্রেস জাতীয় নিরাপত্তা, সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ এবং অর্থনীতির প্রশ্নে উদার মধ্যপন্থী রাজনৈতিক অবস্থানে ফিরে যেতে চায়।

২০১৩ সালে জয়পুর চিন্তন শিবিরের মূল মঞ্চে ফ্লেক্সে ছিল তিনজনের ছবি – সোনিয়া গান্ধী, ডঃ মনমোহন সিং এবং রাহুল গান্ধী। এবার সাংবাদিক সম্মেলনের জন্য মঞ্চে যে ফ্লেক্স লাগানো হয়েছিল তাতে দলের নেতারা ছিলেন না, ছিল মহাত্মা গান্ধীর ডান্ডি মার্চ নিয়ে একটা আর্টওয়ার্ক। তার মধ্যেই কী হতে চলেছে তার ইঙ্গিত ছিল।

যে ঘোষণাটা পার্টির কট্টর কর্মী, সমর্থকদের সবচেয়ে বেশি উৎসাহিত করেছে তা হল কন্যাকুমারী থেকে কাশ্মীর পর্যন্ত ভারত জোড়ো যাত্রার ঘোষণা। দোসরা অক্টোবর, অর্থাৎ গান্ধী জয়ন্তী থেকে, শুরু হবে এই যাত্রা। মনে করা হচ্ছে এটা জাতীয় ঐক্য ও সম্প্রীতি রক্ষার জন্য কংগ্রেসের ডাক। এই মিছিলে রাহুল গান্ধী এবং অন্যান্য নেতারা নেতৃত্ব দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। ভোটারদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ব্যাপারে পদযাত্রার কোনো বিকল্প নেই। ওয়াইএসআর তা দেখিয়ে দিয়েছিলেন, দিগ্বিজয় সিংও দেখিয়েছেন। এতে একেবারে মাটির কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া যায়, সরকার নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যমের গণ্ডির বাইরে গিয়ে নিজেদের বার্তা পৌঁছে দেওয়া যায়। কেন ভারত জোড়ো যাত্রা? কারণ ঐক্য ও সম্প্রীতি হল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের মতাদর্শগত ভিত্তি। এমন একটা অনুশীলন শুরু করার জন্য দোসরা অক্টোবরের চেয়ে ভাল দিন আর কী হতে পারে?

এই চিন্তন শিবিরের ফলে কংগ্রেসের কোনো উল্লেখযোগ্য লাভ হয় কিনা সেটাই এখন দেখার। যা যা ঘোষণা করা হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়িত হলে কোনো নির্বাচনী সুবিধা হবে কিনা তা বলবে সময়।

লেখক ভারতীয় রাজনীতির উৎসাহী পর্যবেক্ষক, ইতিহাসে আগ্রহী। ব্র্যান্ড কনসাল্টেন্সি এবং ভ্রমণ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। মতামত ব্যক্তিগত

আরো পড়ুন

প্রশান্ত কিশোর ভারতীয় রাজনীতির বিপথগামিতার লক্ষণ

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.