সায়ক ঘোষ চৌধুরী

প্রশান্ত কিশোর পাণ্ডে ওরফে পিকে কংগ্রেসের শীর্ষনেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় কংগ্রেসের সংগঠনের ভবিষ্যৎ কাঠামো এবং নির্বাচনী সম্ভাবনা নিয়ে বৈঠক করেছেন। যখন পিকের কংগ্রেসে ঢোকা প্রায় নিশ্চিত বলে সংবাদমাধ্যমে চর্চা চলছে, সেই সময়ে কংগ্রেসের সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ রণনীতি ঠিক করতে ১২-১৫ মে ২০২২ জয়পুরে চিন্তন শিবির করার সিদ্ধান্ত নেন এবং প্রশান্ত কিশোরকে এমপাওয়ার্ড অ্যাকশন গ্রুপ (EAG) -এর সদস্য হওয়ার কথা বলেন। প্রশান্ত কিশোরের লক্ষ্য ছিল, কংগ্রেস সভানেত্রীর প্রধান উপদেষ্টার পদটি, যাতে তিনি শুধু সোনিয়ার কাছেই জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকেন এবং বিনা বাধায় তাঁর পছন্দসই পরিবর্তনগুলো করতে পারেন। তেমন পরিবর্তনের কিছু নমুনা তিনি তৃণমূল কংগ্রেসে করে দেখিয়েছেন। কিন্তু কংগ্রেস শীর্ষনেতৃত্বের সঙ্গে প্রশান্ত কিশোরের কথা যেখানে আটকে গেল বলে মনে করা হচ্ছে, সেগুলো হল

(১) অন্যান্য আঞ্চলিক দলের মতো ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস নির্বাচনী সাফল্যের প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে নিজেদের সংগঠন সংক্রান্ত সমস্ত সিদ্ধান্ত প্রশান্ত কিশোরের হাতে তুলে দিতে রাজি হয়নি।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

(২) প্রশান্ত কিশোর বুঝতে পেরেছিলেন যে কংগ্রেসের পরামর্শদাতা হতে গেলে, বা সোজা কথায় ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের প্রচারের দায়িত্ব নিতে গেলে কংগ্রেসে প্রবেশ করা ছাড়া কোনো গতি নেই। কিন্তু তিনি নিজের সংস্থা আইপ্যাককে নিজের থেকে আলাদা দেখিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস, তেলেঙ্গানা রাষ্ট্রীয় সমিতি, ওয়াইএসআর কংগ্রেস, আম আদমি পার্টির পরামর্শদাতা হিসাবে কাজ চালিয়ে যেতে চাইছিলেন। এটা কংগ্রেস নেতৃত্ব মানতে রাজি হননি। অনেকে পিকের আদর্শগত অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং এ কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন যে প্রশান্ত কিশোর তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী চলা আঞ্চলিক দলগুলোর সঙ্গে জোটে তাদের শর্তেই কংগ্রেসকে জুনিয়র পার্টনার করতে চাইছিলেন। তেলেঙ্গানার মতো রাজ্যে কংগ্রেস প্রধান বিরোধী দল। সেখানে কেন কংগ্রেসের অস্তিত্ব বিলীন করে কে চন্দ্রশেখর রাওকে নেতা মানতে হবে, তার কোনো সদুত্তর প্রশান্ত কিশোর দিতে পারেননি।

(৩) প্রশান্ত কিশোর নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি থেকে শুরু করে নীতিশ কুমারের জনতা দল (সংযুক্ত) হয়ে ডিএমকে, আপ, তৃণমূল কংগ্রেস, ওয়াইএসআর কংগ্রেস, টিআরএস – সবার সঙ্গে কাজ করেছেন। এমন লোকের হঠাৎ করে কংগ্রেসে এসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটা পদে আসীন হয়ে যাওয়া কি সমীচীন? অনেকে চাইছিলেন প্রশান্ত কিশোর কংগ্রেসে যোগ দিয়ে কংগ্রেসি আদর্শের উপরে তাঁর বিশ্বাস প্রমাণ করুন। কারণ একটা রাজনৈতিক দল শুধুই একটা নির্বাচন জেতার যন্ত্র নয়, আদর্শই তার প্রধান চালিকাশক্তি। এই পরীক্ষা দিতে প্রশান্ত কিশোর আদৌ রাজি হলেন না।

প্রশান্ত কিশোরের কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে প্রথম থেকেই কিছু অভিযোগ রয়েছে। যেমন

(১) একজন ব্যক্তির মুখকে সামনে রেখে আকাশকুসুম প্রতিশ্রুতির ক্যাম্পেন চালান এবং এইভাবে একনায়কতন্ত্র তৈরি করেন, গণতন্ত্রের ক্ষতি করেন। কোনো জনপ্রিয় নেতার মুখ সামনে রেখে তিনি মুখ্যমন্ত্রী/ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরভিত্তিক আমলাতান্ত্রিক সরকার তৈরি করতে সাহায্য করেন। এমন ব্যবস্থায় মুখ্যমন্ত্রী বা তাঁর ঘনিষ্ঠ দু-একজনের হাতে সবকটা গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর থাকে। কাজের চেয়ে হোর্ডিং লাগিয়ে প্রচার হয় বেশি। ঠিক এই ধরনের একনায়ক পরিচালিত আমলাতান্ত্রিক সরকারই বৃহৎ পুঁজির প্রয়োজন। অনেক জনবিরোধী সিদ্ধান্ত শুধু হীরক রাজার মুখ দেখিয়ে চালিয়ে দেওয়া হয়। বেশিদূর যেতে হবে না। পশ্চিমবঙ্গেই মমতা ব্যানার্জির একার হাতে দশটা দপ্তর এবং পুরো দক্ষিণ কলকাতায় ওঁর বাড়ি থেকে মোটামুটি দু কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে প্রায় পুরো মন্ত্রিসভা বসবাস করেন। ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার এর চেয়ে বড় নিদর্শন আর কী হতে পারে?

(২) দলীয় নেতাদের এড়িয়ে শীর্ষ নেতার পরিবারের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন পিকে। তারপরে শীর্ষ নেতার পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের মধ্যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা তৈরি করে দলীয় সংগঠনের বারোটা বাজিয়ে দেন। একে এক রাজতন্ত্রই বলা চলে। পশ্চিমবঙ্গে যেমন পিকে মমতার ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ, তেলেঙ্গানাতে তেমনি আবার মুখ্যমন্ত্রী কেসিআরের পুত্র কেটিআরের ঘনিষ্ঠ। কংগ্রেসে প্রশান্ত কিশোরের টার্গেট ছিলেন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী।

(৩) প্রশান্ত কিশোর একজন দক্ষ হোর্ডিং ব্যবসায়ী। তিনি ভারতের সব নেতার মনেই কৃত্রিম ভয় বা কৃত্রিম স্বপ্ন তৈরি করার চেষ্টা করেন। একই সময়ে একাধিক নেতাকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখান এবং তাঁদের দিয়ে জনগণের করের টাকায় তৈরি হোর্ডিং সারা দেশজুড়ে লাগিয়ে বেড়ান। এর সম্পূর্ণ দায়িত্ব তাঁর সংস্থা আইপ্যাকের হাতে না ছাড়লে পিকে কাজ করতে রাজি হন না। পশ্চিমবঙ্গে এখন যেমন রাজ্যজুড়ে মুখ্যমন্ত্রীর ছবিওলা হোর্ডিং লাগানো হয় বিভিন্ন দপ্তরের কাজের বাজেট কাটছাঁট করে, একই পরামর্শ কংগ্রেসকেও দেওয়া হয়েছিল। এক কোটি স্কোয়ার ফুটে হোর্ডিং আর পাঁচ কোটি স্কোয়ার ফুটে দেওয়াল ছবি। কার মুখ থাকবে তা নির্দিষ্ট করতে পারলেই আগামী ১০০ সপ্তাহে সারা ভারতে এই ধরনের হোর্ডিং লাগানো হত।

এর খরচ কেমন? রাজধানী দিল্লিতে এমন হোর্ডিং লাগাতে ১,২৫০ টাকা/স্কোয়ার ফুট প্রতি সপ্তাহের খরচ। সারা ভারতে গড়ে ২৫০ টাকা/স্কোয়ার ফুট খরচ হলে ১০০ সপ্তাহ অমন হোর্ডিং সারা ভারতে লাগাতে খরচ পড়বে মোট ২০,০০০ কোটি টাকা। এর বরাত নিয়ন্ত্রণ করবে প্রশান্ত কিশোরের আইপ্যাক। এবার আন্দাজ করে দেখুন, পশ্চিমবঙ্গে অতগুলো হোর্ডিং লাগাতে তৃণমূল কংগ্রেস জনগণের কত টাকা প্রতি সপ্তাহে খরচ করে।

এখন প্রশ্ন, কংগ্রেসের হয়ে কাজ করতে প্রশান্ত কিশোর এত উৎসাহী ছিলেন কেন? কারণ কোনো আঞ্চলিক দল একটা রাজ্যের বাইরে নিজেকে ছড়াতে পারবে এমন সম্ভাবনা কম, কংগ্রেস কিন্তু আসমুদ্রহিমাচল বিস্তৃত। প্রশান্ত কিশোর জানেন, মোদী ম্যানিয়া ভারতে চিরস্থায়ী হওয়া সম্ভব নয়। খুব বেশি হলে ২০২৪ লোকসভা নির্বাচন, তারপর ভারত বিজেপির হাত থেকে নিষ্কৃতি চাইবে। এই মুহূর্তেও হিন্দি বলয়ের বাইরে বিজেপির নির্বাচনী সাফল্য সীমিত। ‘গোদি মিডিয়া’-র উপর মোদীর সম্পূর্ণ দখল সত্ত্বেও। মোদীর পরে উত্তরসূরির অভাবে প্রধান বিরোধী দল হিসাবে কংগ্রেসকে মানুষ ভাবতে শুরু করতে পারে। একটা জাতীয় দল তৈরি হতে বেশকিছু মানুষের কমপক্ষে ৫০ বছরের নিঃস্বার্থ পরিশ্রম লাগে। আঞ্চলিক দলগুলো ব্যক্তিনির্ভর। আজ পর্যন্ত একটা আঞ্চলিক দলও জাতীয় দল হয়ে উঠতে পারেনি। একজন জননেতার উত্থান পতনের সঙ্গে সঙ্গে তারও উত্থান পতন হয়।

আর সেই কারণেই একটা কৃত্রিম ভয়ের বাতাবরণ তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে কংগ্রেসের ক্ষমতা হারানো অংশ জি-২৩ আর বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে। বলা হয়েছে “কংগ্রেস শেষ হয়ে যাচ্ছে”। কিন্তু মজার কথা, নরেন্দ্র মোদীর এত বাড়বাড়ন্ত আরএসএস নেতাদেরও না পসন্দ। সেই কারণেই বিজেপির প্রাক্তন সর্বভারতীয় সভাপতি এবং আরএসএস ঘনিষ্ঠ নীতিন গড়করিকে মাঝেমধ্যেই মোদী সরকারের কিছু কাজের সমালোচনা করতে দেখা যায়।

এই অবস্থায় প্রশান্ত কিশোর ঠিক কী চাইছেন তা স্পষ্ট নয়। ওঁর নিজের ভাষায়,

(১) “আমার রাজনৈতিক ভাবধারা লেফট অফ সেন্টার…আমি একজন গান্ধীবাদী। তাই আমি শক্তিশালী কংগ্রেস চাই।”

(২) “আমি আজ পর্যন্ত যে যে দলের ভোটকুশলী হিসাবে কাজ করেছি, তাদের কারুর আমি সমর্থক নই। আমি নীতিশ কুমারের চিন্তাভাবনার সমর্থক ছিলাম। সিএএ-এনআরসি নিয়ে দলের সিদ্ধান্তে অখুশি হয়ে নিজের মনোভাব ব্যক্ত করায় আমাকে তাড়ানো হয়।”

(৩) “আমার লক্ষ্য রাজনীতিতে যোগদান। কিন্তু এমপাওয়ার্ড অ্যাকশন গ্রুপ কংগ্রেসে সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত নয়। কাজেই ওখানে আমার মতামত আদৌ গৃহীত হবে কিনা আমি নিশ্চিত নই।”

সোজা কথায়, প্রশান্ত কিশোর হাতের তাস দেখাননি। উনি আগামীদিনে কংগ্রেসে যোগদান করবেন কি করবেন না তা খোলসা করে বলেননি।

কিন্তু প্রশান্ত কিশোর কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন?

এক কথায় কংগ্রেস নেতৃত্বের অপদার্থতার কারণে। চিদাম্বরম স্বীকার করেছেন, কংগ্রেস সম্পর্কে যে পরিমাণ তথ্য প্রশান্ত জোগাড় করেছেন, তা কংগ্রেস নিজে জোগাড় করতে পারেনি। এর জন্য দায়ী কে? কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক, সোশাল মিডিয়া টিমের কাজ কী? শুধু “গান্ধী পরিবার জিন্দাবাদ” স্লোগান দেওয়া?

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের জয় সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে প্রশান্ত কিশোরের গ্রহণযোগ্যতা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। যদিও তাঁর নিজের মতে, কৌশলগতভাবে সেরা সাফল্য হল ২০১৭ সালে পাঞ্জাবে আম আদমি পার্টিকে ক্ষমতায় আসতে না দেওয়া। কিন্তু তৃণমূলের জয়ে সারা ভারতে এই ধারণা তৈরি করেছে যে নরেন্দ্র মোদীকে হারাতে হলে প্রশান্ত কিশোরকে চাই। কিন্তু লোকটি কতটা ব্যবসায়ী আর কতটা রাজনীতিবিদ, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে এখনো সন্দেহ আছে। ওঁর ভারতীয় নির্বাচন সম্পর্কে জ্ঞান প্রশ্নাতীত, কিন্তু সেই জ্ঞান আদৌ গণতন্ত্রের মঙ্গলের কাজে লাগবে কিনা তা নিশ্চিত নয়। এই রহস্যময়তার জন্যই পিকে এতটা কৌতূহলের উদ্রেক করেন। ওঁর ক্ষমতা বা অক্ষমতা নিয়ে চর্চা সত্বর থামার নয়।

কিন্তু এই চর্চা আমাদের ভুলিয়ে দিচ্ছে যে গণতন্ত্র আর রাজনীতি শুধুই নির্বাচন জেতার কৌশল, পাটিগাণিতিক যোগ বিয়োগ হতে পারে না। নীতি, বিচার, কর্মসূচি বাদ দিয়ে শুধুই নির্বাচনী রণকৌশল স্থির করা আসলে ভারতীয় রাজনীতির অপ্রতিরোধ্য অথচ দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা। পিকে এই বিপথগামিতার এক অন্যতম লক্ষণ।

লেখক কংগ্রেসি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। মতামত ব্যক্তিগত।

আরো পড়ুন

তৃণমূল কংগ্রেস ও গোয়া নির্বাচন: শূন্য শুধু শূন্য নয়

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.